বছর তিনেক আগেই বাংলাদেশ ছেড়ে নিউইয়র্ক আসে তাহমিদ আরমান। ১৯ বছর বয়সী তরুণ। বাবা-মাকে রেখে এখানে চলে এসেছে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণের জন্য। সে এমন এক সমাজ ব্যবস্থায় বেড়ে উঠেছে, যেখানে বাবা-মা তাদের সন্তানের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ আরমানের মতে তার বাবা তাকে সুযোগ দিয়েছে নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেয়ার। বলেছে, তারা আমাকে উৎসাহ দিয়েছে এখানে আসার জন্য।
ম্যানহাটনের বারুখ কলেজে যাওয়া তার প্রতিদিনকার রুটিন। অ্যাকাউন্টিংয়ে পড়াশোনা করে। কলেজ শেষে সোজা চলে যায় ব্রুকলিনের ইস্ট ফ্ল্যাটবুশ এলাকায়। তার অ্যাপার্টমেন্ট সেখানেই। তবে আজকাল আরমান চিন্তা করছে কুইন্সে গিয়ে বসবাস করার; আরো নির্দিষ্ট করে বললে কুইন্সের জ্যামাইকায়। সেখানে একটা ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে থাকা যাবে। যুক্ত থাকতে পারবে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে। তার বান্ধবী ও বান্ধবীর পরিবার বাংলাদেশী। তারাও বাস করে জ্যামাইকায়। আরমান বলেছিল, ‘ব্রুকলিনে
আমি কখনো বাসাতে খাই না। অথচ জ্যামাইকায় যেন পুরোদস্তুর নিজের খাবার।’
পরিসংখ্যান বলছে কুইন্সের জ্যামাইকা এবং জ্যামাইকা এস্টেটস-হলিসউডে বাংলাদেশী জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে চালানো জনশুমারি অনুযায়ী ২০০০-১০ সালের মধ্যে মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশী জনসংখ্যা ৫১৬ থেকে ৩ হাজার ৯৭৬ জন হয়েছে। অর্থাৎ বৃদ্ধির পরিমাণ ৬৭০ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে জ্যামাইকা-এস্টেটসে এই সময়ে জনসংখ্যা ২৫১ থেকে হয়েছে ১ হাজার ১৯৭ জনে। অর্থাৎ বৃদ্ধির পরিমাণ ৩০০ শতাংশের বেশি। পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক পরিচালিত আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভেতে (এসিএস) জনসংখ্যা বৃদ্ধির এ চিত্র আরো স্পষ্ট। জরিপ বলছে, ২০১০-১৪ সালের মধ্যে জ্যামাইকা এস্টেটস-হলিউসউডে বাংলাদেশী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯১ জনে। অন্যদিকে জ্যামাইকায় বাংলাদেশী এ সময়েই পরিণত হয়েছে ৫ হাজার ৮৫৫ জনে।
গ্রেটার জ্যামাইকা ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার জিম ডিয়োগো। বাংলাদেশী অভিবাসীরা সে অঞ্চলের সমৃদ্ধ নৃতাত্ত্বিক মিথস্ক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হচ্ছে বলেই তার বিশ্বাস। তার সংস্থা বিভিন্ন পরিকল্পনার মাধ্যমে আবাসন ব্যবস্থাকে আরো সাশ্রয়ী করে তুলেছে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাসিন্দারাও চলে আসছে জ্যামাইকায়। কারণ বলতে তার মতে, এটা যোগাযোগের প্রাণকেন্দ্রেই অবস্থিত। শহরের সাবওয়ে, রেলপথ কিংবা প্রয়োজনে কেনেডি এয়ারপোর্ট উড়োজাহাজ সেবাও বেশ সহজলভ্য।
ডিয়েগো বলেন, আবাসন ব্যবস্থা সাশ্রয়ী হওয়ায় এখানে বসবাস সহজ হয়ে উঠেছে, এ অঞ্চলে বিদ্যমান নানা ধরনের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বসবাসের আকর্ষণেও চলে আসছে নতুন বাসিন্দা। দক্ষিণ-পূর্ব কুইন্সে অনায়াসে তারা মানিয়ে নিতে পারে, অথচ অন্যান্য অঞ্চলে হয়তো সামর্থ্যে কুলিয়ে উঠতে পারত না।
ত্রিনিদাদ থেকে আসা চ্যানরাউটি জগলাল ২০ বছর ধরে বসবাস করছেন জ্যামাইকায়। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি বেশ বড়সড় জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন দেখেছেন। তার ভাষায়, প্রথম দিকে অধিকাংশ বাংলাদেশী বসবাস করত হাইল্যান্ড এভিনিউতে। ধীরে ধীরে তারা হিলসাইড এভিনিউ ও জ্যামাইকা এভিনিউতে সরে আসে। হিলসাইডের দোকানগুলো আগে ছিল স্প্যানিশ, শ্বেতাঙ্গ ও চীনা নাগরিকদের। এখন অধিকাংশ দোকানের দখল চলে গিয়েছে বাংলাদেশীদের হাতে। জ্যামাইকা এস্টেটস—এর ঠিক যেখানে হাইল্যান্ড এভিনিউ ও হিলসাইড এভিনিউ মিলিত হয়েছে, সেখানে যেন বাংলাদেশী সংস্কৃতির সুবিশাল সমাবেশ। দোকানগুলো বাহারি রকমের বাংলাদেশী খাবার সরবরাহ করে। গর্ব নিয়ে জানায় মুসলিম আইন মেনে তৈরি করা মাংসের খবর। সি-টাউন সুপারমার্কেটের মতো বড় ব্র্যান্ডের দোকানগুলোও এখন বিক্রি করে হরেক রকমের হালাল খাবার। সেখানের কাপড়ের দোকানগুলোয় পাওয়া যায় রঙ-বেরঙের শাড়ি, শেরওয়ানি ও ফুলেল নকশায় সূচিকর্ম করা ঐতিহ্যবাহী পোশাক। সেগুলো পরে মসজিদ কিংবা মন্দিরে যায় নারী ও পুরুষ। সন্ধ্যার দিকে হিলসাইড এভিনিউয়ের এসব কাপড়, মসলা ও বিভিন্ন খাবারের দোকান জনপূর্ণ হয়ে ওঠে। নতুন ব্যবসার উত্থানের জন্য ব্যবসা নিয়ে অন্য স্থানে চলে গিয়েছে ডানকিন’ ডোনাটসের দোকান, বন্ধ হয়ে গিয়েছে একটি ক্যারিবিয়ান রুটির দোকানও।
পরিসংখ্যান অনুসারে জ্যামাইকার জনসংখ্যা এরই মধ্যে বৈচিত্র্যময় রূপ ধারণ করেছে। ১০ হাজার ৭০ জন আফ্রিকান-আমেরিকান, ৭ হাজার ১৩২ জন ভারতীয়, ১ হাজার ৮২০ জন পুয়ের্তোরিকান এবং ২ হাজার ৪৩৮ জন ডোমিনিকানের বসবাস সেখানে। সেই বৈচিত্র্যে স্রোতে যোগ দিচ্ছে বাংলাদেশীরাও। এশিয়ান আমেরিকান ফেডারেশনের করা জনশুমারির তথ্যে দেখা যায় সম্প্রতি নিউইয়র্ক শহরে দ্রুতবর্ধনশীল জনগোষ্ঠীর একটি বাংলাদেশী। অনেক বাংলাদেশী এরই মধ্যে অ্যাস্টোরিয়া, জ্যাকসন হাইটস, এলহার্স্ট ও কুইন্স ভিলেজের মতো বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
ঢাকা হাজির বিরিয়ানি জ্যামাইকার একটি বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট। সহপ্রতিষ্ঠাতা কবিতা হোসাইন বিশ্বাস করেন, সেখানে আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশীরা আরো বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তিনি বলেন, আমার ভাই পাঁচ বছর আগে ব্যবসা শুরু করেছে। তিনি দেখেছেন এখানে বসবাসকারী ভারতীয়দের। একটা দোকানও খুলতে চাইলেন। বাংলাদেশী আর ভারতীয় খাবারে তো আর পার্থক্য নেই।
৪০ বছর ধরে বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে সেখানকার অলাভজনক সংস্থা ‘দ্য বাংলাদেশ সোসাইটি’। প্রচার সম্পাদক মাহফুজুল ইসলাম বি. রুমি মনে করেন সাংস্কৃতিক বন্ধনই বাংলাদেশী জনগণকে উৎসাহিত করে জ্যামাইকা এস্টেটস-হলিসউড, জ্যামাইকা, কুইন্স ভিলেজ, জ্যাকসন হাইটস এবং এলমহার্স্টে চলে আসতে। তিনি বলেন, জাতিসত্তার দিক থেকে আমরা ভিন্ন হতে পারি। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েই দক্ষিণ এশিয়ার দেশ। আমাদের মধ্যে এখনো খাবার, পোশাক, অলংকার ও ধর্মের দিক থেকে সাদৃশ্য বিরাজমান।
‘দ্য বাংলাদেশ সোসাইটি’ মূলত বাংলাদেশী অভিবাসীদের সেখানে সাংস্কৃতিক চর্চা, ধর্মপালন, ঈদ উদযাপন ও হালাল খাবারের সংস্থানে সাহায্য করে। বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশে ৯০ শতাংশ মুসলমান এবং ১০ শতাংশ হিন্দু জনসংখ্যার বসবাস। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও পালন করে সংস্থাটি। বিনামূল্যে কর্মসূচি পরিচালনা করে নিউইয়র্ক শহরে আসা মানুষকে বসবাসে এবং ট্যাক্স প্রদানের মতো কাজগুলোয় সহযোগিতার জন্য।
কবিতা হোসাইন বলেছেন, মহল্লাটিকে তার কাছে বাড়ির মতোই মনে হয়। ২০ বছর আগে বিয়ে করে স্বামীর সঙ্গে নিউইয়র্ক এসেছেন তিনি। তারপর আর ত্যাগ করেননি কুইন্স। অদূরেই জ্যামাইকা এস্টেটস-হলিসউড, যেখানে তার ভাই থাকে। ফলে যেকোনো স্থানের চেয়ে কুইন্সে থাকাটা কবিতার জন্য বেশ স্বস্তিকর। তিনি বলেন, আমি অন্য কোথাও যেতে চাই না। গায়ানা ও ভারতের প্রতিবেশী নিয়েই আমি সন্তুষ্ট। পারস্পারিক কোনো সমস্যা নেই আমাদের।
অনুবাদ: আহমেদ দীন রুমি





