আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রিতে পড়াশোনা করে সাউথ কোরিয়া থেকে পিএইচডি ও দু বছর পোস্টডক করি। এরপর  ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসি। এখানে চার বছর পোস্টডক করার পরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জব শুরু করি গত বছর। এখন সিনিয়র সায়েন্টিস্ট হিসেবে ম্যাসাচুসেটস স্টেটে একটা বায়োটেক কোম্পানিতে আছি। ফর্মুলেশন ও অ্যানালাইটিক্যাল সেকশনে মূলত আমার কাজ। বর্তমানে কভিড ভ্যাকসিন, ক্যানসার ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদি নিয়ে কাজ করছি। কভিড আমাদের অনেক বড় সমস্যার একটা পথ দেখিয়ে দিয়েছে, এভাবে ক্যানসার থেকে শুরু করে সব ধরনের রোগের চিকিৎসাই সম্ভব। প্রথমে ফাইজার আর মডার্নাই কভিডের টিকা তৈরি করেছে, কিন্তু এর চাহিদা প্রচুর। কারণ এটা নরমাল ফিভারের মতো হয়ে যাচ্ছে, যেটা থাকবে অনেকদিন। বিশ্বব্যাপী চাহিদা চিন্তা করলে দুটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পুরোটা সরবরাহ করা কঠিন। সেজন্য কীভাবে আরেকটু কার্যকারিতা বাড়িয়ে করা যায় তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর কাজ চলছে। ম্যাসাচুসেটসে বায়োটেকের প্রচুর কোম্পানি আছে। তারা নতুন নতুন টেকনোলজি নিয়ে আসছে। আমাদের এ কোম্পানি বেশি বড় না, এতে কর্মীর সংখ্যা ৭০ জনের মতো।

এ মুহূর্তে বাংলাদেশী আমি একাই। কিন্তু ম্যাসাচুসেটস স্টেটে প্রচুর বাংলাদেশী আছে। তারা ব্যবসা থেকে শুরু করে চাকরিসহ বড় ধরনের অনেক কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এখানে বাংলাদেশীদের বিভিন্ন সংগঠন আছে যারা গেট টুগেদারের আয়োজন করে। আমরা একসঙ্গে বাংলাদেশীরা মিলে সপ্তাহে দুদিন ব্যাডমিন্টন খেলি। এখানে বাংলাদেশীদের দোকান আছে, রেস্টুরেন্ট আছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশী কমিউনিটি খুব ভালো।

যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশী

বাংলাদেশীরা কমবেশি সব জায়গায়ই আছে। যেমন এখানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি, পোস্টডক করেছে এমন অনেক মানুষকে চিনি। এখান থেকে পোস্টডক করে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হয়েছেন এমনও অনেকের সম্পর্কে জানি। এছাড়া অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানে অনেকে কাজ করছে। সব জায়গায় বাংলাদেশীর বিচরণ আছে। কিন্তু আমি যেটা খেয়াল করেছি অন্য দেশীরা তাদের দেশের আরেকজনকে টেনে নেয়ার চেষ্টা করে, যে প্রবণতাটা বাংলাদেশীদের মধ্যে একটু কম।

আমি বাংলাদেশ থেকে বের হয়েছি ২০১০ সালে। তখন আমাদের ব্যাচ থেকে পিএইচডি করতে হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে। আর এখন যদি চিন্তা করি, আমাদের ঢাবির রসায়ন বিভাগের কথাই বলি বা অন্য যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই বলি, এখনকার ছেলেমেয়েরা অনেক স্মার্ট, অনেক কিছু জানে। আগে থেকেই জিআরই প্রিপারেশন নেয়, থার্ড ইয়ার, ফোর্থ ইয়ার থেকেই তারা প্রিপারেশন নেয়া শুরু করে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটা আমার মনে হয়, সরকার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কারোরই সুদূরপ্রসারী কোনো চিন্তাভাবনা নেই। কারণ কভিড থেকেই অনেক কিছু শেখার সুযোগ ছিল। আমি যেটি বলব কিছু কিছু জিনিস যেমন—একটা দেশের ইকোনমি, শিক্ষা ব্যবস্থা, গবেষণা এগুলো হওয়া উচিত যেকোনো প্রভাবমুক্ত। এগুলো চলবে স্বাধীনভাবে এবং সবসময় চলতে হবে। গবেষণাটা সবসময় চলতে হবে। এটার যে সুবিধা তা আমরা এখনো বুঝিনি। কভিড ভ্যাকসিন অনেক দেশ বানাচ্ছে, আমরা সেসব কিনছি। আমরা যদি প্রথমেই একটু চেষ্টা করতাম বা চাইলে এখনো চেষ্টা করা যায়, দেশ থেকে যদি কিছু উৎপাদন করা যায়। আমাদের যদি কোনো দুর্বলতা থাকে সেক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক বাংলাদেশী কাজ করে। আমার জানা মতে, ফাইজার, মডার্নাতেও অনেক বাংলাদেশী কাজ করে। সরকার থেকে কোনো পদক্ষেপ নিয়ে যদি হেল্প নেয়ার চেষ্টা করত তাহলে এ সহযোগিতা নিতে পারত। কিন্তু আমাদের যাদের হাতে দায়িত্ব রিসার্চ চলমান রাখার জন্য, তাদের মাঝে সমস্যা আছে।

আমাদের সময় শিক্ষকরা পুরোদমে শিক্ষক ছিলেন। কেউ কেউ হয়তো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। কিন্তু এখন নিয়োগ থেকে শুরু করে সবকিছুতেই রাজনীতি। এজন্য হাতে গোনা দু-একজন ছাড়া কেউই রিসার্চ করেন না। এগুলো দুঃখজনক। আমার দুজন বন্ধুও ফান্ডিংয়ের জন্য টিকতে পারেনি কারণ তাদের পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না। বুঝতে হবে, গবেষণা ও বিজ্ঞান এগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে হবে। এটি এমন না, আজ বিনিয়োগ করলাম কালই ফল আসবে। দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে হবে। এভাবে যদি চিন্তা করা হয়, তাহলে ভালো ফল এনে দেবে। একটি দেশের উন্নতির জন্য এটিই যথেষ্ট হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী গবেষকদের ভাবমূর্তি

এখানে দেখা হয় কাকে দিয়ে ভালো কাজ হচ্ছে, এদিক দিয়ে চিন্তা করলে বাংলাদেশের অবশ্যই ভাবমূর্তি ভালো। বাংলাদেশীরা আসলে অনেক সংগ্রাম করে বড় হয়, তারা অনেক ট্যালেন্টেড কিন্তু সুযোগের অভাবে সেটা কাজে লাগাতে পারে না। আমি প্রথম যখন দেশ থেকে বাইরে আসি তখন আমি নিজেকে তুলনা করতাম, ওরা যারা এখানে বড় হয়েছে তাদের সঙ্গে আমাদের তফাত কোথায়? কোন দিক দিয়ে পিছিয়ে আছি? আমি দেখতাম আশপাশে যারা আছে তারা কী করছে? তখন আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশীরা যথেষ্ট প্রতিভাসম্পন্ন, কিন্তু তারা ওইভাবে সুযোগ পায়নি। কেউ যদি একটু সুযোগ পায় তারাই ভালো করে। বাইরে এসে বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশীরা ভালো করে।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশীদের অবস্থান

এক্ষেত্রে বলা যায়, বাংলাদেশীদের অবস্থান আছে মোটামুটি। এখানে আরো উন্নতি করার সুযোগ আছে। এজন্য আমাদের আন্তরিকতা আরেকটু বাড়াতে হবে। যে জিনিসের আমার মনে হয় একটু ঘাটতি আছে, আরেকটু শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। বাংলাদেশে আমরা লবিং বলি আর এখানে বলে রেফারেল। মানে একটা প্রতিষ্ঠানে যখন চাকরির সুযোগ হবে তখন ইন্টারভিউ প্রসেস সবই হবে। কিন্তু সিভিটা যদি আমি ফরোয়ার্ড করি এবং সে ব্যক্তি যদি চাকরি পায় তাহলে আমি রেফারেল পাস পাব। আমরা বাংলাদেশীরা এখানে একটু পিছিয়ে আছি। আন্তরিকতা যদি একটু বাড়াই, যদি ভাবি সবাই ভালো করলে আমাদেরই ভালো, তাহলে সামগ্রিকভাবে ভালো হবে।

আমি পিএইচডি, পোস্টডক করার পর মনে হলো পরিবারের সঙ্গে থাকব। ২০১৬ সালের দিকে ভাবলাম বাংলাদেশে গিয়ে সেটল করব। তখন পাঁচ মাস দেশে এসে বেশ চেষ্টা করি। সে সময়ে আমি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারভিউ কলও পাইনি। আমি হয়তো ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট পাইনি কিন্তু পিএইচডি বা পাবলিকেশন রয়েছে, তাতে আমি যেকোনো ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারভিউ কল পাওয়ার যোগ্যতা রাখি। আমি হতাশ হয়ে আবার দেশের বাইরে চলে আসি। এটা শুধু আমার গল্প না, সবার। এটা একটা অনুভূতি। এতে কি আমি হারালাম, নাকি দেশ হারাল? আমি এখানে গ্রিন কার্ড পেয়েছি। এখানে যে গবেষণা করছি সেটার সুবিধা এ দেশ পাবে। সেটা বাংলাদেশ পেতে পারত। এখন হয়তো বাংলাদেশী উল্লেখ করেই বাংলাদেশ খুশি হচ্ছে। কিন্তু এই অবদানটা বাংলাদেশও পেতে পারত। অর্থনীতি আর গবেষণার ক্ষেত্রে কখনো রাজনীতি যুক্ত হওয়া ঠিক নয়। সেটা দেশকে বুঝতে হবে।

 

বদরুল আলম বনি: সিনিয়র সায়েন্টিস্ট, বায়োটেক কোম্পানি,

ম্যাসাচুসেটস স্টেট