দক্ষিণ আমেরিকার পর্যটনসমৃদ্ধ দেশ চিলি। প্রশান্ত মহাসাগরের কোল ঘেঁষে ফিতা আকৃতির দেশটিতে বাংলাদেশী রয়েছে হাতেগোনা। তবে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে এবং ব্যবসায়িকভাবে সাফল্য পেতে বাংলাদেশীরা নতুনভাবে পরিচিত হয়েছেন দেশটিতে। একই সঙ্গে বাংলাদেশীরা নিজেদের দক্ষ হিসেবে তুলে ধরায় চিলিতে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক মিশন এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেলে বাংলাদেশীদের কাছে কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গন্তব্য হতে পারে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। চিলিতে বসবাসরত বাংলাদেশীরা বলছেন, বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি যথাযথ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা থাকলে কৃষি, পর্যটন, রেস্টুরেন্টসহ বেশকিছু সেক্টরে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশীদের। চিলির বাংলাদেশ কমিউনিটির সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, ট্যুরিজম, সামুদ্রিক সম্পদ আরোহণ এবং কৃষিতে বিদেশী শ্রমিকদের ব্যাপক চাহিদা। এরই মধ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে সেখানে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক প্রসার ঘটিয়েছেন। কূটনৈতিক মিশন স্থাপনের মাধ্যমে তত্পরতা বাড়ানো গেলে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার বাইরে অভিবাসনের অন্যতম গন্তব্য হতে পারে চিলি। বসবাসরত বাংলাদেশীরা জানান, মূলত কৃষি খাতে চিলিতে দক্ষতার ভিত্তিতে প্রতি বছর ইউরোপ ও এশিয়া থেকে শ্রমিক নিয়োগ করে। তবে স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ হলে সব ধরনের পেশায় বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন নাইট ক্লাব ও বারে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।

জানা গিয়েছে, নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশীরা প্রথম চিলিতে যাওয়া শুরু করেন। মূলত যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় পাড়ি জমানোর জন্য চিলিকে রুট হিসেবে বেছে নেন অভিবাসীরা। অনেকে জল-স্থলের বিপত্সংকুল পথ পাড়ি দিয়ে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলেও ভাগ্য দোষে অনেকের থাকতে হয় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয়। অনুকূল পরিবেশ না পাওয়ায় এসব অভিবাসীর অনেকে চিলিতে থেকে যান। বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে শতাধিক বাংলাদেশী রয়েছে চিলিতে। যাদের বেশির ভাগই প্রতিষ্ঠিত ও উচ্চশিক্ষত। তবে চিলির বাংলাদেশী কমিউনিটি বলছে, ৬০-৭০ জন বাংলাদেশী রয়েছে দেশটিতে। এ বাংলাদেশীরা রাজধানী সান্তিয়াগো, ইকিকে, ভিনা-ডেল-মার মতো শহরে বসবাস করছেন। যাদের ৮০ শতাংশ ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। উপযুক্ত পরিবেশ, ব্যবসায়িক সুবিধাদি পাওয়ায় এসব বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট, গার্মেন্ট, গ্রোসারি ও সুপারশপের মতো ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। কাজের সন্ধানে পাঁচ বছর আগে চিলিতে পাড়ি জমান বাংলাদেশী রিয়াজুল ইসলাম। সেখানে অভিবাসী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর নিজেই উদ্যোক্তা হয়ে গ্রোসারির দোকান দেন। এরপর দুই বছরের মাথায় আরো একটি দোকান বাড়ান তিনি। অনুকূল পরিবেশ পাওয়ায় দ্বিতীয় ধাপে তিনি রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন। রিয়াজুলের মতো সুমনও সান্তিয়াগো শহরে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করছেন দীর্ঘদিন। ১০ বছর ধরে দেশটিতে থাকার সুবাদে বর্তমানে দুটি রেস্টুরেন্ট এবং একটি সুপারশপের মালিক তিনি। সুমন জানান, চিলিতে ব্যবসার উপযোগী পরিবেশ অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক সুবিধাজনক। এখানে ব্যবসায়ীদের আলাদা মর্যাদা রয়েছে। পর্যাপ্ত সিকিউরিটিসহ সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তার ভাষায়, যে কেউ ৮-১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতি মাসে ১ লাখ টাকার মতো উপার্জন করতে পারেন। বিশেষ করে পোশাক ব্যবসা, গ্রোসারি, রেস্টুরেন্ট কিংবা পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকদের কাছে চিলি মূলত আসল গন্তব্য নয়, অভিবাসন প্রত্যাশীদের কাছে দেশটি একটি রুট। এখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা পাড়ি জমানোর লক্ষ্য থাকে অধিকাংশ অভিভাসন প্রত্যাশীর। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষা আর নানা প্রতিবন্ধকতার বেড়াজালে আটকে পড়া এসব অভিবাসন প্রত্যাশীরা চিলিতেই জীবিকার পথ খুঁজে নিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে এসব অভিবাসী চিলির বিভিন্ন শহরে ব্যবসা-বাণিজ্য করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন। প্রসঙ্গত, চিলিতে বাংলাদেশী কোনো দূতাবাস নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশেও চিলির কোনো মিশন নেই। ব্রাজিলে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে চিলিতে থাকা বাংলাদেশীদের কনস্যুলার সেবা দেয়া হয়। শুধু চিলি নয়, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, কিউবায় ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশীদের ব্রাজিল দূতাবাসের মাধ্যমে কনস্যুলার সেবা দেয়া হয়। চিলিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশী ও চিলির জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় মো. শোয়েব গাজী বণিক বার্তাকে বলেন, হাজার হাজার মাইল দূরত্বের দেশটি কর্মসংস্থানের জন্য এখনো বাংলাদেশীদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। যে কারণে এখানে খুব বেশি অভিবাসী আসতে পারেনি। আবার অনেকে এলেও যুক্তরাষ্ট্র কিংবা কানাডার মতো দেশে চলে গিয়েছে। তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী দেশ আর্জেন্টিনায় বসবাস করছেন আড়াইশোর বেশি বাংলাদেশী। যাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ ছোট-বড় ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সেখানেও বাংলাদেশের দূতাবাস নেই। প্রবাসী বাংলাদেশীদের কথা মাথায় রেখে দুই দেশের যেকোনো একটিতে যদি দূতাবাস খোলা হয়, তাহলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের অংশীদার হতে পারত বাংলাদেশ। অভিবাসী হিসেবে চিলিতে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কোনো সুযোগ নেই। অনলাইনে আবেদন করে ভারতে থাকা চিলির দূতাবাসের মাধ্যমে সেখানে যাওয়ার সব ধরনের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। তাছাড়া দেশটিতে যেতে আলাদাভাবে ভিসার ওপর কোনো ফি নেই। তবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে সেখানে যেতে বিমান ভাড়া বাবদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা (অন ওয়ে) খরচ হয়। এছাড়া টু ওয়ে টিকিট প্রতি ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে বিমান টিকিট কেনা যায়। শুরুতেই বাংলাদেশ থেকে বেশির ভাগ উচ্চশিক্ষার জন্যে গেলেও এখন অনেকেই ব্যবসার জন্য চিলিতে গমন করছেন। স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ হলে যেকোনো পেশায় চিলিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক বেশি।

 

আবু তাহের: সাংবাদিক