আমার বাবা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। ছোটবেলায় আমি বাবাকে আব্বু বলে ডাকতাম। আব্বুর কাছ থেকে আমি সবসময় এক অসাধারণ অনুপ্রেরণা পেতাম। আমার কাছে যেটা অসম্ভব মনে হতো, আব্বু সেটা সম্ভব করে তুলতেন। এটা আমার জীবনের একটি বিশেষ শক্তির জায়গা ছিল এবং এখনো আছে।
আব্বু সাত বছর বয়সে তার বাবাকে হারান। আর মাকে তিনি পাননি। বড় চাচা-চাচিদের কাছেই তিনি মানুষ হয়েছিলেন। মা নেই, বাবাকে হারানোর এ যাত্রাটা সবসময় সহজ ছিল না। এত প্রতিকূলতা কাটিয়ে একটি জায়গায় আসা—আমার মনে হয় তার ভেতরের অসাধারণ শক্তির জন্যই এটা তিনি পেরেছিলেন।
আব্বুর একটি বিশেষ গুণ আমাকে সবসময় মুগ্ধ করত। তিনি সবসময় নিজের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতেন। তবে আত্মবিশ্বাসটা সহজে বোঝা যেত না, যতক্ষণ না কেউ তার সঙ্গে কথা বলত।
আব্বু খুব সহজেই কোনো কিছুর হাল ছেড়ে দিতেন না। আমি কখনো তার মধ্যে হা-হুতাশ জিনিসটা দেখিনি। আমার খুব মনে আছে, আমি যখন ও’ লেভেলস পাস করি, তখন তিনি বিদেশে ছিলেন। কিন্তু তিনি আমাকে একটি বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। খুব খুশি হয়েছেন এ রকম একটা বার্তা পাঠিয়েছিলেন।
বাবা হিসেবে তার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি, সাহস পেয়েছি এবং যখনই তার প্রয়োজন বোধ করেছি—বাবা সঙ্গেই আছেন বলেই মনে হয়েছে। বাবার জীবনদর্শনও আমাকে প্রভাবিত করেছে। ‘প্লেইন লিভিং, হাই থিংকিং’য়ের কথা প্রায়ই তিনি বলতেন।
বাবা দেশপ্রেমিক ছিলেন। বাংলাদেশের ব্যাপারে তার একটা অন্যরকম ভালোবাসা দেখেছি। জীবনে একেবারে শেষ পর্যন্ত তা অটুট ছিল। বাবা বলতেন, ‘আমরা যা পেয়েছি শুধু বাংলাদেশে জন্ম হয়েছে বলেই পেয়েছি।’
অনেকেই জানেন না যে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী অসম্ভব রসিক একজন মানুষ ছিলেন। খুব জটিল জিনিসকে খুব সহজ করে ফেলতেন তিনি। আব্বুর বিশেষ কিছু গুণ ছিল। এর মধ্যে একটা হলো কোনোকিছুকে তিনি অন্য সবার মতো একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন না।
মা যতদিন ছিলেন, পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলো মা-ই আয়োজন করতেন। কিন্তু বাবা খুব উপভোগ করতেন। পারিবারিক অনুষ্ঠানে হইচই পছন্দ করতেন। গল্প করতে খুব পছন্দ করতেন। ভোজন রসিক ছিলেন। পারিবারিক অনুষ্ঠানে প্রচুর ছবি তুলতেন এবং মোবাইল ফোনেই অ্যালবাম বানিয়ে রাখতেন।
বাবা ভ্রমণ করতে খুব পছন্দ করতেন। আম্মা যখন ছিলেন প্রায় পৃথিবীর প্রতিটা উপমহাদেশেই তারা গেছেন। সুক্ষ্মভাবে প্ল্যানিং করতেন। অনেক সময় আমরা পরিবারের সব সদস্য বড় গ্রুপ হিসেবেও বেড়াতে যেতাম। ভ্রমণের জন্য উনি প্রচুর গবেষণা করতেন—কোথায় থাকবেন, কোথায় খাবেন এগুলো আগে থেকেই ভেবে রাখতেন।
বাবা-মায়ের মধ্যকার রসায়ন বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। আমার মায়ের মৃত্যুর খবর তাকে যখন জানাই তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ডকে হারিয়েছি। আমাকে একা থাকতে দাও।’
তারা পাশাপাশি বোর্ডিং স্কুলে পড়তেন বলেই তাদের বন্ধুত্বের যাত্রা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। তারা দুজন দুজনের জন্য অনেক স্যাক্রিফাইস করেছেন। আমার মনে হয় তারা বন্ধু, সাথী, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা ইত্যাদি স্থান বিচারে বেশ অদ্ভুত যুগল ছিলেন।
সিনেমা দেখার প্রতি বাবার খুব ঝোঁক ছিল। ইংরেজি-বাংলা দুই ধরনের সিনেমাই তিনি দেখতেন। সিনেমার গান পছন্দ করলেও একদমই গান গাইতে পারতেন না। জ্যাজ মিউজিক খুব পছন্দ করতেন। রবীন্দ্রসংগীত পছন্দ করতেন, ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক শুনতেন। লাইভ থিয়েটারের খুব শখ ছিল তার। এটার অনুরাগীও ছিলেন তিনি। বই পড়াও তার বিশেষ শখগুলোর একটি ছিল। টেলিভিশন দেখার পরিবর্তে তিনি বই পড়তেন। এটা ছিল তার রিল্যাক্সের জায়গা।
তার ছিল গ্রেট সেন্স অব হিউমার। কোনো বিষয়ে সিরিয়াস হতেন না। নিজেকে নিয়েও রসিকতা করতেন। নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করা মানুষের বড়ই অভাব আছে এদেশে।

সপরিবারে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী
সবার আগে সম্মান—দর্শনটা আব্বার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরস্পরের প্রতি সম্মানের দিকে আব্বু খুব খেয়াল রাখতেন। মানুষকে যত সম্মান করবে তত সম্মান পাবে, এটা তার একটা কোর ভ্যালু ছিল। আর একটা কথা বলতেন, ‘অহংকার খুব ভয়ংকর একটা জিনিস এবং অহংকারি হওয়াটা আমাদের জন্য শুভ না।’
তার মধ্যে ছিল সততা। তিনি বলতেন, ‘কথা দেয়ার আগে ১০ বার চিন্তা করো। কিন্তু একবার কথা দিলে সেটা অবশ্যই রাখতে হবে।’ কারো ভালো না করতে পারলেও তার ক্ষতি না করার উপদেশ দিতেন। নির্দেশের মতোই ছিল সেই উপদেশ। মতের ভিন্নতায় বিশ্বাস করতেন। ধর্মনিরপেক্ষতায় ভীষণভাবে বিশ্বাস করতেন।
ব্যবসা শেখার ক্ষেত্রে বলতে হয় যখন আমি প্রথম ইউনিভার্সিটি পাস করার পরই এপেক্স ফুটওয়্যার কোম্পানিতে আমাকে পজিশন অফার করা হয়। ফ্যাক্টরির প্রতি ফ্যাসিনেশন বাবার ছিল। উৎপাদনমুখিতা তার জন্য মূল ব্যাপার ছিল। উনি বলতেন, আমার ফ্যাক্টরিতে যেতে খুব ভালো লাগে। জব ক্রিয়েশনে তিনি খুব তৃপ্তি পেতেন।
বাংলাদেশ যখন ফিনিশড চামড়া রফতানি করতে পারে না, সে সময় তিনি জুতা রফতানি করেছিলেন বেলজিয়ামে। সেখান থেকে বাংলাদেশের ফুটওয়্যার খাত ১ বিলিয়ন ডলারের ওপর রফতানি পেয়েছে। ১৯৯০ সালে আব্বা কীভাবে এটা বুঝতে পেরেছিলেন আমি জানি না। স্বল্পমেয়াদি চিন্তায় তিনি বিশ্বাস করতেন না। দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে বলতেন সবসময়। পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ে খুব বেশি মুনাফা করা যায় না, এটা সম্ভব না।
আব্বা সুন্দর সুন্দর কাপড় পরতেন। তার সেন্স অব স্টাইল ছিল দারুণ। চাচাদের কাছেও শুনেছি তিনি খুব ফ্যাশনেবল ছিলেন। নতুন নতুন ডিজাইনের ব্যাপারে খোঁজ রাখতেন।
প্রযুক্তির কী উন্নয়ন হচ্ছে সে খবর রাখতেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ফেয়ারে যেতেন তিনি। ট্যানারি মেশিনের ব্যাপারেও তিনি দারুণ নলেজেবল ছিলেন।
আব্বা জানতেন উনি খুব কষ্টে বড় হয়েছেন। বাবা-মা ও নিজের পরিবার, পারিবারিক আবহ তিনি পাননি। যা করেছেন, নিজেই করেছেন। জীবনের কঠিন বাস্তব দেখার কারণে তিনি অপচয় পছন্দ করতেন না। রুমে কেউ না থাকলে এসি বা লাইট জ্বালিয়ে রাখা তাকে ভীষণভাবে বিরক্ত করত। কোনো অনুষ্ঠানে গাড়ি থেকে নামার আগে ড্রাইভারদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা সেটা তিনি জেনে নিতেন। বলতেন, ‘যারা তোমার মতো সুবিধাসম্পন্ন অবস্থানে নেই, তাদের কথা মন থেকে চিন্তা করা উচিত।’ আমার মনে হয় তার ডিএনএর মধ্যে ব্যাপারটা ছিল।
মৃত্যুর আগের দিনও চিকিৎসকেরা একটু আশা দিয়েছিলেন। আমরা রোজার মধ্যে পরিকল্পনা করছিলাম, ঈদের দিন পরিবারের সবাই একসঙ্গে হব। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা হয়নি। ওইদিন রাতে বাবার রক্তচাপ হঠাৎ কমে যায়। পরদিন ভোরবেলা ডাক্তার জানালেন, একটা ক্যাটাসট্রফিক ইভেন্ট হয়েছে। উনি গুরুতর অবস্থায় আছেন। তখনো আব্বু কথা বলছিলেন। আমি ও আমার বোন দুজনেই তার বিছানার পাশে বসলাম। তিনি খুব দুর্বল গলায় বললেন, ‘আই ওয়ান্ট টু গো হোম।’ আমি বললাম, ‘আমরা চেষ্টা করছি।’
জীবনের কঠিন সময়েও তার শেষ কথাগুলো ছিল প্রেরণার উৎস। তিনি একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘সবকিছুর আগে দেশ। আমরা যা পেয়েছি, দেশের জন্য পেয়েছি। সব ধর্মকে শ্রদ্ধা করবে। আমরা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্যবসা করব, বেশি পাশ্চাত্যবাদ কিন্তু ভালো না। আমাদের সংস্কৃতির পথেই আমাদের চলা উচিত।’
আব্বা যে খুব ট্র্যাডিশনাল ধার্মিক ছিলেন তা নয়, তবে যখনই পারতেন নামাজ পড়তেন, স্পিরিচুয়াল ছিলেন।
আব্বার আরো একটি গুণের কথা বলতে হয়। অজস্র লোক তার সঙ্গে দেখা করতে আসত, তিনি সবসময় তার দরজা খোলা রাখতেন। তিনি বলতেন, ‘যা তোমাদের নাগালের মধ্যে নেই, সেটা নিয়ে চিন্তা করো না। যেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারো, সেটার ওপর মনোযোগ দাও।’
আব্বু ৮৩ বছর বয়সে গত হয়েছেন। তাই তার জীবনকে সংক্ষিপ্ত বলা যাবে না। তার একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল খুব ছোট হলেও যেন পৃথিবীর একটা পরিবর্তন আনতে পারেন।
তার অনুপস্থিতিতে আমার শূন্যতাবোধ হয়। তিনি প্রতিদিনই অফিসে আসতেন, দুপুরে থাকলে একসঙ্গে লাঞ্চ করতাম, কথা বলতাম। সেই জায়গায় আর কখনই তাকে পাব না। তিনি মানুষকে ভীষণভাবে অনুপ্রেরণা জোগাতে পারতেন। আর মিটিংয়ে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে একটা জায়গায় নিয়ে আসতেন। এটা আমার কাছে এক বড় অভাব।
সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর: সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর পুত্র। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড; চেয়ারম্যান, এমটিবি বোর্ড এক্সিকিউটিভ কমিটি










