সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীকে আমি দীর্ঘদিন ধরে চিনি। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সে আমার ছাত্র ছিল। কলকাতা থেকে স্নাতক (বিএ) শেষ করে তিনি আমাদের এমএ প্রিলিমিনারি কোর্সে ভর্তি হন। সেখানে এমএ ফাইনাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তিনি ছিলেন ফরাসউদ্দিন ও রাশেদ খান মেননদের সমসাময়িক। শিক্ষাজীবনে বেশ ভালো ছাত্র ছিলেন। প্রথম শ্রেণী না পেলেও তিনি মানসম্মত দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। শ্রেণীকক্ষে তাকে আমি বেশ সাবলীল ও স্পষ্টভাষীই দেখেছি। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ (কলকাতা) থেকে স্নাতক করায় তার ইংরেজি ছিল বেশ ভালো।

তার সমসাময়িক অনেকের তুলনায় সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর পেশাগত সিদ্ধান্ত ছিল ভিন্ন। সহপাঠীদের বেশির ভাগই যখন সরকারি চাকরি কিংবা পেশাদার অর্থনীতিবিদ হওয়ার কথা ভাবতেন, মঞ্জুর তখন ছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন ছাত্রের একজন, যিনি বাণিজ্যিক খাতে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।

পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে ভালো অগ্রগতিও অর্জন করেন। তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি তার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তটি নেন। বহুজাতিক চাকরি ছেড়ে সরাসরি নামেন ব্যবসায়। যুক্ত হন চামড়া শিল্পে, যা সে সময় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি খাত ছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চামড়া শিল্প পুরোপুরি ‘চিনিওটি’ (পাকিস্তানের চিনিওটের বাসিন্দা) ব্যবসায়ীদের দখলে ছিল। সে সময় এ খাতে বাঙালিদের প্রবেশ ছিল খুবই সীমিত। অর্থনীতিতে শিক্ষিত মঞ্জুর এলাহী তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীদের মূলধারা ও নিজ পরিবারের পেশাজীবী ঐতিহ্য—উভয় থেকেই সরে এসে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এটি তার ব্যক্তিত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ স্বাতন্ত্র্য ছিল।

আমি তার পেশাগত জীবনের বিকাশ নিয়ে বিস্তারিত বলব না। বাস্তবতা হলো তিনি একজন অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী। বাঙালি উদ্যোক্তার হাত ধরে চামড়া শিল্পে সমৃদ্ধি ও প্রথম আন্তর্জাতিক মানের জুতা উৎপাদক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। এ শিল্পে ‘বাটা’র আধিপত্য ছিল। এ পরিপ্রেক্ষিতে মঞ্জুর এলাহীর এপেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ ছিল আন্তর্জাতিক মানের জুতা উৎপাদন ও রফতানিমুখী শিল্প গড়ে তুলতে কোনো বাঙালি ব্যবসায়ীর একটি বড় উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক বাজারে জুতা ও চামড়াজাত পণ্য রফতানির সম্ভাবনা অনুধাবনে তিনি বাটার চেয়েও এগিয়ে ছিলেন।

ইতালির জুতা শিল্পের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন মঞ্জুর এলাহী। তাইওয়ান থেকে আনেন বিনিয়োগ। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চামড়া রফতানি খাতে বাংলাদেশের জন্য একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। এভাবেই এপেক্সের সুনাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আজও প্রতিষ্ঠানটি দেশের চামড়া শিল্পে শীর্ষস্থানীয় রফতানিমুখী উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।

একজন ব্যবসায়ী হিসেবে মঞ্জুর এলাহীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য ছিল তার অসাধারণ সততা। তিনি যে ব্যবসা গড়ে তুলেছেন ও যে সাফল্য অর্জন করেছেন, তা মূলত প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতার ভিত্তিতেই করেছেন। তিনি অতিরিক্ত ঋণ নেননি কিংবা ঋণখেলাপিও হননি। এ দিকটিই ব্যবসায়ী সমাজের অনেক সহকর্মীর তুলনায় তাকে স্পষ্টভাবে আলাদা করে।

021

এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে আমি তাকে সিপিডির পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানাই। আমরা সমাজের সব স্তরের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম। বিশেষ করে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ ও সংলাপ গড়ে তোলা। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমরা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছি, যাতে যাদের সঙ্গে যুক্ত হই তাদের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত সততার রেকর্ড নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকে। মঞ্জুর এলাহী আমাদের পর্ষদে যোগ দেন । তিনি আমাদের সঙ্গে অবিচলভাবে যুক্ত ছিলেন। আমাদের সম্পর্কটি ক্রমেই দীর্ঘমেয়াদি ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি সিপিডির কোষাধ্যক্ষ ও নির্বাহী কমিটির সদস্যের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি সিপিডির কর্মসূচিতেও সরাসরি আগ্রহ ও সম্পৃক্ত হয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি দেয়া, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পথ তৈরি করা, ব্যবসা জগতে কী ভালো ও কী সর্বোত্তম সেসব চিহ্নিত করা এবং মানদণ্ড স্থাপন করা—এসব বিষয়ে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর ওপর আমরা গভীরভাবে নির্ভর করেছি। বাংলাদেশে ব্যবসায়িক চর্চা নিয়ে আলোচনা ও পরামর্শে অংশ নিতে গিয়ে এ মানদণ্ডগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করেছে।

সিপিডিতে তিনি শুধু একজন সহকর্মীই ছিলেন না, একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন বটে। তার স্ত্রী নিলুফারও অর্থনীতি বিভাগে আমার ছাত্রী ছিলেন। ফলে আমাদের সম্পর্কটি ছিল দীর্ঘদিনের পুরনো এবং সামাজিকভাবেও আমরা যুক্ত ছিলাম। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর মৃত্যুর পর তার পুত্র সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর সিপিডির বোর্ডে যুক্ত হয়েছেন। মঞ্জুর এলাহীর সঙ্গে সিপিডির সম্পর্কটি পরবর্তী প্রজন্মেও অব্যাহত রাখতে পেরেছি বলে আমি গর্বিত।

মঞ্জুর এলাহী অসাধারণভাবে আকর্ষণীয়, ভদ্র ও শালীন মানুষ ছিলেন। তিনি কেবল ব্যবসাতাড়িত ব্যক্তি ছিলেন না, বরং এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি পৃথিবী কীভাবে চলে সে সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা রাখতেন।

তিনি ব্যবসায়িক জগতে আমার যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। ব্যবসায়ীদের জন্য তিনি এমন মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, যা ভবিষ্যতেও পথনির্দেশক ও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে আমি মনে করি। সিপিডি পরিচালনার প্রয়োজনে ও একজন বন্ধু হিসেবে আমি তাকে গভীরভাবে স্মরণ করি। তার সঙ্গে আমার নিবিড় যোগাযোগ ও সম্পর্কের মাধ্যমে অনেক কিছু শিখেছি।

মঞ্জুর এলাহী একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। তার রসবোধও ছিল দারুণ। নানা বিষয়ে তিনি আলোচনা করতে পারতেন। সিপিডি ছাড়াও অন্য কোনো বিষয়ে তার মতামত জানতে চাইলেও তিনি উপযুক্ত মন্তব্য করতে পারতেন। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ভালো।

তার একটি অনন্য অর্জন ছিল দুবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্য হওয়া। কেবল সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের ক্ষেত্রেই এ ঘটনা দেখা গেছে। প্রথমে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অন্তর্ভুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারেও দায়িত্ব পালন করেন, যার প্রধান ছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান।

দুজন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান তাকে দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত করার যে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন তা প্রমাণ করে তিনি কতটা অপরিহার্য ছিলেন। স্বাধীনচেতা ও নিজেদের স্বার্থের বাইরে গিয়ে মতামত দিতে পারেন এমন মানুষ খুবই বিরল। তিনি দেশকে ভালোবাসতেন ও দেশের জন্য ভালো চাইতেন। তার এ গুণ তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্য হিসেবে বিশেষভাবে উপযুক্ত করে তুলেছিল। আমি নিশ্চিত যে সুযোগ থাকলে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারও তাকে সদস্য করতে আগ্রহী হতো। এ ব্যতিক্রমী দিক তার প্রতি থাকা সমাজের সব স্তরের গভীর শ্রদ্ধারই প্রতিফলন।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ছিলেন উচ্চ মানদণ্ডে বিশ্বাসী। যে খাতগুলোয় তিনি কাজ করেছেন, সেগুলোকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলেই তিনি বিশ্বাস করতেন। একইভাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও তার প্রত্যাশা ছিল সর্বোচ্চ। তিনি বিশ্বাস করতেন সুযোগ পেলে এ দেশও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, ঠিক যেমন তিনি নিজেকে ও তার ব্যবসাকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। সিপিডির কাজের ক্ষেত্রেও তিনি সর্বোচ্চ মান আশা করতেন। দেশ ও সিপিডি উভয় ক্ষেত্রেই তার প্রত্যাশা ছিল সর্বোচ্চ অর্জনের।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান: অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান