বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে কিছু সময় আসে, যখন সরকারের নেয়া কয়েকটি সিদ্ধান্ত পরবর্তী বহু বছরের অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে। নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশ ছিল তেমনই এক সন্ধিক্ষণে। স্বৈরশাসনের অবসান, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে দেশকে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার প্রশ্ন সামনে আসে। সে সময় অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে যে নামটি জড়িয়ে আছে, তিনি এম সাইফুর রহমান।
তিন দফায় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা সাইফুর রহমান শুধু নিয়মিত বাজেট প্রণয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং অর্থনীতিকে রাষ্ট্রনির্ভর কাঠামো থেকে বাজারমুখী করার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯১ সালে তার নেতৃত্বে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট চালু, বাণিজ্য ও শুল্ক ব্যবস্থায় উদারীকরণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারকে বাজারমুখী করার মতো পদক্ষেপ বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামো বদলে দেয়। অর্থনীতিবিদদের অনেকে এসব পদক্ষেপকে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন।
১৯৩২ সালের ৬ অক্টোবর মৌলভীবাজারের বাহারমর্দন গ্রামে জন্ম নেয়া সাইফুর রহমান পেশাগতভাবে ছিলেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর তিনি লন্ডনে উচ্চ শিক্ষা নেন এবং ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ইন ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস থেকে পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করেন। কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং হিসাব ও অর্থ ব্যবস্থার ওপর তার পেশাগত দক্ষতা পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে অর্থনীতি নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
জিয়াউর রহমানের সময় বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জাতীয় অর্থনীতির নীতিনির্ধারণে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা শুরু হয়। তবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৯১ সালে। এরশাদ সরকার পতনের পর গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেয়। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বাণিজ্য উন্মুক্তকরণ এবং বাজারভিত্তিক সংস্কারের প্রবণতা জোরালো হচ্ছিল। বাংলাদেশও সেই পরিবর্তনের বাইরে থাকতে পারেনি।

সাইফুর রহমানের সামনে তখন মূল প্রশ্ন ছিল—রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল অর্থনীতি কীভাবে রাজস্বের শক্ত ভিত, কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থা এবং বেসরকারি খাতের অধিকতর অংশগ্রহণের দিকে যাবে? তিনি সংস্কারের পথ বেছে নেন।
সাইফুর রহমানের অর্থমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট চালু করা। ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইন উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে নতুন ধরনের কর ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এর মাধ্যমে প্রচলিত পরোক্ষ কর ব্যবস্থার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত ভিত্তির একটি রাজস্ব কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।
ভ্যাট চালু করা তখন মোটেও সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। নতুন কর ব্যবস্থা ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও প্রশাসনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। কিন্তু সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থাকে আধুনিক করার জন্য এ ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল বলে সংস্কারপন্থীরা মনে করতেন।
আজকের বাংলাদেশে সরকারের রাজস্ব কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভ্যাট। ফলে ১৯৯১ সালের সেই সিদ্ধান্তকে কেবল একটি কর আইন প্রবর্তন হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যায় না। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি প্রচেষ্টা।
অর্থনৈতিক সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আধিপত্য, দুর্বল ঋণ আদায় ব্যবস্থা এবং আর্থিক খাতে নানা কাঠামোগত সমস্যার মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে অধিকতর বাজারমুখী করার উদ্যোগ নেয়া হয়। নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংস্কারের বৃহত্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সুদের হার, ঋণ বিতরণ, ব্যাংক পরিচালনা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়।
দেশের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও সাইফুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আমদানি শুল্ক কমানো, বাণিজ্য ব্যবস্থাকে উদার করা এবং বেসরকারি খাতের জন্য সুযোগ বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ তার অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এর পেছনে ছিল একটি মৌলিক ধারণা—দেশীয় শিল্পকে শুধু সরকারি সুরক্ষা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক করা সম্ভব নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
সাইফুর রহমানের অর্থনৈতিক দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কঠোর অবস্থান। তার সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০০২ সালে আদমজী জুট মিল বন্ধের সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। তার দ্বিতীয় মেয়াদের আরেকটি বড় সংস্কার ছিল বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ব্যবস্থাকে বাজারমুখী করা। ২০০৩ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে নির্ধারিত বিনিময় হার ব্যবস্থা ছিল; জুন ২০০৩ থেকে বাংলাদেশ ভাসমান বিনিময় হার ব্যবস্থায় যায়।
তিন দফায় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এম সাইফুর রহমান। প্রথমবার আশির দশকের শুরুতে, দ্বিতীয়বার ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে এবং তৃতীয়বার ২০০১-০৬ মেয়াদে। জাতীয় সংসদে ১২ বার বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি। তবে দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এম সাইফুর রহমান শুধু দীর্ঘদিনের একজন অর্থমন্ত্রী নন—অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম।
নিজ জন্মস্থান মৌলভীবাজারের বাহারমর্দন থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাওয়ার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খড়িয়ালা এলাকায় ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এম সাইফুর রহমান। তখন তার বয়স ৭৬ বছর।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
রাষ্ট্রপতি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এবং অর্থনীতিতে শূন্যতার সৃষ্টি হয়। তখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন হয়। প্রথমে একটি উপদেষ্টামণ্ডলী এবং পরে মন্ত্রিসভা তৈরি করা হয়। এম সাইফুর রহমান তখন থেকেই সামনের সারিতে চলে আসেন। তিনি প্রথম দিকে বাণিজ্য ও পরবর্তী সময়ে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করেছিলেন। ঠিক একইভাবে ক্লোজ ইকোনমিকে মার্কেট ইকোনমিতে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু করেছিলেন। সাইফুর রহমান সে সময়টায় প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেন। তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সততা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে অসাধারণ মেধা, দক্ষতা দিয়ে তিনি দেশের প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া অর্থনীতিকে টেনে ওপরে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।
দেশের প্রধান অর্থনৈতিক যে অর্জন তার একটি বিদেশে শ্রমিক প্রেরণ, আরেকটি হচ্ছে গার্মেন্ট খাতের বিকাশ। এ কাজগুলো জিয়াউর রহমানের সময়ই শুরু হয়। এক্ষেত্রে অনুকূল অবস্থা তৈরি করার জন্য সাইফুর রহমান সাহেব তখন যে কাজগুলো করেছিলেন তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। যেমন ব্যাক টু ব্যাক এলসি, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা—এসব দিয়ে তিনি নতুন বিনিয়োগকারীদের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন। তিনি দেশের অর্থনীতিতে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন।
পরবর্তীকালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ভ্যাট প্রবর্তন করে সাইফুর রহমান রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে আরেকটা নতুন অধ্যায় শুরু করলেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার দূরদৃষ্টি ছিল। তিনি আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন এবং তিনি সেটা করতে সক্ষমও হয়েছিলেন। ম্যাক্রো ইকোনমিকে তিনি স্থিতিশীল করেছিলেন।
সাইফুর রহমান যখন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বলা হয়েছে ‘ইমার্জিং টাইগার’ অর্থাৎ উদীয়মান ব্যাঘ্র হিসেবে তুলনা করা হয়েছিল। একটা সময় আমাদের জিডিপি গ্রোথ রেট সাত পেরিয়ে গিয়েছিল। আমি মনে করি, এটা শুধু সাইফুর রহমানের দূরদৃষ্টির কারণেই সম্ভব হয়েছিল। অর্থনীতিকে সচল করার ব্যাপারে তার ভূমিকা ছিল অনবদ্য। আমরা তাকে সবসময় স্মরণ করি। ভবিষ্যতে যারা কাজ করবেন তারা সাইফুর রহমানের সততা-যোগ্যতা, দূরদৃষ্টি-প্রজ্ঞাকে পর্যবেক্ষণ করবেন এবং সেভাবেই কাজ করবেন।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
মন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়
দেশের রাজনীতিতে অর্থনীতি ও সংস্কারকে মিলিয়ে যদি ভাবতে হয়, মরহুম সাইফুর রহমান সাহেব সেক্ষেত্রে অন্যতম অনুকরণীয় ব্যক্তি (ওয়ান অব দ্য রোল মডেল)। একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক হিসেবে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে, জনগণের প্রতি কর্তব্য পালনে এবং তাদের জীবনের মানোন্নয়ন করতে যা করা দরকার, তিনি সবই করেছেন।
বাংলাদেশে একদলীয় বাকশাল রাষ্ট্রচালিত অর্থনীতি থেকে বাণিজ্য উদারীকরণের মতো বড় ধরনের যে রূপান্তর (ট্রান্সফরমেশন) আমরা দেখেছি, তা সাইফুর রহমানের হাত ধরে শুরু হয়েছে। বাণিজ্য উদারীকরণের ফলে বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির যে অধ্যায়টা শুরু হয়, সেখান থেকে আমাদের বেসরকারি খাত উঠে এসেছে। প্রাইভেট সেক্টর সম্পর্কে জিয়াউর রহমানের যে ধারণা ছিল এবং উন্নয়নের রাজনীতি, উৎপাদনের রাজনীতির যে দর্শন ছিল, তাতে সাইফুর রহমান মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণার মাধ্যমে দেশের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন। কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু করে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ, সরকারি খাতের উদ্যোগ সব মিলিয়ে কাজটা তিনি সফলভাবে করেছেন। তখন সবার জন্য একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়েছিল। সক্ষমতা অনুযায়ী সবাই সুযোগটা নিতে পেরেছিল। এটা ছিল উন্নয়নের অর্থনীতিতে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ।
এছাড়া ব্যাংক খাতকে উন্মুক্ত করে দেয়া, বেসরকারি খাতে যার যার প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণের সরবরাহ প্রদানও তিনিই শুরু করেছিলেন। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্যও বেশকিছু পদক্ষেপ সাইফুর রহমান নিয়েছিলেন। তার সবচেয়ে বড় অবদান হলো রাজস্ব আহরণের বিষয়টিতে। তিনিই প্রথম ভ্যাট প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের রাজস্বকে উচ্চ মানে নিয়ে গিয়েছিলেন। রাজস্ব না থাকলে তো উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে যে কাজগুলো করা প্রয়োজন সেগুলো করাও সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে তিনি খুব সফলভাবে কাজ করেছেন। তিনি বেসরকারি খাতের মাধ্যমে দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন। যে কারণে অন্য উন্নয়নগুলো করা সম্ভব হয়েছে। বৈদেশিক ঋণের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীলতা থেকে তিনি সরে এসেছেন।
সাইফুর রহমান যেটা বিশ্বাস করতেন, সে জায়গায় দৃঢ় থাকতেন। রাজনৈতিক চাপের কাছে তিনি কখনই নত হননি।

সালেহউদ্দিন আহমেদ
সাবেক উপদেষ্টা, অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়
সাইফুর রহমান সাহেব ছিলেন একজন অনন্য ব্যক্তি। তিনি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তার অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। প্রথমত, দেশের বাণিজ্য উদারীকরণে তিনি ভূমিকা রেখেছেন, যেটাকে আমরা সংস্কার বলছি সেটার কিন্তু তিনি উদ্যোক্তা। আমার মনে আছে, তিনি ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পলিসি বলে ট্যারিফ কমিশনে একটা বিষয় গঠন করেছিলেন। সেখানে অনেক বিজ্ঞজন বাংলাদেশের বাণিজ্য উদারীকরণ, এক্সপোর্ট, ইমপোর্ট, বিভিন্ন রেগুলেশনস নিয়ে কাজ করেন। এগুলো সহজ করার ব্যাপারে যে সংস্কারগুলো তিনি করেছেন, এখনো সেগুলো বিদ্যমান আছে, যা অর্থনীতিতে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে।
এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো অনেক দিন থেকেই আমাদের এদিকে অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দেশে বাণিজ্য উদারীকরণের ব্যাপারে বিভিন্ন দিক থেকে অনেক রকম অনুরোধ এসেছিল। তার হাত ধরেই সাইফুর রহমান সাহেব বাংলাদেশে প্রথম সংস্কার করেন। ভারতে এটা শুরু করেন মনমোহন সিং। তবে আমার মনে হয়, সাইফুর রহমান তার কার্যক্রম মনমোহন সিংয়ের আগে শুরু করেছিলেন। সেদিক থেকে আমি বলব, বাংলাদেশের এ সংস্কার কার্যক্রমটা উদাহরণস্বরূপ হয়তো অন্য দেশ নিয়েছে। সাইফুর রহমান অর্থনীতি, রাজস্ব নীতি, ভ্যাট, ট্যাক্স সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখতেন। নতুন একটা ট্যাক্স ইমপোজ করতে হলে, কাস্টমস ডিউটি ইনিশিয়েট করতে হলে তিনি কিন্তু মতামত দিতেন। আমি তার সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলাম। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুদ্রানীতি, এমনকি রাজস্ব আয়ের ব্যাপারে আমাদের আলাপ হতো। তার জ্ঞানের গভীরতা ছিল। অল্পস্বল্প জ্ঞান নিয়ে তিনি কথা বলতেন না। আমি মনে করি, বাংলাদেশের ইতিহাসে যেসব অর্থমন্ত্রী এসেছেন, তাদের মধ্যে সাইফুর রহমানের নাম ও অবদান সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
অনেক সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ে কাজ করলে বাহ্যিকভাবে অনেক চাপ থাকে—রাজনৈতিক চাপ থাকে, দলের চাপ থাকে, কিন্তু আমরা কোনোদিন সাইফুর রহমানকে এ ব্যাপারে আপস করতে দেখিনি। তিনি রাজনীতির কথা বলে কোনো ব্যাংকও দেননি। সেদিক থেকে আমি বলতে পারি, সাইফুর রহমান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, কিন্তু তিনি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ছিলেন। তিনি তার দায়িত্ব পেশাদারত্বের সঙ্গে পালন করেছেন।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ
সাবেক উপদেষ্টা, শিক্ষা ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়
এম সাইফুর রহমান দেশের সবচেয়ে সফল অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তার সময়েই অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিশ্বায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, বাণিজ্য উদারীকরণ প্রক্রিয়াটি তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিলেন সেগুলো ছিল অত্যন্ত সমাদৃত।
২০০৩ সালে তিনি টাকা ও ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেন এবং তখনো দেশের বাজার কোনো রকম ঝুঁকিতে পড়েনি। একই সময়ে ব্যাংক খাতের বেশ বড় কিছু সংস্কার করেন। দুঃখজনকভাবে অবশ্য সে সংস্কারগুলো পরে আবার অন্য সরকার এসে পেছনের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে সময় ওই সংস্কারগুলোর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, তাতে একদিকে অর্থনীতি বিশ্বায়নের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পেরেছিল, অন্যদিকে আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা পেয়েছিল।
সাধারণত বিশ্বায়নের সঙ্গে যুক্ত হতে যে ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন হয়, বাজার উদারীকরণের সংস্কারে অন্যান্য দেশে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়, বাংলাদেশে কিন্তু সেটা হয়নি। এ ধরনের সংস্কারের বিরুদ্ধে যেকোনো দেশে বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর বিরোধিতা থাকে। কিন্তু সাইফুর রহমানের ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা ও সরকারের ওপর প্রভাব ছিল, পাশাপাশি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তার ওপর যে আস্থা ছিল, তার ফলেই তিনি এ কঠিন সংস্কারগুলো করতে পেরেছিলেন। এছাড়া তিনি এমনভাবে সংস্কারগুলো করেছিলেন, এমন কৌশল ও সময় নির্ধারণ করেছিলেন যে তাতে দেশের ভেতরে তেমন নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়েনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ সংস্কারগুলোর সময় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলাম। অনেক বিষয়ে, বিশেষ করে বাণিজ্য উদারীকরণ, ডলারের বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ নিয়ে তার সঙ্গে আমার পরামর্শ করার সুযোগ হয়েছে। তিনি আমার পরামর্শ গ্রহণ করতেন। আমি তাকে সে পরামর্শগুলো দিতে পেরে ও তার সান্নিধ্যে আসতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান
মনে করি।
তার প্রতি ও তার স্মৃতির প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। এ দেশ, এ দেশের অর্থনীতিতে তার কাজের ছাপ চিরকাল থাকবে। তিনি আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

এম কায়সার রহমান
এম সাইফুর রহমানের মেজো সন্তান ও
চেয়ারম্যান, কোয়ালিটি ফিডস লিমিটেড
পিতা এবং রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদ সাইফুর রহমান একরকম নন। পারিবারিকভাবে তিনি খুব একটা সামাজিক ছিলেন না। তাই তার সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার স্মৃতি আমাদের বেশ কম। ২০০৮ সালে সম্ভবত আমার ছোট ভাইকে আমি বলেছিলাম, ‘বাবাকে নিয়ে চলো আমরা ঘুরতে যাই, সম্ভবত এটাই বাবাকে নিয়ে শেষ ঘুরতে যাওয়া হবে।’ আমার এ কথাই সত্যি হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য তিনি কুয়ালালামপুরে ছিলেন তখন, আমরা দুই ভাই ও আমাদের পরিবার মিলে দুইদিনের জন্য সেখানে গিয়েছিলাম। এটাই বাবার সঙ্গে আমার একমাত্র ছুটি কাটানোর স্মৃতি। ছোটবেলায় আমাদের নিয়ে বাবার ছুটি কাটানোর বিষয়টা ছিল একেবারেই সিলেট ও চট্টগ্রামনির্ভর। আমরা মায়ের সঙ্গে অনেক জায়গায় গিয়েছি, কিন্তু বাবার সঙ্গে যাওয়া হয়নি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন বাবা মনে করতেন আমরা কলেজে পড়ি। তার ঠিক জানা ছিল না, আমরা কে কোথায় পড়ছি।
অনেকেই মনে করতেন, তিনি একগুঁয়ে ছিলেন। কিন্তু তিনি আসলে সবার কথা শুনতেন। তার অনেক সমালোচক তার প্রিয়ভাজন ছিলেন। তিনি স্পষ্টবাদী ছিলেন। যেটা মনে আসত সেটাই বলতেন।
ছাত্রজীবনে তিনি রাজনীতি করতেন না, কিন্তু একটা সংগঠনের সদস্য ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে নিজের অংশগ্রহণকে তিনি কোনোদিন অতিরঞ্জিত করেননি। তিনি মনে করতেন, এটা সব ছাত্রের দায়িত্ব ছিল।
আমাদের পেশাগত জীবনে তিনি কখনই কোনো মত দেননি। তিনি কখনই আমাদের বলেননি—কী করতে হবে। বাবা বইয়ের পড়াশোনার বাইরেও আমাদের ভাবতে বলতেন। কারণ এতে অনেক কিছু শেখার আছে। এছাড়া কখনই তিনি আমাদের বলেননি যে এটা করো, ওটা করো। তিনি বলতেন, ‘যেটা তোমরা ভালো মনে করো, সেটাই করো।’
বাবা খুব নজরুলভক্ত ছিলেন। তিনি বলতেন, কাজী নজরুল ইসলাম শুধু কবি নন, উনি যুগে যুগে, শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষকে অনুপ্রাণিত করবেন। কাজী নজরুল ইসলামকে তিনি মহাকবি হিসেবে বিবেচনা করতেন। আমরা আগে-পরে নজরুলকে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, এটা নিয়ে তার আক্ষেপ ছিল। তিনি বলতেন, গুণীজনের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে সমাজের উন্নতি হয় না।
*স্মৃতিচারণগুলো ২০২৪ সালে এম সাইফুর রহমানের সংবর্ধনা (মরণোত্তর) উপলক্ষে বণিক বার্তার বিশেষ প্রকাশনা ‘কৃতী মুখ’ থেকে নেয়া










