পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতির একরকম পরিস্থিতি ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে সেসব পরিবর্তন হয়ে গেছে। সে অবস্থায় দেখা গেল, সব ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা রাষ্ট্র করবে এমন আর্থসামাজিক নীতি সরকার নিয়েছে। পাকিস্তান আমলে যারা প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করেছি, পরে এসে একটা অসুবিধার মধ্যে পড়ে গেলাম। ওই সময় বেসরকারি খাতের জন্য সামনে এগিয়ে যাওয়ার মতো সুযোগ-সুবিধা কিছুটা কমে গেল। ঠিক তখনই সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর মতো গুটিকয়েক উদ্যোক্তা ব্যবসা-বাণিজ্যকে সামনে এগিয়ে নিতে অনেক চেষ্টা করেছেন।

মঞ্জুর এলাহীর নাম বিশেষভাবে বলতে হয়। তিনি নানাভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। ধীরে ধীরে দেশে পরিবর্তন এল। এরপর বেসরকারি খাতকে সরকার একটা ড্রাইভিং রোল দেয়ার কথা চিন্তা করল। কারণ দেখা গেল, রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় ব্যবসা-বাণিজ্য চালানো সম্ভব নয়। সরকার চিন্তা করল দেশকে প্রাইভেট সেক্টরের হাতে দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে।

মঞ্জুর এলাহী, লতিফুর রহমান সবাই এ অগ্রযাত্রায় সামনের দিকে এগিয়ে আসার চেষ্টা করলেন। এর মধ্যে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী একজন পথিকৃৎ। শীর্ষস্থানীয় এ উদ্যোক্তা বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন।

তিনি প্রথমেই লেদার অ্যান্ড ফুটওয়্যার শিল্পে মনোযোগ দিলেন। অল্প কিছুদিনেই তিনি নিজের একটি শক্ত স্থান তৈরি করলেন সেখানে। মঞ্জুর এলাহী নীতি ও নৈতিকতার সঙ্গে আপস করেননি। এটাই ছিল তার বিশেষত্ব। চামড়া শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। আমরা ওই সময় ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলাম। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী আর আমি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছি এবং সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন সমঝোতায় পৌঁছারও চেষ্টা করেছি। মঞ্জুর এলাহীর উদ্যোগ ছাড়া আজকের দিনে বেসরকারি খাতের অবস্থা ভিন্ন রকম থাকত। দেশের শিল্প-ব্যবসা ও রফতানি খাতের বিভিন্ন পর্যায়ে তার অবদানের স্বীকৃতির প্রয়োজন আছে। তিনি চামড়া ও জুতা শিল্পে কাজ করেছেন, সঙ্গে সার্ভিস সেক্টর উন্নয়নের জন্যও খেটে গেছেন। সরকারি পর্যায়ে আলাপ-আলোচনাও আমরা একসঙ্গে করেছি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সার্বিকভাবে মঞ্জুর এলাহীর অবদান অসামান্য, বিশেষ করে বেসরকারি খাতে। বাংলাদেশী বেসরকারি খাতে ব্যাংক স্থাপনের বেলায়ও তার বিশেষ ভূমিকা আছে। তার হাত ধরে গড়া মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ব্যাংক খাতের প্রচলিত অসুবিধাগুলো দেখা যায় না। আর দশটা ব্যাংকের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় আছে এটি। তার দেখানো রাস্তায়ই আমরা চলছি। তার পুত্র সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরও শিল্পকে বাবার দেখানো পথেই এগিয়ে নিচ্ছেন।

আজ থেকে ৩২ বছর আগের কথা, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেছি। পত্রিকাটি চালু করতে মঞ্জুরের কাছে টাকা ধার চেয়েছিলাম। উনি মানা করলেও সাবেক সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন বেশ অনুপ্রেরণা দেন। মূলত লন্ডনের ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের আদলে এটি চালুর পরিকল্পনা করেন তিনি। কিন্তু এরপর মঞ্জুর এলাহীর কাছে গেলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেই টাকা দিয়ে দিলেন। এত বছর পরও পত্রিকাটি নিজের সুনাম ধরে রেখেছে। কারণ আমরা সবসময় আমাদের নীতিটা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। কোনো ব্যক্তি নয়, অর্থনীতিকে মূল বিষয় ধরেই পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়। মঞ্জুর এলাহীও এ বিষয়ে বেশ অটল ছিলেন, যেন কোনো সংবাদে ব্যক্তিস্বার্থ প্রতিফলিত না হয়।

022

তার স্ত্রী আমাদের পত্রিকা ও সানবিমস স্কুল পরিচালনা করতেন। চেয়ারম্যান হয়েও মঞ্জুর এলাহী কখনো স্কুলের কাজে হস্তক্ষেপ করতেন না। এখনো স্কুলটির বেশ সুনাম আছে।

মানুষ কীভাবে সমাজে ও অর্থনীতিতে অবদান রাখতে চায় এবং তার উদ্দেশ্যই সবচেয়ে মুখ্য বিষয়। উদ্দেশ্য শুধু অর্থ আয় করা নয়, দেশ ও জাতির জন্য কতটুকু দিতে পারলাম তার ওপর নির্ভর করবে।

এত ব্যস্ত মানুষ হলেও তিনি বেশ আড্ডাপ্রিয় ছিলেন। আমি, মঞ্জুর এলাহীর, স্যামসন চৌধুরী সাহেব, লতিফুর রহমান ও কাশেম সাহেব মিলে অনেক দেশ-বিদেশ ঘুরেছি। এগুলো ছিল একদম ব্যক্তিগত ভ্রমণ। নিজেদের মতো আড্ডা, গল্প আর মজা হতো এ সময়। কখনো আমরা দেশ ও জাতির প্রতি নিজেদের কর্তব্য ও শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছি।

দেশের প্রতি তার অবদান আসলে অনেক। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারে উপদেষ্টাও ছিলেন। মঞ্জুর এলাহী সাতটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ২০০২ সালে ‘সেরা বিজনেস পারসন’-এর মর্যাদাও পেয়েছেন। ওনার কথা ও অবদান অল্পতে বলে শেষ করার মতো নয়।

যেমন আইসিসির জন্য দুটি টেলিফোন লাগবে বলে ওনাকে একদিন জানালাম। এর ঠিক ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তা পেয়েও গেলাম। যেখানে অনেক সময় এসব কাজে ৭২ মাসও লাগে।

তার দুই সন্তানও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে যথেষ্ট ভালো কাজ করছেন। তিনি সন্তানদের এভাবেই তৈরি করেছেন। মেয়ে তার মায়ের স্কুল দেখছেন আর ছেলে নিজের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন।

অতীতের কথা বলা প্রয়োজন কিছু। সত্তরের দশকে আমাদের কঠিন সময় গেছে। আশির দশকের পরবর্তী পর্যায়ে আমরা বেসরকারি খাতের নীতির কারণে বিভিন্ন অসুবিধায় পড়েছি। কিন্তু প্রাইভেট ব্যাংকগুলো এগিয়ে এলে কঠিন সময় অনেকটা কাটিয়ে উঠতে পারি। ব্যবসার নামে সে সময় অনেকে অনেক টাকা লুটপাট করেছে। কিন্তু মঞ্জুর এলাহীকে ঘিরে এমন কোনো ঘটনা নেই। আমারও যেমন ন্যাশনাল ব্যাংকে কাজের সময় এমন কিছু অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

মানুষের ভুলভ্রান্তি হতে পারে, কিন্তু ন্যায়নীতির প্রতি তিনি সবসময় অটল ছিলেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে দুর্নীতি আছেই, তাই সামনে এগোতে এগুলোর মধ্য দিয়ে ঢেউ খেলিয়ে যেতে হবে। এ চেষ্টা মঞ্জুর এলাহী করেছেন, আমরাও করি।

মঞ্জুর এলাহী বেশ বাস্তববাদী মানুষ ছিলেন। নিজের মতো করেই নিজের পথ তৈরি করেছেন। তার চিন্তা ছিল, ‘আমার দেশের মানুষ ভালো না থাকলে তো আমি ভালো থাকব না।’ ফলে এপেক্স ফার্মার মতো নানাদিকে তিনি সামনে এগিয়ে গেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সামনের দিকে আরো অবদান রাখবে বলে আমি আশা করি।

মাহবুবুর রহমান: প্রেসিডেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশ