সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ও আমি ১৯৬২ সাল থেকে তার মৃত্যু অবধি একান্ত বন্ধু ছিলাম। বিভিন্ন পরিধিতে বিভিন্ন সময়ে তার সম্পর্কে জানা, তাকে ভালো লাগা ও তার সঙ্গে কাজ করা হয়েছে।

আমি যে খুব ভালো ছাত্র ছিলাম এটা মঞ্জুর সবার কাছে বেশ ফলাও করে বলত। অনেকটা এমন করে বলত—ক্লাসের ফার্স্ট ফরাস আর লাস্ট আমি। আর আমিও সঙ্গে সঙ্গে বলতাম, ‘কিন্তু অর্জনের দিক থেকে তুমি আমাকে ছাড়িয়ে গেছ।’ এ স্বীকৃতি সে গ্রহণ করত অবশ্য।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীকে শ্রদ্ধা করার, ভালো লাগার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আমাদের দেশে যে কজন বিজ্ঞ, জ্ঞানী, ঠোঁটকাটা, সৎ, স্বচ্ছ ব্যক্তি ছিলেন বা আছেন তার মধ্যে মঞ্জুর এলাহী সন্দেহাতীতভাবে একেবারে শীর্ষে।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর বংশ পরিচয় বিশাল। তিনি প্রধান বিচারপতির ছেলে, প্রধান বিচারপতির ভাই। তার শ্বশুর ড. মফিজ চৌধুরী লন্ডন থেকে ১৯৭৩ সালে রসায়নে পিএইচডি করেছিলেন। অন্যদিকে আমি, বলতে গেলে নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের একজন মেধাবী সন্তান। কিন্তু আমাদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বের কখনো ফারাক হয়নি। এটা বোধ হয় সম্ভব হয়েছে মঞ্জুর আর আমার ধ্যানধারণা অনেকটা একই ধরনের ছিল বলে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা একটা গৌরবোজ্জ্বল যুদ্ধের মধ্য দিয়ে হয়েছে। এটাকে আমাদের লালন করা দরকার, সম্মান করা দরকার। আমরা গত ৫২-৫৩ বছরে যা অর্জন করেছি তার মধ্যে অনেক সমস্যাও আছে। তবে যা অর্জন করেছি সেটাকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আর সেটা পারব বলে আমরা দুজনেই বিশ্বাস করতাম। আরো বিশ্বাস করতাম যে তখন এ দেশ একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হবে, যেখানে দারিদ্র্য থাকবে না। ক্ষুধা থাকবে না, চিকিৎসার অভাব ও সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। সব মানুষ একটা কল্যাণ রাষ্ট্রের সুখী বাসিন্দা হবে—এটা আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম এবং তা প্রকাশও করতাম। এটা আমাদের মধ্যে একটা কমন পয়েন্ট।

বন্ধুবান্ধব বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পিছিয়ে পড়াদের সাহায্যের জন্য মঞ্জুর জানপ্রাণ ঢেলে দিত। একটা ঘটনা উল্লেখ করা যায়। ১৯৯৫ সাল। আমি তখন মালদ্বীপে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি। তখন একদিন মঞ্জুর আমাকে কল করল। জানাল, সে ইস্ট ওয়েস্ট নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় করার চিন্তা করছে। আমার কাছে জানতে চাইল আমি সঙ্গে থাকব কিনা। আরো বলল, সঙ্গে না থাকলে বোধ হয় কাজটা করা যাবে না। ওই সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে নিজেদের সঙ্গে নেয়ার চেষ্টা করছিল কিন্তু সে বলেছে, ‘আমি দোস্তের সঙ্গে আছি।’ এখন আমরা সবাই জানি, বিশ্ববিদ্যালয়টা ২৯ বছরে অনেক কিছু অর্জন করেছে।

এবার মঞ্জুরের পছন্দের দুই-একটা বিষয় বলা যাক। আমরা আমাদের রাজস্বের শতকরা ১২ ভাগ বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা হিসেবে দিয়ে থাকি। প্রতি পাঁচজন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে একজন আর্থিক সহায়তা পায়। প্রতি বছর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের সন্তানদের প্রায় ৩৫-৪০ জন পড়াশোনার সুযোগ পায়। তাদের আমরা বিনা টিউশনে পড়াই। কাজের পদবির বিচারে একদম নিম্নস্তরের মানুষদেরও বিশ্বমানের শিক্ষার সুযোগ দিতে পারছি, বিষয়টা মঞ্জুর খুব পছন্দ করত।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর ব্যক্তিজীবন খুব পরিচ্ছন্ন। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ওর অসাধারণ সাহস ছিল। আমাদের কেউই আদর্শগত কারণে আপন মনে করতেন না। যখন যারা ক্ষমতায় এসেছেন, যখন যারা করপোরেট ওয়ার্ল্ড, তারা মনে করেছে আমরা বোধ হয় তাদের বৈরী। আমরা আসলে কারো বৈরী না। আমরা ছিলাম দেশের।

আমরা করাচিতে একসঙ্গে কাজ করেছি। মঞ্জুর ব্রিটিশ টোব্যাকো কোম্পানিতে বিরাট চাকরি করত। সেই চাকরি ছেড়ে এসে ১৯৭২ সালে বেসরকারি খাতে যাবে এটা আমরা কেউ ভাবিনি। কিন্তু ওর ভেতরে একটা প্রত্যয় ছিল। একটা পরিকল্পনা ছিল। সেটা নিয়ে মাঠে নেমেছে এবং খুব সফল হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠান এপেক্স গ্রুপ, বিশেষ করে এপেক্স ফুটওয়্যার তো বিশ্বখ্যাত। যেখানে দেশের প্রায় অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান করছে, সেখানে এপেক্স নতুন নতুন বাজার পাচ্ছে।

মঞ্জুর খুব সংগীতপিপাসু ছিল। আমাদের বন্ধু ছিল আবদুশ শাকুর, অতুল প্রসাদের গান গাইত। মঞ্জুর খুব পছন্দ করত। আমরা প্রায়ই বসে শুনতাম শাকুরের গান। এমনিতে দেশের গান, রবীন্দ্রসংগীত তো শুনতই কিন্তু অতুল প্রসাদের গানের মধ্যে একটা বিশেষ ভাব আছে, সেটা পছন্দ করত মঞ্জুর। আর খাবারের প্রতি খুব দুর্বল ছিল। সামনে ভালো খাবার থাকলে স্বাস্থ্য বিবেচনা করত না। এমনিকে শেষবার চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগে ইস্ট ওয়েস্টের একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে ইচ্ছেমতো খাচ্ছিল। আমার বাধাও মানছিল না। পরদিন সকালেই পরিবার থেকে সংবাদ পেলাম শরীর বেশি খারাপ।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর সঙ্গে বন্ধুত্বটা এমন ছিল যে আমাদের দুই পরিবারের ছেলেমেয়েরাও একাত্ম। আমার ছেলেমেয়েরা বিদেশ থাকে কিন্তু যখন মনে পড়ে মঞ্জুরের ছেলেমেয়ে নাসিম, মুনিজেও কাছেই আছে, তখনই মন ভালো হয়ে যায়।

ভালো চাকরি, মন্ত্রী হওয়া—এগুলো তো সসীম। মঞ্জুর ব্যবসায়ী হয়েছিল অসীম হওয়ার লক্ষ্যে। একশ বছর পর বাংলাদেশের অর্থনীতি কী হবে, বাজার কোনদিকে যাবে সেটা দেখার ক্ষেত্রে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীকে অগ্রণী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটা সময়ে মঞ্জুরকে প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান (মন্ত্রী সমমর্যাদার) হওয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। সেটা গ্রহণে অস্বীকার করতে তার এক মুহূর্ত লাগেনি। ১৯৯৮ সালে যখন আমাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদ প্রস্তাব করা হলো, আমি তা গ্রহণ করলাম। আমি পাঁচজন মানুষের সঙ্গে আমার প্রস্তুতি হিসেবে আলাপ-আলোচনা করেছি। তার মধ্যে মঞ্জুরের সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় ধরে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছি, বিচার-বিশ্লেষণ করেছি।

আরেকটা কাজ আমরা একসঙ্গে করেছি, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি সিস্টেম—এটা দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটা অঙ্গ। দেখলাম বাংলাদেশ ব্যাংকে কিছু করার নেই। মঞ্জুর, স্যামসন এইচ চৌধুরী, লতিফুর রহমান, রোকেয়া রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে এ সিস্টেমটা আমি চালু করেছিলাম।

তার গ্রুপের, বিশেষ করে এপেক্স ফুটওয়্যারের যে কর্মকাণ্ড, তার সবকিছুর হিসাব-নিকাশ মঞ্জুরের ল্যাপটপে ছিল। প্রতিদিন অন্তত দুই-তিনবার সেগুলো পর্যালোচনা করত। এপেক্স যেভাবে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে তার পুরোটাই মঞ্জুরের উদ্যোগে হয়েছে।

মঞ্জুর অনেক ঠাণ্ডা থাকতে পারত। চামড়ার দাম, চাহিদা ইত্যাদি অর্থনীতির সঙ্গে খুব ওঠানামা করে। এর মধ্যে থেকে এই ‍দুর্দিনে ইতালির সঙ্গে প্রথম শুরু হয় কোলাবরেশন। অনেক সময় ইতালীয়রা এপেক্সের পণ্য কিনে নিয়ে মেড ইন ইতালি ট্যাগ দিয়ে বিক্রি করেছে। এ প্রতিযোগিতার মধ্যে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে এপেক্স ফুটওয়্যার বাজার তৈরি করতে পেরেছে।

আবারো ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি। জন্মদিন পালন করতে চাইলে মঞ্জুর খুব আপত্তি করত। তবে বোধ হয় মনে মনে খুশি হতো। কোন কোন বন্ধু আসবে, কারা গান গাইবে এসব বলত। বয়স যত বেড়েছে ওর এই প্রবণতা তত বেড়েছে। পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল চমৎকার, অ্যাবসলিউটলি ফ্যামিলিম্যান। অনেক দূরের আত্মীয় হলেও কাছে টানার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।

১৯৯৭ সালে ১১টা নতুন ব্যাংক অনুমতি পেল। কয়েকটা ছিল রাজনৈতিক। তবে মঞ্জুরদের ব্র্যাক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ছিল একদম অরাজনৈতিক। সে সময় আমার হাতে ছিল অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা। আমি তো নীতিমালা ধরে ধরে এগোচ্ছি, একদম শেষে এসে থেমে গেছি। তখন সে সব সমাধান করেছে।

ও অনেক দৃঢ়চেতা, সৎ ছিল। পিছিয়ে পড়া মানুষকে নিয়ে ভাবত। কোনো কাজ করতে কখনো পিছপা হতো না। তবে অহেতুক কাজে মাথা ঘামাত না। একজন অসাধারণ, স্বচ্ছ, সৎ এবং পরিপূর্ণ মানুষ সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী।

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। চেয়ারপারসন, বোর্ড অব স্ট্রাস্টি ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি