বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির (যুক্তরাষ্ট্র) ভবিষ্যৎ নেতার সরকার পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ফলে মনে হচ্ছে, তিনি ভূরাজনীতির প্যাঁচে পড়ে যাবেন। রাশিয়ার সঙ্গে স্বস্তিকর সম্পর্ক রক্ষার ইচ্ছা এবং বাণিজ্য চুক্তি (টিপিপি) বাতিলে তার প্রতিশ্রুতি মনে হচ্ছে বড়ই অসময়ের। তার এ ধরনের ইচ্ছা বরং প্রকাশ্যে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি সামনে আনবে।
এদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনৈতিক সত্তা (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) কর্তৃক গঠিত ব্লক এরই মধ্যে অস্তিত্বের সংকটে পড়তে যাচ্ছে। এর প্রধান একটি দেশ ইইউ ত্যাগের পক্ষে ভোট দিয়েছে, দীর্ঘতর সময় পর্যন্ত থাকা এর একজন নেতা এখন গুরুত্বপূর্ণ পুনর্নির্বাচনের মুখোমুখি এবং এর ব্যাংকিং খাত এখনো নানা ঝামেলায় টলায়মান।
আবার বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান প্রবৃদ্ধি ইঞ্জিনগুলোর তথ্যের ওঠানামাও লক্ষণীয়। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য নিয়ে একটি সরবরাহ যুদ্ধ চলমান। সুদহার ঊর্ধ্বমুখী ও আর্থিক সংকটের পর ঋণমাত্রা সবে বাড়তে শুরু করেছে। উল্লিখিত সব তথ্যই বলে যে, বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিন্যস্ত ও স্বস্তির একটি বছর স্মরণ করা সত্যি নিদারুণ কঠিন। তবে ২০১৭ সালের পর্দা উন্মোচন হওয়ায় বাজার অবশ্য ওইসব নিয়ে মোটেই উদ্বিগ্ন নয়। নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার চাঙ্গা হয়েছে। তাই এসঅ্যান্ডপি/টিএসএক্স কম্পোজিট ইনডেক্সও এখন আর দূরবর্তী বিষয় নয়।
কিন্তু সামগ্রিকভাবে কোন দিকে যাচ্ছি, সেটি নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকেই যাচ্ছে। রাসেল ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান বৈশ্বিক বিনিয়োগ কর্মকর্তা জেফ হুসি বলেন, ২০১৭ সাল কিছু অনিশ্চয়তা ও সম্ভাব্য অগুনতি ঝুঁকি হাজির করবে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে এবং প্রবৃদ্ধিমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পারলে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের সুফল অব্যাহত থাকবে। কিন্তু বাজার যখন অনন্য উচ্চতায় উন্নীত হয় (যেমনটা সাম্প্রতিক সময়ে হয়েছে), তখন প্রায়ই তাড়াতাড়ি সেটার পতনও ঘটে এবং সে পতন হয় খুবই যন্ত্রণাকর।
আরবিসি গ্লোবাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্টের প্রধান হানিফ মামদানি বলেন, আমরা সবাই জানি, বাজার সোজা পথে চলে না। সেক্ষেত্রে সবসময় ঝুঁকি থেকেই যায়। আবার সিটিগ্রুপ ইকুইটি স্ট্র্যাটেজিস্ট চোবিয়াস লেভকোভিকের ভাষ্য হলো, নির্বাচন-পরবর্তী ইকুইটি গেইন থেকে ২০১৭ সালে কিছু রিটার্ন ধার করতে হতে পারে বিনিয়োগকারীদের। তিনি উল্লেখ করেন, আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসন থেকে আসা বড় অবকাঠামোসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো আইনপ্রণেতার সমালোচনার শিকার হতে পারে, সেগুলো তাদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হতে পারে, সেক্ষেত্রে সেটিই বিনিয়োগকারীদের হতাশার কারণ হবে। উপরন্তু ট্রাম্পের ব্যয় পরিকল্পনা হবে ২০১৭ সালে ক্ষমতাকেন্দ্রের ভেতরে সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত বিষয়। ম্যাককুয়ারি ক্যাপিটালের কোয়ান্টিটেটিভ অ্যানালিস্ট গার্ভিন্ডার ব্রার বলেন, নীতি/রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা ইকুইটি মার্কেট চালিত হওয়া অব্যাহত থাকবে, সেটাই বৃদ্ধি করবে যেকোনো অনুমানের অনিশ্চয়তা। এক্ষেত্রে ব্রার কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও তার উদীয়মান ডলার-সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিতে জোর দেন না, উপরন্তু তিনি জোর দেন ইউরোপের আসন্ন নির্বাচন ও ব্রেক্সিট অনিশ্চয়তার ওপর, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্তিমিত ও বাজারের অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করতে পারে।
জাপানের মতো ইউরোপে ঋণাত্মক সুদহারের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। আদতে সেটিই হবে ২০১৭ সালে বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারে অংশগ্রহণকারীদের কোনো ধারণা নেই যে, ব্রেক্সিট কঠোর, নমনীয় না এর মাঝামাঝি কিছু একটা হবে। কাজেই চলতি বছরে এটিও একটি চ্যালেঞ্জ থাকছে। এদিকে ইতালির ব্যাংকিং খাত পুঁজি ও সম্পদ মানে দুর্বল অবস্থার সম্মুখীন। অর্থাৎ সেখানকার ব্যাংকগুলোয় পুঁজির সংকট প্রবল। এটিও কম ঝুঁকির নয়।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও চলতি বছরে ঘোর অমানিশা বিরাজ করছে। স্পেন থেকে পোল্যান্ড সবখানেই জনরঞ্জনবাদী রাজনৈতিক দলগুলো ভরবেগে অবস্থান করছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অস্থিতিশীলতার স্ফুলিঙ্গ দেখা দিচ্ছে। আর এ স্ফুলিঙ্গে জ্বালানি জুগিয়ে চলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়। গ্লাস্কিন শেফ প্লাস অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও স্ট্র্যাটেজিস্ট ডেভিড রোজেনবার্গ ২০১৭ সালে বিনিয়োগকারীদের আরেকটি ফ্যাক্টর মনে রাখার বিষয়ে জোর দেন। চলতি বছরের অনুষ্ঠেয় ২২ অক্টোবরের নির্বাচনে দেশটির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের সমর্থন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। জরিপ বলছে, গেল ডিসেম্বরে বার্লিনের ক্রিসমাস মার্কেট হামলায় ১২ জন মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় তার জনপ্রিয়তা অনেকখানি কমে গেছে। রোজেনবার্গ উল্লেখ করেন যে, ইউরো পরীক্ষণ ও ইউরোপের সংহতি অক্ষত রাখতে মেরকেলকে প্রধান ব্যক্তি মনে করা হয়। তিনি বলেন, ফ্রান্সের নির্বাচনের সঙ্গে মার্চ নাগাদ শুরু হওয়া যুক্তরাজ্যের সত্যিকার ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া ২০১৭ সালে ইউরোপজুড়ে উদ্বায়িতা তৈরি করতে পারে। আবার এসব রাজনৈতিক ঝুঁকির সঙ্গে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার একটি প্রেক্ষাপটও রয়েছে। এখনো ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক সংকট থেকে বিশ্ব অর্থনীতি পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি। কাজেই ২০১৭ সালে সেদিক থেকেও বেশ উদ্বেগ থাকছে।
ডেসজারডিন্স গ্রুপের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ হেনডরিক্স ভ্যাচন উল্লেখ করেন, ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে কিছু দেশের অর্থবহ অগ্রগতি হলেও বৈশ্বিক পর্যায়ে ঋণ এখনো প্রধান সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এটা বড় হুমকি হবে। তিনি আরো বলেন, সুদহারের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ঋণগ্রহীতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করায় এখন আলোচ্য ঝুঁকি আরো বাড়বে।
ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে আলোচ্য অর্থনীতিবিদ দেখিয়েছেন, খানা, সরকার এবং অ-আর্থিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণ ২০১৫ সালে জিডিপির ২১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এখন এটি জিডিপির ২৫০ শতাংশের কাছাকাছি উন্নীত হতে পারে।
প্রাগ্রসর/উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো খারাপ দিকে মোড় নিচ্ছে। আবার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয়ও ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষণীয়। ক্রয়ক্ষমতা সাম্যের দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর অর্থনীতিও নানা সমস্যায় জর্জরিত। চীনের নীতিনির্ধারকদের বহিঃপ্রবাহের স্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের মতো কিছু ইস্যু মোকাবেলা করতে হচ্ছে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাড়তি হস্তক্ষেপ করা হলে সেটা বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশটির প্রবৃদ্ধি পথ বজায় রাখাটা কঠিন করে তুলবে।
ম্যাককুয়ারি ক্যাপিটালের ল্যারি হো বলেন, ২০১৬ সালের সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয়বস্তু ছিল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনের আদৌ শক্ত অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে কিনা। ২০১৬ সালের শেষ দিকে চীনা অর্থনীতি আবারো নিরাশাবাদীদের দ্বারা সমালোচনায় বিদ্ধ হয়েছে। এখন দেশটির প্রধান উদ্বেগ মূল্যস্ফীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, নীতি ও সম্পদের দিক থেকে উল্লিখিত সবকিছুই ন্যায্য হতে পারে। কিন্তু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির জন্য সেগুলো মোকাবেলা কতটা কঠিন, তা অনুমান করা সত্যি দুঃসাধ্য।
এদিকে কানাডা, নরওয়ে ও নিউজিল্যান্ডের গৃহঋণের মাত্রা ২০০৮ ও ২০০৯ সালের আর্থিক সংকটের আগে যুক্তরাষ্ট্রে যেমন ছিল, সে পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। ভ্যাচন বলেন, সংক্ষেপে বলতে গেলে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঋণ সমস্যাকে সেভাবে সামলানো হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উন্নত দেশে গৃহঋণের যে উল্লম্ফন হয়েছে, তা বিপদে ফেলেছে সরকারের ঋণ। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যদি সুদের হার বাড়তেই থাকে।
কানাডার স্থানীয় অর্থনীতি ও ইকুইটি মার্কেট এখনো বহুলাংশে পণ্য, বিশেষ করে তেলের ওপর নির্ভরশীল। ক্রুডের দাম ও ওপেকের তেল উৎপাদন কমানোর প্রতিজ্ঞা মিলিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এ সংস্থা কি তেল উৎপাদন হ্রাসের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারবে? ইতিহাস বলছে, বিষয়টি মোকাবেলা সহজ হবে না। যারা মানবে না তাদের কীভাবে শাস্তি দেয়া হবে, সে বিষয়টিও পরিষ্কার নয়। এটি তেলের দামকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং এমন কিছু ঘটতে পারে, যা একেবারেই কাম্য নয়।
এ ধরনের অনিশ্চয়তার মাঝে ২০১৭ সালে বিনিয়োগকারীদের একমাত্র বাজার অস্থিতিশীলতাই ভরসা। আরবিসির মামদানি বলেন, এমন সুযোগ আসবে অথবা এমন সময় আসবে, যখন মানুষ প্রশ্ন করবে— আমরা কত দূর এলাম ও তা কত দ্রুত? তখনই হয়তো একটি আকস্মিক পরিবর্তন ঘটতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য এক্ষেত্রে প্রস্তুত হয়ে থাকাটা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। এর মানে বছর শুরু করতে হবে হাতে কিছু নগদ অর্থ রেখে এবং প্রস্তুত থাকতে হবে পরবর্তী সুযোগের জন্য।
রাজনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের কথার ভিত্তিতে ২০১৭ সালে শেয়ারবাজার প্রভাবিত হবে। তবে ধূলিকণা সরে গেলে দিন শেষে মৌলিকতারই (ফান্ডামেন্টালস) বিজয় সূচিত হবে।
লেখক: ফিন্যান্সিয়াল পোস্টের ইনভেস্টিং ও ট্রেডিং ডেস্কের
ওয়েব এডিটর
ভাষান্তর হুমায়ুন কবির






