চিপ সংকটের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নড়েচড়ে বসেছে। সংকটের আগেও অনেক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব চিপ তৈরিতে পদক্ষেপ নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং নিজেদের চিপ উৎপাদন ও ব্যবহার করে আসছে। অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কা থাকলেও আগামী বছর নিজেদের সবচেয়ে বড় কারখানায় চিপ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস। খবর রয়টার্স।

দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে এ বিষয় উঠে এসেছে। চাহিদা কমে আসায় প্রতিযোগী চিপ উৎপাদনকারীরা যেখানে বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছে তখন স্যামসাং উৎপাদন বাড়ানোর এ পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, স্যামসাং তাদের উৎপাদন বাড়াতে বিনিয়োগের যে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে তা মেমোরি চিপে শীর্ষস্থান অর্জনে সহায়তা করবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে শেয়ারের দামে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিল্পসংশ্লিষ্টদের বরাতে দ্য সিউল ইকোনমিক ডেইলির প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ডির্যাম মেমোরি চিপ উৎপাদনে ১২ ইঞ্চি ওয়েফার যুক্ত করতে চায় স্যামসাং। দেশটির পিয়ংটেকে অবস্থিত পিথ্রি কারখানায় এ কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো হবে।

১২ ইঞ্চির ওয়েফার যুক্ত করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি কারখানায় ৪ ন্যানোমিটারের চিপ ক্যাপাসিটি যুক্ত করবে। তবে গ্রাহকদের চাহিদা ও পছন্দের ডিজাইন অনুযায়ী এটি তৈরি করা হবে বলে স্যামসাং সূত্রে জানা গেছে। চলতি বছর পিথ্রি কারখানায় উন্নত প্রযুক্তির ও আধুনিক ডিজাইনের এনএএনডি বা ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরি চিপ উৎপাদন শুরু হয়েছে। এটিই এখন পর্যন্ত স্যামসাংয়ের সবচেয়ে বড় উৎপাদন কেন্দ্র।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী বছরের মধ্যে স্যামসাং অন্তত ১০টি অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহারযোগ্য মেশিন যুক্ত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্যামসাংয়ের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। অক্টোবরে দেয়া এক বিবৃতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্টটি জানিয়েছিল, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির চিপ উৎপাদন কমানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।

স্যামসাংয়ের মেমোরি বিজনেস বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান জিন ম্যান সে সময় জানানা, অবকাঠামোগত উন্নয়নে যে মূল পরিকল্পনা রয়েছে সেটি নিয়েই কাজ করতে চাই। স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান যেখানে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সেখানে এর উল্টো পথে রয়েছে মাইক্রন টেকনোলজি। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ অর্থবছরে ৭০০-৭৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যেখানে ২০২২ অর্থবছরে বিনিয়োগ ছিল ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার। ২০২৪ অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি তাদের মূলধন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে।

তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি অক্টোবরে ২০২২ সালের জন্য বার্ষিক বিনিয়োগ বাজেট ১০ শতাংশ কমানোর পাশাপাশি আসন্ন চাহিদার বিষয়ে আরো সতর্ক অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছে।

চিপ উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার ধরে রাখতে এবং গ্রাহকদের চাহিদা বাড়াতে স্যামসাং বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। স্মার্ট ডিভাইসের পাশাপাশি অন্যান্য পরিষেবার পরিধি বাড়াতেও কাজ করেছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো স্যামসাং পে। এটি স্যামসাংয়ের ডিজিটাল ওয়ালেট পরিষেবা ও ডিজিটাল সার্টিফিকেট প্লাটফর্ম। পরিষেবাটি ক্রমেই আন্তর্জাতিক বাজারে বিস্তৃত হচ্ছে, যা চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরো ১৩টি দেশে চালু করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

যে দেশগুলোয় স্যামসাংয়ের  ডিজিটাল ওয়ালেট পরিষেবা চালু হচ্ছে সেগুলো হচ্ছে বাহরাইন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, কাজাখস্তান, কুয়েত, নরওয়ে, ওমান, কাতার, দ. আফ্রিকা, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।

গ্যালাক্সি ব্যবহারকারীরা স্যামসাং ওয়ালেটের দ্বারা ডিজিটাল কি, পেমেন্ট কার্ড, বোর্ডিং পাস, সেই সঙ্গে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও স্টুডেন্ট আইডির মতো শনাক্তকরণ কার্ডগুলো একটি একক মোবাইল অ্যাপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

অন্যদিকে চলতি বছরের শুরুর দিকে স্মার্টফোনের জন্য সফটওয়্যার আপডেট নীতিমালায় বেশকিছু পরিবর্তন এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর অংশ হিসেবে গ্যালাক্সি এস২২ সিরিজের স্মার্টফোনগুলোয় চার বছর সিস্টেম আপডেট দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

গ্যালাক্সি আনপ্যাকড ইভেন্টে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্টটি জানায়, গ্যালাক্সি এস২২-এর পাশাপাশি সম্প্রতি উন্মুক্ত অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনগুলোয় চার বছর আপডেট দেবে। ফলে এখন থেকে ব্যবহারকারীরা স্মার্টফোনের সফটওয়্যার ও সিকিউরিটির ক্ষেত্রে বর্তমান বাজারনীতির তুলনায় বেশি আপডেট পাবে।

অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমে দীর্ঘ সময় সফটওয়্যার আপডেট দেয়ার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের কাছে থাকা স্মার্টফোনের আয়ু ও ব্যবহারের সময় বেড়ে যাবে। টেকসই বাজার ব্যবস্থা উন্নয়নে টুগেদার ফর টুমরো মার্কেটিং ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে স্যামসাং নতুন এ উদ্যোগ নিয়েছে।

মোট ১২টি ডিভাইসে স্যামসাং অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের চার বছর মেয়াদি আপডেট দেয়ার কথা জানিয়েছে। গ্যালাক্সি এস২২, ট্যাব এস৮ ছাড়াও গ্যালাক্সি এস২১, এস২১এফই, গ্যালাক্সি জি ফোল্ড৩ ও জি ফ্লিপ৩ স্মার্টফোনও আপডেট কার্যক্রমের আওতায় আসবে।