কভিড-১৯-এর কারণে গত দুই বছর ছিল বিশ্ববাসীর জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তিগত ব্যবহার উপলব্ধি করার সময়। মহামারী বিস্তারের দরুন বিভিন্ন দেশ কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় পুরোপুরি গৃহবন্দি সময় কাটে সবার। প্রযুক্তিবিদরাও এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিয়ে আসতে থাকেন নানা চমক। সদ্যসমাপ্ত বছরে মার্ক জাকারবার্গের মেটাভার্স, জ্যাক ডরসির ব্লকচেইন অথবা ইলোন মাস্কের ড্যান্সিং রোবট—এ রকম নানা চমক অবলোকন করেছে প্রযুক্তি জগৎ। এত কিছুর চাপে প্রযুক্তি জগতে নতুনত্বের পাশাপাশি বেড়েছে সংকটও। গত বছরের উল্লেখযোগ্য সংকট ছিল বিশ্বব্যাপী শুরু হওয়া চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর সংকট।

কয়েক দশক ধরেই প্রযুক্তি খাতের মূল উপাদান হয়ে উঠেছে চিপ। প্রযুক্তি দুনিয়ার যন্ত্রকে নানা উপায়ে কার্যক্ষম এবং তথ্যপ্রবাহ ঠিক রাখতে মূল কাজটি করে এ চিপ। প্রতি বছরই আরো নতুন প্রযুক্তিগত ক্ষমতা ও নিপুণতা নিয়ে আসে এসব চিপ। তবে ২০২১ সালে প্রযুক্তি খাতে বিশ্বব্যাপী অভূতপূর্ব ব্যবহার বাড়ায় এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটায় সংকট সৃষ্টি হয় চিপ উৎপাদন ও সরবরাহ খাতে।

গত এক দশকে ওয়েব, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন ধরনের অ্যাপসের কারণে অনেকটাই আড়াল হয়ে পড়েছিল সেমিকন্ডাক্টরের গুরুত্ব। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টেলের নতুন চিপের চেয়ে গুগলের অপ্রতিরোধ্য ওয়েব সার্চ, অ্যামাজনের ই-কমার্স সাম্রাজ্য ও ফেসবুকের এফওএমও ফিডের ওপরেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সিলিকন ভ্যালি। তবে ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী চিপ সংকট আবারো মনে করিয়ে দিয়েছে যে এর গুরুত্ব অন্য যেকোনো কিছুর তুলনায় এখনো বেশি।

২০২১ সালে নতুন ভোক্তাগোষ্ঠী তৈরি হওয়ায় চিপের চাহিদায় চাপ বেড়েছে বহুগুণ। মহামারী ও ভৌগোলিক উদ্বেগের দরুন চিপ সরবরাহ শৃঙ্খলে তৈরি হয়েছে নানা সংকট। সাধারণ কম্পিউটার চিপ থেকে শুরু করে উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন চিপ, সব ক্ষেত্রেই এ চাপ অনুভব করা গেছে। ফলে সংকটে পড়েছে কার থেকে শুরু করে গেমিং কনস্যুল ও খেলনা উৎপাদন। চিপ উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য দুটি বৃহৎ শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব একটি দৃশ্যমান আকারে রূপ নিয়েছে। অনেক সরকারই নিজেদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রচুর পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতেও রাজি হয়েছিল।

বিভিন্ন উদীয়মান খাতে পছন্দসই চিপ ডিজাইন একটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বচালিত গাড়ি ও ফাইভজি খাতে এ ধরনের চিপের ব্যবহার বাড়ছে। সাধারণ ব্যবহারের জন্য উৎপাদিত চিপের তুলনায় এগুলো অনেকটা আলাদা এবং বিশেষ কাঠামোয় তৈরি করা হয়, যা নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলোর কার্যক্ষমতা আরো গতিশীল করে তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনিস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) অ্যাডভান্সড মাইক্রো-ইলেকট্রনিকস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জেসাস ডেল অ্যালামো বলেন, চিপের ব্যাপারে আসলে বিশেষ কিছু বলার নেই। যেকোনো কিছুর মূলই হলো চিপ। এসব চিপ অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশে অনেক জটিল কার্য সম্পাদন করে, যা আমাদের জীবনে অবিশ্বাস্য সুবিধা এনে দেয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মাহামারীকালীন সবাই বুঝতে পেরেছে আমাদের অর্থনীতিতে চিপ কতটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে আছে। ২০২০ সালের শুরুতে অটোমোবাইল নির্মাতারা নিজেদের কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় শুধু চিপ সংকটের কারণে। শিল্প রোবট থেকে শুরু করে মেডিকেল ডিভাইসে চিপের ব্যবহার সংকট আরো বিস্তৃত করে তোলে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ এ চিপ সংকটকে আরো জটিল করে তুলেছে। ২০১৮ সালে হুয়াওয়ের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় অনেক চীনা কোম্পানি সেমিকন্ডাক্টর ওয়েফার মজুদ করে। এতে করোনাকালে সরবরাহ চেইন সংকট আরো গাঢ় হয়। ২০২১ সালে প্রযুক্তি জায়ান্ট, ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সরকার বুঝতে পেরেছে সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আগামী দিনে আরো গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা যাবে। সে বিষয়টি মাথায় রেখে এ খাতে বড় অংকের বিনিয়োগ নিয়ে আসছে তারা। নতুন বছরে আমরা হয়তো তার প্রভাব দেখতে পাব।