লুঙ্গি তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ?

লুঙ্গি নামক মানবদেহের নিম্নাঙ্গে পরিধেয় তুমুল আরামদায়ক লৈঙ্গিক সাম্যের প্রতীকরূপে পরিগণিত (আজ্ঞে হ্যাঁ, প্রকৃতপক্ষে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবারই পরিধেয় ওটি) পোশাক কিংবা বস্ত্রখণ্ডটির আদি উৎস ঠিক কোন ভূখণ্ডের মাটিতে পোঁতা, সে প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব খুঁজতে গেলে পয়লায় খানিক গোলমালেই পড়তে হয়। বস্ত্র বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদরা বহু তালাশ করেও আজ অবধি লুুঙ্গির আদি আবির্ভাবভূমি বিষয়ে একমত হতে পারেননি। এ কী গোলমাল! পোশাকটি নেহাতই সরল গড়নের হলেও এর ইতিহাস ও উৎস সন্ধানের বেলায় এত প্যাঁচ! (আলাভোলা মনের প্রশ্ন, লুঙ্গি কি তবে জিলাপির দূর সম্পর্কের নিকটাত্মীয়?) সে যা-ই হোক, লুঙ্গির উৎস ঠিক কোথায় সে-সংক্রান্ত প্রশ্ন নিয়ে বিরাজিত বিভ্রান্তিকর দশাকে আপাতত নিষ্ক্রিয় করে দেয়ার জন্য তুলনামূলকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য হিসেবে গণ্য একটি সিদ্ধান্তকে সামনে আনা যাক এবার। সেটি হলো, বার্মা নয় বা বাংলা নয়—লুঙ্গি এসেছে আদতে দক্ষিণ ভারত থেকে। আরো নির্দিষ্ট করে বললে তামিলনাড়ু অঞ্চল থেকে। দূর অতীতকাল থেকেই তামিলনাড়ুতে ‘ভেশতি’ নামের একটি পোশাক তৈরি হতো বলে প্রমাণ মেলে। মসলিন কাপড়ের তৈরি সেই ভেশতি আকারে-প্রকারে এবং পরিধান প্রক্রিয়ায় লুঙ্গির পূর্বসূরি। লুঙ্গিরই পূর্বগামী এ ভেশতি সে কালের ব্যাবিলনেও নাকি রফতানি হতো। ‘বারাদাভারগাল’ নাম্নী এক তামিল জেলে সম্প্রদায় লুঙ্গির এ পূর্বসূরিকে রফতানি প্রক্রিয়ার মধ্যে পৌঁছে দিত প্রাচীন মিসর, মেসোপটেমিয়া কি পশ্চিম আফ্রিকায়ও। তামিল ছবির বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তার কয়েক হাজার বছর আগে তামিল লুঙ্গির এমন বিশ্বব্যাপী বিস্তার! ভাবা যায়? তবে ইতিহাসবিদদের বড় একটা অংশ মনে করেন তামিলভূমিতে লুঙ্গি হাজির হয়েছে মালয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে।

লুঙ্গি যখন ব্রহ্মদেশের সামাজিক সম্পদ

তামিলনাড়ু ছাড়িয়ে ব্রহ্মদেশে যাওয়া যাক। হালের মিয়ানমার বা সাম্প্রতিক অতীতের বার্মার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসে লুঙ্গির এক বিশিষ্ট স্থান রয়েছে বরাবরই। মানে বহু আগে থেকেই আরকি। স্মরণ করুন—সেই ছোটবেলায় প্রথম হাতে আসা ব্যাকরণ বইতেও আমরা বারবার পড়েছি, খোদ লুঙ্গি শব্দটিই হলো বর্মি ভাষার—বার্মা বা মিয়ানমার ‘হইতে আগত’। বার্মা মুলুকের প্রচলিত প্রাচীন প্রবাদও আছে, ‘যে পুরুষ পরতে জানে না সে আদতে অন্ধ, আর যে নারী লুঙ্গি বুনতে জানে না সে আদতে খোঁড়া’। কথাটি যে অতি বাজে নোংরা একপেশে পুরুষতান্ত্রিক বচন তাতে সন্দেহ নেই। তবে এ থেকে বার্মাবাসীর লুঙ্গিপ্রীতির একটা দিকও বেশ বোঝা যায়। সেখানে আজো নারী-পুরুষ উভয়েরই প্রিয় স্বাচ্ছন্দ্যময় পোশাক লুঙ্গি। তবে আজব ব্যাপার কী, লুঙ্গিকে বার্মায় আগে লুঙ্গি বলে ডাকা হতো না! ঘটনাটি উদ্ভট হলেও কিন্তু সত্য। অন্তত উনিশ শতক অবধি বার্মায় লুঙ্গি শব্দটির প্রচলন ছিল না। আজকের লুঙ্গি ওখানে প্রাচীনকালে পরিচিত ছিল ‘পাসো’, ‘লুঙ্গাই’ ও ‘হাতামিন’ নামে। ইংরেজ সিভিলিয়ান হেনরি ইউল ১৮৫৫-তে বার্মায় গিয়ে দেখেছিলেন, প্রায় প্রত্যেক বর্মি পরিবারেই আজকের লুঙ্গি অর্থাৎ তত্কালের লুঙ্গাই, পাসো কি হাতামিন বোনার চল রয়েছে।

পাসো নামের লুঙ্গিসম বস্ত্রটি মুখ্যত ছিল পুরুষের পরিধান। কমপক্ষে ৩০ ফুট লম্বা পাসোতে কোনো সেলাই অবশ্য থাকত না। ‘হাতামিন’ ছিল বিপরীতপক্ষে নারীদের নিজস্ব লুঙ্গি, তাতে সেলাই থাকত, দৈর্ঘ্যে তা সাড়ে চার কি পাঁচ ফুটের বেশি হতো না এবং বাড়তি হিসেবে পাড় বসানো থাকত। লুঙ্গির দুই পূর্বসূরির মধ্যে নারী-পুরুষ ভেদ থাকলেও দুটিই ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। বিশেষত পাসো, তাতে সেলাই থাকত না বটে; কিন্তু কোন ব্যাটা ছেলের পাসো আকারে কত বড় তা দেখেই তার আভিজাত্য ও সামাজিক অবস্থান মাপা হতো! আর লুঙ্গাই ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়, ওই গোত্রের পোশাকের মধ্যে। এখনকার বাজারে সহজলভ্য বার্মিজ লুঙ্গিই আদতে তখনকার লুঙ্গাই। ইউল সাহেব লিখেছেন, এ গোত্রের পোশাকগুলো অনেকটা ভারতীয় ধুতির মতো। তবে লুঙ্গি-পাসো-হাতামিনের কোঁচাটা এত বড় হয় যে তা দেখে বিদেশী পর্যটকরা বলেন, ‘একটা বাচ্চার মাথার সমান বড়ো’। ইউল সাহেবের সবচেয়ে ভালো লেগেছিল বর্মি লুঙ্গাইয়ের রঙদার বাহার। এর উজ্জ্বল রঙ (প্রধানত লাল, সবুজ ও হলুদ) আর ‘জিগ-জ্যাগ’ ডিজাইনের কথা তিনি খুব উচ্ছ্বাসের সঙ্গে লিখেছেন। সুতা ও বুননের তারতম্যের কারণে দামের ওঠা-নামার উল্লেখও তার লেখায় পাই। তিনি বার্মায় সেই উনিশ শতকের মাঝামাঝি সবচেয়ে সর্বনিম্ন ৪ রুপি থেকে সর্বোচ্চ ১০০ রুপির লুঙ্গাই-পাসো-হাতামিন দেখেছিলেন। অর্থাৎ ওই সময় বার্মার ধনী-গরিব সবাই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী লুঙ্গি গোত্রীয় পোশাক পরতে স্বচ্ছন্দ ছিল।


দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরো দেশে

লুঙ্গির সঙ্গে সমুদ্র-নদী বা জলাভূমির একটা প্রাথমিক যোগ আছে বলেই মনে হয়। দক্ষিণ ভারত, বাংলা মুলুক কি বার্মা—লুঙ্গিপ্রিয় সব জায়গাই তো জলে ঘেরা। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়াঘেঁষা বার্মা মুলুক ছাড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রময় অন্যান্য দেশেও তাই লুঙ্গি বা লুঙ্গি ঘরানার পোশাক জনপ্রিয়। এ অঞ্চল থেকেই ভারতীয় বণিকরা লুঙ্গির ধারণা নিয়ে গিয়েছিল তাদের দেশে।

শ্যামদেশ বা থাইল্যান্ডের কথা দিয়ে শুরু করা যাক। শ্যামদেশে নারী-পুরুষ উভয়েরই প্রিয় পোশাক লুঙ্গি। নারীর পরিধেয় লুঙ্গির নাম থাই ভাষায় ‘পা তোং’, পুরুষের ‘পা কাও মাহ’।

মালয়েশিয়ায়-ইন্দোনেশিয়ায়ও লুঙ্গি অনেকেই পরে। ইন্দোনেশিয়া-জাভা অঞ্চলে ‘সারং’ নামে লুঙ্গির চল আছে। বাটিকের সারং জাভা দ্বীপপুঞ্জে খুবই জনপ্রিয় পরিচ্ছদ বলে গণ্য হয়। চেক লুঙ্গি পরে ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম পুরুষরা নামাজ আদায় করে। এছাড়া বাড়িতে পরিধানের জন্য নারী-পুরুষের আলাদা আলাদা ধরনের লুঙ্গি সেখানে প্রচলিত। ও দেশের প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো নিজে বেশ লুঙ্গিভক্ত, একবার তো লুঙ্গিকে ইন্দোনেশিয়ান সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলেই ঘোষণা দিয়ে বসেছিলেন। তিনি দেশের মানুষকে মাসে অন্তত একবার সারং পরার আহ্বান জানিয়েছেন।

মালয়েশিয়ায় লুঙ্গি পরিচিত ‘কাইন’ বলে। এটি মালয় ভাষার একটি শব্দ। সেখানে লুঙ্গির বিভিন্ন গোত্রের নাম-পরিচয় এমন: ১. কাইন পেলিকাত (স্ট্রাইপ ও বক্স প্যাটার্নের নকশার লুঙ্গি), ২. কাইন টেনুন (তাঁতে তৈরি লুঙ্গি), ৩. কাইন বাটিক (নামেই পরিচয়, মানে বাটিকের লুঙ্গি; মালয়েশিয়ায় বাটিকের লুঙ্গি প্রধানত নারীরাই পরে), ৪. কাইন সামপিং (বিশেষ এক ধরনের জামার সঙ্গে একান্তই পুরুষের পরিধেয় লুঙ্গি) ইত্যাদি।

ফিলিপাইনেও লুঙ্গির নানা নাম। কোনো এলাকায় তার নাম ‘টাপি’, কোথাও ‘পাতাডাইয়ং’ বা ‘মালং’। সেসবের মাপও বহু রকমের। কোনোটি হাঁটু অবধি, কোনোটি পা পর্যন্ত। কোনোটি আবার পরা হয় টিপিক্যাল বাঙালি লুঙ্গির কায়দায়, কোনোটি ধুতির ধরনে। এমনকি সেখানে বহু স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব নকশা ও রঙের পরিচয়বাহী লুঙ্গি। দৈনন্দিনের জীবনযাপনে ছাড়াও বিশেষ বিশেষ উৎসবের দিনে দামি বাহারি লুঙ্গি পরে আনন্দ করে ফিলিপিনোরা। এ দেশগুলো ছাড়া সিঙ্গাপুরেও লুঙ্গির প্রচলন আছে। তবে কসমোপলিটন বাণিজ্যিক কালচারে বেড়ে ওঠা নগর-রাষ্ট্র বলেই হয়তো সেখানে লুঙ্গির নিজস্ব কোনো ধরন তৈরি হয়নি। প্যাসিফিক দ্বীপপুঞ্জের দেশগুলোতেও শুনেছি লুঙ্গি প্রচলিত আছে নানা রকম মজাদার ‘ফিউশনে’; রীতিমতো ‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার’ পরিস্থিতি। ফিজিতে লুঙ্গিকে বলা হয় ‘ইসুলু’, হাওয়াইতে ‘কিকিইপা’, পাপুয়া নিউগনিতে ‘লাপ-লাপ’, তাহিতিতে ‘পারেউ’, টোঙ্গাতে ‘টুপেনু’। কত নাম! মনে রাখাও তো মুশকিল!

দ্বীপদেশেও লুঙ্গি? হ্যাঁ, আমাদের আশপাশের দুই দ্বীপদেশেও লুঙ্গির চলের কথা জানা যাচ্ছে। না, না! গল্প নয়! শ্রীলংকা ও মালদ্বীপেও লুঙ্গির চল নেহাত অন্যূন নয়। মালদ্বীপে লুঙ্গিকে ডাকা হয় ‘মুন্ডু’ নামে। মুন্ডু কথাটি সম্ভবত মালদ্বীপবাসী দক্ষিণ ভারতের সাদা লুঙ্গির থেকেই নিয়েছেন, ওটিরও নাম মুন্ডু কিনা। মালদ্বীপ ও দক্ষিণ ভারতের সমুদ্রযোগ সম্ভবত এ শব্দসমতার কারণ। এবার যাই লংকায়। শ্রীলংকায় লুঙ্গিসম বস্ত্রটির নামও সারং। মুখ্যত সিংহলিরা ওই নামে একে ডাকে। তবে নারীর পরিধেয় লুঙ্গিকে লংকাবাসী ‘রেড্ডা’ নামে চিহ্নিত করে। আর ওখানকার তামিল ও মুর অধিবাসীরা লুঙ্গিকে বলে ‘সারম’ বা ‘চারম’।

আফ্রিকা ও আরবে লুঙ্গি

সেই সুদূর আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ায়ও লুঙ্গি পরা হয়। শুনে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বহুকাল আগে থেকেই সোমালিয়ায় তো বটেই, আফ্রিকার অন্যান্য দেশের মাওয়াই নৃগোষ্ঠীর মানুষ রঙিন লুঙ্গি পরতে ভালোবাসে। আগে সেখানে শুধু সুতির তৈরি লুঙ্গির প্রচলন ছিল। তবে ইদানীং সিল্ক, নাইলন ও পলিয়েস্টারের তৈরি লুঙ্গিও আফ্রিকায় মেলে। ওমানেও বিশেষ উৎসবে লুঙ্গি পরার চল রয়েছে। ‘ইজার’ নামের লুঙ্গি গোত্রের পোশাক ওমানিরা অতীতকাল থেকেই পরে আসছে। ইয়েমেনে লুঙ্গির এক বিশেষ বাজার রয়েছে। ইয়েমেনি লুঙ্গির রয়েছে এক বিশেষ বুনন প্রক্রিয়া এবং হীরক ধাঁচের মোটিফের উপস্থিতি তাকে আরো বিশিষ্ট করেছে। ইয়েমেনিরা নিজস্ব ঘরানার লুঙ্গি ছাড়া পরতে চায় না। তা তারা যে দেশেই থাক না কেন। ভারতের হায়দরাবাদের বারকাস নামের মহল্লায় একটি ইয়েমেনি জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে, তারা কিন্তু ভারতে লভ্য বাঙালি-দক্ষিণী-বর্মি কোনো ঘরানার লুঙ্গিই পরে না, কেনা তো দূরস্থান। ওখানে ইয়েমেনি দোকানগুলোতে ওই বিশেষ লুঙ্গি বিক্রি হয় ১ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ৫০০ রুপিতে।    

লুঙ্গির গল্প

শেষে একটি গল্প বলি। পাঠকেরা হয়তো মজাই পাবেন। এক প্রখ্যাত বাঙালি কথাসাহিত্যিক রাতে সুতির লুঙ্গি না পরে ঘুমোতে পারেন না। তো মার্কিন মুলুকের এক শহরে সাহিত্যানুষ্ঠানের দাওয়াতে গিয়ে হলো বিপদ। সঙ্গে তার লুঙ্গি নেই! খোঁজটোজ করে দেখা গেল ওই শহরে বার্মিজ লুঙ্গি প্রচুর মেলে, কারণ শহরভর্তি বর্মি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিবাসী। পরে দূরের এক বাঙালি অধ্যুষিত শহরে বহু মাইল গাড়ি চালিয়ে গিয়ে সুতির ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লুঙ্গি কথাসাহিত্যিককে এনে দিলেন এক আয়োজক। অতঃপর তিনি আরামসে ঘুমোতে যেতে পারলেন। ইয়েমেনিদের নিজস্ব লব্জের লুঙ্গির প্রতি এত মায়ামাখা টান দেখে ওই সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত কথাসাহিত্যিকের কথাই মনে পড়ছিল বারবার।

 

শাকের আনোয়ার: প্রাবন্ধিক