এপ্রিলে মুক্তি
পায় তামিল
ছবি কারনান।
ছবির নায়ক
প্রশংসিত অভিনেতা
ধানুশ। তবে
ছবিতে তিনি
‘স্টাইলিশ
হিরো’ নন,
না তিনি
‘রকিং
স্টার’।
পুরো ছবিতে
ধানুশকে দেখা
গেল লুঙ্গি
পরা এক
গ্রাম্য, ক্রুদ্ধ
যুবকের বেশে।
না, অ্যাংরি
ইয়াংম্যান সাজতে
তাকে জিন্স,
ডেনিমের আশ্রয়
নিতে হয়নি।
ক্রমেই গ্ল্যামারসর্বস্ব
হয়ে ওঠা
‘পলিশড
লুক’-এর
ভারতীয় চলচ্চিত্র
দুনিয়ায় এখনো
কিছু স্বদেশী
ভাব বজায়
আছে দক্ষিণী
চলচ্চিত্রে। লুঙ্গি
পরা ধানুশ
তারই প্রতীক।
তামিলনাড়ুতে লুঙ্গির মতো কিন্তু সেলাই ছাড়া এক টুকরো কাপড় পেঁচিয়ে যে পোশাকটি পুরুষরা নিম্নাঙ্গে পরে সেটির নাম ভেশতি। এটি ঐতিহ্যবাহী পোশাক বিবেচনায় তামিলনাড়ুতে দাপ্তরিক পরিসরে সবখানেই অনুমোদিত। কিন্তু একই রকম লুঙ্গির ক্ষেত্রে আছে নিষেধাজ্ঞা। এমনটার পেছনে কারণটা কী? জবাবটা অনেকটাই রাজনৈতিক। এ নিয়ে ভারতীয় একটি ব্লগে বেশ লক্ষ্যভেদী আলোচনা করেছেন অরুণেশ নামের একট অচেনা লেখক। ভেশতি সমাজের উচ্চশ্রেণীর পোশাক। তাই সমাজের সবখানেই এটি চালু। কথা ওঠে লুঙ্গি ঘরের পোশাক। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষ সবখানেই এ পোশাকে মাঠেঘাটে কাজ করছে। এগুলো তামিলনাড়ু থেকে অরুণেশের পর্যবেক্ষণ। তিনি দলিত লেখক ও থিয়েটারশিল্পী। পড়াশোনা পণ্ডিচেরী বিশ্ববিদ্যালয়ে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ইন্ডিয়া প্রেসে কিছুদিন কাজও করেছেন সম্পাদক হিসেবে।
তিনি আরো
জানাচ্ছেন, সেখানকার
একাডেমিয়ায় পশ্চিমা
পোশাক অনুমোদিত,
এমনকি যেখানে
পোস্ট-কলোনিয়ালিজম
নিয়ে চায়ের
কাপে ধোঁয়া
ওঠে, টেবিল
চাপড়ে উত্তেজনাকর
বিতর্কও হয়।
বিজ্ঞান বিভাগে
না হয়
এ রকমটা
মানা যায়,
কিন্তু যেখানে
উপনিবেশোত্তর সমাজ-রাজনীতি
নিয়ে আলাপ
হয় সেখানে
তো এটা
মানা কঠিন।
অরুণেশ বলছেন,
একাডেমিয়ায় পাড়ানো
হলেও তার
শিক্ষার্থীদের মনকে
প্রত্যক্ষরূপে ডিকলোনাইজ
করতে দিতে
আগ্রহী নন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত
বিভাগে সাদা
ধুতি অনুমোদিত।
অরুণেশ মনে
করেন, এমন
পরিস্থিতির পেছনে
লুঙ্গির দুটি
পরিচয় দায়ী।
এক. লুঙ্গি
শ্রমজীবী তথা
বহুজনের পোশাক।
আরেকটি হলো
মুসলমানরাও নামাজ
পড়ার সময়
অনেকেই লুঙ্গি
পরে। অবশ্য
এখানে হিসাবটা
এমন সরলও
হয়তো না।
কারণ মুসলিম
রোহিঙ্গাদের ওপর
হত্যাযজ্ঞ চালানো
মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী
পোশাক লুঙ্গি।
সেখানে একে
মুসলমানের পোশাক
বলে ছুড়ে
ফেলা হয়নি।
চেন্নাইভিত্তিক ডিজাইনার
ও ভারতের
অন্যতম লিঙ্গনিরপেক্ষ
ফ্যাশন ব্র্যান্ডের
প্রতিষ্ঠাতা পুরুশু
আরি। তিনি
লুঙ্গির ঐতিহাসিক
ও লিঙ্গনিরপেক্ষ
বৈশিষ্ট্য নিয়ে
কথা বলেছেন।
তার কথায়,
ভেশতির চেয়ে
লুঙ্গির বণিজ্য
ইতিহাস ও
বৈশ্বিক আবেদন
অনেক বেশি
বিস্তৃত। দ্বাদশ
শতাব্দীতে থামিজ
বণিকরা মধ্যপ্রাচ্যে
লুঙ্গি রফতানি
করত।
তামিলনাড়ুতে লুঙ্গির
সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে
আবার স্পটলাইটে
এনেছিলেন রাজ্যের
প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী
আন্নাদুরাই (মৃ.
১৯৬৯)।
তিনি লুঙ্গি
পরেই সাক্ষাত্কার
দিতেন। তিনি
এটা করেছিলেন
তার রাজনৈতিক
বিদ্রোহ হিসেবে।
তিনি লুঙ্গিকে
জনপরিসরে ‘স্বাভাবিক’
করে তুলতে
চাইছিলেন। আন্নাদুরাইয়ের
সেই বিদ্রোহের
পর অনেক
সময় কেটে
গেছে। এ
বছর মারি
সেলভারেজের কারনান
ছবিটি ফিরিয়ে
আনল লুঙ্গিকে,
পুরো ছবিজুড়ে
ধানুশকে দেখা
গেছে লুঙ্গিতেই।
পুরুশু আরিও
উল্লেখ করেছেন
কারনানের কথা।
‘মারি
সেলভারেজের কারনান ছবিতে দেখা
যায় প্রভাবশালী
উচ্চবর্ণের প্রবীণ
গ্রামবাসী পরে
ভেশতি ও
থুন্ডু। অন্যদিকে
বিদ্রোহী ও
নিম্নবর্ণের তরুণরা
সবাই নিম্নাঙ্গে
পরেছে লুঙ্গি।’
লুঙ্গিকে পরিবেশবান্ধব
পোশাক বলা
হয়। কারণ
এর কোনো
অংশ অব্যবহূত
থাকে না।
উৎপাদনে কোনো
দূষণও হয়
না। ফেরা
যাক অরুণেশের
কাছে। তার
মতে, লুঙ্গি
শুধু পরিবেশবান্ধব
পোশাকই নয়,
বরং ফ্যাশন
ইন্ডাস্ট্রিতে ক্ষমতার
সম্পর্কের বিনির্মাণেরও
উপাদান।
পুরুশু আরি তামিলনাড়ুতে একসময় লুঙ্গি রফতানির যে সমৃদ্ধ ইতিহাসের কথা বলেছেন সেদিকে কৌতূহল থেকে একটু দৃষ্টিপাত করা যাক। তামিলনাড়ুর একটি জেলা
কাডালোর।
এটি একটি
বন্দর শহর।
রাজ্যের রাজধানী
চেন্নাই থেকে
১৬০ কিলোমিটার
দূরত্বে এর
অবস্থান। হাতে
বোনা সুতি
কাপড়ের ইতিহাস
ভারতে অনেক
দিনের পুরনো।
যিশুর জন্মেরও
আগের। কাপড়
বুননে বিভিন্ন
কৌশল কাডালোরে
আছে সেই
সঙ্গম যুগ
(খিস্টপূর্ব প্রথম
শতাব্দী থেকে
ষষ্ঠ শতক)
থেকে। ঘরে
পরার জন্য
হোক কিংবা
বিলাসী পোশাক
হিসেবে বোনা
হোক স্থানীয়
তাঁতিদের শৈলীতে
প্রত্যেকটি লুঙ্গিই
হতো ভিন্ন
চেহারার। এখানকার
বস্ত্র প্রাচীনকালে
বিদেশে বেশ
আদরণীয় ছিল।
এখানে লুঙ্গি
বোনার সঙ্গে
জড়িতরা বংশপরম্পরায়
কাজটি করে
চলেছে। ভারতের
প্রাচীন অনেক
ভাস্কর্যে সেলাইবিহীন
লুঙ্গি নামের
পোশাকটি ব্যবহারের
প্রমাণ পাওয়া
যায়। বিংশ
শতাব্দীতে তামিলরা
দুনিয়ার যেখানে
গিয়েছে সেখানে
লুঙ্গি রফতানি
হয়েছে। লুঙ্গি
ছাড়াও একে
সারোং, কাইলি,
সারাম, কোম্বোয়
নামেও ডাকা
হয়। তবে
দক্ষিণ ভারতে
লুঙ্গির বিকাশ
হয়েছে ইনফরমাল
পোশাক হিসেবে।
অনেক মন্দিরে
লুঙ্গি পরে
ঢোকা যাবে
না। এ
প্রসঙ্গে বৈষম্য
করার কথা
শুরুতে অরুণেশের
বয়ানে ক্ষোভ
হয়ে ঝরেছে।
দক্ষিণ ভারতের
অনেক গবেষক
মনে করেন,
তাদের অঞ্চল
থেকেই বাণিজ্য
সূত্রে বাংলা,
মিয়ানমার, ব্রুনেই,
শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া,
মালয়েশিয়ায় লুঙ্গির
প্রচলন হয়েছে।
কলকাতার ন্যাশনাল
ইনস্টিটিউট অব
ফ্যাশন টেকনোলজির
শিক্ষক সুমন্ত্র
বকশি মনে
করেন উল্টোটা—
ষষ্ঠ থেকে
দশম শতাব্দীর
মধ্যে অন্ধ্র
প্রদেশ ও
তামিলনাড়ুতে চোলা
রাজত্বে লুঙ্গির
আবির্ভাব ঘটে।
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়া থেকে
বণিক ও
নাবিকরা এ
পোশাক নিয়ে
এসেছিল। বকশির
কথায়, ‘এর
আগে লুঙ্গি
ব্যবহারের নিদর্শন
ভারতে দেখা
যায় না।
ভারতের পূর্ব
উপকূল ধরে
লুঙ্গির বিস্তার
ঘটে এবং
বাংলা ও
উড়িষ্যায় প্রবেশ
করে। এ
কারণে খেয়াল
করলে দেখা
যায় দক্ষিণ
এশিয়ায় মূলত
উপকূল ঘেঁষা
অঞ্চলেই লুঙ্গি
ব্যবহারের বিস্তৃতি
ঘটেছে। তামিলনাড়ুতে
জেলে নারী-পুরুষ
উভয়ই কর্মক্ষেত্রে
লুঙ্গি পরে।
বেশি গরম
ও আর্দ্রতার
অঞ্চলে লুঙ্গির
ব্যবহার বেশি।’
তামিলনাড়ুর লুঙ্গিতে চেকের ডিজাইনের অস্তিত্ব পাওয়া যায় পুরনো আমল থেকেই। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশরা একে ‘মাদ্রাজ চেক’ নামে ডাকত। জন গাইয়ের গবেষণা থেকে জানা যায়, দক্ষিণ ভারতে সাদা-কালো চেকের সুতির লুঙ্গির আদি নিদর্শনটি পাওয়া যায় পর্তুগালের লিসবনে সপ্তদশ শতাব্দীর একটি চিত্রকর্মে। এ রকম চেক নকশার কাপড় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমদানি হতো অনেককাল আগে থেকেই। মালয় অঞ্চলে যেত এ কাপড়। সেখানে লুঙ্গির ব্যবহারও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ম্যাক্সওয়েল এখানে একটি সংযোগ সূত্র দেখিয়েছেন। দক্ষিণ ভারতের করোমান্ডেল উপকূলে চেক ডিজাইনের কাপড়কে বলা হয় পুলিকাট; আর ইন্দোনেশিয়ায় ডাকা হয় পেলেকাট। অতীতের বাণিজ্য সূত্রেই এ সাদৃশ্য। ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপগুলোতে যে চেক ও মোটা কাপড়ের সারোং পাওয়া যায় তার সূচনাটা কোনো সুদূর অতীতে হয়েছিল দক্ষিণ ভারত থেকে রফতানি হয়ে যাওয়া কাপড় থেকে। পরবর্তী সময়ে ইন্দোনেশিয়ার ইসলামী সংস্কৃতিতে এ ডিজাইনের আত্মীকরণ ঘটে। যন্ত্রের আগমন হলেও মাদ্রাজের হাতে বোনা চেক লুঙ্গির চাহিদা কমেনি। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে ৪৫ হাজার তাঁতে লুঙ্গি বোনা হতো আর এতে যুক্ত ছিল প্রায় দুই লাখ মানুষ।
কারনানের আগেও
ভারতের পপুলার
কালচারে লুঙ্গির
আবেদন, উদযাপন
দুই-ই
দেখা গেছে।
১৯৮৭ সালে
মুক্তি পায়
মনিরত্নমের নায়াকান।
এক গুণ্ডার
গডফাদার হয়ে
ওঠার মেলোড্রামাটিক
গল্প। গুণ্ডার
চরিত্রে ছিলেন
কমল হাসান।
লুঙ্গি পরে
কমল তথা
ভেলুর দারুণ
সব দৃশ্য
দর্শক ভুলবে
না। এরপর
২০১৩ সালে
লুঙ্গি নিয়ে
দক্ষিণ এশিয়ার
পপুলার কালচারে
সবচেয়ে বড়
উপস্থাপনাটি দেখা
যায়। শাহরুখ
খান ও
দীপিকা পাড়ুকোন
অভিনীত চেন্নাই
এক্সপ্রেসের সুপারহিট
গান ‘লুঙ্গি
ড্যান্স’।
লুঙ্গিকে এমন
ট্রিবিউট মনে
হয় না
আর দেয়া
হয়েছে। ব্রাত্য
লুঙ্গি হয়ে
উঠল অভিজাত
মহলেরও বোল।
এস এম রশিদ: লেখক





