ভেশতি!
এ
আবার কি!
আচমকা
শুনতে কেমন জানি ঠেকছে। আবার মনে হয়, কোথায় যেন শুনেছি! নিশ্চয়ই শুনেছেন। বলছি আমাদের দেশের অতিপরিচিত একটি পোশাক লুঙ্গির কথা। লুঙ্গির এক পূর্বপুরুষের নাম ভেশতি। ইতিহাসে উল্লেখিত আছে, মসলিন কাপড়ের ভেশতি পোশাক তামিল থেকে ব্যাবিলনে রফতানি হতো। বর্তমানে লুঙ্গি বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে বেশ জনপ্রিয়। মালদ্বীপেও লুঙ্গির ব্যবহার দেখা যায়। তবে লুঙ্গি সম্পর্কে সর্বাধিক প্রচলিত যে ইতিহাস রয়েছে তা হলো এ অঞ্চলে লুঙ্গির ব্যবহার শুরু হয়েছে দক্ষিণ ভারতে অর্থাৎ বর্তমানের তামিলনাড়ুতে, আর সেখানে লুঙ্গি এসেছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে।
লুঙ্গি যে কেবল পুরুষেরই পোশাক তা কিন্তু নয়। বিভিন্ন দেশ, সম্প্রদায়ভেদে লুঙ্গি পুরুষ ও নারী উভয়ই নানাভাবে কোমরে বেঁধে পরে। দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে বিয়ের অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে লুঙ্গির ব্যবহার আছে।
ভারতের
কেরালায় নারী ও পুরুষ উভয়ই লুঙ্গি পরিধান করে। জেনেছি অঞ্চলভেদে এর বিভিন্ন নাম রয়েছে। যেমন মুন্ডু, কাসাভু ইত্যাদি। মিয়ানমারে ইয়াঙ্গুন এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন পার হলেই আচমকা একটি পরিবর্তন চোখে পড়েছে, তা হলো নারী-পুরুষ সবাই লুঙ্গি পরা। কেরালা কিংবা তামিলনাড়ুতে গেলে লুঙ্গির বিষয়টি মাথায় থাকে। তাই পরিবর্তনটা চোখে পড়ে কম। ইয়াঙ্গুন শহরে আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না লুঙ্গির এমন সগৌরব উপস্থিতি নিয়ে। তাই হয়তো বেশি করে চোখে পড়েছে। মিয়ানমারে লুঙ্গিকে বার্মিজ ভাষায় লোঙ্গাই বলে ডাকা হয়, যা পুরুষরা পরিধান করে। এখানে নারীদের জন্য এটি তামাইন নামে পরিচিত, যা খুবই জনপ্রিয় পোশাক। লোঙ্গাই মিয়ানমারের জাতীয় পোশাক হিসেবে স্বীকৃত।
ইন্দোনেশিয়া
ও মালয়েশিয়ায় লুঙ্গিকে সারং বলে অভিহিত করা হয়। এ দুই দেশের মানুষ লুঙ্গির ভেতর জামা ইন করে পরে। কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও লাওসে সারংয়ে ব্যবহার ঐতিহ্যবাহী। বলা হয় লাও মেয়েরা অন্তত তিন হাজার বছর ধরে লুঙ্গিজাতীয় পোশাক পরছে। লাওসে এখন বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর নারীরা মূলত সারং পরে। থাইল্যান্ডের উত্তরাংশ ও উত্তর-পূর্বাংশের নারীদের সারং ডিজাইনে বেশ স্বতন্ত্র। কম্বোডিয়ায় নারীদের লুঙ্গিজাতীয় পোশাক সোম্পোত নামে পরিচিত। পুরুষরাও পরে এ পোশাক। তবে এটা মূলত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পোশাক। পঞ্চদশ শতাব্দীতে মালয় দ্বীপপুঞ্জে নারী ও পুরুষদের মধ্যে সারংয়ের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়।
ইন্দোনেশিয়ায় ডাচ ঔপনিবেশিক শাসনামলে নারীদের সারং পরতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। অন্যদিকে সেখানে ইউরোপীয় নারীরা নিজেদের জন্য সারং বানাত। অনেক ডাচ নারী ঘরে সারং পরত। এমনকি ইউরোপের বাজারে সারং ছিল দামি বস্তু।
ইয়েমেন
ও সোমালিয়ায় লুঙ্গিকে ‘মা আউইস’ বলে ডাকা হয়, যা পুরুষরা পরিধান করে। সোমালিয়ায় অফিসের সময় বাদে অন্য সময়ে প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ সবাই লুঙ্গি পরে। সোমালিয়ায় লুঙ্গির সঙ্গে আবার অতিরিক্ত হিসেবে বেল্টও পরা হয়। জাপানেও লুঙ্গির প্রচলন আছে। সেখানে লুঙ্গি একটি উৎসবের পোশাক। মালদ্বীপেও পুরুষরা লুঙ্গি পরে। অনেকটা ভারতের তামিলদের মতো একরঙের। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাদা রঙের হয়। অন্য রঙ কম চোখে পড়ে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই সারং নারীরা পরে।
এবার
আসি বাংলাদেশের কথায়। এ দেশের সব সম্প্রদায়ের পুরুষদেরই লুঙ্গি পরিধান করতে দেখা যায়। সুতার নকশা করা, বাটিক অথবা সিল্কের লুঙ্গি কখনো কখনো বিয়ের উপহার হিসেবে বরকে দেয়া হয়। যদিও বাঙালি মেয়েরা লুঙ্গি পরে না। তবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকার বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর নারীরা লুঙ্গির মতো দেখতে একটি পোশাক পরে। এ পোশাককে থামি বলে অভিহিত করা হয়। দেশের হিন্দুদের মাঝে আগে ধুতি বেশ প্রচলিত থাকলেও এখন দেখা যায় লুঙ্গিই তার স্থান দখল করে নিয়েছে।
বাঙালির
ইতিহাসে সবসময়ই যে লুঙ্গির আধিপত্য ছিলে সে রকমটা মনে হয় না। ব্রিটিশরাজের সময়ে ধুতিরই প্রচলন ছিল বেশি। অবশ্য নিম্নবর্গের মানুষ মধ্যযুগের পর থেকে লুঙ্গিই পরত। বিভিন্ন ইতিহাস বইতে এ রকমটাই পড়েছি। সিরাজগঞ্জ মহকুমার তত্কালীন ম্যাজিস্ট্রেট পি নোলান পাবনা জেলার একজন সাধারণ নাগরিকের পোশাক বর্ণনায় লিখেছেন: ‘The ordinary rayat wears only dhuti,
costing about 12 annas or 1s. 6d., and a small cloth called gamcha, which he
puts on his head when it is hot. It is kept well to cool his body, and used for
a variety of purposes like a kerchief।’ ইতিহাসবিদ রাধারমণ সাহা ১৯২৬ সালে পাবনা জেলার ইতিহাসের বইতে ধুতি, গামছার কথা উল্লেখ করেছেন, ‘ধুতি,
গামছা সাধারণ গৃহস্থের সর্ব্বদা ব্যবহার্য্য পরিধেয়। চাদর, দোহরাদি তাহারা শীতকালে ও অন্য সময়ে ব্যবহার করে।’
তত্কালীন
আরো অনেক লেখকের বর্ণনায়ও এর সমর্থন মেলে। পাবনা জেলার সমাজ ও সংস্কৃতি বইয়ের লেখক মো. হাবিবুল্লাহ্র সঙ্গে এক সাক্ষাত্কালে ১১২ বছর বয়সী উমেদ আলী জানিয়েছেন, ‘বিশ
শতকের প্রথম দিকে আমার বয়স তখন ১০-১১। বাপজান সাতআনা দিয়ে একটি গামছা কিনে এনে দিলেন। সেইটি পরে খালি পায়ে কোনো রকম একটা জামা ছিল, সেটি গায়ে দিয়ে বাপের সাথে চললাম সাঁড়া ঘাট দেখতে। সাত আনা দিয়ে যেটি কেনা হয়েছিল, সেটিকে ধুতিও বলা যায়, আবার গামছাও বলা যায়। তখন সাধারণ মানুষের এর চেয়ে বেশি পয়সা খরচ করার অবস্থা ছিল না। স্কুলে যেতাম গামছা পরে। আমার একটা গামছা আর বাপজানের একটা। এর বেশি আর কাপড় ছিল না।’
বিশ
শতকের প্রথম দিকে মুসলমানদের মধ্যে লুঙ্গি পরিধানের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এ সময় বার্মার রেঙ্গুন থেকে (বর্তমানের মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন) লুঙ্গি আমদানি হতো। একটু অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের কাছে ‘নয়ন সুখ’ নামের সাদা মিহি সুতার এক প্রকার লুঙ্গি দারুণ জনপ্রিয় ছিল। ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ বইয়ের লেখক গোলাম মুরশিদ লিখেছেন, ‘উনিশ
শতক শেষ হওয়ার আগেই ইংরেজি শিক্ষিতদের মধ্যে পশ্চিমা পোশাক অথবা সে পোশাকের কিছু উপকরণ অনুপ্রবেশ করেছিল। তবে বৃহত্তর বাঙালি সমাজে বহাল থাকে সনাতনী পোশাক।’ সনাতনী পোশাক বলতে গোলাম মুরশিদ ধুতি, গামছাকেই বুঝিয়েছেন বলেই প্রতীয়মান হয়।
গ্রামের
মুসলমানরা সবসময়ই কম-বেশি লুঙ্গি পরত। দেশভাগের পর দ্রুত পূর্ববাংলায় পুরুষদের পরনের পোশাক হিসেবে লুঙ্গির বিস্তার ঘটে। ধরে নেয়া হয়, বাংলায় লুঙ্গির প্রচলন মুসলমানদের হাতে। হতে পারে সেটি হিন্দু-মুসলিম আলাদা পরিচয় নির্মাণের অভিপ্রায় থেকে অথবা সে সময় রেঙ্গুনে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বাঙালির যাতায়াত বেড়ে যাওয়ার কারণে লুঙ্গি আমাদের সংস্কৃতিতে সহজে প্রবেশ করতে পারে। উপলক্ষ যা-ই হোক না কেন, বাঙালির ব্যাপক বিস্তৃত লুঙ্গি পরিধানের ইতিহাস খুব পুরনো নয়।
ইতিহাস
পর্যালোচনা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, লুঙ্গির ডিজাইনে, পরার ধরনে, বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে এ দেশে বড় একটা পরিবর্তন আসেনি। সেই চিরচেনা চেক লুঙ্গি, আর তাতে রঙের প্রাধান্য। রয়েছে একরঙা লুঙ্গি, বাটিকের লুঙ্গি, সিল্কের লুঙ্গিও। তবে লুঙ্গি পরার ব্যবহারিক প্রয়োগ বৃদ্ধি পায়নি।
ইতিহাস
বলে, এখন থেকে প্রায় ৭২ হাজার বছর আগে মানুষ নগ্নতা ঢাকতে পোশাকের ব্যবহার শুরু করে। পোশাক মানুষের ব্যক্তিত্ব, দেশ, সংস্কৃতি ও সময়কেও ধারণ করে। প্রাচীন সভ্যতার পরিচয় আমরা পাই টেরাকোটায় সে সময়ের মানুষের মূর্তি ও ছবি দেখে। পোশাক তাই ব্যক্তি মানুষের রুচি, পছন্দ প্রকাশের পাশাপাশি সময় ও সংস্কৃতিকেও সংরক্ষণ ও প্রতিনিধিত্ব করে চলে। যেকোনো পরিবর্তন ও বিবর্তন ঐতিহ্যের হাত ধরেই আসে। তবে বর্তমান বিশ্ব পশ্চিমা ফ্যাশনের প্রভাবে প্রভাবিত। মানুষের পছন্দের কাছে দেশীয় পোশাকের চাহিদা কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ধীরে ধীরে কমছে লুঙ্গির ব্যবহার। লুঙ্গি হারাচ্ছে তার নিজস্ব ঐতিহ্য।
এলিজা বিনতে এলাহী: পর্যটক ও শিক্ষক





