খলিফা হারুন অর রশিদকে নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় যে ধারণা কালক্রমে গড়ে ওঠে তার পেছনে বড় ভূমিকাটি রেখেছে ভুবন ভোলানো আরব্য রজনী। এতে পাওয়া যায় ইসলামী সভ্যতার এক স্বর্ণযুগের চোখ ধাঁধানো চিত্র। কিন্তু হারুনের মৃত্যুর ৩০ বছর পর জন্ম নেয়া নবম শতাব্দীর মুসলিম ইতিহাসবিদ আল-তাবারি (৮৩৯-৯২৩ খ্রি.) যে ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেছিলেন তাতে খলিফা হারুনের নামে যে কীর্তির স্বীকৃতি প্রচলিত আছে তা কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হবে। আল-তাবারি কোরআনের একজন প্রসিদ্ধ তফসিরকারী। বিশ্ব ইতিহাস, কাব্য, নীতিশাস্ত্র, ব্যাকরণ, গণিতবিদ্যা, ওষুধশাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন। তার ঐতিহাসিক গ্রন্থটির নাম তারিখ আল-তাবারি। এ গ্রন্থ অনুসারে দেখা যায়, খলিফা হারুন শাসনামলের বেশির ভাগ সময়ই বরং রাজপাটের দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন বার্মাকি পরিবারের অভিজাতদের হাতে। তাবারির বিবরণীতে খলিফা হারুন, তার দরবার ও জীবনের নানা অধ্যায়ের কৌতূহলোদ্দীপক নানা তথ্য পাওয়া যায়।

আল-তাবারি জানিয়েছেন, আল-আব্বাস বিন মোহাম্মদ তার পিতার কাছে শুনেছেন যে খলিফা হারুন দিনে ১০০ রাকাত নামাজ আদায় করতেন। আমৃত্যু তিনি এভাবে নামাজ পড়েছেন। কেবল অসুস্থ থাকলেই তার এ সাধনায় ব্যত্যয় ঘটত এবং সেক্ষেত্রে তিনি প্রতিদিনের জন্য ১ হাজার দিরহাম দান করতেন। আর জাকাত তো সবসময়ই আদায় করতেন। যখন হজ পালনে যেতেন তখন তার সঙ্গে থাকত নানা বিভাগের শতাধিক পণ্ডিত ও তাদের সন্তানরা। আর যে বছর নিজে যেতে পারতেন না, সেবার তার বদলে পাঠাতেন ৩০০ জনকে। তাদের যথেষ্ট রাহাখরচ দেয়া হতো এবং খলিফা কাবা শরিফের জন্য সুদৃশ্য গিলাফ পাঠাতেন।

তিনি সচেতনভাবেই আল-মনসুরকে অনুসরণ করতেন এবং তার মতো আচরণের আদর্শ তৈরি করতে চেয়েছেন। তবে একটি বিষয় ব্যতিক্রম ছিল—পয়সা খরচ। খলিফা হারুনের আগে আর কাউকে এভাবে উদারহস্তে দান-খয়রাত করতে দেখা যায়নি। যেকোনো ভালো কাজকে তিনি সম্মানিত করতেন। কাজের কর্তাকে দিতেন অঢেল দিনার।

কবিতা নিয়ে তার আগ্রহ ছিল। কবিদের ভালোবাসতেন। সাহিত্যের ঝোঁক ছিল তার। ধর্মীয় আলেমদের তিনি খুব সম্মান করতেন। তবে ধর্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্কবিতর্ক তিনি পছন্দ করতেন না। তার মত ছিল এমন—এসব বিতর্ক অনর্থক এবং এজন্য পরকালে কোনো পুরস্কারের ব্যবস্থাও নেই।

কবিদের কবিতা পছন্দ হলে খলিফা হারুন সেগুলোর জন্য বেশ উচ্চমূল্য দিতেন। ৭৯৭ হিজরির রমজান মাসে মারওয়ান ইবনে আবি হাফসাহ একটি কবিতা লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন হারুনের দরবারে। সেখানেই তিনি সেটি আবৃত্তি করে শোনান। খুশি হয়ে হারুন তাকে ৫ হাজার দিনার উপহার দেন। দরবারেই তাকে নগদ দিনার বুঝিয়ে দেয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, হারুন তার নিজের আলখাল্লা খুলে উপহার দেন মারওয়ানকে। তাকে ১০ জন গ্রিক দাস ও তার নিজস্ব ঘোড়াশাল থেকে একটি ঘোড়া দেয়া হয়।

ইবনে মরিয়ম আল-মাদানি ছিলেন খলিফা হারুনের বিশ্বস্ত সহচর। আল-মাদানি ছিলেন রসিক মানুষ। তিনি খলিফাকে হাসিখুশিতে মাতিয়ে রাখতেন তার নানা মজার গল্পকথায়। খলিফা তার কথা শুনে কখনো ক্লান্ত হতেন না। আরবের নানা গল্পগাছা সম্পর্কে খুব ভালো জানাশোনা ছিল আল-মাদানির। তাই তার কথা আনন্দ নিয়ে শুনতেন খলিফা হারুন।

কবিতা নিয়ে খলিফা হারুনের যে আকর্ষণ তা নিয়ে সাঈদ বিন সালম আল-বিহিলির একটি বিবরণী উল্লেখ করেছেন আল-তাবারি। একদিন দরবারে গিয়ে তিনি খলিফা হারুন অর রশিদকে সম্বোধন করে বললেন, হে বিশ্বাসীদের অধিনায়ক, বিহিলাহ সম্প্রদায়ের এক বেদুইন আপনার ফটকে দাঁড়িয়ে আছে। তার মতো এমন কাব্য প্রতিভা আমি আগে কখনো দেখিনি!

খলিফা তখন তার দরবারের দুই সেরা কবি আল-উমিনি ও আল-নামারির কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন, তারা দুজনই তখন দরবারে উপস্থিত ছিলেন। যা হোক সাঈদ নানা কথা বলে সেই বেদুইন কবিকে খলিফার দরবারে হাজির করার অনুমতি আদায় করলেন।

সিল্কের পোশাক আর ইয়েমেনি আলখাল্লা গায়ে জড়িয়ে সেই বেদুইন ভেতরে এলেন। তার পোশাক ছিল কিছুটা অদ্ভুত ধরনের। তাকে বসার আসন দেয়া হলো। দরবারে অন্য কবিরাও মনোযোগ দিলেন। এবার সাঈদ বললেন, ‘খলিফা ও তার পূর্বপুরুষের প্রশংসায় তোমার কাব্য উপস্থাপন করো।’ বেদুইন তার কবিতা শোনালেন। শোনা শেষ হলে খলিফা বললেন, ‘তোমার কবিতা শুনলাম। ভালোও লেগেছে। তবে আপনাকে নিয়ে আমার জিজ্ঞাসা আছে। তোমার কবিতাগুলো নিজের লেখা কিনা তা নিয়ে সন্দেহ লাগছে। কবিতাগুলো যদি সত্যিই তোমার হয়ে থাকে তাহলে এদের দুজনকে নিয়ে কয়েক লাইন শোনাও।’ এ দুজন বলে খলিফা তার দুই ছেলে মোহাম্মদ আল-আমিন ও আল-মামুনকে নির্দেশ করেছিলেন। দুই ছেলে খলিফার দুই পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বেদুইন বললেন, হে বিশ্বাসীদের অধিনায়ক, আপনি আমাকে অসাধ্য এক কাজ দিলেন, কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই। আমাকে একটু চিন্তা করার সময় দিলে আমি উপযুক্ত কবিতা হাজির করতে পারব এবং আমার মনের উত্তেজনাও প্রশমিত হবে। খলিফা কিছু সময় মঞ্জুর করলেন। বেদুইন বললেন, আপনি আমার গলার ফাঁস ছাড়িয়ে দিয়েছেন। এবার তাহলে শুনুন—বলে তিনি নতুন কবিতা আবৃত্তি শুরু করলেন।

কবিতা শুনে খলিফা বললেন, ‘ও বেদুইন, তোমার ওপর পরম করুণাময়ের রহমত বর্ষিত হোক। এবার বলো তুমি কী উপহার চাও। এমন কিছু চেয়ো না যা তোমার কাব্য প্রতিভার তুলনায় কিঞ্চিতকর হয়।’ বেদুইন এবার চাইলেন, ‘১০০ উট।’ খলিফা হারুন তাকে এক লাখ দিরহাম ও সম্মানসূচক সাতটি আলখাল্লা দেয়ার নির্দেশ দিলেন।

মুগাব আল-জুবায়েরি উল্লেখ করেছেন খলিফা হারুন অর রশিদ তার দুই ছেলে মোহাম্মদ আল-আমিন ও আবদুল্লাহ আল-মামুনকে নিয়ে মদিনা সফর করেছিলেন। সেখানে তিনি জনগণকে তিন দফা বিভিন্ন উপহারসামগ্রী দেন। যে পরিমাণ উপহারসামগ্রী তিনি দিয়েছিলেন তার মূল্য ছিল ১০ লাখ ৫০ হাজার দিনার। সে বছর তিনি মদিনার ৫০০ জন বিশিষ্ট আলেমকে নগদ অর্থসহায়তা দিয়েছিলেন।

৮০৮ খ্রিস্টাব্দের শেষ নাগাদ কিংবা ৮০৯-এর শুরুতে খলিফা হারুন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার মৃত্যু হয় ৮০৯ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে।

খলিফা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তার কাছে ছিলেন জিবরিল বিন বাখতিশু। একদিন তিনি শোনালেন তার বেদনার কারণ এক স্বপ্নের কথা। জিবরিল তাকে বললেন, স্বপ্ন মানুষের মনের কল্পনা। তাই তা নিয়ে মাথা না ঘামাতে। তার পরও খলিফা জিবরিলকে শোনালেন তার স্বপ্নের বিবরণী।

খলিফা হারুন শোনালেন—স্বপ্নে দেখলাম আমি আমার বিছানায় বসে আছি। হঠাৎ নিচ থেকে একটা হাত উঠে এল। হাতটা আমি চিনি, কিন্তু সেটা যে কার তা আর মনে পড়ছিল না। সে হাতে ছিল একমুঠো লাল মাটি। তারপর একটি কণ্ঠ কথা বলে উঠল, যার চেহারা আমি দেখতে পাইনি। সে অজানা কণ্ঠ বলে উঠল, ‘এ মাটিতেই তোমার কবর হবে।’ আমি জিজ্ঞাস করলাম, এটা কোথায়? জবাব এল, তুস। এ নামটা বলেই হাতটা অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার ঘুমও ভেঙে গেল।

সব শুনে জিবরিল বিন বাখতিশু বললেন, ‘আমার প্রভু, এটা বেশ রহস্যময় স্বপ্ন। আমার ধারণা আপনি শুয়ে শুয়ে খুরাসানের কথা চিন্তা করছিলেন। সেখানকার গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ঝামেলার কথা ভাবছিলেন। এসব বিষয়ই ঘুমের মধ্যে আপনার মনে এসেছে এবং আপনি এমন স্বপ্ন দেখেছেন। দুশ্চিন্তা করবেন না। বিষাদের পরিবর্তে মনকে প্রফুল্ল করুন। কোনো অসুস্থতা কাছে ঘেঁষতে পারবে না।

এরপর কিছু দিন কেটে যায়। খলিফা ও জিবরিল দুজনই এ স্বপ্নের কথা ভুলে যান। তারপর এক বিদ্রোহ দমনের জন্য হারুন খুরাসান যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পথিমধ্যে তার শরীর খারাপ হয় এবং তুস পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে পরিস্থিতি বেশ সংকটজনক হয়ে ওঠে। হঠাৎ তার মনে হয় সেই স্বপ্নের কথা। জিবরিলকে বলেন সে কথা। তিনি পাশের বাগান থেকে কিছু মাটি আনার নির্দেশ দেন। এ মাটি দেখে খলিফা হারুন বলে ওঠেন, স্বপ্নে আমি এ মাটিই দেখেছিলাম। এ বলে তিনি কাঁদতে শুরু করেন। তিনদিন পর সেখানেই খলিফা হারুন মৃত্যুবরণ করেন। তাকে সেই বাগানে সমাহিত করা হয়।

 

এসএম রশিদ: লেখক