ইতিহাসের শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ সভ্যতার, সাম্রাজ্যের আলোচনায় সেখানকার পুরুষ শাসকদের কথাই সাধারণত বেশি আলোচিত হয়। প্রদীপের আলো যেহেতু তাদের ওপরই থাকে, তাই বাকিরা কীর্তিমান এই পুরুষদের আড়ালে পড়ে যান। নারীদের ক্ষেত্রে ইতিহাস আরো কৃপণ। তাদের সম্পর্কে লেখা হয়েছে কম, আর যাও লেখা হয়েছে সেখানে সত্যের চেয়ে কল্পনার মিশেলই বেশি। অবশ্য অতীতের রক্ষণশীলতা, নারীদের সম্মুখে না আনার রাজকীয় ও সামাজিক নীতি এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষত মুসলিম শাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত নারীদের সম্পর্কে খুবই কম তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু যেহেতু ‘কীর্তিমানের মৃত্যু নেই’—একদিন না একদিন ইতিহাসের স্বনামখ্যাত পুরুষ চরিত্রের পাশাপাশি নারীদের কীর্তিও প্রকাশিত হয়েছে। তাই আরব্য রজনীজুড়ে খলিফা হারুন অর রশিদের জয়জয়কারের পাশাপাশি ইতিহাস একদিন তার স্ত্রী জুবাইদার কীর্তির কথাও মানুষের সামনে উপস্থিত করেছে।

জুবাইদা ছিলেন আব্বাসীয় বংশের তৃতীয় খলিফা আল-মাহাদির সৎ ভাই জাফরের কন্যা। আল-মাহাদির প্রধান স্ত্রী খাইজুরানের বোন সালসাল তার মা। অর্থাৎ মাহাদি-খাইজুরান দম্পতির পুত্র হারুন এবং জাফর-সালসাল দম্পতির কন্যা জুবাইদা মূলত জ্ঞাতি ভাইবোন, পরবর্তী সময়ে তাদের বিয়ে হয়। জুবাইদার পূর্ণ নাম আমাত-আল-আজিজ এবং পরবর্তী সময়ে তাকে উম্মে জাফর নাম দেয়া হয়। তবে তিনি জুবাইদা নামেই সবার কাছে অধিক পরিচিত। ইতিহাসে হারুন প্রভূত খ্যাতি পেয়েছেন কিন্তু জুবাইদার জন্ম সালটি পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। কিন্তু হারুনের অন্তত এক বছরের কনিষ্ঠ হিসেবে ৭৬৬ খ্রিস্টাব্দকে তার আনুমানিক জন্মসাল ধরা হয়ে থাকে। তত্কালীন রীতি অনুসারে হারুন অর রশিদ ও জুবাইদার বিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত ছিল এবং জুবাইদার ১৫/১৬ বছর বয়সে, অর্থাৎ ৭৮১-৮২ খ্রিস্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

তত্কালীন বাগদাদের জৌলুশ, সুনামের কথা আজ সবার অবগত। এখনো বলা হয়ে থাকে, খলিফা হারুন অর রশিদের বাগদাদের মতো সম্পদ এবং জ্ঞানে সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য হাতেগোনা। ইসলামের বিজয়কেতন যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, সে সময়ের মুসলিম জাহানের খলিফা হারুন। রাজ্য শাসনে ব্যস্ত থাকার পাশাপাশি রীতি অনুসারেই একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। সেই সঙ্গে তার ছিল আরো অনেক উপপত্নী এবং দাসী। এদের বেশির ভাগই মূলত ছিল শিল্পী ও বাইজি। খলিফার ব্যস্ত রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিজীবনের মধ্যে জুবাইদাই তাঁর মনোযোগ সর্বাধিক আকর্ষণ করেছিলেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে তাকে বেশকিছু বাধা অতিক্রম করতে হয়েছিল। মোটামুটি নবম শতাব্দীর সূচনা থেকে জুবাইদাই হারুনের প্রধান স্ত্রী এবং হারেমের কর্ত্রীতে পরিণত হন এবং ১৪ বছর পর্যন্ত নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে উম্মে মোহম্মদ আব্বাসা এবং একজন উসমানীয় অভিজাত নারীর সঙ্গে তাকে এই মর্যাদা ভাগ করে নিতে হয়।

হারেম সম্পর্কে ‘ভাসা ভাসা’ ধারণা থাকলেও মনে হয়, এটি কেবলই রাজা-বাদশাহদের আমোদের স্থান হিসেবে ব্যবহূত হতো কিন্তু হারেম মূলত ছিল রাজকীয় নারীদের রাজনীতির কেন্দ্র। ইতিহাসের যেকোনো সময়কাল বা শাসন সম্পর্কে অধ্যয়ন করলে হারেমের গুরুত্ব অনুভব করা যায়। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, অষ্টম কিংবা নবম শতকে নারীরা লোকসমক্ষে আবির্ভূত হতেন না কিন্তু অভিজাত নারীরা তাদের অন্দর মহল থেকেই রাজনীতি, কূটনীতি, ক্ষমতার চর্চা করতেন। এসবের মধ্যে প্রথমেই ছিল রাজা, বাদশাহ বা খলিফার সুনজর লাভ করা। পিতামাতা উভয়ের দিক থেকে রাজরক্তের অধিকারী হওয়ার কারণে আভিজাত্যের প্রভাবে হারুনের জেনানা মহলে জুবাইদা এমনিতেই এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে শিক্ষা, বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞায়ও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

হারুন অর রশিদ আরো একাধিক নারীর প্রতি আসক্ত হয়েছিলেন—কারো গুণের কারণে, আবার কখনো সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে। সাধারণ মানসে হারুনের যে ‘ইমেজ’ রয়েছে তার সঙ্গে এ কথা সাংঘর্ষিক হলেও তা ঐতিহাসিক সত্য। মনে রাখা প্রয়োজন, শাসকদের অসংখ্য উপপত্নী ও দাসী রাখার অনুমতি ছিল। হারুনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়নি কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৌতূহলোদ্দীপক কিছু ঘটনা পাওয়া যায়। যেমন হারুন একবার বাগদাদের এক কবির আবাসে দাদানির নামে একটি মেয়ের গান শুনে মোহিত হয়ে যান। পরবর্তী সময়ে দাদানির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলে হারুনের চাচার মাধ্যমে জুবাইদা অভিযোগ প্রেরণ করেন। হারুন বলেছিলেন, ‘আমি কেবল তার সংগীতে মুগ্ধ।’ একই সঙ্গে দাদানিরের সংগীত শ্রবণে আব্বাসীয় অভিজাতদের তিনি নিমন্ত্রণ করেন। সংগীতে মুগ্ধ হয়ে অভিজাতরাই বরং জুবাইদার কাছে গিয়ে হারুনের পক্ষে কথা বলেন।

এ ঘটনার পর জুবাইদা বিষয়টি কেবল মেনেই নেননি, নিজে থেকে হারুন অর রশিদকে ১০ জন দাসী উপহার দেন। জেনে বিস্মিত হতে হয়, এদের মধ্যে তিনজন হারুনের পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন যাদের মধ্যে দুজন পরে আব্বাসীয় সিংহাসনের অধিকারী হন। প্রশ্ন জাগে, নিজে থেকে জুবাইদা কেন এমন উপহার দিতে গেলেন?

মূলত এখানে জুবাইদার রাজনৈতিক কৌশলের নিদর্শন রয়েছে। কেবল দাসী নয়, জুবাইদা নানা সময়ে খলিফাকে বিভিন্ন উপহার প্রদান করেছেন। এই উপহার প্রদানের মাধ্যমে মূলত নিজের প্রতি খলিফার দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। জুবাইদা যে সময় হারুনকে উপহার প্রদান করেছিলেন তখনো অবশ্য হারুন সিংহাসনে বসেননি কিন্তু জুবাইদা আগেই হবু খলিফাকে প্রীত করেছিলেন যা পরবর্তী সময়ে তার জন্য সুফল বয়ে এনেছিল।

হারুনের সঙ্গে জুবাইদার প্রেম এবং বৈবাহিক সম্পর্ক মধুর ছিল বলেই জানা যায়। একটি ঘটনা এ রূপ উল্লিখিত হয়েছে, একদিন হারুন যে মুহূর্তে ইবনে জামির সঙ্গে কাব্য নিয়ে আলোচনা করছিলেন, জুবাইদা সে সময় খবর পাঠালেন, ‘দীর্ঘ তিন দিবস আপনার অনুপস্থিতিতে আমি বিরহকাতর।’ হারুন জানালেন তিনি সে মুহূর্তে কবির সঙ্গে রয়েছেন। জবাবে জুবাইদা লিখে পাঠালেন, ‘সুরা পান, সংগীত কিংবা অন্য কোনো ধরনের বিনোদনেই আমি তৃপ্তি লাভ করি না, যেখানে আপনি অনুপস্থিত।’ এই বার্তা লাভ করতেই হারুন, জামির হাত ধরে তাকে সঙ্গে করেই অন্দরমহলে গমন করেন। বলাবাহুল্য, হারেমে বহিরাগতের প্রবেশানুমতি ছিল না। কিন্তু হারুন এমন একটি স্থানে জামিকে বসালেন যেন সে জুবাইদাকে দেখতে না পারে কিন্তু জুবাইদা ঠিকই তার কবিতা শ্রবণ করতে সক্ষম হন।


এ ধরনের রাজকীয় দম্পতির মধ্যেও দাম্পত্য কলহ ছিল। একবার সম্ভবত আজিজা (হারুনের স্ত্রী এবং জুবাইদার জ্ঞাতি বোন) ও হারুনের সম্পর্ক নিয়ে জুবাইদা কোনো কটু কথা বলেছিলেন। ক্রোধের বশে সে মুহূর্তে হারুন ‘তিন তালাক’ উচ্চারণ করে ফেলেন। পরবর্তী সময়ে ক্রোধ কমে গেলে ধর্মীয় আইনবিশারদগণের পরামর্শ অনুসারে এই তালাকের অসারতা প্রমাণ করা হয়। অন্যদিকে জুবাইদা খলিফার যথেষ্ট আদর-যত্ন করতেন। তার ভালো লাগা ও মন্দ লাগায় জুবাইদার সদাসতর্ক দৃষ্টি থাকত। খলিফা নিজেও জুবাইদার বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তিনি জুবাইদার বিলাসী জীবনের বন্দোবস্ত করেছিলেন। কিন্তু আদতে একটা সময়ে খলিফার ‘হাত খোলা’ বদান্যতা জুবাইদার প্রয়োজন ছিল না। জুবাইদা তার হারেমের ভেতর থেকেই স্বতন্ত্র ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তুলেছিলেন। এছাড়াও মূলত খলিফার স্ত্রীদের ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের বার্ষিক রাজস্ব বরাদ্দ করা হতো। সবকিছু মিলিয়ে জুবাইদা বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে জুবাইদার সম্পর্কে সম্মানের সঙ্গে বলা চলে, তিনি এসব সম্পদ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করেছেন।

একবার হজযাত্রায় খলিফা হারুন অর রশিদের সঙ্গী হয়েছিলেন জুবাইদা। তারা একাধিকবার হজ পালন করেছেন এবং এক্ষেত্রে তারা পায়ে হেঁটে যাত্রা করতেন। এ সময় জুবাইদা হজ যাত্রাপথের দুর্গম অবস্থা লক্ষ করেন। একই সঙ্গে পানির অপ্রতুলতা তাকে ব্যথিত করে। সে বছর পানির এতই অভাব হয়েছিল, হজযাত্রী থেকে শুরু করে মক্কার অধিবাসী সবাইকে ভুগতে হয়েছিল। এ সমস্যা সমাধানের পথ জুবাইদা নিজের হাতে নেন। প্রথমেই তিনি জমজম কূপের গভীরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেন, যেন দ্রুততম সময়ে পানি লাভ করে সমস্যার সাময়িক সমাধান হয়। কিন্তু তিনি জানতেন, এ সমাধান দীর্ঘমেয়াদি নয়। তিনি নির্দেশ দিলেন, যেন পানির উৎস খুঁজে বের করা হয় যেখান থেকে পানি মক্কায় আনা সম্ভব।

কিন্তু আরবে তো সহজে পানির উৎস পাওয়া যায় না! মক্কা উপত্যকার আশপাশে কিছু কূপ থাকলেও পানির উপযুক্ত দুটি উৎস পাওয়া গেল ৩৫ কিলোমিটার দূরে হুনাইন এবং অন্যটি আরাফায়। প্রচলিত আছে, জুবাইদা এ দুটি অঞ্চল কিনে নিয়েছিলেন। তার নির্দেশ মোতাবেক পানি আনয়নের জন্য খাল খনন শুরু হয়। পানির সহজলভ্যতা এবং এ খালের রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি ৫০ মিটার অন্তর একটি করে কূপ খনন করা হয়। আশপাশের ছোট ছোট পানির উৎসকে এ জলপ্রণালির সঙ্গে যুক্ত করে পানিপ্রবাহ অব্যাহত রাখা হয়েছিল। মরুভূমি, পাহাড় এবং কখনো মাটির নিচ দিয়ে চলে যাওয়া এ পানি পরিবহন ব্যবস্থার পরিকল্পনা এবং অবকাঠামো তৈরির বিষয়টিকে প্রকৌশলের দৃষ্টিতে দেখলেও বিস্মিত হতে হয়। এই চমত্কার জলপ্রবাহ কৌশল তৈরি করতে তত্কালীন প্রকৌশলীদের কৃতিত্বের পাশাপাশি প্রভূত অর্থ খরচ হয়েছিল। ‘নহর-এ-জুবাইদা’ নামের এই দীর্ঘ ব্যবস্থাটি তৈরিতে আনুমানিক ১৭ লাখ দিনার খরচ হয়েছিল, যেখানে প্রতিটি দিনার মূলত ১০ গ্রাম স্বর্ণের একেকটি মুদ্রা।

যে কাজের কথা হয়তো হারুন অর রশিদ নিজেও চিন্তা করেননি, জুবাইদা তা করে দেখান। এক্ষেত্রে জুবাইদার ইচ্ছাশক্তি ও সংকল্পের প্রশংসা করতেই হয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, তত্কালীন সময়ে মরুঝড়, ডাকাতদের আক্রমণ পেরিয়ে পাথুরে রাস্তা দিয়ে কাফেলা যাতায়াত করত। যাত্রীদের পথের কষ্ট দূর করতে জুবাইদার পরিকল্পনায় কুফা থেকে মক্কা এবং মদিনা পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রাস্তা তৈরি করা হয়। এখানে একটি পথ আগে থেকেই ছিল, যা ব্যবহারের জন্য খুব একটা উপযুক্ত ছিল না। তার নির্দেশে পাথর সরিয়ে সমতল করে মসৃণ রাস্তার রূপ দেয়া হয়। দীর্ঘ এ পথের মধ্যে বিভিন্ন দূরত্বে ৪০টি সরাইখানা তৈরি করা হয়, যেখানে মানুষের বিশ্রাম ও পশুখাদ্যের বন্দোবস্ত নিশ্চিত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে এই ব্যবস্থা দুর্বৃত্তদের উৎপাত কমাতেও সাহায্য করে। বলা বাহুল্য, এ দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণেও প্রয়োজন হয়েছিল অনেক অর্থ এবং উপযুক্ত পরিকল্পনা-কৌশল। সে কারণেই রাস্তাটি প্রায় হাজার বছর পর্যন্ত যাত্রীদের দ্বারা ব্যবহূত হয়েছিল এবং এখনো কোনো কোনো স্থানে—বিশেষত কুফা অঞ্চলে—এই রাস্তার কিছু অবশেষ লক্ষ করা যায়। প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা লিখেছেন, ‘মক্কা থেকে বাগদাদে যাত্রাপথে প্রতিটি জলাধার, পুকুর এবং কূপ তাঁর (জুবাইদা) অনুগ্রহের সাক্ষ্য বহন করে...এই রাস্তাটির প্রতি তিনি মনোযোগী না হলে তা কখনো ব্যবহারের উপযোগী হতো না।’

কেবল বাইরেই নয়, নিজের হারেম এবং সংলগ্ন স্থানেও সুরুচি ও বৃহৎ কর্মযজ্ঞের ছাপ রেখেছেন জুবাইদা। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন ফ্যাশনদুরস্ত। পাদুকায় বিভিন্ন ধরনের রত্ন, পাথরখচিত ফিতা ব্যবহারের চল করেন তিনি। হাতির দাঁত ও স্বর্ণের স্তম্ভে একটি বিশাল ভোজনালয় তৈরি করেছিলেন। রেশম দ্বারা আচ্ছাদিত রূপার একটি পালকি ব্যবহার করতেন তিনি। হারেমে তার অধীনে প্রচুর নপুংসক দাস ও দাসী ছিল, যাদের নানা শিক্ষায় গড়ে তুলেছিলেন। বলা হয়ে থাকে, এই দাসীদের মধ্যে অন্তত একশ জনকে তিনি বাছাই করেছিলেন কেবল কোরআন পাঠ করার জন্য। পালাক্রমে কিংবা একত্রে তারা সকাল-সন্ধ্যা কোরআন পাঠ করত। এ কারণে জুবাইদার আবাসকে অনেক সময়ে ‘মৌচাক’ হিসেবে উল্লেখ করা হতো কেননা মৌচাক থেকে যেমন গুঞ্জন ভেসে আসে, জুবাইদার আবাস থেকে সবসময় কোরআন তিলাওয়াত ভেসে আসত।

অবশ্য হারুন অর রশিদের এই বেগমের কিছু খামখেয়ালি বিলাসের কথাও শোনা যায়। যেমন তিনি একটি বানর পুষতেন যার জন্য অন্তত ৩০ জন সশস্ত্র পাহারাদার, খিদমতগার নিয়োজিত হয়েছিল। এমনকি জুবাইদার সঙ্গে কেউ দেখা করতে এলে জুবাইদাকে কুর্নিশ করার পাশাপাশি বানরটির হাতে তাদের চুমু খেতে হতো। শোনা যায়, একজন সেনাপতি এই প্রস্তাবের কেবল বিরোধিতাই করেননি, বানরটিকে কেটে দুই টুকরো করেছিলেন। অবশ্য খলিফা তাকে এ কারণে কোনো শাস্তিও প্রদান করেননি।

জুবাইদার প্রতি নানা সময়ে হারুন আসক্ত হয়েছেন, আবার তাদের মধ্যে দূরত্বও তৈরি হয়েছে। পত্নী, উপপত্নী বাদেও জুবাইদার বিলম্বিত মাতৃত্ব অন্যতম একটি কারণ। দীর্ঘ সময় ধরে খলিফাকে কোনো উত্তরাধিকারী প্রদানে অক্ষম হওয়ার কারণে জুবাইদাকে নিজের জায়গা ধরে রাখতে নানা কৌশল খাটাতে হয়েছে। ইতিহাস বলে, প্রধান স্ত্রী হিসেবে হারুনের ওপর জুবাইদার যথেষ্ট প্রভাব ছিল। ভুলে গেলে চলবে না, জুবাইদা পিতা এবং মাতা উভয় তরফ থেকেই রাজকীয় রক্তের অধিকারী। হারুনের দরবারে তাই জুবাইদার যথেষ্ট প্রভাব ছিল। এই প্রভাবের কারণেই বারবার একাধিক নারীর কাছ থেকে তিনি হারুনকে জয় করে নিয়েছেন। হারুনও তার এ স্ত্রীকে ছেলেবেলা থেকেই জানতেন। জুবাইদার বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, জেদ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হারুন কাব্য থেকে কূটনীতি, নানা বিষয়েই স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা-পরামর্শ করতেন। তবে তা নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত।

অসুস্থতার কারণে ৮০৯ খ্রিস্টাব্দে হারুন অর রশিদের মৃত্যু হলে হারুন-জুবাইদা দম্পতির পুত্র আল-আমিন ষষ্ঠ আব্বাসীয় খলিফা হিসেবে অভিষিক্ত হন। পাঁচ বছর বয়সেই তাকে হারুন অর রশিদের উত্তরাধিকারী মনোনীত করা হয়েছিল। এই পর্যায়ে খলিফার মাতা হিসেবে জুবাইদার আড়ালে চলে যাওয়ার কথা এবং সে রকমই হয়েছিল কিন্তু আল-আমিনের একটি বিকারের কারণে তাকে আবার ভূমিকা পালন করতে হয়। আল-আমিনের প্রিয়তমা উপপত্নীর মৃত্যু হলে তিনি পরিবার ত্যাগ করে হারেমের নপুংসকদের মধ্যে সময় কাটাতে আরম্ভ করেন। একসময় বিষয়টি বিতর্ক সৃষ্টি করলে জুবাইদা আপন পুত্রের কাছে সুন্দরী নারী উপহার প্রেরণ করেন। এতে কিছুটা ফলও পাওয়া যায় কিন্তু এরই মধ্যে হারুনের অপর পুত্র আল-মামুন প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেন।

উত্তরাধিকারের এই যুদ্ধে আল-আমিন পরাজিত হন এবং বলা হয়ে থাকে, তার কাটা মাথা একটি বর্শায় গেঁথে বাগদাদের প্রবেশ পথে প্রদর্শিত হয়। পুত্র শোকে জুবাইদা কালো পোশাক ধারণ করেন এবং আল-মামুনের উদ্দেশে দীর্ঘ কবিতা লেখেন।

উল্লেখ্য, হারুনের এই পুত্রকে ছেলেবেলায় জুবাইদাই লালন পালন করেছিলেন। ফলে জুবাইদার প্রতি আল-মামুন পুত্রসম আচরণ করেছিলেন। জুবাইদার চিঠির জবাবে লিখেছিলেন তিনি একজন উপযুক্ত পুত্র হয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন। ছয় বছর পর যখন তাঁদের প্রথম দেখা হয়, আল-মামুন জুবাইদাকে বলেছিলেন যে আল-আমিনের হত্যার জন্য তিনি দায়ী নন। জবাবে জুবাইদা বলেন, ‘এমন একদিন আসবে যেদিন তোমাদের পুনরায় দেখা হবে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি তোমাদের দুজনকেই যেন ক্ষমা করেন।’ বিদুষী

জুবাইদার ধৈর্য, প্রজ্ঞার পরিচয় এই একটি কথা থেকেই বোঝা যায়। আল-মামুনের খেলাফতের মধ্যেই এই বিদুষী নারী ৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। মামুন সে সময়ে রাজধানীতে না থাকার কারণে শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলেন না। আরব্য রজনীর পাতায় জুবাইদা বেঁচে আছেন তার কীর্তিতে।

তথ্যসূত্র

১. টু কুইন’স অব বাগদাদ, নাবিয়া অ্যাবট, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস

২. দ্য ক্যানাল অব জুবাইদা, আবু হুজাইফা

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক