খলিফা হারুন
অর রশিদ
প্রায়ই প্রাসাদের
আনুষ্ঠানিকতা ছেড়ে
বেরিয়ে পড়তেন।
ঝরনার ধারে
বাগানে মনোরম
পরিবেশে একাকী
সময় কাটাতে
পছন্দ করতেন।
সেখানে ছিল
পুষ্পশোভিত জলাশয়,
জেসমিন আর
গোলাপ ফুলের
বিছানা, জমকালো
টালি দেয়া
গ্রীষ্মকালীন ঘর।
ঘরের কার্পেটগুলো
যেন তৃণভূমির
মতো সবুজ,
কোমল। ইচ্ছে
পূরণের জন্য
সেখানে কেবল
ঠোঁট নাড়ানোই
যথেষ্ট। চোখের
পলকেই যেন
অদৃশ্য পাখিরা
গান শুনিয়ে
যায়। চত্বরের
পাশেই ধীরগতিতে
বয়ে চলেছে
টাইগ্রিস নদী।
নদীপথ ধরে
তিনি মসুল
শহর পর্যন্ত
বেড়াতে পারতেন,
হারিয়ে যেতেন
মাঝিদের সুরের
মূর্ছনায়। বাগানে
খলিফা প্রায়ই
দাবা খেলে
সময় কাটাতেন।
খেলায় তার
পরাজিত হওয়ার
কোনো ভয়
নেই। কারণ
তিনিই প্রথম
খলিফা, যিনি
খেলাটি চালু
করেছেন। অভিজ্ঞ
খেলোয়াড়দের পুরস্কার
আর সম্মাননা
প্রদান করে
এর প্রতি
ব্যাপক আগ্রহ
জাগিয়ে তুলেছেন।
খলিফা যখন
অনুসারীদের সামনে
হাঁটতেন, তা
যেন এক
দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যের
অবতারণা করত।
তার গায়ের
চাদর বাতাসে
ভেসে বেড়াত।
প্রশংসিত দরবারিরা
ভাবতেন তিনি
হয়তো কোনো
মানুষ নন;
বরং স্বর্গ
থেকে নেমে
আসা স্বয়ং
দেবদূত। তিনি
মহান কিংবদন্তি
বাহরাম গুরের
কথা স্মরণ
করতেন। তিনি
পারস্যের খসরুদের
কাছ থেকে
‘হিরা’
রাজ্যটি ছিনিয়ে
এনেছিলেন। এ
বিজয় ছিল
দুটি ক্ষুধার্ত
সিংহের মুখ
থেকে শিকার
ছিনিয়ে আনার
মতো। যেন
বাহরাম গুর
একটিমাত্র তীর
নিশানা করেছেন।
বন্য গাধার
পেছনের খুর
ছুঁয়ে সে
তীর আঘাত
হেনেছে সিংহের
কপালে। অব্যর্থ;
লক্ষ্যভেদী সে
নিশানা। সে
যুগের শিকারিরা
সত্যিই বিশ্বাস
করত যে
তারা দেখেছে
শুভ্র বাজপাখি
তাদের কবজি
থেকে উড়ে
যাচ্ছে, আর
নখরে নিয়ে
আসছে এক
অদ্ভুত শিকার।
সে প্রাণিটা
দেখতে কিছুটা
সাপ আর
কিছুটা মাছের
মতো, যার
পাখনার স্থলে
শোভা পাচ্ছে
পাখির পালক!
খলিফা হারুন,
তার স্বজাতীয়
আরবদের মতো
ঘোড়া পছন্দ
করতেন। প্রাচীনকাল
থেকেই আরবদের
কাব্য-সাহিত্যে
ঘোড়া এক
বিশেষ স্থান
দখল করে
আছে। শুধু
মহান বিজেতার
সঙ্গী হিসেবেই
নয় বরং
তার চেয়েও
ওপরে; কখনোবা
উপপত্নী হিসেবে।
আরবদের চোখে
প্রথমে তেজি
ঘোড়া, তারপর
রমণীদের স্থান।
আরব গীতিকবিদের
কাছে ঘোড়ার
নাসারন্ধ্রে চুম্বন
কোনো ছলনাময়ী
নারীর চুম্বনের
চেয়েও বেশি
আকাঙ্ক্ষিত।
ঘোড়দৌড় ছিল
খলিফা হারুনের
অন্যতম শখ।
নির্দিষ্ট দিনে
প্রাসাদের খুব
কাছেই নদীর
ডান তীরের
আস্তাবলটা উত্তেজনায়
ফুটতে থাকত।
বাগদাদ বা
রাক্কা থেকে
বাছাইকৃত তেজি
ঘোড়াগুলো ঘোড়দৌড়ে
খলিফার রঙ
বহন করত।
যখন তার
পছন্দের ঘোড়াগুলোই
বিজয়ী হতো,
খলিফার সন্তুষ্টির
কোনো সীমা
থাকত না।
কবিদের ডেকে
আনা হতো
তাদের বিজয়গাথা
বর্ণনা করতে,
বিখ্যাত পণ্ডিত
আসমাই ঘোড়াদের
প্রশংসা আর
গুণকীর্তন করতেন।
বেশির ভাগ
সময় রাজকীয়
আস্তাবলের ভাগ্যেই
জয়মাল্য জুটত।
বাকিরা পত্রমারফত
আগেই জেনে
যেত প্রতিযোগিতায়
তাদের অবস্থান
কি হবে!
প্রতিযোগিতায় বৈচিত্র্যপূর্ণ
কিছু খেলাধুলাতেও
খলিফা হারুনের
আগ্রহ ছিল।
বর্শা নিক্ষেপে
আবিসিনিয়রা ছিল
অপ্রতিরোধ্য। ধনুর্বিদ্যার
প্রতিযোগিতায়ও ছিল
এক অভিনব
কৌশল। যার
নিশানা থাকত
একটি সোনার
ছোট গোলক।
তীরন্দাজরা তার
লক্ষ্যভেদ করতে
পারলেই সে
গোলক ভেঙে
বেরিয়ে আসবে
এক ঘুঘু।
আর সে
কুশলী তীরন্দাজের
ভাগ্যে জুটবে
সে সোনালি
গোলক।
তারপর ছিল
লম্বা ধনুকের
নানা কসরত,
ভোঁতা অস্ত্র
দিয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধ।
হ্যান্ডবলের মতো
চমত্কার কিছু
খেলারও প্রচলন
ছিল। হারুনই
প্রথম খলিফা,
যিনি পোলো
খেলেছিলেন। তিনি
এ খেলা
শুধু তার
সম্ভ্রান্ত সভাসদদের
মধ্যেই নয়
বরং জনসাধারণের
মধ্যেও বেশ
জনপ্রিয় করে
তুলেছিলেন। খেলায়
যথোপযুক্ত পুরস্কার
ও সম্মাননা
দেয়ার প্রচলন
ছিল।
ক্রীড়া প্রতিযোগিতার
দিনগুলোতে প্রাসাদ
চত্বরে পোলো
বল আকাশে
ছুঁড়ে দেয়া
হতো। এ
উৎসবের দিনগুলোতে
বাগদাদবাসী খলিফা
হারুনের সৈন্য-সামন্তদের
শক্তি-সামর্থ্য
অবলোকন করত।
তাদের দুর্ধর্ষ
সব কীর্তিকলাপ
দর্শকদের আনন্দ
দিত। তাদের
ছোঁড়া পোলো
বলে অপ্রত্যাশিত
দুর্ঘটনা এড়াতে
এ সময়
রক্ষীরা চারপাশের
এলাকা ঘিরে
রাখত।
এ ক্রীড়া
অনুষ্ঠান ক্ষমতার
প্রতি তরুণ
খলিফার মনোভাবকেই
ফুটিয়ে তুলত।
দুঃসাহসী খেলাগুলোকে
‘রাজদণ্ডের
খেলা’ বলে
অভিহিত করা
হতো। খেলার
মাঠে রাজকীয়
দণ্ডটি গম্ভীর
মূর্তির কারো
হাতে শোভা
পেত, সে
গোলকটি যেন
মহাবিশ্বের গোলকের
ন্যায়, তাকে
কেন্দ্র করেই
স্তরে স্তরে
তার সভাসদদের
ক্ষমতা প্রকাশ
পাচ্ছে। সারাদিনের
কর্মব্যস্ততা শেষে
প্রাসাদের কর্মচারীরা
সন্ধ্যায় এ
খেলাগুলো খুব
উপভোগ করত।
কর্মচারীরা বাইরে
ছদ্মবেশের আড়ালে
যেন নিজেদের
প্রতিবিম্বই দেখতে
পেত।
আরব্য রজনীর
গল্পগুলো খলিফা
হারুনুর রশিদের
গল্প কিনা
এ ব্যাপারে
ঐতিহাসিকরা এখনো
সন্দিহান। কিংবদন্তি
হিসেবে ছড়িয়ে
পড়া এসব
গল্প যেন
একেবারে বাস্তব
হয়ে আমাদের
চোখে ধরা
দেয়। যেন
খলিফা তার
ঘনিষ্ট সহচর
জাফরকে নিয়ে
ছদ্মবেশে সফরে
বেরিয়েছেন। একটি
জাতির প্রচলিত
কিংবদন্তিগুলোই মাঝে
মাঝে ঐতিহাসিক
প্রমাণের চেয়ে
বেশি সত্য
হয়ে ধরা
দেয়। বাগদাদের
রাজদরবার, তার
সভাসদসহ পুরো
পরিবেশ যেন
হাজার আরব্য
রজনীর গল্পগুলোই
আমাদের বারবার
মনে করিয়ে
দেয়। এ
যেন এক
উপাখ্যানের সংকলন;
কোনো কিংবদন্তি
নয়। যেন
রাণী শেহেরেযাদ
বাদশাহকে প্রতি
রাতে গল্প
শুনিয়ে যাচ্ছে।
হাজার বছরের
দীর্ঘ সে
রাত...
খলিফা হারুন
চেয়েছিলেন একটি
স্বাধীন পরিবেশ;
সহজ-সুস্থ
জীবনের স্বাদ।
অনাড়ম্বর আর
সাধারণ মানুষের
মতো একই
মুক্ত বাতাস
নেয়ার সুযোগ।
উঁচু উঁচু
প্রাসাদের চার
দেয়াল তাকে
বিষণ্ন করে
তুলত। চারপাশে
সভাসদ পরিবেষ্টিত
হয়ে খলিফা
মানসিকভাবে খুব
ক্লান্ত হয়ে
পড়তেন। তিনি
প্রাণখুলে হাসতে
চাইতেন, কিন্তু
রাজসভার ভাঁড়দের
শত প্রচেষ্টা
দিনদিন বিফল
হয়ে যাচ্ছিল।
জাফর তাকে
মাঝে মাঝে
উল্লসিত করতে
পারত, কিন্তু
সবসময় নয়।
খলিফা আফসোস
করে বলতেন,
‘ওহ,
জাফর, আমি
আমার ভারাক্রান্ত
হূদয়কে হালকা
করার জন্যই
তোমাকে নিয়োগ
দিয়েছি। ঈশ্বর
কিছু মানুষ
সৃষ্টি করেছেন,
যারা দুঃখীদের
হূদয়ের ভার
কমাতে পারে।
তুমি কি
তাদের মধ্যে
একজন নও?’
—জাঁহাপনা,
আসুন আমরা
ছাদে যাই
এবং আমাদের
উপরে লাখ
লাখ মৃদু,
অভিব্যক্তিপূর্ণ তারাদের
দিকে তাকাই।
আসুন আমরা
চাঁদের দিকে
তাকাই, যা
প্রেমিকের মুখের
মতো জ্বলজ্বল
করে!
—না,
আজ রাতে
নয়।
তারপরে
খোলা জানালার
পাশে বাগান
আর গাছের
সৌন্দর্য দেখতে
দেখতে, ফুলের
মিষ্টি সুবাসে
শ্বাস নিয়ে,
পাখির কলতান,
ঝরনার গান
শুনতে শুনতে,
স্ত্রী থেকে
বিচ্ছিন্ন প্রেমিক,
বিশ্বাসীদের নেতা
সকাল পর্যন্ত
ঘুমান।
—না,
আজ রাতে
নয়।
—টাইগ্রিসের
তীরে জাহাজে
জেলেরা জাল
তোলে। দূর
থেকে ভেসে
আসে তাদের
গান। মৃদু
অথচ হূদয়ভেদী।
কান পেতে
তাদের শুনুন।
—না,
আমি চাই
না।
—আসুন
আমরা আপনার
আস্তাবলে যাই,
ঘোড়াগুলোর ওপর
চোখে চোখ
রাখি, গভীর
রাতের মতো
কালো, নির্জন।
নানা রঙের
মাদী ঘোড়া-ধূসর,
বাদামি, তামাটে,
চিত্র-বিচিত্র,
সাদা। মনকে
আন্দোলিত করুন।
—না,
আমার নয়।
—জাঁহাপনা,
হেরেমের তিনশত
রমণী আজ
প্রস্তুত। তারা
নাচবে, গান
গাইবে, বাজনার
হিন্দোল তুলবে।
শুধু আপনার
জন্য। তাদের
আপনার সামনে
হাজির করছি।
মুহূর্তেই আপনার
মনের সব
যাতনা দূর
হয়ে যাবে।
—নাহ!
আমি তাদের
চাই না।
—তাহলে,
আপনার বিশ্বস্ত
দাস জাফরের
মাথায় আঘাত
করুন। কেন
সে তার
মালিককে খুশি
করতে পারছে
না।
রাজত্বের
সে পদভার
থেকে ক্রমাগত
ভেসে আসে,
‘আমার
হূদয় ভারাক্রান্ত...
ঘুম
আমাকে ত্যাগ
করেছে।’
আমরা
খুব বেশি
গল্প শুনি,
ক্লান্ত খলিফা
কীভাবে রাতের
আঁধারে ছদ্মবেশী
হয়ে ঘুরে
বেড়ান, তার
প্রজাদের খোঁজখবর
নেন; এক
সাদাসিধে অনাড়ম্বর
জীবনযাপন করেন।
অনুরূপ ব্যাপার
নিরো, ক্যাস্টিলের
পিটার, সেবাস্টিয়ান
দ্য ফার্স্ট
ও স্কটল্যান্ডের
পঞ্চম জেমসের
বেলায়ও ঘটেছে।
এমন আরো
অনেকেই আছেন
যাদের ইতিহাস,
তথ্যের অভাবে,
কিংবদন্তি হিসেবে
স্থান করে
নিতে পারেনি।
মানুষের ধারণা
তারা সব
সাধারণ চাহিদার
ঊর্ধ্বে, যেন
প্রেম ও
কল্পনার রাজ্য
তাদের কখনো
স্পর্শই করতে
পারেনি।
ভাষান্তর: নোমান বিন হারুন





