৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় খিলাফতের খলিফা পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন হারুনুর রশিদ। তিনি ৮০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। পিতা খলিফা মোহাম্মদ আল মাহদির অসিয়ত অনুসারে বড় ভাই মুসা আল হাদির মৃত্যুর পর সহজে খলিফা পদ লাভ করেন। কিন্তু তার শাসনামল ক্ষমতালাভের মতো সহজ ছিল না। ক্ষমতারোহণের পর থেকে তিনি অভ্যন্তরীণ ও বহিঃ নানা সংকটে জড়িয়ে পড়েন। বিদ্রোহ আর সীমান্ত সংঘাতে তার দিন কেটে যায়। মুসা আনসারীর ভাষায়: ‘তাঁর জীবনের কর্মকাণ্ড ও রাষ্ট্রীয় নীতি পরিচালিত হয় প্রধানত বাইজেন্টাইন প্রশ্নকেন্দ্রিক এবং সমগ্র জীবনের মূল্যবান সময়গুলো কাটে সমর ক্ষেত্রে।’ সীমান্ত রক্ষা ও বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত থাকায় তার পক্ষে নির্বিঘ্নভাবে রাজকার্য পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে তিনি মূলত বার্মেকিদের ওপর নির্ভর করতেন। তিনি সমরক্ষেত্রে সময় ব্যয় করায় তার হয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন ইয়াহইয়া বার্মেকি। তিনিই মূলত খলিফা হারুনের শাসন পরিচালনা করতেন। খলিফা হারুনের শাসনামলে বার্মেকি পরিবারের বাইরে তার স্ত্রী জুবাইদার প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি নানা জনহিতকর কাজে যুক্ত হয়ে খলিফা হারুনের শাসনামলে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। সামগ্রিক বিবেচনায় খলিফা হারুনের শাসনামল ত্রিকেন্দ্রিক ছিল। যুদ্ধক্ষেত্র সামলেছেন খলিফা হারুন নিজে। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছে বার্মেকি পরিবার। আর তার স্ত্রী জুবাইদার নেতৃত্বে অনেক জনহিতকর কাজ পরিচালিত হয়েছে।
উদারতার তরবারি
খলিফা হারুন ছিলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক। তিনি তার শাসনকে সুসংহত করতে প্রথম দিকে উদারতার তরবারি ব্যবহার করেন। ক্ষমতারোহণ করেই তিনি হজ পালনের জন্য মক্কা-মদিনা যান। এর মাধ্যমে জনতার মাঝে তার ধর্মপরায়ণতার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ববর্তী শাসক তার বড় ভাই হাদির সময়ে গ্রেফতারকৃত অনেক রাজবন্দিকে মুক্তি প্রদান করে রাজপদে নিয়োগ দেন। পরবর্তী সময়ে ওই মুক্তিপ্রাপ্ত রাজবন্দিরা তার বড় সমর্থকে পরিণত হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন ইয়াহইয়া-বিন-খালেদ বার্মেকি। খলিফা হাদি তাকে বন্দি করেন। হারুন তাকে মুক্তি প্রদান করে উজির পদে নিয়োগ প্রদান করায় তিনি একনিষ্ঠভাবে খলিফা হারুনের প্রশাসন দেখভাল করেন। শুধু ইয়াহইয়া বার্মেকি নয়, তার পুত্ররাও খলিফা হারুনের প্রশাসনের স্তম্ভ হয়ে ওঠেন। ফলে খলিফার পক্ষে নির্বিঘ্নে সমরক্ষেত্রে সময় দেয়া সম্ভব হয়। ইয়াহইয়া বার্মেকির মতো রাজমাতা খায়জুরানের প্রতি খলিফা হাদি বৈরী ছিলেন। খলিফা হারুন ভাইয়ের ওই নীতি থেকে বেরিয়ে এসে রাজমাতা খায়জুরানকে সম্মানিত করেন। তার এসব উদার পদক্ষেপ তাকে অল্প সময়ে জনপ্রিয় শাসকে পরিণত করে।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা খলিফা হারুনের ওই উদারতার নীতির মতো উদার ছিল না। আলাবিদের প্রতি তিনি প্রথমদিকে সহনশীল হলেও তার শাসনামলে ইয়াহইয়া আলাবি দায়লাম অঞ্চলে বিদ্রোহ করেন। ফলে বাধ্য হয়ে খলিফা হারুনকে তার নীতি পরিবর্তন করতে হয় এবং বিদ্রোহ দমনে তিনি সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন। আলাবিদের মতো খলিফা হারুনের সময়ে খারেজিরাও বিদ্রোহ করে। খারেজি নেতা ওয়ালিদের নেতৃত্বে পরিচালিত বিদ্রোহ অনেক কষ্টে সরকারি সামরিক বাহিনী দমন করতে সক্ষম হলেও খারেজিরা ওয়ালিদের মৃত্যুর পর তার বোন আব্বাসীয় যুগের জোয়ান অব আর্ক খ্যাত কবি লায়লার নেতৃত্বে পুনরায় সংগঠিত হয় এবং সরকারি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলমান রাখে। কবি লায়লার নেতৃত্বে খারেজিরা ওয়ালিদের সময়ের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং খলিফা হারুনের সামরিক বাহিনীকে বহুবার পরাজিত করেন। অবশেষে খলিফা হারুনের সেনাপতি ও কবি লায়লার আত্মীয় ইয়াজিদ-বিন-মাজাইদের আপ্রাণ চেষ্টায় ওই বিদ্রোহ দমিত হয়। খলিফা হারুনের প্রশাসন খারেজিদের জন্য অস্ত্র সমপর্ণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। কবি লায়লাসহ তার দলবল ওই সুযোগ গ্রহণ করলে ওই খারেজি বিদ্রোহের অবসান হয়।
উদার হারুন পুড়েছেন ঈর্ষায়
শিয়া নেতা ইমাম মুসা আল কাজিমের বিরুদ্ধে তার গৃহীত পদক্ষেপ উদার হারুনের উপর্যুক্ত উদারতার কাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শিয়াদের প্রতি আব্বাসীয়দের মনোভাব উদার ছিল না। খলিফা হারুনও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি শিয়াদের সন্দেহ করতেন। আর ওই সন্দেহ থেকেই তিনি শিয়াদের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সম্মানিত পণ্ডিত ও সাধু ব্যক্তি হিসেবে খ্যাতি লাভকারী মদিনার জনপ্রিয় শিয়া নেতা ইমাম মুসা আল কাজিমকে তিনি হেজাজ থেকে বাগদাদে নিয়ে আসেন। সরাসরি তাকে গ্রেফতার না করলেও খলিফা হারুনের সময়ে ইমাম মুসা বাগদাদে অনেকটা গৃহবন্দি ছিলেন। কারাগারের অধ্যক্ষ সিন্দি ইবনে মাহিকের বোনের জিম্মায় তাকে রাখা হয়। গৃহবন্দি থাকায় অল্প সময়ে ইমাম মুসার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে এবং তিনি ৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে গৃহবন্দি থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ইমাম মুসা গৃহবন্দি থাকাবস্থায় মারা যাওয়ার ঘটনা খলিফা হারুনের প্রতিপক্ষের প্রতি উদারতার নীতিতে কলঙ্কের দাগ লেগে যায়। ইমাম মুসার নেতৃত্বে আব্বাসীয়দের বিরুদ্ধে শিয়া বিদ্রোহের আশঙ্কা থেকে তাকে গৃহবন্দি করা হলেও বাস্তবে ওই সময়ে শিয়া বিদ্রোহের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। মূলত ইমাম মুসার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে খলিফা হারুন তাকে গৃহবন্দি করেন।
বার্মেকি পরিবারের পতনের ঘটনাও এক্ষেত্রে আরো একটি প্রমাণ। যে বার্মেকি পরিবার খলিফা হারুনের উদারতায় ক্ষমতার উচ্চপদে আসীন হয়, ওই বার্মেকি পরিবারের পতনে তার ভূমিকা মুখ্য ছিল। ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে খলিফা হারুন যে ইয়াহহিয়া বার্মেকিকে কারাগার থেকে মুক্ত করে সরকারের উচ্চপদে নিয়োগ করেন, খলিফা হারুনের নির্দেশেই ৮০৩ খ্রিস্টাব্দে ওই ইয়াহহিয়া বার্মেকিসহ তার তিন ছেলে ফজল, মুসা ও মোহাম্মদকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। বৃদ্ধ ইয়াহহিয়া বার্মেকির অন্য ছেলে পণ্ডিত জাফরের দুই ভাগ করা মাথা বাগদাদ সেতুর দুই পাশে ঝুলিয়ে রাখা হয়। বার্মেকি পরিবারের ৩ কোটি ৬ লাখ ৭৬ হাজার দিনার নগদ মুদ্রা, টাইগ্রিস নদীর তীরে নির্মিত তাদের মনোরম প্রাসাদ, অলংকার ও মূল্যবান আসবাব বাজেয়াপ্ত করা হয়। ক্ষমতার শুরুতে খলিফা হারুন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ইয়াহহিয়া বার্মেকির প্রতি যে উদারতা দেখান, রাজনৈতিক কারণেই তিনি আবার বার্মেকি পরিবারের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেন। রাজনৈতিকভাবে বার্মেকিরা প্রভাবশালী হয়ে উঠলে রাজস্ব প্রশাসনের একচ্ছত্র অধিপতি বনে গেলে পথের কাঁটা সরিয়ে দিতে খলিফা হারুন বার্মেকিদের পতন ঘটান।
ইমাম মুসা ও বার্মেকি পরিবারের প্রতি খলিফা হারুনের নীতি প্রমাণ করে যে তার শাসনের প্রথমদিকে খলিফা হারুন—আলাবি, রাজমাতা খায়জুরান অথবা ইয়াহইয়া বার্মেকিসহ অন্যদের প্রতি যে উদারতার তরবারি ব্যবহার করেন তা তার রাজনৈতিক কৌশল ছিল। উদারতার তরবারির মাধ্যমে তিনি মূলত বিনা তীরে পাখি শিকার করতে চেয়েছিলেন।
সমরনির্ভর অভ্যন্তরীণ ও বিদেশ নীতি
খলিফা হারুন তার রাজত্বের প্রথম চার বছর (৭৮৬-৭৮৯) খিলাফতের অখণ্ডতা বজায় রাখতে সর্বদা চেষ্টা করেন। ওই সময়ে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর মোকাবেলায় সর্বদা তাকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকতে হয়েছে। ফলে তিনি অধিকাংশ সময় বাগদাদের বাইরে অবস্থান করেছেন। ওই কারণে তিনি তার প্রধান কার্যালয় বাগদাদ থেকে সরিয়ে রাক্কায় নিয়ে যান এবং তার প্রধান কার্যালয় রাক্কাকে কেন্দ্র করে সামরিক তত্পরতায় ব্যস্ত সময় পার করেন। তিনি আলাবি, খারেজি বিদ্রোহ দমনের পাশাপাশি আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানে চলমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ওই অঞ্চলে রাজনৈতিক সংকট আব্বাসীয় খিলাফতকে দুর্বল করে দেয়। তাই খলিফা হারুন ওই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সংকটকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেন। এছাড়া তার সময়ে মসুল নগরে বিদ্রোহ হলে তিনি বিদ্রোহ দমনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেন। তিনি মসুল প্রাকাররাজি ধ্বংসের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের দমন করেন। অন্যদিকে দামাস্কাসের মুদার ও হিমারদের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব তিনি কঠোরভাবে দমন করেন। ইফ্রিকিয়ার শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সেনাপতি হারসামাকে প্রেরণ করেন। কিন্তু তার এ সামরিক নীতি সফল হয়নি। তিনি ইফ্রিকিয়া থেকে রাজস্ব আদায় করতে ব্যর্থ হন। বরং ইফ্রিকিয়ায় সেনাবাহিনী মোতায়েন ও প্রশাসন পরিচালনার জন্য মিসর থেকে বার্ষিক ১ লাখ দিনার ভর্তুকি হিসেবে প্রেরণ করা হতো। এমতাবস্থায় আলজেরিয়ার শাসনকর্তা ইব্রাহিম বিন আগলাবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বার্ষিক ৪০ হাজার দিনার রাজস্বের বিনিময়ে তিনি ইফ্রিকিয়া আগলাবিয়দের কাছে ইজারা প্রদান করেন। আগলাবিয়রা ওই ইজারার সুযোগে ইফ্রিকিয়ায় বংশানুক্রমিক স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করলে ইফ্রিকিয়ায় আব্বাসীয় খিলাফতের শাসনের অবসান ঘটে।
খলিফা হারুনের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশ নীতি অনেক ক্ষেত্রে বাইজেন্টাইনদের সঙ্গে চলমান আব্বাসীয়দের সীমান্ত সংঘাতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। খলিফা হারুন বাইজেন্টাইনদের থেকে তার সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে পুনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করেন। তিনি তার পিতার প্রতিষ্ঠিত সাগুর বা সেনা উপনিবেশ ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে আওয়াসিম বা সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করেন। ওই সামরিক ঘাঁটির অংশ হিসেবে তিনি তুরাস পর্বতমালার দক্ষিণ ঢালে তারসুস আলেপ্পোর মাঝে নতুন প্রতিরক্ষা লাইন প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রচলিত এ নতুন ব্যবস্থায় ওই অঞ্চলে অসন্তোষ দেখা দেয়। আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানে নতুন করে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। তারসুস দুর্গ সংস্কার করে ওই এলাকায় বদলির ভিত্তিতে তিন হাজার খোরাসানি সৈন্য নিয়োগ করেন। বেতনের বাইরে প্রণোদনা হিসেবে ১০ দিনার বৃত্তি মঞ্জুরি ও বসবাসের জন্য জমি বরাদ্দ প্রদান করে পরিত্যক্ত ম্যাসিসা ও এন্টিওক দুর্গের দুই হাজার সৈন্যকে ওই অঞ্চলে নিয়োগ করেন। আব্বাসীয়দের সেনানিবাস মাম্বিজ থেকে প্রতি বছর গ্রীষ্মকালীন সামরিক মহড়ার রীতি চালু করা হয়। তার প্রচলিত এ নতুন ব্যবস্থায় ওই অঞ্চলে জনগণ ক্ষুব্ধ হয়। আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানে নতুন করে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
৭৯১ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইনরা আব্বাসীয়দের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি ভঙ্গ করলে তিনি তার সমুচিত জবাব দেন। তিনি পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে সাইপ্রাস ক্রিট দ্বীপ তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। তার ওই সামরিক পদক্ষেপে কাজ হয়। বাইজেন্টাইনরা ভীত হয়ে পড়ে এবং সম্রাজ্ঞী আইরিন নিয়মিত কর দেয়ার শর্তে আব্বাসীয় খিলাফতের সঙ্গে নতুন একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। ওই চুক্তি ৮০২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ওই সময়ে সম্রাজ্ঞী আইরিনকে সরিয়ে সেনাপতি নাইসিফোরাস বাইজেন্টাইনের ক্ষমতারোহণ করেন। তিনি সম্রাজ্ঞী আইরিনের সঙ্গে খলিফা হারুনের সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করেন এবং ৯০৩ সালে কর প্রদান না করে খলিফা হারুনকে অপমানজনক পত্র লেখেন। খলিফা হারুন ওই পত্রের কঠোর জবাব দেন এবং তাত্ক্ষণিক সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন। স্বসৈন্যে তিনি বাইজেন্টাইনদের শক্ত ঘাঁটি হিরাক্লিয়াস দখল করেন। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত কর প্রদানের শর্তে নাইসিফোরাস খলিফা হারুনের সঙ্গে চুক্তি করেন। তবে তিনি পুনরায় চুক্তি ভঙ্গ করলে খলিফা হারুন আবারো নাইসিফোরসকে পরাজিত করেন। নতুন করে শান্তিচুক্তি হয়। কিন্তু খলিফা হারুন তারাবিস্তান ও দাইলামে বিদ্রোহ দমনে গেলে নাইসিফোরাস পুনরায় শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করেন। এবার খলিফা হারুন ৩৫ হাজার বেতনভুক্ত সৈন্য ছাড়াও বিশাল স্কাউট বাহিনীর সহায়তায় বিথিনিয়া পর্যন্ত সমগ্র এশিয়া মাইনর এবং পশ্চিমে মেসিয়া ও করিয়া পর্যন্ত অধিকার করেন। মাকাল্লিয়া, মালিকোপিয়া, থিবাসা, আইভারো পলিস, নাইসিয়া ও হিরাক্লিয়াসের ওপর আব্বাসীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও নাইসিফোরাসের সঙ্গে তার সন্ধি ও যুদ্ধ যুদ্ধ খেলাকে আমীর আলী খলিফা হারুনের অদূরদর্শিতার পরিচয় বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু নিসঃন্দেহে তার উপর্যুক্ত অঞ্চল বিজয় তার গৌরব ও সামরিক শৌর্য-বীর্যকে ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছে দেয় এবং এর মাধ্যমে তিনি নিজেকে শক্তিশালী শাসক হিসেবে প্রমাণ করেন।
যুদ্ধ জয় ও বিদ্রোহ দমনের পাশাপাশি খলিফা হারুন শত্রুর শত্রু-বন্ধু নীতি গ্রহণ করে বিখ্যাত ফ্রাঙ্কীয় সম্রাট শার্লেমাইনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। উভয় সরকারপ্রধান একে অন্যের সঙ্গে দূত ও উপহারাদি বিনিময় করেন। খলিফা হারুন শার্লেমাইনের জন্য পোশাক ও সুগন্ধি দ্রব্য প্রেরণ করেন। তার এ কূটনৈতিক নীতি তার প্রতিপক্ষ বাইজেন্টাইন ও স্পেনের উমাইয়া শাসকদের জন্য বেশ অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে।
জনসেবা ও নহরে জুবাইদা
খলিফা হারুন সমরক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকলেও জনসেবায় বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি বিদ্যালয়, মসজিদ, রাস্তা, সরাইখানা, হাসপাতাল, সেতু নির্মাণ করেন। তিনি জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার স্ত্রী জোবাইদাও বহু জনকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হাজিদের পানির কষ্ট দূর করার জন্য খলিফা হারুনের স্ত্রী জোবাইদা মক্কায় একটি খাল খনন করেন। ওই খাল পরবর্তীকালে নহরে জুবাইদা নামে পরিচিতি পায়। খলিফা হারুনের ওপর তার স্ত্রীর প্রভাব এত প্রবাল ছিল যে তার উত্তরাধিকার মনোনয়েনে তিনি স্ত্রী দ্বারা প্রভাবিত হন। তবে উত্তরাধিকারী মনোনয়নের ক্ষেত্রে তিনি অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন বলেই তার মৃত্যুর পর আব্বাসীয়রা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তার দুই পুত্র আমিন ও মামুনের মধ্যে সংঘটিত হয় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ।
শিক্ষা-সংস্কৃতি-আরব্য রজনী
খলিফা হারুন ছিলেন তত্কালীন সময়ের বিবেচনায় আধুনিকমনা। তিনি শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশে বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি পণ্ডিত ও সংস্কৃতমনা ব্যক্তিদের সমাদর করতেন। আব্বাসীয় খলিফা মনসুর আব্বাসীয় খিলাফতে যে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালান, খলিফা হারুনের সময়ে তা আরো পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হয়। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মূল্যবান বই সংগ্রহ করে তা অনুবাদের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ইউক্লিডের এলিমেন্ট ও টলেমির আল মাজেস্ট্রা তার সময় অনূদিত হয়। তিনি মালেকি ও হানাফি মাজহাবের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তার সময়ে মদিনায় মালেক ইবনে আনাস মালেকি মাজহাব ও কাজি আবু ইউসুফ হানাফি মাযহাবের প্রসারে কাজ করেন। তিনি বুদ্ধিজীবীদের তার দরবারে স্থান দেন। বিখ্যাত সংগীতশিল্পী ইব্রাহিম মৌসুলি, চিকিৎসাবিদ বখতিশু পুত্র জিব্রাইল, জগত্খ্যাত বৈয়াকরণবিদ আসমাই শফিই ও আব্দুল্লাহ-বিন-ইদ্রিস তার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। খলিফা হারুন নিজেও কবিতা লিখতেন। তার প্রেমিকা হেলেনা সম্পর্কে কাব্য রচনা করে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। খলিফা হারুন তার চাটুকারদের পছন্দ করতেন। তিনি অনেক চাটুকার ও ভাঁড়কে তার দরবারে স্থান দেন। ওয়ালিদের স্তুতিমূলক লেখায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি তাকে পুরস্কৃৃত করেন।
খলিফা হারুনের সময়ের ওইসব দরবারি বুদ্ধিজীবী, চাটুকার ও ভাঁড়েরা তার খ্যাতির প্রসারে কাজ করেন। খলিফা হারুন যুদ্ধবিগ্রহে ব্যস্ত থাকলেও বাগদাদসহ সমগ্র খিলাফতের মানুষের কাছে তারা খলিফা হারুনকে মহৎ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন। আরব্য রজনীর কাল্পনিক গল্পের মাধ্যমে খলিফা হারুনের শাসনামলকে কাল্পনিকভাবে বয়ান করা হয়। ওই গল্পগুলো অল্প সময়ে দেশ-বিদেশে জনপ্রিয় হয়। কৌশলী বয়ানে কাল্পনিক গল্প বাস্তব হয়ে ওঠে। ওই গল্পের অন্যতম চরিত্র খলিফা হারুন হওয়ায় অল্প সময়ে তার শাসনের খ্যাতি আরব্য রজনীর গল্পের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আরব্য রজনীর গল্প, দরবারি বুদ্বিজীবী, চাটুকার ও ভাঁড়েরা খলিফা হারুনের প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করে। আর ওই প্রচারযন্ত্রের প্রভাবে খলিফা হারুনের এমন এক অলীক ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে যার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক বাস্তবতার মিল নেই। তাই আরব্য রজনীর গল্পের মতো খলিফা হারুনের শাসনামলের ইতিহাস আজও অনেক ক্ষেত্রে রহস্যাবৃত্ত।
সূত্রপঞ্জি:
Ali, Szed Ameer. A Short History of Saracens. London:
Macmillan and Co., Limited, ১৯০০.
Al-Tabari. Tarikh al-rusul Wa©l-Muluk. New York: The
state University of New York Press, ১৯৯৭.
Hitti, Philip K. History of the Arabs. London: Macmillan,
১৯৮৯.
Saban, MA. The Abbasid Revolation. Cambridge:
Cambridge University Press, ১৯৭৯.
Tayed, Ei-Hibri. The Abbasid Caliphate: A History. Amherst:
University of Massachusetts, ২০২১.
আনসারী,
মুসা।
মধ্যযুগের মুসলিম
সভ্যতা ও
সংস্কৃতি।
ঢাকা:
চয়নিকা,
২০০৭।
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়





