গোলাপকে বলা যায় কৃতজ্ঞ উদ্ভিদ। এটি দুনিয়ার সব প্রান্তেই জন্মায়। মাটি কিংবা জলবায়ু যেমনই হোক না কেন, গোলাপ সবখানেই জন্মায়। আফ্রিকা, এশিয়ার একেবারে পূর্ব প্রান্ত, ক্যারিবিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বাগান, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে পুরো ইউরোপে গোলাপ জন্মায়। গোলাপ বাগানে জন্মায়, আবার বন্য পরিবেশেও জন্মায়। গোলাপের কাঁটা আমাদের রক্ত ঝরাতে পারে, হয়তো এটা গোলাপের গণতান্ত্রিক, স্বাধীনচেতা চরিত্রেরই অংশ। গোলাপ দেখে আপনি চোখ জুড়ান আর তার সুগন্ধে বিমুগ্ধ হন—গোলাপ কোনো আপত্তি জানাবে না। কিন্তু তাকে ছিঁড়ে নিজের দখলে নিতে যাবেন, গোলাপ রুখে দাঁড়াবে। আপনার গায়ে কাঁটা ফুটিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে চাইবে। গোলাপ আলো-বাতাসে উন্মুক্ত থাকে, তার যত্নের চাহিদা কম। তাকে দেখতে আসা সবাইকেই সে স্বাগত জানায়।

তা গোলাপ কত বছর ধরে মানুষকে স্বাগত জানাচ্ছে? গোলাপ বিশেষজ্ঞ ওরিয়েটা সালা তার বইয়ে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের ১৮০ প্রজাতির গোলাপের বিবরণ তুলে ধরেছেন। তার মতে, দুনিয়ায় যিশুর জন্মের ২ হাজার বছর আগে গোলাপের অস্তিত্বের কথা লিপিবদ্ধ আছে। গোলাপ দুনিয়ায় হাজির হয়েছিল টারশিয়ারি যুগে। সালার মতে, বাল্টিক অঞ্চল, ভারত, ওরিগন ও কলোরাডোতে যে ফসিলের নমুনা পাওয়া গেছে, তা থেকে এ সময়কাল নির্ধারণ করা যায়। সালার মতে, গোলাপের ৯৫টি প্রজাতি এশিয়ার নিজস্ব, আর ১৮টি উত্তর আমেরিকার। অবশ্য অনেকে আবার বলেন, গোলাপ টারশিয়ারি যুগের আগেই পৃথিবীতে এসেছিল। আমেরিকান রোজ অ্যাসোসিয়েশন ফসিলের মাধ্যমে তিন থেকে চার কোটি বছর আগে গোলাপের অস্তিত্বের কথা জানিয়েছে। এটা নিশ্চিত, দুনিয়ায় ফুলের আবির্ভাব মানুষের অনেক আগে।

গোলাপ রহস্যবাদ, অধ্যাত্মবাদ, সংস্কৃতি, সেমিওটিকসে মিশে আছে হাজার বছর ধরে। বহুকাল আগে থেকেই তাই মানুষ বুঝে নিয়েছে গোলাপ কেবল একটা ফুল নয়, কেবল সুঘ্রাণের উৎস নয়, বরং তার চেয়ে বেশি কিছু।

কোনো সন্দেহ নেই, গোলাপই এ গোলার্ধের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুল। টাইটানিকের নায়িকা রোজ থেকে শুরু করে পশ্চিমা দেশে কত মেয়ের নাম যে রোজ, তার ইয়ত্তা নেই। ইউরোপের কোনো কোনো এলাকায় গোলাপ আগুন কিংবা অগ্নিশিখার সঙ্গে প্রতীকীরূপে সম্পর্কিত।

দুনিয়ায় যেমন শত শত প্রজাতির গোলাপ দেখা যায়, তেমনি আমাদের মাথার উপরেও কিন্তু গোলাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদের মাথার ওপর রোজ নামে একটা নিহারিকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। লাল গোলাপের মতো দেখতে বলেই এর নাম রোজ নেবুলা। আর নাসার দেয়া আনুষ্ঠানিক নাম এনজিসি ২২৪৪। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব সাড়ে চার হাজার আলোকবর্ষ। তাই শক্তিশালী টেলিস্কোপ ছাড়া খালি চোখে রোজ নেবুলাকে দেখা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।

বিপরীতক্রমে পৃথিবীর বুকে জন্মানো গোলাপ আমাদের চোখ আর হাতের নাগালেই থাকে, চাইলেই তার সৌন্দর্য চোখ দিয়ে দেখা যায়, ঘ্রাণ উপভোগ করা যায়, ছুঁয়ে দেয়া যায়। অবশ্য গোলাপ ছিঁড়তে গেলে সে কাঁটা দিয়ে বাধা দিতে চায়। এ যেন আমাদের জীবনের মতোই—একদিকে কোমলতা, অন্যদিকে কণ্টকাকীর্ণ পথ। প্রবাদই তো আছে, ‘লাইফ ইজ নট আ বেড অব রোজেস’।&dquote;&dquote;

লাল গোলাপের অনেক কার্যকর, বাস্তবিক ব্যবহার আছে, যেগুলো মানুষের জীবনে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। গোলাপ দিয়ে রোজহিপ (গোলাপ গাছের ফল) টি নামের এক ধরনের হারবাল চা তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে জ্যাম ও জেলি তৈরিতেও গোলাপ ব্যবহার হয়। বুলগেরিয়ান রোজ অয়েল প্রাকৃতিক প্রোজেসটেরোন জেলের উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়। একটা ফুলের অবদান আর কত হতে পারে! একদিকে তার স্বর্গীয় সৌন্দর্য, ঘ্রাণ এবং একই সঙ্গে নানা ধরনের ঔষধি গুণ। আরো আছে সাংস্কৃতিক ও অধিবিদ্যিক প্রভাব। ষোড়শ শতকের বিখ্যাত চিকিৎসক ও ভবিষ্যদ্বক্তা নস্ত্রাদামুস গোলাপের নানা ধরনের ঔষধি গুণ উন্মোচন করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন কৃষ্ণ প্লেগ থেকে গোলাপ মানুষকে রক্ষা করতে পারে। তবে এ জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন প্লেগে নিজের পরিবার শেষ হয়ে যাওয়ার পর। তবে নস্ত্রাদামুসই প্রথম নন, যিনি গোলাপের বিশেষ ঔষধি গুণের কথা জানিয়েছেন। আমেরিকার নেটিভ জাতিগুলো এবং ভারতেও প্রাচীনকাল থেকেই গোলাপ রোগ সারাতে ব্যবহার করা হয়েছে। হাজার বছর ধরে গোলাপ কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক হয়েই থাকেনি, এর ঔষধি গুণের জন্যও প্রশংসিত হয়েছে।

দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অনেক পবিত্র, গোপন দলিলে গোলাপের অলৌকিক ও প্রতীকী অর্থের কথা উল্লেখ আছে। অনেক স্থানে অধ্যাত্মবাদে গোলাপের নানা ধরনের অর্থ আছে। হিন্দু অধ্যাত্মবাদীরা মনে করেন, প্রতীক হচ্ছে স্বর্গীয় ভাষা। প্রতীক হচ্ছে স্বর্গের দরজার চাবির ফুটো, যেখান দিয়ে স্বর্গে প্রবেশ করা যাবে।

সব প্রকাশেই গোলাপ সৌন্দর্যের সমার্থক। তাই এটা দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, রুশ এবং আরো অনেক ভাষায় গোলাপের নাম ‘রোজ’ই। এছাড়া রোজ শব্দটি সামান্য পরিবর্তন হয়ে গ্রিক প্রেমের দেবতা ‘এরোজ’-এর নামকরণ হয়েছে। গোলাপের সিম্বলিজমের প্রভাব বুঝতে এ নামকরণটিকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি।  ইহুদিদের অধ্যাত্মবাদ কাবালাহ শিক্ষায় গোলাপের প্রতীকের ব্যবহার দেখা যায়। অনেক গুপ্তগোষ্ঠী যেমন অর্ডার অব দ্য গোল্ডেন ডন, রোজিক্রুশিয়ানিজম প্রভৃতিতেও গোলাপের চিহ্নের ব্যবহার আছে। ক্যাথলিক চার্চ ঐতিহাসিক সময় থেকেই তাদের জপমালায় গোলাপ ব্যবহার করে। কিন্তু হয়তো অনেকেই জানেন না জপমালায় গোলাপের ব্যবহার কীভাবে শুরু হয়েছিল এবং কী এর প্রতীকী গুরুত্ব।

আমেরিকার আদি অধিবাসী বা রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে গোলাপ নিয়ে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত। বুনো গোলাপের বিভিন্ন জাতকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে অনেক উৎসব প্রচলিত। গোলাপ গাছ একাধারে তাদের কাছে খাবার, ভেষজ ওষুধ ও সৌভাগ্যের উৎস। রেড ইন্ডিয়ানদের বিভিন্ন ভাষায় বুনো গোলাপের নানা ধরনের বর্ণাঢ্য ও বিবরণীমূলক নাম আছে।

নেটিভ ইন্ডিয়ানদের অনেক গোষ্ঠীর পোশাক ও অঙ্গসজ্জায় গোলাপের ব্যবহার দেখা যায়। সমতলের অনেক গোষ্ঠী যেমন লাকোটা, ডাকোটা ও নাকোটা তাদের অলংকারের সজ্জায় জ্যামিতিক নকশা ব্যবহার করে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের বনভূমির গোষ্ঠী যেমন আনিশিনাবে ও ইরোকুয়োইস এবং কানাডার ক্রি গোষ্ঠী তাদের নকশায় ব্যবহার করে ফ্লোরাল প্যাটার্ন। এছাড়া ব্ল্যাকফিট ও ওকানাগান গোষ্ঠীও গোলাপের নকশাযুক্ত ডিজাইন ব্যবহার করে।

নেটিভ ইন্ডিয়ানদের ভাষার বৈচিত্র্য বিস্ময়কর। তাদের ভাষায় রূপক ও প্রতীকী উপস্থাপনার আধিক্য দেখা যায়। এসব প্রতীকী ও রূপক প্রত্যেকটি গোষ্ঠীর আবাস ও সংলগ্ন পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। একবার বুনো উদ্ভিদের নেটিভ আমেরিকান ভাষায় নামকরণগুলো শ্রেণীবদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল তাদের পদ্ধতি আধুনিক বৈজ্ঞানিক শ্রেণীকরণ থেকে একেবারে ভিন্ন প্রকৃতির। ওজিবওয়ে ভাষায় বুনো গোলাপের নাম Oginiiminagaawanzh (উচ্চারণ ও-গিনিমিনা-গ-উনঝ), পুরো নামের অর্থ এ রকম—ogini তার মা; imin ফল; agaawanzh ছোট ঝোপ। পুরো নামের বাংলা অনুবাদ হবে ছোট ঝোপ থেকে মা ফল। এ নাম ইঙ্গিত করে গোলাপের খাওয়ারযোগ্য ফল বা রোজ হিপসকে। অ্যানিশিনাবে ভাষার শব্দ ওজিন মানে টমেটো। টমেটো ও রোজহিপ (গোলাপ গাছের ফল) দুটোই স্ব স্ব গাছের খাওয়ারযোগ্য অংশ। এভাবে নেটিভ আমেরিকান ভাষাগুলোয় একই শব্দের অর্থ বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে ভিন্ন। তাই তাদের ভাষায় ফুলের নাম নির্দিষ্ট করাটা বেশ কঠিন।

গ্রেট প্লেইনের বিভিন্ন গোষ্ঠী যেমন ডাকোটা, ওমাহা, পওনি, শেইয়ান ও ব্ল্যাকফিটদের প্রত্যেকের ভাষায় বিভিন্ন প্রজাতির গোলাপের নিজস্ব নাম আছে:

 

Tribe                                Tribal Name                Latin Classification

 

Dakota                            Onzhinzhintka            Rosa pratincola

Ponca-Omaha               Wazhide                       Rosa pratincola

Pawnee                           Pahatu                          Rosa pratincola

Blackfeet                        Kinii                               Rosa acicularis

 

প্লেইন অঞ্চলে বুনো গোলাপের ঘ্রাণ ও সরব উপস্থিতির কারণে দক্ষিণ ডাকোটার সিয়োক্স রিজারভেশনের নাম হয়েছে রোজবাড সিয়োক্স রিজারভেশন। ১৯৩৪ সালের ইন্ডিয়ান রিঅর্গানাইজেশন অ্যাক্টের মাধ্যমে এ রিজারভেশন প্রতিষ্ঠা হয়। এতে বাস করে লাকোটা গোষ্ঠীর আদিবাসীরা।

নেটিভ আমেরিকানদের আধ্যাত্মিকতায় বস্তু দুনিয়া ও আধ্যাত্মিক দুনিয়ার জটিল ও নিবিড় সম্পর্ক দেখা যায়। নেটিভ ইন্ডিয়ানদের ধর্মবিশ্বাসের মূল ধারণাটি হচ্ছে সবারই আত্মা আছে, তা সে পশু-পাখি হোক কিংবা পাথর, হোক সে বহমান নদী। চারপাশে এইসব আত্মাকে স্বীকৃতি দেয়ার পর তারা সেই আত্মাদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চায়, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চায়। এজন্য নেটিভ আমেরিকানরা নিজস্ব কিছু উপায়ও তৈরি করে নিয়েছে। এর মধ্যে আছে নানা ধরনের আচার-অনুষ্ঠান, নাচ-গান। বেশকিছু গোষ্ঠী মনে করে, গোলাপের আত্মা বিশেষ, তাকে সম্মান দেখানো জরুরি। গোলাপের কোনো অংশ নিজেদের কাজে ব্যবহারের আগে তারা সেই নির্দিষ্ট গাছের আত্মার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে এবং সেই অংশ আহরণের বিনিময়ে গোলাপ গাছকে উপহারও দেয়া হয়। আত্মাকে সন্তুষ্ট রাখতে সাধারণত তামাক ভেট দেয়া হয়। এসব আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নেটিভ আমেরিকানরা প্রকৃতির প্রতি নিজেদের বিনয়, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এটি তাদের ধর্মীয় জীবনেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা প্রকৃতি থেকে শুধু সেইটুকুই নিতে চায়, যতটুকু তাদের প্রয়োজন। শত হাজার বছর ধরে নেটিভ আদিবাসীরা এভাবেই জীবনযাপন করে এসেছে। যদিও তাদের এসব আচার-রীতি পশ্চিমা সভ্যতার সমাজ কখনই গ্রহণ করেনি।

ধূমপান করা নেটিভ আমেরিকানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক রীতি, তাদের বিশ্বাস এর মাধ্যমে সমাজের মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। কোনো ধরনের ঐক্য, সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে ইন্ডিয়ানরা পাইপ উৎসবের আয়োজন করে। আর ধূমপান করতে গিয়ে ইন্ডিয়ানরা তামাকের সঙ্গে বুনো গোলাপ গাছের কাণ্ডের ছাল ব্যবহার করে।

ওকানাগান গোষ্ঠীর ধর্মীয় নেতারা সৌভাগ্যের জন্য বুনো গোলাপের  ডালপালা পানিতে সিদ্ধ করেন এবং সেই পানি দরকার মতো ছিটিয়ে দেন। যেমন মাছ ধারার জন্য বড়শি কিংবা জালে সেই গোলাপ কাণ্ড মিশিয়ে সিদ্ধ করা পানি ছিটিয়ে দেয়া হয়। শিকারিরা শিকারে যাওয়ার আগে এ পানি নিজেদের গায়ে ছিটিয়ে নেন, যাতে তারা শিকার করতে সফল হন। ওকানাগান ওঝারা সদ্য খোঁড়া কবরে বুনো গোলাপের গাছপালা দিয়ে ঝাড়ু দেন সেখানে মরদেহ সমাধিস্থ করার জন্য।

নেটিভ ইন্ডিয়ানরা বুনো গোলাপের প্রতিটি অংশ—কাণ্ড, শিকড়, পাতা, ফল, কুঁড়ি খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে। গোলাপের ফলকে তারা দুর্ভিক্ষের খাবার বলে মনে করে। কারণ শীতকালে যখন সবকিছু বরফে ঢেকে যায় তখন এ গোলাপ ফল ইন্ডিয়ানদের কাছে ভালো খাবারের উৎস হয়ে ওঠে।

পশ্চিম থেকে এবার পুবের দুনিয়ায় আসা যাক। আমাদের অঞ্চলেও গোলাপ তার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশে এমন কোনো ফুলের বাগান পাওয়া যাবে না, যেখানে গোলাপ গাছ নেই। ভারতবর্ষের সংস্কৃতিতে গোলাপের উপস্থিতি প্রাচীনকাল থেকেই। হিন্দু বিয়ে, উৎসব, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা—সবখানেই গোলাপের ব্যবহার দেখা যায়। সুগন্ধি তৈরিতে গোলাপের ব্যবহার আছে। দ্য গ্রেট কারিজ অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে গোলাপের পাপড়ি ব্যবহার করে বিভিন্ন পদের বিবরণী আছে।

আয়ুর্বেদের প্রাচীন গ্রন্থগুলোয় গোলাপকে ওষুধ তৈরির উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ভারতবর্ষের প্রাচীন গ্রন্থগুলোয় গোলাপ নিয়ে বিস্তারিত কিছু পাওয়া যায় না। তবে গত কয়েক দশকের প্রত্নতাত্ত্বিক খননে দেখা গেছে সিন্ধু সভ্যতায়ও গোলাপের ব্যবহার ছিল। সেখানে সুগন্ধি তেল তৈরিতে গোলাপ ব্যবহার করা হতো। ইতালির মিলানে অবস্থিত Instituto Derivati Vegetali-র পরিচালক ড. পাওলো রোভেসতি ১৯৭৫ সালে পাকিস্তানে অবস্থিত সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে অভিযান চালান। সেখানে তিনি তক্ষশীলা জাদুঘরে সুগন্ধি তৈরির জন্য পাতন প্রক্রিয়ায় ব্যবহূত টেরাকোটার যন্ত্রপাতি দেখতে পান। এসব যন্ত্রপাতি সিন্ধু সভ্যতার, যেগুলোর বয়স পাঁচ হাজার বছর। একই সময়কার সুগন্ধি রাখার কনটেইনারও সংরক্ষিত আছে জাদুঘরে। এ থেকে সিন্ধু সভ্যতায় সুগন্ধি তেল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে ভারতবর্ষে গোলাপের ব্যবহার বিস্তৃত হয় পঞ্চদশ শতকে মোগলদের হাত ধরে। মোগল-শ্রেষ্ঠ আকবরের আমলে প্রতিকৃতি অংকনের রীতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আকবর গোলাপকে অমর করে রেখে গেছেন একটি প্রতিকৃতিতে, যেখানে তাকে গোলাপ হাতে দেখা যায়। শাহজাহানের আমলে তার নির্দেশে প্রস্তুতকৃত শেখ সাদির গুলিস্তাঁর পাণ্ডুলিপিতে গোলাপের চিত্র দেখা যায়।

মোগলদের পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে গোলাপের বিভিন্ন জাত ভারতে প্রবেশ করে। সায়েন্স এডুকেশনে হিস্টরি অব দ্য রোজ নামের প্রবন্ধের লেখক রয় ই. শেপার্ড উল্লিখিত প্রবন্ধে লিখেছেন, কলকাতার বোটানিকাল গার্ডেনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বেশ কয়েক জাতের গোলাপের চাষ করেছিল।&dquote;&dquote;

কাশ্মীরের শ্রীনগরে মোগলদের তৈরি শালিমার গার্ডেনে গোলাপের দেখা মেলে।

হায়দার আলী ও তার পুত্র টিপু সুলতান অষ্টাদশ শতকে অনেকগুলো বাগান তৈরি করেছিলেন। মোগলদের বাগানের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিপু তৈরি করেছিলেন লালাবাগ নামের এক বাগান। কথিত আছে, বাগানটিতে লাল গোলাপ ফোটার পরে সেই দৃশ্য দেখে টিপুর মুখ থেকে লাল বাগ! নামটি বেরিয়ে আসে। লাল বাগ মানে লাল বাগান। ২৪০ একর জমিতে তৈরি এ বাগানে শত শত প্রজাতির গোলাপ ফুল আছে।

লেখক স্টিফেন অল্টারের লেখায় পাওয়া যায় হিন্দু ধর্মীয় আচার-বিশ্বাসে গোলাপের ব্যবহারের বিবরণ, তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় গোলাপের ব্যবহার হয়। নিজের স্যাকরেড ওয়াটার গ্রন্থে এ-বিষয়ক তার একটি অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন স্টিফেন। গঙ্গা নদী দিয়ে যাওয়ার সময় একবার এক পুরোহিত স্টিফেনের হাতের মুঠোতে গোলাপ, গাঁদা ফুলের পাপড়ি রেখে সেগুলোকে নদীতে ছড়িয়ে দিতে বলেন। বৃন্দাবনে কৃষ্ণের ধামেও গোলাপের বিপুল ব্যবহার দেখা যায়।

আয়ুর্বেদে গোলাপের ব্যবহার পাওয়া যায়। গোলাপের পাপড়ির স্বাদ মিষ্ট এবং এতে ঠাণ্ডা করার উপাদান আছে। তাই হজমের সমস্যা দূর করতে গোলাপের পাপড়ি ব্যবহার হয়। গোলাপ থেকে পাউডার, ম্যাসাজ অয়েল তৈরি হয়। পোড়ার ক্ষতে গোলাপ ও চন্দনের মিশ্রণের প্রলেপ ব্যবহারের রীতি আছে। ব্রণের চিকিৎসা, ত্বকের নির্জীব ভাব দূর করতে গোলাপ বহুল ব্যবহূত। চোখের নানা সমস্যায় গোলাপজল উপকারী।

অ্যারোমাথেরাপি আয়ুর্বেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খাবার ও ঔষধির মতো ঘ্রাণের গুরুতর প্রভাব আছে মানুষের মন ও দেহের ওপর। অনেক মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা দূর করতে গোলাপ ব্যবহার করা হয়। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে, গোলাপ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিভিন্ন ফ্যাক্টরের সঙ্গে জড়িত, যেগুলো মানুষের আবেগ ও হূদয়ের ওপর সেগুলোর প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করে। গোলাপের তেলের সুবাসে অ্যান্টিডিপ্রেশন ক্ষমতা আছে। এ ঘ্রাণ আনন্দের অনুভূতি বয়ে আনে, প্রেমের অনুভূতি গাঢ় করে, ভয় কমায়, মনমরা ভাব দূর করে। গোলাপের পাপড়ি ও কিছু গুল্ম ব্যবহার করে গুলকাণ্ড নামে এক ধরনের আয়ুর্বেদিক জ্যাম তৈরি করা হয়, যা অবসাদ দূর করতে এবং হূদযন্দ্রের সমস্যায় ব্যবহার হয়।

গোলাপের তেল আবিষ্কারের কৃতিত্ব অনেক প্রচলিত কিংবদন্তিতে দেয়া হয় মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরকে। কথিত আছে, ১৬১২ সালে তিনি এ তেল আবিষ্কার করেন। জাহাঙ্গীরের প্রাসাদ চত্বরে বাগান, পুকুর, ঝরনা, পানির নহর ছিল। বাগানে ছিল অসংখ্য গোলাপ গাছ। বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে সেই ঝরনা, পুকুরে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দেয়া হতো। এ রকম এক উপলক্ষ চলার সময় জাহাঙ্গীর হঠাৎ পানির ওপর তেলের পাতলা একটি স্তর দেখতে পান। সেই তেলের গন্ধে জাহাঙ্গীর মোহিত হন এবং তা বোতলে সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। এভাবেই শুরু হয় গোলাপের তেলের ব্যবহার। তবে এ কিংবদন্তি ঐতিহাসিক বিবেচনায় টেকে না। কারণ আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রাচীনকালে সিন্ধু সভ্যতায় গোলাপের তেল তৈরির প্রক্রিয়া চালু ছিল।

বর্তমানে উচ্চমানের গোলাপ তেল তৈরি হয়। এক কেজি তেল তৈরি করতে প্রয়োজন হয় সাড়ে তিন হাজার কিলোগ্রাম গোলাপ ফুল। এ হিসাবে ৩৫ কেজি গোলাপের তেল তৈরি করতে দরকার ১৪ লাখ গোলাপ ফুল।

ফুল হিসেবে বৈজ্ঞানিক গঠন, গন্ধ, সৌন্দর্য সবকিছুতেই গোলাপ প্রাচ্যেও যা, প্রতীচ্যেও তা-ই। কিন্তু দুই সংস্কৃতিতে গোলাপের ভিন্ন ধরনের অর্থ দেখা যায়। পশ্চিমে গোলাপের প্রতীকী অর্থ প্রাচীন মিসর, ভারত ও দূর পূর্বের দুনিয়ায় পদ্ম ফুলের মতো। তবে সবখানেই গোলাপের সৌন্দর্য ও সুঘ্রাণের বন্দনা চোখে পড়ে। পশ্চিমের প্রাচীন সংস্কৃতিতে রোমান দেবী ভেনাস স্বর্গীয় নারীসত্তার প্রতীক। এরপর খ্রিস্ট ধর্ম যখন ইউরোপে বিকশিত হচ্ছিল, তখন তাদেরও যিশুর পুরুষসত্তার সঙ্গে ভারসাম্য আনতে একটি নারী-ধর্মীয় সত্তার প্রয়োজন হয়েছিল। কারণ ইউরোপে তখন প্রাচীন সংস্কৃতির স্বর্গীয় নারীসত্তার ধারণাটি প্রবল ছিল। তাই সামনে আনা হলো মাতা মেরিকে। কিন্তু কোনোভাবেই মাতা মেরিকে গোলাপ ফুল দিয়ে সম্মান জানানো যেত না, কারণ গোলাপ যে রোমান দেবী ভেনাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। মাতা মেরির পবিত্রতার কথা মাথায় রেখে তার জন্য নির্দিষ্ট করা হলো পদ্ম ফুল। আর মেরি মাগদেলানের জন্য বাছা হলো গোলাপ, তাকে জায়গা দেয়া হলো ভেনাসের কাছে। মধ্যযুগে তৈরি ইউরোপের অসংখ্য গির্জার জানালার কাচে রঙিন কারুকাজে এ দৃশ্য দেখা যাবে। প্যারিসের নটরডম গির্জায় রোজ উইন্ডো আছে।

কবিতা হোক কিংবা পবিত্র জ্যোতিষশাস্ত্র, গোলাপ সবখানেই সৌন্দর্যের প্রতীক। আজকের দিনে জ্যোতিষবিদ্যার শিল্প ও বিজ্ঞান নিয়ে মানুষের বোঝাপড়া বেড়েছে। অনেক প্রাচীন পৌরাণিকগাথা মানুষের সামনে স্পষ্ট হয়ে গেছে। আজকের জাদু আগামীকালের বিজ্ঞান। জ্যোতিষশাস্ত্রের পুরাণগুলোয় গোলাপের সরব উপস্থিতি দেখা যায়। এসব পুরাণের হয়তো অনেকগুলোই আজ আর মানুষ বিশ্বাস করে না। কিন্তু গোলাপের আবেদন কিন্তু ফুরায়নি। প্রচলিত আছে, পুরাণ হচ্ছে সেই ঘটনা, যা কখনো ঘটেনি; কিন্তু সেগুলো সবসময়ই টিকে থাকে। গোলাপও হয়তো তেমনি, পুরাণ আর মানুষকে না টানলেও সেই পুরাণে থাকা গোলাপকে মানুষ জীবন থেকে বাদ দিতে পারেনি। গোলাপ মানুষের সঙ্গেই আছে—অসুখে, উৎসবে, প্রেমে।