অস্কার ওয়াইল্ড। অনুবাদ: ইবনে মোতালেব
তরুণ ছাত্রটি চিত্কার করে বলল, ও বলেছে, যদি লাল গোলাপ এনে দিতে পারি, তাহলে আমার সঙ্গে নাচবে। কিন্তু আমার পুরো বাগানে একটিও লাল গোলাপ নেই। ঘন সবুজ এক গাছের ভেতরে নিজের বাসা থেকে এক বুলবুলি তার কথা শুনল, পাতার ফাঁক দিয়ে দেখল এবং ব্যাপারটা কী ভাবতে লাগল।
ছেলেটির সুন্দর দুটি চোখ কান্নায় ভরে আছে। সে কেঁদে কেঁদে বলছে, আমার পুরো বাগানে একটিও লাল গোলাপ নেই। আহারে সুখ যে কত ছোট জিনিসের ওপর নির্ভর করে। জ্ঞানীরা যা লিখেছেন আমি সব পড়েছি, দর্শনের সব গোপন বিষয় আমার জানা, তবু একটি লাল গোলাপের অভাবে আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বুলবুলি বলল, ‘শেষ পর্যন্ত তাহলে আমি একজন প্রেমিককে পেলাম। যদিও আমি তাকে চিনতাম না। রাতের পর রাত আমি তার জন্য গান গেয়েছি। রাতের পর রাত তার গল্প তারাদের শুনিয়েছি, এতদিনে তার দেখা পেলাম। কচুরিপানার ফুল ফোটার সময় ফুলের যেমন সঘন বিস্তার তেমনি সঘন তার চুল, আর ঠোঁট তার আকাঙ্ক্ষার গোলাপের মতোই। কিন্তু আবেগ তার মুখমণ্ডলে ছড়িয়েছে বিবর্ণ আইভরির রঙ, তার ভ্রুর ওপর পড়ে আছে দুঃখের সিলমোহর।
ছাত্রটি বিড়বিড় করে বলল, রাজকুমার কাল রাতে বলনাচের আয়োজন করেছে, আমার প্রেমিকা সেখানে যাবে; আমি যদি তাকে একটি লাল গোলাপ এনে দিতে পারি, তাহলে ভোর পর্যন্ত আমার সঙ্গে নাচবে। আমি যদি লাল গোলাপ এনে দিতে পারি, তাহলে তাকে আমার বাহুবেষ্টনীতে ধরতে পারব, আমার কাঁধের ওপর সে তার মাথা এলিয়ে দেবে, তার হাত আমার হাতে আঁকড়ে থাকবে। কিন্তু বাগানে তো কোনো লাল গোলাপ নেই। আমি নিঃসঙ্গ হয়ে বসে থাকব, আমাকে পাশ কাটিয়ে সে চলে যাবে। আমাকে সে গ্রাহ্যও করবে না, আমার হূদয় ভেঙে যাবে।
বুলবুলি বলল, এ নিশ্চয়ই সত্যিকারের প্রেমিক। আমি যা গাই তাতেই সে যন্ত্রণা পায়। তাকে যন্ত্রণা দিয়ে আমার আনন্দ কোথায়? ভালোবাসা নিশ্চয়ই বিস্ময়কর একটা কিছু। এটা পান্নার চেয়েও দামি, উপলের চেয়ে দুর্লভ। মুক্তো কিংবা বেদানা ফল দিয়ে এটা কেনা যায় না। বাজারে এর বেচাকেনা চলে না। কোনো বণিকের কাছ থেকে কেনার নয়, পাল্লায় সোনা রেখে তা মাপারও নয়।
তরুণ শিক্ষার্থী বলছে, বাদকরা বসবে গ্যালারিতে, তাদের বাদ্য বাজাবে, বীণা আর বেহালার শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমার প্রেমিকা নেচে যাবে। এমন হালকা হয়ে নাচবে যে তার পায়ের পাতা মেঝেতেও পড়বে না। আমুদে পোশাক পরা সভাসদরা তাকে ঘিরে ধরবে। কিন্তু আমি যে লাল গোলাপ দিতে পারিনি, তাই আমার সাথে নাচবে না। সে ঘাসের ওপর উপুড় হয়ে পড়ল এবং হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করল।
সবুজ টিকটিকি লেজ তুলে তার পাশ দিয়ে ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, সে কাঁদছে কেন?
রোদের আলোয় পাখা ঝাপটানো প্রজাপতিও জিজ্ঞেস করে, কাঁদছে কেন?
কোমল নিচু কণ্ঠে ডেইজি ফুলও প্রতিবেশীকে জিজ্ঞেস করে, কাঁদছে কেন?
বুলবুলি জবাব দেয় ‘একটি লাল গোলাপের জন্য কাঁদছে।’
তারা একসাথে বলে ওঠে, ‘কী হাস্যকর। লাল গোলাপের জন্য?’
তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছিদ্রান্বেষী টিকটিকি সরাসরি হেসে উঠল।
কিন্তু বুলবুলিই তার দুঃখের কারণ বুঝতে পারল, তারপর ওক গাছে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে থেকে প্রেমের রহস্য নিয়ে ভাবল।
তারপর হঠাৎ তার বাদামি পাখা মেলে বাতাসে উড়ে গেল, একটি ছায়ার মতো বাগানের ওপর দিয়ে উড়ে গেল, ছায়ার মতো বাগান প্রদক্ষিণ করল।
ঘাসঘেরা জায়গাটার কেন্দ্রে একটি গোলাপ গাছ দাঁড়িয়ে। চোখে পড়তেই উড়ে চলে এল। পাখা ঝাপটে কাছে এসে চিত্কার করে বলল, ‘আমাকে একটি লাল গোলাপ দাও, আমি তোমাকে আমার সবচেয়ে সুন্দর গানটা শোনাব।’
কিন্তু গাছ মাথা নাড়ল।
বলল, আমার ফুল তো সাদা রঙের, সমুদ্রের ফেনার মতো সাদা, পাহাড় চূড়ার বরফ সাদার চেয়ে বেশি সাদা, তুমি বরং সূর্যঘড়িটার কাছে দাঁড়ানো আমার ভাইয়ের কাছে যাও, তুমি যা চাও হয়তো তা তোমাকে দিতে পারে।
বুলবুলি এবার সূর্যঘড়ির কাছে বেড়ে ওঠা গোলাপ গাছের কাছে গেল। বলল, ‘আমাকে একটা লাল গোলাপ দাও, আমি তোমাকে সবচেয়ে সুন্দর গানটা শোনাব।’
কিন্তু গাছ মাথা নাড়ল।
বলল, ‘আমার ফুল তো হলুদ। হলুদ সিংহাসনে বসা মৎসকন্যার চুলের মতো হলুদ, সকালে কাঁচি নিয়ে যখন ঘাস কাটতে আসে, তখনকার উজ্জ্বল হলুদ ড্যাফোডিলের চেয়ে উজ্জ্বল। তুমি বরং আমার ভাইয়ের কাছে যাও, ছাত্রটির জানালার পাশে বেড়ে উঠছে, তুমি যা চাও হয়তো সে দিতে পারে।
বুলবুলি উড়ে গিয়ে কাকুতি জানাল, ‘আমাকে একটা লাল গোলাপ দাও, আমি তোমাকে আমার সবচেয়ে সুন্দর গানটা শোনাব।’
গাছ বলল, ‘আমার গোলাপ লাল, ঘুঘুর পায়ের পাতার মতো লাল, সমুদ্রের গুহা থেকে উঠে আসা লাল প্রবালের ঢেউয়ের চেয়েও লাল। কিন্তু শীতে এবার আমার শিরা-উপশিরা জমাট বেঁধে গেছে, তুষার আমার কুঁড়ি নষ্ট করে দিয়েছে, ঝড় ভেঙেছে আমার ডাল, এ বছর আর কোনো গোলাপ ফুটবে না।’
বুলবুলি বলল, ‘আমি একটি লাল গোলাপ চেয়েছি, মাত্র একটি লাল গোলাপ। এটা পাওয়ার আর কি কোনো উপায় নেই?’
গাছ বলল, ‘উপায় আছে, কিন্তু উপায়টা এত ভয়ঙ্কর যে আমি বলতে সাহস পাচ্ছি না।’
বুলবুলি বলল, ‘উপায়টা আমাকে বলো, আমি ভীত নই।’
গাছ বলল, ‘তুমি যদি লাল গোলাপ চাও, তাহলে তা করতে হবে চাঁদের আলোয়, সংগীতে আর তোমার নিজের হূিপণ্ডের রক্ত দিয়ে। একটি কাঁটায় বুক ঠেকিয়ে আমাকে তোমার গান শোনাতে হবে। তোমার রক্ত ঝরে আমার শিরায় প্রবেশ করে তা আমার রক্তে পরিণত হবে।
বুলবুলি চিত্কার করে বলল, ‘লাল গোলাপের মহামূল্য হবে মৃত্যু, জীবন তো সবার কাছেই প্রিয়। সবুজ বনে বসে থাকাটা বড় মধুর, স্বর্ণরথে সূর্য আর মুক্তোরথে চাঁদ দেখতে পারাটাও মধুর অভিজ্ঞতা; কাঁটালতা ঘ্রাণ বড় মিষ্টি, উপত্যকায় হারিয়ে যাওয়া ব্লুবেল ফুল মিষ্টি, পাহাড়ের ওপর প্রবাহিত লতাগুলো মিষ্টি। তবুও প্রেম জীবনের চেয়ে উত্তম আর মানুষের হূদয়ের তুলনায় পাখির হূদয়ের কী এমন দাম?
পাখিটি তার বাদামি ডানা মেলে বাতাসে উড়ে গেল। ছায়ার মতো বাগানের ওপর দিয়ে উড়ে গেল, সমস্ত কুঞ্জবন উড়ে উড়ে দেখল।
তরুণ ছাত্রটি তখনো ঘাসের ওপর শুয়ে আছে, মেয়েটি তাকে ফেলে চলে গেছে, তার সুন্দর চোখে অশ্রু তখনো শুকোয়নি।
চেঁচিয়ে বুলবুলি বলল, ‘সুখী হও, তুমি সুখী হও, তুমি তোমার লাল গোলাপ পাবে—চাঁদের আলোয় আমার গান দিয়ে সেই ফুল ফোটাব আর আমার হূিপণ্ডের লাল রক্ত দিয়ে সে গোলাপ রাঙাবো। বিনিময়ে আমি এটাই চাই, তুমি একজন সত্যিকারের প্রেমিক হবে: কারণ ভালোবাসা দর্শনের চেয়ে জ্ঞানী, যদিও দর্শন জ্ঞানী এবং ক্ষমতার চেয়ে শক্তিশালী, যদিও ক্ষমতা ভীষণ শক্তিধর। তার ডানার রঙ আগুনের শিখার মতো, একই রঙ তার শরীর। তার ঠোঁট মধুর মতো মিষ্টি, আর তার নিঃশ্বাসে পোড়ানো রজনের সৌরভ।’
ছাত্রটি ঘাস থেকে চোখ তুলে ওপরে তাকায়, শোনে, কিন্তু বুলবুলি তাকে কী বলছে কিছুই বুঝতে পারে না। সে জানে কেবল তার বইয়ে যা লেখা আছে সেসব কথা।
কিন্তু ওক গাছ সব কথাই বুঝতে পারল এবং দুঃখ পেল। বুলবুলিটা ছিল তার খুব প্রিয়, তার ডালেই বাসা বেঁধেছে।
ওক গাছ ফিসফিস করে বলল, ‘আমাকে শেষ গান গেয়ে শোনাও, তুমি যখন থাকবে না, আমি খুব নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ব।’
বুলবুলি গাছের জন্য গান গাইল অভ্রপাতে বুদ্বুদ ওঠা পানির মতো তার কণ্ঠস্বর।
যখন পাখির গান শেষ হলো, ছাত্রটি উঠে দাঁড়াল, পকেট থেকে একটি নোট বই আর সিসার পেন্সিল বের করল।
বৃক্ষরাজির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘তার গড়নকে তো আর তার নয় বলে অস্বীকার করা যাবে না, কিন্তু তার কি সেই অনুভূতি আছে? আমার আশঙ্কা, নেই। আসলে সে অধিকাংশ শিল্পীর মতোই তার সবটাই স্টাইল—শৈলী, কোনো আন্তরিকতা নেই। অন্যের জন্য তো সে আত্মদান করবে না। সে কেবল সংগীতের কথা ভাবে, সবাই জানে শিল্প হচ্ছে স্বার্থপর। তার পরও স্বীকার করতে হবে, তার কণ্ঠের সুরধ্বনি খুবই মিষ্টি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই ভালোর কোনো মানে নেই। বাস্তবে তা কারো কোনো কাজে আসে না।’
তারপর সে নিজের কক্ষে চলে গেল, খড়ের গদির ছোট্ট বিছানায় শুয়ে এই প্রেমিকার কথা ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
তারপর যখন আকাশে চাঁদ উঠল, বুলবুলি চলে এল গোলাপ গাছের কাছে, কাঁটার ওপর নিজের বুকটা স্থাপন করল। কাঁটায় চাপ দিয়ে সারা রাত গান গাইল, শীতল স্ফটিক চাঁদ আকাশে হেলান দিয়ে গান শুনল। পাখি সারা রাত গান গাইল, আর কাঁটা একটু একটু করে বুকে বিঁধতে থাকল, আর তার শরীর থেকে বেরোতে লাগল তারই জীবন বাঁচানোর রক্ত।
বালক ও বালিকার অন্তরে কেমন করে ভালোবাসার সৃষ্টি হয়, বুলবুলি সেই গান গাইল। আর ছড়ানো গোলাপ গাছের শীর্ষে ফুটতে থাকল আশ্চর্য সুন্দর লাল গোলাপ, একটার পর একটা পাপড়ি গড়াতে থাকল, যেমন পাখি গেয়ে চলল একটার পর একটা গান। রঙটা প্রথমে নদীর ওপর ঝুলে থাকা কুয়াশার মতো পাণ্ডুর, সকালের পায়ের মতো পাণ্ডুর, ভোরের ডানার মতো অভ্রবর্ণ। অভ্রতে প্রতিবিম্বিত গোলাপের ছায়ার মতো, জলাশয়ে গোলাপের ছায়ার মতো—তেমনি গোলাপ গাছে ছড়ানো শীর্ষদেশে গোলাপ ফুটছে।
তখনো গাছ কেঁদে কেঁদে বুলবুলিকে বলে যাচ্ছে, ‘কাঁটার ওপর আরো চাপ দাও। আরো বেশি চাপ দেয় ছোট্ট বুলবুলি। তাড়াতাড়ি করো, নতুবা দিনের আলো ফুটে ওঠার আগে গোলাপ ফোটার কাজ শেষ হবে না।’
বুলবুলি আবারো শক্তি দিয়ে কাঁটার ওপর বুকের চাপ দিয়ে যেতে থাকল, গানের আওয়াজ বেড়েই চলল, পুরুষ ও নারীর অন্তরে আবেগ জন্ম নেয়ার গান গাইছে এই পাখি।
গোলাপের পাতায় গোলাপি ঝলক এসেছে—বর যখন কনেকে চুম্বন করে, তখন যে গোলাপি আভা ছড়িয়ে পড়ে সে রকম, কিন্তু তখনো কাঁটা পাখিটার হূিপণ্ডে পৌঁছেনি, তখনো গোলাপটা সাদাই রয়ে গেছে, কেবল বুলবুলির হূিপণ্ডের রক্তই পারে গোলাপের হূিপণ্ডে লাল এনে দিতে।
গাছ তখনো চিত্কার করে বলে যাচ্ছে, ‘ছোট্ট বুলবুলি, আরো কাছে এসো, আরো কাছে, নতুবা দিন এসে যাবে, গোলাপের কাজ অসমাপ্ত থেকে যাবে।’
পাখি কাঁটার ওপর নিজের বুক আরো জোরে চাপ দিল। কাঁটা স্পর্শ করল পাখির হূিপণ্ড। ভয়ংকর যন্ত্রণা সঞ্চারিত হলো পাখির দেহে। তীব্র, তীক্ষ তার যন্ত্রণা, বুনো এবং আরো বুনো হয়ে উঠল তার গান—সে এমন ভালোবাসার গান গেয়েছে যে ভালোবাসা পরিশুদ্ধ হয় মৃত্যুতে, কিন্তু কবরে সেই ভালোবাসার মৃত্যু হয় না।
বিস্ময়কর গোলাপ ততক্ষণে লাল হয়ে উঠল পূর্ব আকাশের লাল গোলাপের মতো। পাপড়িতে আবৃত করল লাল—যেন হূিপণ্ড তার লাল পদ্মরাগমণি।
কিন্তু বুলবুলির কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে আসছে, আরো ক্ষীণ; পাখা ঝাপটাতে থাকল, চোখের ওপর নেমে এল আবছায়া। পাখির কণ্ঠ আরো ক্ষীণ, আরো ক্ষীণ হয়ে এল, পাখি অনুভব করল, কিছু একটা তার গলায় আটকে গেছে।
তারপর বুলবুলির শেষ চিত্কার সংগীত! সাদা চাঁদ সে গান শুনল, ভোরের কথা ভুলে গিয়ে আকশে বেশিক্ষণ রয়ে গেল। লাল গোলাপ সে গান শুনল এবং চরমানন্দে কাঁপতে শুরু করল। ভোরের বাতাসের কাছে পাপড়ি মেলতে শুরু করল। প্রতিধ্বনি এই গান নিয়ে এল পাহাড়ের গুহায়, ঘুমন্ত মেষপালকরা তাদের স্বপ্ন থেকে জেগে উঠল। নদীর কূলে প্রতিধ্বনিত হতে হতে এই বার্তা সমুদ্রে পৌঁছে গেল।
গাছ বলল, ‘দেখো, দেখো এখন গোলাপটা সম্পূর্ণ হয়েছে।’
কিন্তু বুলবুলি কোনো সাড়া দিল না। বুলবুলি ঘাসের ওপর মৃত পড়ে আছে, তার হূিপণ্ডে বিঁধে আছে কাঁটা।
আর দুপুরে দরজা খুলে ছাত্রটি বাইরে তাকায়।
সে চিত্কার করে ওঠে ‘কী সৌভাগ্য, এখানেই তো লাল গোলাপ! আমি কোনোদিনও সারা পৃথিবীতে এমন সুন্দর গোলাপ দেখিনি। আমি নিশ্চিত এর নিশ্চয়ই বড় কোনো লাতিন নাম থাকবে।’
সে নুয়ে লাল গোলাপটা তুলল।
তুলে রাখল নিজের হ্যাটের ওপর। তারপর গোলাপ হাতে ছুটল প্রফেসরের বাড়ির দিকে।
প্রফেসরের কন্যা তখন দরজায় বসে সিল্কের নীল সুতো গুটাচ্ছে। তার পায়ের কাছে শুয়ে আছে ছোট্ট কুকুর।
চিত্কার করে ছাত্রটি বলল, ‘তুমি বলেছিলে, আমি যদি তোমাকে লাল গোলাপ এনে দিতে পারি, তাহলে আমার সাথে নাচবে। এই নাও পৃথিবীর সবচেয়ে রঙিন গোলাপ। আজ তুমি গোলাপটি তোমার হূদয়ের সবচেয়ে কাছে সেঁটে রাখবে। আমরা যখন একসাথে নাচব, গোলাপ তোমাকে বলে দেবে, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি।’
কিন্তু মেয়েটি ভ্রুকুটি করল।
বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে, আমার পোশাকের সাথে এই ফুল যায় না। তাছাড়া চেম্বারলেইনের ভ্রাতুষ্পুত্র আমার জন্য সত্যিকারের কিছু হিরেজহরত পাঠিয়েছে। আর এটা তো সবাই জানে, এগুলোর দাম ফুলের দামের চেয়ে অনেক বেশি।’
ক্ষুদ্র ছাত্র বলল, ‘তাহলে আমার কথা শোনো, তুমি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ।’ সে ছুড়ে ফেলল, রাস্তায় একটি গর্তের মধ্যে গিয়ে পড়ল, তার ওপর দিয়ে চলে গেল ঘোড়ার গাড়ির চাকা।
মেয়েটি বলল, ‘অকৃতজ্ঞ! তাহলে আমাকে বলতে হচ্ছে, তুমি বড্ড বাজে মেজাজের। তাছাড়া তুমি তো এমন কেউ নও? তুমি কেবল একটা ছাত্র। চেম্বারলেইনের ভ্রাতুষ্পুত্রের জুতোর বকলেসে যতটুকু রুপা আছে, আমি বিশ্বাস করি না, এতটুকু সম্পদও তোমার আছে।’ সে চেয়ার থেকে উঠে ঘরের ভেতরে চলে গেল।
হেঁটে ফেরার পথে ছাত্রটি বলছে, ভালোবাসা কী রকম যাচ্ছেতাই একটা ব্যাপার। যুক্তিবিদ্যা যতটুকু কাজে লাগে, ভালোবাসা তো এর অর্ধেকও কাজে লাগে না। কারণ ভালোবাসা দিয়ে কিছু প্রমাণ করা যায় না, যা কিছু ঘটার নয়, ভালোবাসা সে কথাই বলে যায়; অসত্য বিষয় মানুষকে দিয়ে বিশ্বাস করিয়ে নেয়। আসলে ভালোবাসা পুরোপুরি অবাস্তব একটি বিষয়, আর এ যুগ সবকিছুতেই বাস্তবতার যুগ, আমি আবার দর্শনের কাছে ফিরে যাব এবং অধিবিদ্যা অধ্যয়ন করব।
সে তার রুমে ফিরে আসে এবং ধুলো পড়া একটি বড় বই বের করে পড়তে বসে যায়।






