গোলাপের লিখিত ইতিহাসে চোখ বুলালে দেখা যাবে, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তবিংশতি শতাব্দীর সারগনের আমলের রাজসমাধিভূমে স্যার লেনার্ড উলির প্রাচীনতম আবিষ্কার-পরবর্তী বেশ কয়েকটি শতাব্দী যাবৎই ফুলটি দলিলবিহীন। তবে ধরে নেয়া চলে যে ইরাকি-তুর্কি মাতৃভূমি থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা তার জয়যাত্রা শুরু করে জলে-স্থলে বাণিজ্যপথে চলে উদ্যমী পুষ্পটি পৌঁছে গিয়েছিল ক্রিটে, গ্রিসে, আফ্রিকার উত্তরে, মিসরে—সওদাগরি কারোয়ানের সখের সঙ্গিনী হয়ে। এমনি করে হাজার বছর ধরে অলক্ষে পথচলার পর অবশেষে গোলাপের দেখা মেলে খ্রিস্টপূর্ব ষোলো শতকের ক্রিটের দেয়ালচিত্রে আর মৃৎপাত্রের গায়ে আঁকা ছবিতে।
খ্রিস্টজন্মের ৭০০ বছর পূর্বের মহাকাব্য ইলিয়াড-ওডিসির দুটিতেই গোলাপের উল্লেখ রয়েছে। তবে বিশেষ গোলাপের নয়, গোলাপবিশেষের, শৈলীগত বাগ্ভঙ্গিমায়, যেমন ‘দ্য রোজি ফিঙ্গার্ড ডন’। তদানীন্তন গ্রিসের স্মির্না বা বর্তমান তুরস্কের ইজমিরবাসী হোমারের বর্ণনায় অ্যাকিলিসের ঢাল ছিল গোলাপখচিত, নিহত হেক্টরের সর্বাঙ্গে আফ্রোদিতি লেপন করেছিলেন গোলাপেরই মলম। প্রেমের অধিষ্ঠাত্রী গ্রিক দেবী আফ্রোদিতি ও রোমান দেবী ভিনাস, উভয়ের প্রতি উৎসর্গিত পুষ্পটি ছিল অভিন্ন—পাটল বা হাল্কা লাল রঙের অবিকল্প গোলাপ।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম দিকে গ্রিসের লেসবসবাসিনী গীতিকবি সাফোর (খ্রি.পূ. ৬১০-৫৭০) বাণীবন্দনাতেই গোলাপ পুষ্পকুলের রানীরূপে প্রথম অধিষ্ঠিত হয়। সেই থেকে বিগত ২ হাজার ৭ শতাধিক বছরের ইতিহাসে, এই পৃথিবীতে গোলাপই একমাত্র রাজন্য, যিনি তাঁর রাজমুকুটখানি হারাননি; বরং সাম্রাজ্যটিও নিরবধিই বিস্তার করে চলেছেন।
লেসবসের এই কালজয়ী গীতিকবির যে গানে গোলাপের পুষ্পরানী হিসেবে অভিষেক ঘটেছিল, সেটির উদ্ধৃতি দেয়া গেল সরাসরি গ্রিক থেকে ইংরেজি অনুবাদে:
Song of Rose
‘Would Jove appoint some flower to reign,
In matchless beauty on the plain,
The Rose (mankind will all agree),
The rose the queen of flowers should be;
The pride of plants, the grace of bowers,
The blush of meads, the eye of flowers;
Its beauties charm the gods above,
Its fragrance is the breath of love;
Its foliage wantons in the air,
Luxuriant like the flowing hair;
It shines in blooming splendour gay,
While Zephyrs on its bosom play.
Translation : F. Fawkes
আরেকটি ইংরেজি অনুবাদ :
For Zeus chose us a king of the flowers in his mirth,
He would call to the rose, and would royally crown it;
For the rose, ho, the rose! is the grace of the earth,
Is the light of the plants that are growing upon it!
For the rose, ho, the rose! is the eye of the flowers,
Is the blush of the meadows that feel themselves fair,
Is the lightning of beauty that strikes through the
bowers
On pale lovers that sit in the glow unaware.
Ho, the rose breathes of love! ho, the rose lifts the cup
To the red lips of Cypris invoked for a guest!
Ho, the rose having curled its sweet leaves for the
world
Takes delight in the motion its petals keep up,
As they laugh to the wind as it laughs from the west.
আর্কেয়িক গ্রিস ও ক্ল্যাসিক্যাল গ্রিসের যুগসন্ধিক্ষণিক গীতিকবি সাফোর এ গান যত পড়ি তত ভালো লাগে এবং ততবারই মনের গহনে দুটি প্রশ্ন জাগে: কী গোলাপ দেখে প্রাচীন এই গ্রিক কবি এমন উচ্ছ্বসিত গোলাপ-প্রশস্তি লিখে ফুলের সিংহাসনে গোলাপকে চিরস্থায়ী করলেন এবং নিজেও গোলাপের মতোই নিত্য উদ্ধৃত রইলেন? তাঁর দেশ ও কালের খ্যাতিমান অন্য কবি কি সে গোলাপ দেখেননি?
প্রথম প্রশ্নটির জবাব। এককালের এশিয়া মাইনরের অংশ লেসবস দ্বীপে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে সাফো দেখেছিলেন সম্ভবত পাঁচ পাপড়ির সহজ-সরল বিনম্র সুন্দর ওয়াইল্ড রোজ বা বন্য গোলাপ, যে আপন খেয়ালে নিজে নিজে ফোটে; কি অরণ্যে কি উদ্যানে, যাকে ব্রিড করে কেউ ফোটায় না। বন্য অভিহিত এই গোলাপ প্রাকৃতিক উদ্ভিদবিশ্বের সুন্দরতম অংশটি। এর বৈজ্ঞানিক ও প্রায়োগিক নাম স্পিশিজ রোজ।
কেউ ফোটায় না বলেই বর্তমান বিশ্বে ওয়াইল্ড বা স্পিশিজ রোজের টাইপ মাত্র ১০০, যেখানে ব্রিড রোজের ভ্যারাইটি প্রায় তিন হাজার। প্রাকৃতিক এই আদিম গোলাপের পাপড়ির সংখ্যা সর্বোর্ধ্ব পাঁচ, কদাচিৎ চারও দেখা যায়। কিন্তু পাঁচের বেশি দেখলেই বুঝতে হবে ওটা নির্ভেজাল আদিম নয়, ব্রিড রোজ বা কৃত্রিম গোলাপ।
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর কবি অ্যানাক্রিয়নের স্তবগানে গোলাপের ধরাধামে আবির্ভাব বর্ণিত হয়েছে সবিস্তারে; যেমন কীভাবে প্রেমদেবী আফ্রোদিতির সমুদ্র থেকে অভ্যুত্থানের অভিঘাতপ্রসূত শুভ্র সমুদ্রফেনা থেকে অভ্যুদয় ঘটেছিল তাঁর যোগ্য প্রতিনিধি গোলাপের। এ কবির দেখা গোলাপও ছিল প্রাকৃতিক, বৈজ্ঞানিক মূল্যসংযোজিত নয়।
সাফো এই ন্যাচারাল স্পিশিজ রোজ বা প্রাকৃতিক বন্য গোলাপ ছাড়া কোনো কালচার্ড বা কাল্টিভার রোজ দেখেননি। কারণ রোজ কালচারের সূচনাই হয় সাফোর কাল থেকে দেড় হাজার বছর পরে, সেও তাঁর দেশ থেকে বহু হাজার মাইল দূরে, দূরপ্রাচ্যের সুদূর চীন দেশে। তাঁর উপমহাদেশ ইউরোপে কাল্টিভার রোজ বা বর্ণ সংকর গোলাপের চর্চা শুরু হয় সাফোর সময়ের আড়াই হাজার বছর পরে।
জাপানি উদ্ভিদবিদ মিকিনোরি ওগিসু তাঁর মাই ওয়ার্লড অব প্লান্টস নামক গ্রন্থে লিখেছেন: চীন দেশের জনগণ প্রকৃতি সৃজিত প্রাচীন গোলাপের সংকরায়ন পদ্ধতি শিখে কাল্টিভার বা মনুষ্য কর্তৃক মূল্যসংযোজিত আধুনিক গোলাপের উদ্ভাবন ও উৎপাদন করে আসছেন হাজার বছর আগে থেকে, যেখানে ইউরোপ-আমেরিকায় কাল্টিভার রোজের ইতিহাসের বয়স মাত্র শ-দুয়েক বছর।
প্রতিটি রাজবংশেই চৈনিক বিবুধমণ্ডলী মনমাতানো সৌরভময় বন্য গোলাপের সৌন্দর্যে আবিষ্ট ছিলেন। কাব্যে কেবল গোলাপেরই গান গাইতেন তাঁরা। আজ সেসব কবিতা পড়েই আমরা বুঝতে পারি, সেকালের জনগণ কেমন বিমোহিত ছিলেন অনাড়ম্বর সেই প্রাকৃতিক গোলাপের মনোহর পারিপাট্য দেখে। সং বংশের রাজত্বকালের (খ্রি. ৯৬০-১২৭৯) মহৎ কবি চেন কানজেং কর্তৃক আদিম গোলাপ উত্কীর্তিত হয়েছে বিশ্বের সমস্ত পুষ্পের চেয়ে বেশি রোমান্টিক বলে। উত্তর চীনের সং ডিন্যাস্টিতে গোলাপের সম্মানে অন্যান্য অনেক স্বনামধন্য উদ্ভিদকেই অনেক জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে।
চীনের জিয়াংসু প্রদেশের ফরেস্ট্রি একাডেমির প্রফেসর ওয়াং গুয়োলিয়াং তাঁর ৩০ বছরের গবেষণার ফসল ‘হাজার বছর আগের চাইনিজ সং ডিন্যাস্টির প্রাচীন গোলাপ’ শীর্ষক একটি মিমিয়োগ্রাফে বলেছেন যে চীনের প্রাকৃতিক গোলাপের বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য এখনো তাঁকে স্তম্ভিত করে। মিমিয়োগ্রাফটিতে তিনি চীনের শাংরিলা ডিস্ট্রিক্টের আদিম গোলাপ আর রোজ কাল্টিভেশনের সুদীর্ঘ ইতিহাসসমৃদ্ধ প্রাচীন গোলাপের কিছু নির্বাচিত ভ্যারাইটি নিয়ে চাঞ্চল্যকর আলোচনা করেন।
আলোচনার ফোরামটি ছিল ‘ম্যানহাটন রোজ সোসাইটি’ কর্তৃক এই ‘প্রাকৃতিক গোলাপ’ বিশেষজ্ঞের সম্মানে আয়োজিত ‘ডিনার উইথ ডক্টর ওয়াং গুয়োলিয়াং’। এ ইভেন্ট থেকেই আমি জানলাম, গোলাপবিশ্বের প্রবীণ ও নবীন দুই নেতা চীন ও যুক্তরাষ্ট্র প্রাকৃতিক গোলাপের প্রতি এখনো কত গভীরভাবে উৎসাহী। জানলাম ‘ম্যানহাটন রোজ সোসাইটি’র ‘স্কাইস্ক্রেপার্স অ্যান্ড রোজেস’ নামক নিউজলেটারে প্রকাশিত ইভেন্টটির ওপর দীর্ঘ প্রতিবেদন থেকে।
ভেবে বিস্মিত হলাম যে যুক্তরাষ্ট্র গোলাপ বানানোতেও বোমা বানানোর মতোই পারদর্শী। এ কারণেই বাকি বিশ্ব কর্তৃক উদ্ভাবিত গোলাপের নিবন্ধনও করতে হয় ‘আমেরিকান রোজ সোসাইটি’ কর্তৃক প্রবর্তিত ও পরিচালিত ইন্টারন্যাশনাল চেকলিস্টে। প্রযুক্তির প্রতীক স্কাইস্ক্রেপার্সের সঙ্গে প্রকৃতির প্রতীক গোলাপের এই মেলবন্ধন সর্বগ্রাসী বিভ্রান্তির চলমান এই কালটিতে মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারে।
কদাচিৎ সাদা দেখা গেলেও বন্য গোলাপ সাধারণত আরক্ত বর্ণ বা পাটল রঙেরই হয়। বরং ‘গোলাপি রঙ’ কথাটি সাফো বর্ণিত সেই প্রাকৃতিক গোলাপেরই সৃষ্টি। যেকোনো মিশ্র রঙে গোলাপি আভা বর্ণনাটাও আদিম গোলাপেরই অবদান, যেমন—গোলাপি লাল, গোলাপি বেগুনি।
এই না শুঁকে পাওয়ার মতো সুরভি বিলানো প্রাকৃতিক গোলাপ আজ সবার বাগান থেকেই নির্বাসিত। অথচ ওয়াইল্ড রোজ এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার মতো সব বড় মহাদেশেরই নেটিভ।
গীতিকবি সাফোর দেশ ও কালের খ্যাতিমান অন্য কোনো কবি কি সে গোলাপ দেখেননি? যে গোলাপ সাফো দেখেছিলেন? যেমন তাঁর সমসাময়িক কবি আলসিউস? যিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন সমকালীন রাজনীতিক ডামাডোল নিয়ে লিখে? আসলে যার যা দেখার তিনি তা-ই দেখেছেন। রোমান্টিক প্রকৃতির ইন্দ্রিয়সেবী গীতিকবি সাফো মানুষের দলাদলির বদলে গোলাপের ঢলাঢলি দেখেছেন। যেমন দেখেছেন পারস্য কবি ওমর খৈয়াম (খ্রি ১০৪৮-১১৩১)। তিনিও গোলাপ নিয়ে মাতামাতি করেছেন, কোনো কাল্টিভার রোজ দেখে নয়, একমাত্র প্রাকৃতিক গোলাপ দেখে, যা নিরুচ্চার সরল সৌন্দর্যের এক চিরন্তন প্রতীক।
সোচ্চার জটিল সৌন্দর্যের গোলাপ নিয়ে প্রথম কাব্য রচনা করেছেন সম্ভবত চীন দেশের সং বংশের রাজত্বকালের কবিকুল, যাঁদের দেশে তাঁদের কালের আগে থেকেই প্রকৃতির কাজে হাত লাগিয়ে সংকর প্রজনকরা single গোলাপের বহুগুণ বেশি পাপড়িসংবলিত একালের semi-double, double, full, very full ইত্যাদি সংজ্ঞায়িত গোলাপের জটিল সৌন্দর্য সৃষ্টি করে ফেলেছিলেন।
ওমর খৈয়ামের কবিতাকে প্রমথ চৌধুরী বলেছেন:
‘ফুলের মতো ফুটে ওঠা দর্শন, যেমন হালকা যেমন ফুরফুরে, তেমনি সুন্দর তেমনি রঙিন। এর প্রতিটি হচ্ছে ইরান দেশের গোলাপ। এ গোলাপের রঙের সম্বন্ধে ওমর জিজ্ঞাসা করেছেন,
‘দীর্ণ-হিয়া কোন সে রাজার
রক্তে নাওয়া এই গোলাপ—
কার দেওয়া সে লালচে আভা,
হূদয়-ছ্যাঁচা শোণিত-ছাপ’।
ওমরের কবিতার রস গোলাপফুলের আসব, সে রস পান করলে মানুষের মনে গোলাপি নেশা ধরে।’
যেমন কান্তি ঘোষের অনুবাদে:
সদ্য ফোটা এই যে গোলাপ, গন্ধ-প্রীতি-উজল মুখ,
বলেছ নাকি—মিথ্যা এসব, এই ক্ষণিকের দুঃখ-সুখ।
পৃথ্বী-বুকে উঠছে ফুটে গর্বে পরি’ রঙিন সাজ—
পাপড়ি টুটে ছড়িয়ে মোদের জীবন-রেণু পথের মাঝ।
ঐহিক প্রেমী ওমরের, কান্তি ঘোষের অনুবাদে যিনি বলেন ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও,/ বাকীর খাতায় শূন্য থাক্/ দূরের বাদ্য লাভ কি শুনে?/ মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক’, নগদ চাহিদার তালিকায় গোলাপের বাইরে আছে শুধু একটি ‘দিওয়ান’ মানে একটি কাব্যগ্রন্থ। যেমন সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অনুবাদে:
বনচ্ছায়ায় কবিতার পুঁথি পাই যদি একখানি
পাই যদি এক পাত্র মদিরা আর তুমি যদি রানী
সে বিজনে মোর পার্শ্বে বসিয়া গাহো গো মধুর গান
বিজন হইবে স্বর্গ আমার, তৃপ্তি লভিবে প্রাণ।
এই কবিতার পুঁথিখানিও আমার মতে কেবল একটি শৈলীর, তথা গজল নামক গীতিকবিতার, যা সুরসহযোগে শ্রাব্য। উল্লেখযোগ্য যে ফারসি গজল রচনার সূচনা বস্তুত জ্যোতির্বিদ কবি এই ওমর খৈয়াম থেকেই। আজ পর্যন্তও ফারসি কাব্যের শ্রেষ্ঠতম ফসল গজল। বলা হয়, ‘পারস্য হয়ে ভারতবর্ষে আগত মুসলমানদের শ্রেষ্ঠতম উপহার তাজমহলের পরে গজল।’
গজলের প্রতিটি দ্বিপদী সার্বভৌম একটি শব্দার্থগত সত্তা, একটা আলাদা কবিতা। তেমনি প্রতিটি গোলাপও যেন স্বতন্ত্র একটি নন্দনতত্ত্বগত সত্তা, জনৈকা অন্যরূপা নায়িকা।
এজন্য আমার মনে হয়, প্রতিটি গোলাপ যেন একটি গজল। আবার প্রতিটি গজল যেন একটি গোলাপ। পুষ্পের ভুবনে যেমন কেবল গোলাপই দৈহিক প্রেমের অবিমিশ্র প্রেরণা, কাব্যের জগতেও তেমনি কেবল গজলই শরীরী প্রেমের অবিমিশ্র অভিব্যক্তি, তবে কেবল অপুরস্কৃত প্রেমের। কিন্তু যত পুরস্কারহীনতার হাহাকারই হোক না কেন গজল, তার কাঙ্ক্ষিত প্রতিদান অবশ্য ইন্দ্রিয়জ বাসনারই। গোলাপও এমনই ইন্দ্রিয়জ বাসনারই প্রতীক।
তেমনি ইন্দ্রিয়জ কামনার প্রতিমূর্তি গীতিকবি সাফোই তো হবেন গোলাপের সমঝদার, গাইবেন গোলাপের গান। যেমন তাঁর রাজনৈতিক গোলযোগপূর্ণ কালের অন্য কবি লিখেছেন রাজনৈতিক প্রলাপের কথা।
কে ছিলেন এই নারী? মহামতি সক্রেটিসেরও (খ্রি.পূ. ৪৭০-৩৯৯) ১৪০ বছর পূর্বেকার, মহাকবি হোমারের খ্রি.পূ. সপ্তম শতক ছোঁয়া, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ২ হাজার ৮০০ বছর পূর্বকালের জীবনধারিণী? নানাবিধ বিষয়ে ইতিহাস সৃষ্টিকারিণী? কী তাঁর পরিচয়?
তিনি ছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের গ্রিসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র লেসবস দ্বীপবাসিনী। বিত্তবান সারকাইলাসের স্ত্রী সাফো জীবনের যাপনে চলনে বলনে ছিলেন জনৈকা সম্ভ্রান্ত ‘অ্যারিস্টোক্র্যাট’। তাই তিনি চলতে পারতেন যেমন খুশি তেমন। ছিলেন সহজাত গীতিকবি এবং নিবেদিতচিত্ত শিক্ষয়িত্রী। পরিচালনা করতেন লেসবসের প্রধান শহর মিটিলিনে নিজের প্রতিষ্ঠা করা অবিবাহিতা মেয়েদের ‘থিয়াসস’, মানে বিশেষ গোষ্ঠীর ট্রেনিং একাডেমি।
তাঁর ছাত্রী হিসেবে দূর দূর থেকে আসা কুমারীদের সঙ্গে কবিতা লেখা, আবৃত্তি করা ছাড়াও নিত্য মিথস্ক্রিয়াতেই কাটত সাফোর প্রতিটি দিন। (এঁর আদলেই তো সক্রেটিসের দিন কাটত ছেলেদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায়। অতএব এ ব্যাপারে সক্রেটিসকে সাফোর ভাবশিষ্য ভাবা যায় না কি?)।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিতে তাদের ছিমছাম ফিটফাট অর্থাৎ সম্মোহক করে গড়ে তুলতেন সাফো, সম্ভবত আসন্ন বিবাহের জন্য। ‘আনওয়েড’ ছাত্রীদের সঙ্গে এই শিক্ষিকার অন্তরঙ্গতা এতখানি বেড়ে যেত যে বিদায়কালে প্রত্যেককেই একটি করে ‘ওয়েডিং সং’ লিখে দিতেন তিনি। গানগুলোর কাব্যভাষা হতো ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশে খোলামেলা, যেমন:
Come back to me, Gongyla, here tonight,
You, my rose, with your Lydian lyre.
There hovers forever around you delight:
A beauty desired.
Even your garment plunders my eyes.
I am enchanted: I who once
Complained to the Cyprus-born goddess,
Whom I now beseech
Never to let this lose me grace
But rather bring you back to me:
Amongst all mortal women the one
I most wish to see.
হোমারের মতো দেবতাকে সম্বোধন নয়, মহাকাব্যিক বয়ানও নয়; সাফোর কবিতায় ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির কথা, ব্যক্তির প্রতি ব্যক্তির বারতা, সবই ব্যক্তিগত প্রেমবিষয়ক। গীতিকবিতার ইতিহাসে এটা প্রথম ঘটে সাফোর লিরিকেই। তিনি গান লিখতেন এবং সুর দিতেন ‘লায়ার’ বা বীণা বাজিয়ে সোলো গাওয়ার জন্য। গীতিকবিতার Lyric নামকরণ হয় সাফোর Lyre থেকেই। লিরিকের জন্য নিজস্ব একটি ছন্দও উদ্ভাবন করেছেন এই কালজয়ী লিরিসিস্ট, যেটি ‘সাফিক মিটার’ নামে প্রচলনে এসে অব্যবহিত-পরবর্তী গীতিকবিদের ওপর বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছিল। নীলনয়না রূপসী Sappho-র দৃষ্টান্তেই ‘নীলকান্তমণি’নামী প্রেশাস স্টোনের নামকরণ হয় Sapphire।
সাফো তাঁর প্রয়াণ-পরবর্তী ২০০ বছর সাফার করেন তাঁর তথাকথিত সমকামিতার রটনায়। তবু খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় ও দ্বিতীয় শতকে তাঁর নয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার প্রথম কারণ হোমারিক ও অ্যাট্টিক গ্রিক ভাষার উত্থান ও জটিল লেসবিয়ান তথা ইয়োলিয়ান আঞ্চলিক ভাষার পতন—যে আঞ্চলিক সুরেলা ভাষায় সাফো গান লিখতেন। তাঁর কাব্যভাষা ছিল আন্তরিক আঞ্চলিক, আনুষ্ঠানিক সাহিত্যিক নয়।
দ্বিতীয় কারণ কবি অ্যানাক্রিয়ন কর্তৃক আনীত সমকামিতার অভিযোগে তাইতিয়ান নামক চার্চম্যানের আদেশে ১৪১ খ্রিস্টাব্দে সাফোর পাণ্ডুলিপি ধ্বংসকরণ। তেমনি ‘কামোদ্দীপক’ জ্ঞান করে সাফোর ভক্তদের স্মৃতিবাহিত বাকি কবিতাগুলোও ১০৭৩ সালে পোপ গ্রেগরির নির্দেশে দাহন হলো তৃতীয় কারণ।
আবার তার অনেকখানি পুনরুদ্ধার সম্ভব হয় অক্সিরাইনচুস স্তূপের প্রাচীন রাবিশের মধ্যে পাওয়া ইজিপ্সিয়ান প্যাপিরাসের টুকরাটাকরা থেকে, ১৮৯৮ সালে। এই অন্ত্য উনিশ শতকের ভিক্টরীয় রক্ষণশীলতার চূড়ান্ত পর্বের ইংল্যান্ডে নারীসমাজের সমকামিতার পরিভাষা হিসেবে ব্যবহারে চলে আসে Lesbian ও Sapphic শব্দ দুটি এবং সেখান থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে স্থায়ী হয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ ইউরোপিয়ান রেনেসাঁসের পর থেকে ‘বৈকৃতকাম’ নারী সাফোর আদৃতি ও উদ্ধৃতি দিন দিন ‘বিপজ্জনক’ হারে বেড়ে চলা।
বেড়ে চলার কারণ তাঁর গীতিকাব্যের প্রতি কণিকার ধ্বনিমাধুর্য ও মোহগ্রস্তকর প্রসাদগুণ। রচনাশৈলীর নিহিত কাব্যবোধের সূক্ষ্মতা ও গভীরতার জন্য রোমাঞ্চকর এ কবি সর্বকালেই সাদরে উদ্ধৃত। বস্তুত তিনি বেঁচেও আছেন কেবল ব্যাপক উদ্ধৃতির মাধ্যমেই। তাঁর প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব পাঠকদের মধ্যে মুগ্ধবিস্ময় সৃষ্টি করে, যা তাঁর কাব্যের সর্বাঙ্গেই অনুভবনীয়। সাফোর কাব্যভাষায় আছে তাঁর জন্মস্থান ইয়োলিয়ার লৌকিক বাকপ্রপঞ্চ আর হোমারীয় মহাকাব্যিক শব্দস্পন্দের রেশঋদ্ধ কবিপ্রসিদ্ধির ঐশ্বর্য।
তাঁর শব্দ নির্বাচন ও বিন্যাস ছিমছাম, প্রকাশ ঋজু, বর্ণময় এবং সর্বোপরি চমকপ্রদ। নিজের রচনা থেকে তফাতে দাঁড়াতে পারেন সাফো। সেখান থেকে নিজের ভাবাকুলতা ও বেদনাতুরতার বিচার করতে পারেন নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিজনিত দোষগ্রাহীতার সঙ্গে। সারকথা: অবিক্ষুব্ধ ও সুশান্ত মুহূর্তে স্মরিত হলেও তাঁর কাব্যাশ্রিত উদ্দাম আবেগ জোর হারায় না আদৌ। সাফোর বিদ্যায়তনের কুমারীদের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ায় প্রধান তত্পরতা ছিল নাচ, গান, আবৃত্তি এবং ক্ষেত্রবিশেষে দাম্পত্য জীবনের কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ‘সিমিউলেশন’ কিংবা কপট অভিনয়।
সাফোর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনা, এমনকি তাঁকে সিসিলিতে নির্বাসিত করা; এসবের মূল কারণ তিনি ছিলেন তাঁর কাল থেকে অনেক অনেক এগিয়ে। তাঁর “সিঙ্গল উইমেন’স একাডেমি” একাই যথেষ্ট ছিল সমাজকে ক্ষ্যাপানোর জন্য। যেমন একালের রবীন্দ্র-বিদূষণের প্রধান কারণও ছিল স্বকাল থেকে তাঁর বেজায় বেশি এগিয়ে থাকা, যথা ভদ্র ঘরের শিক্ষিত মেয়েদের অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পীরূপে মঞ্চস্থ করা।
গোলাপপ্রেমী সাফো যে বৈকৃতকাম ছিলেন না, তার চূড়ান্ত প্রমাণ হলো তাঁর বিবাহ ও সন্তান জনন। লেসবিয়ান নারী যেখানে পুরুষকে অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যে ঘনিষ্ঠ হতে দেন না, সেখানে পুরুষের ঔরসে তাঁর গর্ভে সন্তান ধারণ করার কথা ভাবাও যায় না। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার অষ্টম খণ্ড মাইক্রোপিডিয়া লিখেছে: এটা নিশ্চিত যে, সাফো এক কন্যাসন্তানের জননী হয়েছিলেন। কন্যাটির নাম রেখেছিলেন নিজের মায়ের নামে, ক্লিস।
এছাড়া লাতিন কবি ওভিদ (খ্রি.পূ. ৪৩-খ্রি. ১৮) বর্ণিত লেজেন্ডে আছে ফাওন নামের এক তরুণ নাবিক কর্তৃক প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে মাত্র ৩০ বছর বয়সে (নাকি ৪০?) সাফো সমুদ্রতীরবর্তী অতিউচ্চ এক পর্বতগাত্র থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। পুরুষের জন্য কোনো সমকামী নারীর আত্মহত্যা করা অকল্পনীয়। কথাটি শ্রুতিনির্ভর হলেও আমি বলব, সমকামী নারী বিষমকামী প্রেমিকার শ্রুতি সৃষ্টি করে না।
সারকথা, প্রাণবন্ত এই কালজয়ী গীতিকবির কামবিকৃতির মিথ্যা কোনো গল্পগাছা শুনতেও প্রস্তুত নই আমি। কারণ তাঁর সঙ্গে দেখা না হলে গোলাপের দেশটা আমার দেখা হতো না, তিনি দেখিয়ে না দিলে এমন একটি ফুলের পথে আমার চলা হতো না। ভাবতে আমার ভালো লাগে যে স্বতন্ত্র শ্রেণীর বাংলা গানের স্রষ্টা জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় হয়তো সাফো আর গোলাপকে মনে রেখেই এই অবিস্মরণীয় গানটির কথা আর সুর রচনা করেছিলেন, ‘তোমার সঙ্গে দেখা না হলে/ ভালোবাসার দেশটা আমার দেখা হত না/ তুমি না হাত বাড়িয়ে দিলে/ এমন একটি পথে আমার চলা হত না’।
আনীত অভিযোগ সমকামিতার চিহ্নমাত্র দ্রষ্টব্য নয়, তাঁর অবিনষ্ট কবিতানিচয়ের কোথাও। তবু ইউরোপের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠা নারী গীতিকবি লেসবসের সাফোকেই সমকামী নারীর প্রোটোটাইপ বা আদিরূপ জ্ঞান করে নারীসমাজের সমকামিতার জাত্যর্থরূপে সর্বকালের জন্যই স্থায়ী হয়ে গেল ‘সাফি্ফজম’ বা ‘লেসবিয়ানিজম’ শব্দদ্বয়। অসত্য এভাবেই ইতিহাসের ঘাড়ে চেপে বেঁচে থাকে কাল থেকে কালে।
[আবদুশ শাকুরের রচনাবলি থেকে
সংকলিত। সংক্ষেপিত]






