প্রাচীনতম গোলাপের ফসিল পরীক্ষা করে জীবাশ্ম বিজ্ঞানীরা এর বয়স নির্ণয় করেছেন ২ কোটি ৬০ লাখ বছর। আমাদের দলিলকৃত যৌবন বন্দনার বয়স বড়জোর তিন হাজার বছর। একেবারে শুরু থেকে প্রিয়তমাকে ঘিরেই যৌবরাজ্যে কবির অভিষেক। প্রিয়তমাকে বরণ করতে কি অভিবাদন জানাতে গোলাপের চেয়ে উত্তম কোনো কিছুর কথা কবিরা ভাবেননি। গোলাপ গোলাপের মতোই রয়ে গেছে, বদল হয়েছে উপস্থাপনের কায়দা ও কৌশল।

আমাদের যখন যৌবনের উন্মেষ, সেই স্বাধীনতা-উত্তর সত্তরের দশকটিও ছিল আমাদের গোলাপ ও প্রিয়তমার দশক। আমাদের পথ দেখিয়েছেন কবি শহীদ কাদরী তার তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা কবিতায়:

ভয় নেই

আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে

মার্চ পাস্ট করে চলে যাবে এবং স্যালুট করবে

কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।

ভালোবাসার সঙ্গে রুটিও দরকার, রুটি কিনতে টাকা দরকার, শহীদ কাদরী সম্ভবত তাও বিস্মৃত হননি, নতুবা কেন লিখতে যাবেন:

ভয় নেই

আমি এমন ব্যবস্থা করবো

স্টেট ব্যাংকে গিয়ে

গোলাপ কিংবা চন্দ্রমল্লিকা ভাঙালে অন্তত চার লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে।

আমরা গোলাপ নিয়ে নারীর কাছে গিয়েছি, স্টেট ব্যাংকে অবশ্য যাইনি। গোলাপের সৌরভই খুলে দিয়েছে নারীর ভালোবাসার ভল্ট। কাছাকাছি সময়েই কবি শামসুর রাহমান ঘাতক কাঁটা প্রত্যাখ্যান করে কেবল গোলাপের দাবি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি গোলাপ নেবো।

গুলবাগিচা বিরান বলে হরহামেশা

ফিরে যাবো&dquote;&dquote;

তা হবে না দিচ্ছি বলে।

ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি

গোলাপ নেবো।

শামসুর রাহমান খুনির হাতেও গোলাপ ফুটিয়েছেন:

আস্তে আস্তে রাত্রি কাটে

খুকি ঘুমায় সোনার খাটে

ঘুমো খুকি নিঝুম ঘুমো

তোমার চুলে মেঘের চুমো

হঠাৎ দেখি দুপুর রাতে

গোলাপ ফোটে খুকির হাতে।

নিশ্চুপ ছিলেন না কবি আল মাহমুদ। তার পথটা আরো ভিন্ন:

পৃথিবীতে যত গোলাপ ফোটে

তার লালবর্ণ আমাদের রক্ত

আর তার সুগন্ধ আমাদের নিঃশ্বাস বায়ু।

অভাবগ্রস্ত ছন্দের দোলায় ৮০ বছর পূর্তিতে পেছন ফিরে আল মাহমুদ দেখেন:

আমি কবি এক মিল খুঁজে ফিরি

আলো ও আঁধারি আঁচল উড়িয়ে—  

জুড়িয়ে পরান, গাইব কী গান

মান-অভিমান দুই হাতে ঠেলে

পাপড়ি মেলে গোলাপ বাগান।

রফিক আজাদের কবিতায় গোলাপ বারবার এসেছে, বিভিন্নভাবে এসেছে:

প্রকৃতি বিভক্ত হন তিনটি সত্তায়

উত্তাপে, গোলাপে ও নারীর সৌরভে।

কিংবা রুটি ও শবজির গন্ধ ওরা বেশি ভালোবাসে। তবু,/ ‘গোলাপ গোলাপ’ বলে কান্না করা ওদের স্বভাব।

কবির পক্ষেই বলা সম্ভব যে গোলাপকে ঘিরে ষড়যন্ত্রে মেতেছে মানুষ, প্রকাশ্যে নির্বসন করে গোলাপকে ফ্যাশনে প্যারেডে নামিয়েছে। রফিক আজাদ জেগে থাকেন গোলাপের জন্য:

সারা রাত জেগে থেকে গোলাপের জেগে ওঠা দেখি,

এই মতো ধৈর্য্য-শ্রম-নিষ্ঠা-ইচ্ছা ছাড়া অনিবার্ন

ঐ লাল গোলাপের উত্থানের কথা কেউ ভাবতে পারে না।

লাল যে অবর্ণনীয় সে কথাটি মানুষেরা খুব বুঝে গেছে;

একমাত্র রক্তের লাবণ্যে তাকে বর্ণনা করা সম্ভব।

 

গোলাপের নিচে নিহত

গোলাপের নিচে নিহতদের একজন কি আবলু হাসান নন?

গোলাপের নিচে নিহত হে কবি কিশোর আমিও ভবঘুরেদের প্রধান ছিলাম

জ্যোত্স্নায় ফের জাগুয়ারা চাঁদ দাঁতে ফালা ফালা রয়েছে আমারও প্রেমিক হূদয়

আমিও আমার প্রেমহীনতায় গণিকার কাছে ক্লান্তি

সঁপেছি

বাঘিনীর মুখে চুমু খেয়ে আমি বলেছি আমাকে উদ্ধার দাও।

অকালপ্রয়াত আবুল হাসান অস্থির ও যুদ্ধোন্মাদ মানুষকে আহ্বান করেছিলেন, ‘গোলাপের মতো শান্তি হোন’

মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না

আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে

কবিদের সুধী সমাবেশে আমার মৃত্যুর আগে বলে যেতে চাই

সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন&dquote;&dquote;

গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন, কী লাভ যুদ্ধ করে।

শত্রুতায় কী লাভ বলুন? আধিপত্যে এত লোভ।

হত্যা ও খুনখারাবির রাজ্যে নির্মলেন্দু গুণ জানিয়ে দেন: আজ আমি কারো রক্ত চাইতে আসিনি। সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় গোলাপ:

তোমার হাতে গোলাপ তুমি ফুলের কাছে ঋণী রইলে

বাসের অমন ভিড়ের মধ্যে মেয়েটা

আমাকে এক লাইন কবিতা দিয়ে হঠাৎ নম্র-নেত্রপাতে

বেলগাছিয়ায় নেমে গেল রক্ত গোলাপ হাতে

বাকিটা পথ রইল শুধু ঘামের গন্ধ, ব্রিজের ধুলো

তোমার হাতে গোলাপ, তুমি আমার কাছে ঋণী রইলে।

 

গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’&dquote;&dquote;

এভাবে বলতে পারেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ

চুনি উঠল রাঙ্গা হয়ে

আমি চোখ মেললুম আকাশে

জ্বলে উঠল আলো

পুবে পশ্চিমে

গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম, ‘সুন্দর’

সুন্দর হল সে।

রবীন্দ্রনাথের প্রেম ও প্রকৃতিতে গোলাপ এসেছে একেক বেশে।

এক এক ছন্দে ও সুরে।

বলি, ও আমার গোলাপ বাসা, বলি ও আমার গোলাপ বালা

তোলো মুখখানি তোলো মুখখানি, কুসুমকুঞ্জ করে আলো।

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গানে গোলাপ কখনো ফুল হয়ে কখনো স্মৃতি হয়ে কখনো চরিত্র হয়ে এসেছে।

অরুণ-রাঙা গোলাপ-কলি

কে নিবি সহেলি আয়

গালে যার গোলাপী আভা

 এ ফুল-কলি তারে চায়

কিংবা ‘লাইলি তোমার এসেছে ফিরিয়া মজনু গো আঁখি খোলো’ গানটির অন্তরা থেকে কয়েকটি পঙিক্ত:

আজি, দখিনা বাতাস বহে অনুকূল,

ফুটেছে গোলাপ নার্গিস ফুল

ওগো বুলবুল, ফুটন্ত সেই গুলবাগিচায় দোলো

বনের হরিণ হরিণী কাঁদিয়া পথ দেখায়েছে মোরে&dquote;&dquote;

হুরী ও পরীরা ঝুরিয়া ঝুরিয়া চাঁদের প্রদীপ ধরে

পথ দেখায়েছে মোরে।

গোলাপ শুধু গোলাপই, নাকি একদা এটাও ছিল ফুলও? সুকুমার রায় লিখেছেন: একটি সামান্য জংলি ফুল আজ মানুষের চেষ্টা ও যত্নে সুন্দর গোলাপ হইয়া উঠিয়াছে, নানা লোকে গোলাপের চর্চা করিয়া আপন পছন্দমতো নানারূপ বাছাই করিয়া, নানা রকম মিশাল দিয়া কত যে নূতন রকমের গোলাম গড়িয়া তুলিয়াছে, তাহার অন্ত নাই।

সৈয়দ মুজতবা আলী মাতাল হওয়াকে বলেছেন গোলাপী নেশায় একটুখানি বে-এক্তিয়ার হয়ে যাওয়া।

কাঠও নয় আবার গোলাপও নয়, তবুও কাঠগোলাপ। প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন, আবাদ করিতে জানিলে কাঠগোলাপ বসরাগোলাপে পরিণত হয়।

নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্নের গোলাপ একটি নীতিশিক্ষামূলক কবিতা, পুরোটাই উদ্ধৃত হলো:

প্রফুল্ল গোলাপ পুষ্প করি দরশন,

কত আনন্দিত হয় মানুষের মন।

কিন্তু তার সুকোমল পত্র সমুদয়,

মুহূর্ত সুন্দর থাকি ক্রমে ম্লান হয়।

শুকাইয়া যায় হায়! দিনের ভিতর,

ক্রমে ক্রমে এসে পড়ে ধরার উপর।

সুন্দর বরণ আর নাহি থাকে তার,

কিন্তু তবুও করে সদা সুগন্ধ বিস্তার।

ভেবে দেখ মানবের রূপ ও যৌবন,

কিছুদিন তরে করে সৌন্দর্য্য-সাধন।

কিন্তু তাহা কাল-বশে যবে চলে যায়,

কাহার ক্ষমতা আছে ফিরাইতে চায়।

তবে তার গর্ব্ব কেন করি অকারণ

সাধিতে কর্ত্তব্য করিব যতন।

মনের সহিত সদা সুকাব্য করিব

গুণে বিভূষিত হতে সচেষ্ট হইব

দেহ লয় পাবে গুণ চিরকাল রবে

শুষ্ক গোলাপের মত সুগন্ধ ছড়াবে।

নামের সাথে গোলাপ আছে এমন অন্তত ১০০ উপন্যাসের নাম বলা যাবে। একালের সবচেয়ে আলোচিত উমবার্তোর একোর ‘দ্য নেইম অব দ্য রোজেস’। কালো গোলাপ—‘দ্য ব্ল্যাক রোজ’ লিখেছেন সি জে ওয়াকার। রহস্য ও খুনখারাবিতেও গোলাপ পিছিয়ে নেই—আগাথা ক্রিস্টির ‘দ্য রোজ অ্যান্ড দ্য নিউ ট্রি’ এবং স্টিফেন কিংয়ের ‘রোজ মার্ডার’ সাক্ষ্য দেবে।

বাংলা উপন্যাসে বুদ্ধদেব বসুর ‘গোলাপ কেন কালো’ ও রশীদ করিমের ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ নাম তো নিতেই হয়, সৈয়দ শামসুল হকের গল্পগ্রন্থ—তিনটি গল্পের একটি বই ‘রক্তগোলাপ’ বিস্মৃত হওয়ার নয়।

বাংলা ১৩৫৪-এর বৈশাখে প্রকাশিত হয়েছিল কমলকুমার মজুমদারের ‘গোলাপ সুন্দরী’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন: গোলাপ সুন্দরীর মূল কাহিনীটি অতিশয় রোমান্টিক। হাসপাতাল থেকে ছুটি পাওয়ার পর বিলাস (এতদিন রাজরোগ যক্ষ্মায় আক্রান্ত) কোনো স্বাস্থ্যকর নিরালা জায়গায় একটি বাগানবাড়িতে একা থাকে। সে বাগানে গোলাপ ফোটায় বিশেষত একটি গোলাপ যার রঙ ঠিক কী রকম লাল হবে তা সে নিজেই জানে না, যে গোলাপের জন্য নির্দিষ্ট একটি নারী আছে, সেই নারী কখনো গোলাপের কাছে এলে তাকে আর ভালোবাসার কথা মুখে উচ্চারণ করতে হবে না। একসময় আসে সেই নারী, তার নাম মনিক চ্যাটার্জি। সত্যিই সে একসময় জলরঙের চিত্র, পরে ভাস্কর্য হয়। কাহিনীর চেয়েও বড় এর কাব্য সৌন্দর্য, কয়েকটি মাত্র চরিত্র, তবু জীবনের কত দিক উদ্ভাসিত করেছেন লেখক, মৃত্যুকে দিয়েছেন মহান সংজ্ঞা।

নামে কী এসে যায়&dquote;&dquote;

গোলাপকে আর কী নামে ডাকা যায়? ডুমুর না চন্দ্রমল্লিকা? গ্ল্যাডিওলাস না ড্যাফোডিল? ধুতুরা না ঝিঙেফুল? যে নামেই ডাকা হোক একই সুঘ্রাণ বিলিয়ে যাবে।

রোমিও ও জুলিয়েটে জুলিয়েটকে দিয়ে এ কথাই বলিয়েছেন শেক্সপিয়ার। ডযধঃং রহ ধ হধসব? ঞযধঃ যিরপয বি পধষষ ধ ত্ড়ংব নু ধহু ড়ঃযবৎ হধসব ড়িত্ষফ ংসবষষ ধং ংবিবঃ. নামে কী এসে যায়? গোলাপকে যে নামেই ডাকো, একই সুগন্ধ ছড়াবে।

শেখ সাদী বলেছেন, গোলাপ এবং কাঁটা আর আনন্দ ও বেদনা একই অন্তর্জালে আটকানো।

ক্যাথরিন বেটস বললেন, ভালোবাসা একটি গোলাপ রোপণ করল আর তাতেই পৃথিবীটা মধুর হয়ে গেল।

আলফোঁস কার লখেছেন, গোলাপে কাঁটা আছে তাই কেউ কেউ খিটিমিটি করে, আমি কৃতজ্ঞ যে কাঁটায় গোলাপ আছে।

বসরার গোলাপের খ্যাতি নিয়ে যে পারস্য, সেখানকার প্রবচন: পৃথিবীটাই গোলাপ, একবার ঘ্রাণ নিয়ে বন্ধুকে দিয়ে দাও।

গোলাপের গন্ধ যেহেতু বাঁধাকপির গন্ধের চেয়ে মিষ্টি, তাই গোলাপ দিয়ে ভালো স্যুপ বানানো যাবে বলে যারা মনে করেন, তারাই হচ্ছেন আদর্শবাদী। এ বুক অব বারলেস্কে এমন একটি কৌতূহলোদ্দীপক কথা বলেছেন এইচএল মেনকেন।

নিটল প্রিন্সেসের সেই গুরুত্বপূর্ণ কথাটি মনে করুন: তুমি গোলাপটা পেতে যে সময় ব্যয় করেছ তা-ই তোমার গোলাপকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

গোলাপ নিয়ে পঙিক্তমালার শেষ নেই। হোমার লিখেছেন ইলিয়াড ও অডেসিতে। লিখেছেন শেখ সাদী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম ও জালাল উদ্দিন রুমি। প্রেমকে লাল গোলাপ বলেছেন রবার্ট বার্নস, অসুস্থ গোলাপ লিখেছেন উইলিয়াম ব্লেক, লিখেছেন রাইনার মারিয়া রিলকে, গ্যোটে। ক্বাসিদা রচনা করেছেন ফেদেরিকো গার্সিয়া সোরকা। লিখেছেন শেলী, রবার্ট হেরিক, ডব্লিউ বি ইয়েটস।

বব ডিলানকে জিজ্ঞেস করা হলো, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা কী? তিনি বললেন, রবার্ট বার্নসের এ রেড, রেড রোজ। ২২টি কবিতা নিয়ে ডব্লিউ বি ইয়েটসের কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য রোজেস’ প্রকাশিত হলো ১৮৯৩ সালে। তখন তিনি মড গনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। সুতরাং এটি হয়ে উঠল গোলাপ ও ভালোবাসার উৎসব। কিছুকাল পর যখন ইয়েটস এই নারীর কাছে প্রত্যাখ্যাত হলেন, গোলাপের লালও বিবর্ণ হতে শুরু করল।

টিএস এলিয়টের কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য রোজ গার্ডেন’, পাবলো নেরুদার ‘দ্য সেপারেট রোজেস’, গোলাপের কবিতা লিখেছেন কিটস, ব্রাউনিং, এমিলি ডিকিনসন, বায়রন। লিখেছেন চসার, রবার্ট হেরিক। প্রকৃতি ও প্রেম নিয়ে লিখেছেন, কিন্তু গোলাপের কথা বলেননি, এমনটি হওয়ার নয়।

 

গোলাপ জন্মের মিথ

গ্রিক-রোমান সংস্কৃতি গোলাপ জন্মের অন্তত এক ডজন মিথের জন্ম দিয়েছে। তারই একটি:

ফুল ও বসন্তের ঈশ্বরী ক্লোরিস এক সকালে চলার পথে এক বনদেবীর নিষ্প্রাণ দেহের সঙ্গে ধাক্কা লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ব্যথিত ক্লোরিস সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে আবার জীবন দেবে, কিন্তু তাকে ফুলে পরিণত করবে। পশ্চিমের বাতাসের প্রভু জেফিরাসকে প্রবলভাবে বইতে বলল, যাতে মেঘ সরে যায় এবং এপোলো মৃতকে রোদের উষ্ণতা দিতে পারে, এর সঙ্গে আফ্রোদিতি যোগ করল সৌন্দর্য, ডায়েনিসাস দিল পাগল করা সুঘ্রাণ—তারপর থ্রি গ্রেসেস—তিন দেবী দিল মাধুর্য, আনন্দ ও বৈভব। সবাই স্বীকার করল, এটাই হবে ফুলের রানী। আফ্রোদিতি এর নাম দিল ‘লাল গোলাপ’ এবং ফুলটা উপহার দিল তার পুত্র ভালোবাসার ঈশ্বর ইরোসকে।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের প্রায় সবাই গোলাপ এেঁকছেন। পিকাশো, সালভাদর দালি, মাতিস, ভ্যান গখ প্রমুখের কয়েকটি ছবি সংযুক্ত হলো।

 

 

গোলাপের পঙিক্তমালা

কাঁটা আঁকড়ে ধরার সাহস যার নেই

গোলাপের প্রত্যাশা তাকে মানায় না

—অ্যান ব্রন্টি

 

প্রতিদিনের ভোর সহস্র গোলাপ নিয়ে আসে

তুমি বলো, গতকালের গোলাপ কোথায় গেল?

—ওমর খৈয়াম

গোলাপের সবচেয়ে দুর্লভ সৌরভ কাঁটাতেই

—জালাল উদ্দিন রুমি

গোলাপ তো কাঁটা ছাড়া প্রস্ফুটিত হয় না

কিন্তু কাঁটা কি গোলাপের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে না?

—রিখটার

কখনো গোলাপ বৃষ্টি হবে না, যদি আমরা

আরো গোলাপ চাই, আরো গোলাপ গাছ লাগাতে হবে।

—জর্জ এলিয়ট

চলো গোলপকুঁড়ি দিয়েই মুকুট বানাই

পাপড়ি ঝরে যাওয়ার আগেই

—ওয়ার্ডওয়ার্থ

 

আমাকে বলো গোলাপ কি নগ্ন

—পাবলো নেরুদা

আমাকে বলো গোলাপ কি নগ্ন

নাকি এটাই তার একমাত্র পোশাক?

গাছ কেন লুকিয়ে রাখে

তাদের মূলের বৈভব?

লুকিয়ে চলা অটোমোবাইলের

অনুতাপ কে শোনে?

বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের চেয়ে

দুঃখভারাক্রান্ত আর কিছু কি পৃথিবীতে আছে?

                

গোলাপ ও শরাবের পেয়ালা

—হাফিজ

এসো ছড়িয়ে দিই গোলাপের পাপড়ি

পেয়ালা শরাবে পূর্ণ করি;

চলো মহাবিশ্বের ছাদ ছিন্নভিন্ন করে ফেলি

সৃষ্টি করি নতুন এক মহাবিশ্ব।

প্রেমিকের রক্ত ঝরাতে হবে

এই যদি হয় যন্ত্রণার বাহিনীর ইচ্ছে

তাহলে আমি ও সাকী এক সাথে চড়ে

উপড়ে ফেলব বাহিনীর ভিত্তিমূল!

লাল শরাবের পেয়ালায় ছড়াব গোলাপজল

ধূপাধারে দেব সুঘ্রাণ বাতাসের মাধুর্য।

 

গোলাপ বাগানে

—জালালউদ্দিন রুমি

সুন্দর এক বাগানে

আমার ভালোবাসা আমার সাথে হাঁটে

অজ্ঞাতসারে আমি

একটি গোলাপকুঁড়ির দিকে তাকাই

আমার ভালোবাসা আমাকে শোনায়

এ কী লজ্জা

তুমি গোলাপের দিকে তাকাচ্ছ

যেখানে আমার গাল রক্তিম হয়ে গেছে

 

নারী গোলাপ নয়

—আনা কাস্তিলো

নারীর কোনো শুরু নেই

শুধু অব্যাহত প্রবাহ

যদিও নদী প্রবাহিত হয়

নারী কোনো নদী নয়।

নারী গোলাপ নয়

সমুদ্র কিংবা নক্ষত্র নয়

আমি তাকে যে কথা বলতে চাই

আমি জানি সে তা আগেই জানে।