[পাবলো নেরুদা (জন্ম ১২ জুলাই ১৯০৪—মৃত্যু ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩) বিশ শতকের সবচেয়ে বেশি পঠিত কবি। ১৯৭১-এ নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী নেরুদার হাতে সৃষ্টি হয়েছে এ কালের শ্রেষ্ঠ কিছু প্রেমের কবিতা। ভালোবাসা দিবস সামনে রেখে তাঁর কিছু প্রেমের পঙিক্তমালা অনূদিত হলো]

আজ রাতে আমি সবচেয়ে করুণ পঙিক্তগুলো লিখতে পারি

আমি তাকে ভালোবাসতাম

কখনো কখনো সেও আমাকে ভালোবেসেছে

কীভাবে কখন এবং কোথা থেকে— এসব না জেনেই

            আমি তোমাকে ভালোবেসেছি

কোনো সংকট কিংবা অহমিকা ছাড়াই

            তোমাকে কেবলই ভালোবেসেছি

আমি এভাবেই ভালোবাসি, কারণ ভালোবাসার অন্য কোনো

            পদ্ধতি আমার জানা নেই।

প্রেম বড় সংক্ষিপ্ত

ভুলে যাওয়া এত দীর্ঘ...

বসন্তকাল চেরি বৃক্ষকে নিয়ে যা করে

আমিও তোমাকে নিয়ে তা-ই করতে চাই।

তুমি সকল ফুল ছেঁটে ফেলতে পারো

কিন্তু বসন্তের আগমনকে তুমি

ঠেকাতে পারো না।

রংধনু কোথায় গিয়ে শেষ হয়

তোমার হূদয়ে না দিগন্তে?

তাই আমি নিঃসঙ্গ বাড়ির মতো তোমার অপেক্ষায় থাকি

যতক্ষণ না তুমি ফিরে এসে আমার ভেতর

            বসবাস শুরু করো

আমার জানালা যন্ত্রণায় ভুগতে থাকে।

আমি তোমার পায়ের পাতা দুটো ভালোবাসি

কারণ তা মাটির ওপর দিয়ে হেঁটেছে

বাতাস আর পানির ওপর দিয়ে হেঁটেছে

যতক্ষণ না আমাকে খুঁজে পায়।

যদি তুমি একটু একটু করে আমাকে ভালোবাসা

বন্ধ করে দিতে চাও

আমিও ভালোবাসা একটু একটু করে বন্ধ করে দেব।

যদি হঠাৎ তুমি

আমাকে ভুলে যাও

আমাকে খোঁজো না, কারণ

আমি তোমাকে একেবারে ভুলেই গেছি।

তুমি আমার কাছ থেকে রুটি নিয়ে যাও

যদি চাও, বাতাস নিয়ে যাও, কিন্তু

আমার কাছ থেকে তোমার হাসি নিয়ে যেয়ো না।

দূরে কোথাও যেয়ো না, এমনকি একদিনের জন্যও না,

কেমন করে বলব আমি জানি না— একটি দিন কিন্তু দীর্ঘ সময়

আমি তোমার জন্য প্রতীক্ষায় থাকব

খালি কোনো স্টেশনে যখন ট্রেনগুলোকে

পার্ক করা হয় অন্য কোনোখানে, ঘুমোয়।

রাতের বেলা স্বপ্ন দেখি তুমি আর আমি দুটি বৃক্ষ

একসাথে বেড়ে উঠি, পরস্পরের সাথে মূল জড়িয়ে আছে

আর তুমি তো জানো ও বৃষ্টি

            আমার মুখ ভালোবাসে

কারণ আমরা তো মাটি ও বৃষ্টিতেই তৈরি।

যখন তুমি আবির্ভূত হও

সমস্ত নদী ধ্বনি তোলে

আমার শরীরের ঘণ্টাধ্বনি

আকাশ কাঁপিয়ে দেয়

পৃথিবী ভরে যায় স্তোত্রপাঠে।

কেবল তুমি আর আমি

কেবল তুমি আর আমি, ভালোবাসা আমার

আমরা তা শুনতে পাই।

যদি কোনো কিছু আমাদের মৃত্যু থেকে রক্ষা

            করতে না পারে

অন্তত ভালোবাসা তো জীবন থেকে রক্ষা

            করতে পারবে।

রাতের বেলায় ভালোবাসা তোমার আমার হূদয় বেঁধে দেয়

আর ঘুমের মধ্যে দুটো হূদয় অন্ধকার

পরাস্ত করে।

আমি তোমার ভালোবাসা ভুলে গেছি

তবুও সকল জানালায় আমি তোমার

ঝলক দেখতে পাই।

যখন তৃষ্ণা ও ক্ষুধা ছিল

তুমি ছিলে ফল

যখন দুঃখ ও ধ্বংসাবশেষ

তুমি হলে দৈব।

আমি তোমাকে ভালোবাসি

আর দিগন্ত মিছেই তোমাকে

লুকিয়ে রাখে।

আমি তাকে আর ভালোবাসি না এটা নিশ্চিত

কিন্তু আমি কেমন করে তাকে ভালোবাসতাম

তার শ্রবণে পৌঁছতে আমার স্বর বাতাস

খুঁজে বেড়াচ্ছে।

 

কেউ তোমার হাতে নদী থামাতে পারবে না

তোমার চোখ এবং ঘুমকাতুরে ভাব আমার প্রিয়তম,

তুমি যে সময়ের কম্পন, যা উলম্ব আলো

আর অন্ধকার আকাশের মাঝ দিয়ে যায়।

আমাকে বলো গোলাপ কি নগ্ন

নাকি এটাই তার একমাত্র পোশাক?

বৃক্ষ কেন লুকিয়ে রাখে

তাদের মূলের বৈভব?

একটি মাত্র চুম্বনে

তুমি সবকিছু জেনে যাবে

যা এখনো বলিনি।

আমাদের ভালোবাসা জন্মেছে

দেয়ালের বাইরে

বাতাসে

নিশীথে

মৃত্তিকায়

যে জন্যই কাদা ও ফুল

ধূলি ও মূল

তোমার নাম জানে।

ছায়া ও আত্মার মাঝখানে আমি তোমাকে ভালোবাসি

এখনো প্রস্ফুটিত হয়নি এমন বৃক্ষের মতো যে নিজের ভেতর

পুষ্পের আলো লুকিয়ে রাখে— আমি সে বৃক্ষের মতো ভালোবাসি।

প্রিয়তমা, এখন ফাটলধরা সাগরের ভেতর দিয়ে

আমরা অন্ধ পাখির মতো ফিরে যাই।

ভালোবাসার চিন্তা কি বিলুপ্ত

আগ্নেয়গিরিতে পড়ে যায়?

আমার নতুন করে জন্ম হয়েছে

আমি আমার নিজস্ব অন্ধকারের মালিক

অশ্রু ঝরে

ছোট্ট লেকে কী অপেক্ষা করে?

নাকি ওগুলো অদৃশ্য নদী

যা বয়ে যায় দুঃখের দিক।

আমি তোমাকে মুকুট পরিয়ে দিই

আমার হাড়ের ছোট্ট রাজত্ব।

আমাকে সারা পৃথিবীর

দুঃখগুলো দাও

আমি দুঃখগুলোকে

আশায় বদলে দেব।

সবকিছু আমাকে বহন করে তোমার কাছে নিয়ে যায়

যা কিছু অস্তিত্বমান সবই, সুঘ্রাণ, আলো, ধাতব টুকরা

সবই যেন ছোট নৌকো, পাল তুলেছে তোমার

দ্বীপপুঞ্জের দিকে— যেন সব দ্বীপ আমার প্রতীক্ষায় আছে।

আমি তোমাকে ভালোবাসা থেকে

                     ভালো না বাসার দিকে যাই

প্রতীক্ষা থেকে প্রতীক্ষা না করার মতো।

এখন আমি এক থেকে বারো পর্যন্ত গুনব

আর তুমি চুপচাপ থেকো

                   আমি চলে যাব।

বালুকায় তোমার ছায়ামূর্তি যেন ভেঙে না যায়

অনুপস্থিতিতে তোমার চোখের পাতা যেন সরে না যায়

তুমি এক মিনিটের জন্যও যেয়ো না প্রিয়তমা।

কারণ যে মুহূর্তে তুমি অনেক দূর চলে যাবে

সারা পৃথিবীর প্রশ্নের জবাব আমাকে দিতে হবে

তুমি কি ফিরে আসবে

নাকি মৃত্যুর জন্য আমাকে ফেলে যাবে।

রাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভালোবেসে যাও।

 

অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী