সে যুগের ভারতবর্ষে স্টুডিও ফটোগ্রাফি ছিল পুরুষদের রাজত্ব। ফটোগ্রাফির প্রযুক্তি এসেছিল পাশ্চাত্য থেকে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তিনির্ভর যে আধুনিকায়ন, তার যাত্রা এ আধুনিক যুগের শুরুতে সৃষ্টি হয়েছিল পাশ্চাত্যেই। ইংরেজ শাসনের হাত ধরে তার ছোঁয়া লাগতে শুরু করে ভারতবর্ষে। নারীরা এ অঞ্চলে প্রায় সবসময়ই পুরুষের অধীন ও অন্তঃপুরের বাসিন্দা হয়ে থেকেছে। আরো অনেক কাজের মতো  নারীরা ফটোগ্রাফিতেও এসেছেন অনেক বাধা ডিঙিয়ে। বাঙালি নারীরাও পিছিয়ে থাকেননি। তারাও এগিয়ে এসেছিলেন ফটোগ্রাফি করতে।

মোগল আমলে অভিজাতদের মধ্যে প্রতিকৃতি আঁকার চল ছিল। এর পর ইংরেজ শাসনামলে মহারাজারা বিলেতি শিল্পীদের দিয়ে নিজেদের পোর্ট্রেট আঁকাতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এরই ধারাবাহিকতায় এসে যায় আলোকচিত্র। রাজা আর অভিজাতরা নিজেদের প্রাসাদ কিংবা সমরাস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে ভালোবাসতেন। সে সময় এ পোর্ট্রেট আলোকচিত্র ছিল অভিজাতদের আভিজাত্যের প্রতীক। অনেক মহারাজা তো আলোকচিত্র নিয়ে এত উত্সাহী ছিলেন যে, তারা অনেকে ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার নিয়োগ করেছিলেন। ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা   মালহার রাও ভাড়া করেছিলেন বারোদার হরিচাঁদ চিন্তামনকে, বুন্দির রঘুবীর সিং ভাড়া করেন গণপাত্র &dquote;লালাকালেকে এবং ইন্দোরের হোলকার লালা দীন দয়ালকে নগদ অর্থ দিয়ে ছবি তোলাতেন। হায়দরাবাদের নিজাম ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে এই লালা দীন দয়ালকে ভাড়া করেছিলেন। নিজাম তাকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। এই দীন দয়াল জেনানা বা নারী ফটোগ্রাফির প্রচলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সে গল্পে যাওয়ার আগে একটু ভিন্ন দিক থেকে শুরু করা যাক।

বাংলায় বাণিজ্যিক ফটোগ্রাফির শুরুটা ১৮৪০-এর দশকে। রেলওয়ে ও ইংরেজি স্কুলের মতো ফটোগ্রাফিও বাঙালি সমাজের অংশ হয়ে উঠেছিল। পারিবারিক ইতিহাস সংরক্ষণ, সরকারি রেকর্ড তৈরিতে ধীরে ধীরে আলোকচিত্র অপরিহার্য হয়ে উঠছিল। একসময় বাঙালি নারীরাও হয়ে উঠলেন ফটোগ্রাফার।

আলোকচিত্রী হওয়ার আগে শুরু হয়েছিল নারীদের ছবি তোলার চল। পর্দাঘেরা পালকিতে চড়ে ধনী-সম্ভ্রান্ত বংশের নারীরা স্টুডিওতে ছবি তুলতে যেতেন। সেই আবদ্ধ স্টুডিওর আলোকচিত্রীও নারী। অর্থাত্ নারী গ্রাহকদের চাহিদাই নারী আলোকচিত্রী তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল। একটু আগে যার কথা হচ্ছিল, অর্থাত্ লালা দীন দয়ালকে নিয়ে, তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম স্থানীয় মানুষ, যিনি জেনানা স্টুডিও চালু করেছিলেন। ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে হায়দরাবাদের তিনি এ স্টুডিও চালু করেছিলেন। এ স্টুডিওতে কঠোরভাবে পর্দা নিশ্চিত করা হয়েছিল। স্থানীয় নারীদের সহায়তায় একজন ইংরেজ নারী ফটোগ্রাফার পর্দানশীন নারীদের ছবি তুলে দিতেন। এ ইংরেজি নারী ফটোগ্রাফার ছিলেন মিসেস কেনি লেভিক।

&dquote;অন্নপূর্ণাতবে এই কেনি লেভিক ভারতবর্ষে কাজ করা প্রথম নারী ফটোগ্রাফার নন। ভারতে প্রথম পেশাদার নারী ফটোগ্রাফার হচ্ছেন মিসেস ই. মায়ার। তিনি ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিট কর্নারে নারীদের জন্য স্টুডিও খুলেছিলেন। এটাই সম্ভবত ভারতবর্ষে প্রথম জেনানা স্টুডিও। তবে এই স্টুডিও তখন নারীদের খুব একটা আকর্ষণ করেনি। এটা ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। অর্থাত্ তখনো নারীদের ছবি তোলার ব্যাপারটি ভারতবর্ষে সেভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। জেনানা স্টুডিও সফলতা না পেলেও মিসেস ই. মায়ার নারী ফটোগ্রাফার হিসেবে সফল ছিলেন। ১৮৬৪ সালে জার্নাল অব বেঙ্গল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির ডিসেম্বর সংখ্যায় তার কৃতিত্বের গল্প পাওয়া যায়। সে বছর সোসাইটির বার্ষিক প্রদর্শনীতে তার একটি ছবি স্থান পেয়েছিল। স্টুডিও চালুর পরের বছর অর্থাত্ ১৮৬৪ সালে মিসেস ই. মায়ারের স্টুডিওটি ৫ ওয়াটারলু স্ট্রিটে স্থানান্তর হয়। তবে মিসেস ই. মায়ারের আগেও কয়েকজন নারী ফটোগ্রাফারের নাম খাতায় পাওয়া যায়। ১৮৫৭ সালে বেঙ্গল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে জানানো হয়েছিল যে, সোসাইটিতে নারী প্রাথমিক সদস্যের সংখ্যা চার। এদের মধ্যে তিনজন ছিলেন মিসেস মৌয়ট, মিসেস টি টমসন ও মিসেস সি বি ইয়ং। তবে এদের ছবি তোলা সম্পর্কে তেমন কিছু উদ্ধার করতে পারেননি ছবি তোলা: বাঙালির ফোটোগ্রাফি-চর্চা গ্রন্থের রচয়িতা সিদ্ধার্থ ঘোষ। লেখক জানাচ্ছেন, মিসেস মায়ারের পর যে নারী ফটোগ্রাফিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন তিনি মিসেস ডি গ্যারিক। ১৮৭৭ সালে তিনি ওয়াটারলু স্ট্রিটে জেনানা স্টুডিও খোলেন। তবে এ স্টুডিওটি এক বছরের মাথায় বন্ধ হয়ে যায়। এর পর জেনানা স্টুডিও নিয়ে মঞ্চে আসেন লালা দীন দয়াল। ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে হায়দরাবাদের তিনি জেনানা স্টুডিও চালু করেছিলেন। তখন পুরুষ ফটোগ্রাফাররা এ স্টুডিও নিয়ে দারুণ কৌতূহল দেখিয়েছিলেন।

উপরে আলোচিত বাঙালি নারীদের আলোকচিত্রের আলোকচিত্রী ছিলেন কোনো না কোনো ইংরেজ নারী। কিন্তু বাঙালি নারীরা কীভাবে, কবে ফটোগ্রাফার হয়ে ওঠেন?

এ ইতিহাসের শুরু হয়েছিল দীন দয়ালের জেনানা স্টুডিও চালু করার কয়েক বছর আগেই। মিসেস উইন্স বাঙালি নারীদের ছবি তোলাই শুধু নয়, বরং তাদের ফটোগ্রাফি শেখানোর উদ্যোগ নিলেন। সিদ্ধার্থ ঘোষের গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, এটাই ছিল বাঙালি নারীদের ফটোগ্রাফি শেখানোর প্রথম উদ্যোগ। তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে নারীদের ফটোগ্রাফি শেখানোর উদ্যোগ নেন। ব্রাহ্মসমাজ মিসেস উইন্সকে সহযোগিতা করেছে এ কাজে।

&dquote;দেবলীনা১৮৮৫ সালে বামাবোধিনী পত্রিকায় সম্পাদকীয় বিভাগে মিসেস উইন্সের উদ্যোগ প্রসঙ্গে লেখা হয়েছিল—

‘বিজ্ঞাপন স্তম্ভে ফটোগ্রাফি অর্থাত্ ছবি তোলার শিক্ষা দেওয়ার একটি বিজ্ঞাপন দৃষ্ট হইবে। বিবী উইন্স অনেক ব্যয় ও পরিশ্রম স্বীকার করিয়া অতি সুন্দর নূতনপ্রণালীতে এই বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছেন, তিনি অন্তঃপুরে গিয়া অথবা কলিকাতা বা মফঃস্বলের স্থানবিশেষে শ্রেণী খুলিয়া ইহা মহিলা ও ভদ্রলোকদিগকে শিক্ষা দিতে ইচ্ছুক। শিক্ষার্থে ব্যয় সম্বন্ধে বন্দোবস্ত তাঁহার সহিত কথা হইলে ঠিক হইতে পারিবে। ইংলন্ড প্রভৃতি সভ্যদেশে এ বিদ্যার অত্যন্ত কদর, উপায় না থাকাতে স্ত্রীলোকেরা ইহাতে বঞ্চিত। যে সকল  মহিলার সময়, অর্থ ও শিখিবার ইচ্ছা আছে, আমরা আশা করি, তাঁহারা এ সুযোগ ছাড়িবেন না।’

১৮৮৬ সালের আরেকটি বিজ্ঞাপন প্রচার হয়েছিল। বিজ্ঞাপনের কথাগুলো ছিল মোটামুটি এ রকম—

‘পেশাদার ফটোগ্রাফার মিসেস উইন্স বাসায় গিয়ে

ভদ্র মহিলা এবং ভদ্র মহোদয়দের ফটোগ্রাফি শিক্ষা দিতে প্রস্তুত।

কিংবা শহর বা মফস্বলে গিয়ে ক্লাস নিতে পারবেন।

মহিলাদের ছবি তোলা হয় তাদের বাসায় গিয়ে।

৪, ডালহৌসি স্কয়ার।’

তবে এখনো মিসেস উইন্সের এ ফটোগ্রাফি শিক্ষাদানের সাফল্য নিয়ে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। এর পর বাঙালি নারীদের ফটোগ্রাফি শিক্ষাদানের দায়িত্ব নেয় ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত ‘নারী শিল্প শিক্ষালয়’। ১৯১৬ সালে ৮৩ মানিকতলা স্ট্রিটে বাহ্ম ছাত্রীনিবাসে এ শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

১৮৮৯ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার জার্নাল থেকে বেশ ক’জন নারী ফটোগ্রাফারের নাম পাওয়া যায়। এ তালিকায় শুধু একজন ভারতীয় নারীর নাম আছে। ১৯০৭ সালের জর্নালে ছিল কুমারী সি সোরাবজীর নাম।

&dquote;ত্রিপুরারপ্রথম ভারতীয় নারী ফটোগ্রাফার হিসেবে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের তৃতীয় স্ত্রী মহারানী মনমোহিনী। মনমোহিনী ছবি তুলেছেন, সেগুলো ডেভেলপও করতেন। ত্রিপুরা থেকে ১৮৯০ সালে ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার দপ্তরে প্রেরিত আলোকচিত্রগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল মহারানী মনমোহিনীর তোলা ও প্রিন্ট করা।

ঊনবিংশ শতকে ঠাকুরবাড়ির একজন নারীকেই ফটোগ্রাফি করতে দেখা গেছে। তিনি জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। ইন্দিরা দেবীর একটি চিঠি থেকে তার মা জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর ফটোগ্রাফির হদিস পাওয়া যায়। এ চিঠিটি আবার লেখা হয়েছিল আরেক নারী ফটোগ্রাফার দেবলীনা দেবীর উদ্দেশে। ইন্দিরা দেবী ও প্রমথ চৌধুরীর একটি ছবি তুলেছিলেন দেবলীনা। ছবি পেয়ে খুশি হয়ে ইন্দিরা দেবী দেবলীনাকে চিঠি লিখেছিলেন। এ চিঠিতে তিনি তার মায়ের ফটোগ্রাফিচর্চার কথা উল্লেখ করেছিলেন। এ চিঠি না পাওয়া গেলে জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর এ অবদান হয়তো ইতিহাসের পাতায় উঠে আসত না। ১৯৪৬ সালের সেই চিঠির কিছু অংশ নিম্নরূপ:

কল্যাণীয়াষু,

এইমাত্র তোমার চিঠি ও প্রেরিত ছবি পেয়ে পত্রপাঠ প্রাপ্তি স্বীকার করছি।... এই বুড়োবুড়ির ছবি কষ্ট করে তুলেছ সে জন্য তোমার ধন্যবাদ প্রাপ্য।... আমার মা প্রায় শতাধিক বত্সর আগে বোর্ন শেপার্ডের কাছে ছবি তুলতে শিখে বাড়ির এমন সব লোকের ছবি তুলেছিলেন যাদের অন্য কোন ছবি নেই বা হবারও সম্ভাবনা ছিল না।

এখন সব শিল্প ও প্রায় সব কর্মের দ্বারই মেয়েদের পক্ষে অবারিত। নতুন যুগের নতুন পথে তোমাদের জয় হোক এই আশীর্বাদ।

শ্রী ইন্দিরা দেবী।

এ চিঠি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধার্থ ঘোষ সিদ্ধান্ত টেনেছেন, ‘ইন্দিরা দেবীর চিঠি পড়ে মনে হয় জ্ঞানদাননন্দিনী নিশ্চয় ঠাকুরবাড়ির প্রাচীনাদের ফটোগ্রাফ তুলেছিলেন। সারদা দেবী ও প্রফুল্লময়ী দেবীর ছবি দু’টি তাঁর তোলা হতে পারে। বিষয়টি আরও অনুসন্ধান সাপেক্ষ।’

ঊনবিংশ শতকে বাঙালি নারীদের মধ্যে প্রথম পেশাদার ফটোগ্রাফি শুরু করেছিলেন সরোজিনী ঘোষ। তিনি এমনকি স্টুডিও খুলেছিলেন। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি অমৃতবাজার পত্রিকায় সরোজিনী ঘোষকে নিয়ে ‘লেডি ফটোগ্রাফার’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে লেখা হয়, ‘‘৩২ কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের মহিলা আর্ট স্টুডিওর সুদক্ষা হিন্দু মহিলা শিল্পীর কাজ দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। আমাদের জন্য তিনি কিছু কাজ করেছেন যার ‘ফিনিশ’ লক্ষ্য করলে ফোটোগ্রাফার রূপে তাঁর যোগ্যতা ও দক্ষতা সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না। এই মহিলার জীবনের কাহিনী শুনলে সমবেদনায় মন ভরে যায়। এবং তাঁর কাজের নৈপুণ্য যেন তা আরো বাড়িয়েই তোলে। স্বদেশবাসীর কাছ থেকে শ্রীমতী সরোজিনীর উত্সাহ ও সমর্থন লাভ করা উচিত, বিশেষ ক’রে জেনানা মহলে প্রবেশাধিকার থাকায় হিন্দু পরিবারের মহিলাদের তিনি যখন ফোটোগ্রাফ গ্রহণ করতে পারেন। খুব ন্যায্য দামে তিনি চিরস্থায়ী ব্রোমাইড এনলার্জমেন্ট ও প্ল্যাটিনোটাইপের কাজ করেন।’’

শ্রীমতী সরোজিনীর পর নারীদের মধ্যে পেশাদার ফটোগ্রাফার হিসেবে নাম আসে অন্নপূর্ণা দেবীর। তাঁর কর্মকাল বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক। তিনিই প্রথম বাঙালি নারী, যিনি ফটোগ্রাফিকে জীবিকা অর্জনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে। তার পিতা অম্বিকাচরণ মিত্র ছিলেন দর্শনের অধ্যাপক। ১২ বছর বয়সে অন্নপূর্ণার বিয়ে হয়েছিল আইনজীবী উপেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে। শুরুতে শখ করেই ফটোগ্রাফি শিখেছিলেন। পেশাদার ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছিলেন ১৯৩০ থেকে ১৯৪০-এর দশকে। তিনি কোনো স্টুডিও খোলেননি, নিজের বাসায়ই কাজ করতেন। তবে ছবি তুলতে বাইরে যেতেন। ছবি ডেভেলপ, প্রিন্টিং, ফিনিশিং— সব এক হাতেই করতেন। মুসলিম সমাজে অন্নপূর্ণা দেবী বেশ সম্মান পেয়েছিলেন। কবি জসীমউদ্দীন, গায়ক আব্বাস উদ্দীন আহমেদ ছিলেন অন্নপূর্ণার গুণগ্রাহী। সংসারের খরচ জোগাতে অন্নপূর্ণা ফটোগ্রাফি করেছেন। এক কথায় তিনি ছিলেন পুরদস্তুর একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার। নিজের ছেলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি অবসর নিয়েছিলেন। উপমহাদেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, কবি সরোজিনী নাইডুর একটি ছবি তুলেছিলেন অন্নপূর্ণা দেবী। আলোকচিত্রটির এক কোণে আছে ফটোগ্রাফারের স্বাক্ষর। তিনি ফটোগ্রাফি ছাড়ার পর ‘আজাদ হিন্দ বাগ মহিলা সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৬ সালে ৮২ বছর বয়সে তিনি দেহত্যাগ করেন।

একসময় কলকাতায় পেশাদার নারী ফটোগ্রাফার হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন বিলেতি এডনা লরেঞ্জ। গত শতকের শুরুর দিকে তিনি বেশ অনেকটা সময় ফটোগ্রাফি পেশায় যুক্ত ছিলেন। তার স্টুডিও ছিল ৫৪ নং ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে। পরবর্তীতে তা ৪০ নম্বর পার্ক স্ট্রিটে স্থানান্তর হয়। ১৯৩২ সালের দলিল থেকে দেখা যায়, এডনা লরেঞ্জের একমাত্র নারী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন একজন বাঙালি নারী। তিনি ৫ নম্বর বিবি রোজীয় লেনের চঞ্চলাবালা দাসী। তার স্টুডিওটি ছিল নিষিদ্ধপল্লীর কাছে। তাই এখানে সমাজের অভিজাত বা সাধারণ ঘরের নারীরা যে খুব একটা ছবি তুলতে আসতেন, সেটা মনে হয় না। চঞ্চলাবালার গ্রাহকরা ছিলেন মূলত নিষিদ্ধপল্লীর নারীরা। জীবিকার প্রয়োজনেই নিষিদ্ধপল্লীর নারীরা ছবি তুলতেন। উল্লেখ্য, সেকালে রঙ্গমঞ্চের অভিনেত্রীরাও ছবি তুলতেন। তবে সিদ্ধার্থ ঘোষ শেষমেশ এক স্থানীয় বাসিন্দার কাছে শুনেছেন যে, চঞ্চলাবালা দেবী নাকি বাঙালি ছিলেন না, ছিলেন ওড়িশার মেয়ে। তিনি ওড়িশাতেই ফিরে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই মারা যান।

বিখ্যাত ডাক্তার ও রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্রর দুই কন্যা মীরা চৌধুরী ও ইন্দিরা দেবী ফটোগ্রাফার হিসেবে নাম করেছিলেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ ফটোগ্রাফি জানতেন এবং নিজের দুই মেয়েকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। দুই মেয়েকে কৈশোর পেরনোর আগেই ক্যামেরা কিনে দিয়েছিলেন। ১২ বা ১৩ বছর বয়সেই মীরা দেবী ব্রাউনি নম্বরে টু বক্স ক্যামেরায় ছবি তুলতে শুরু করেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ নিজে ছবি ডেভেলপ ও প্রিন্ট করতেন। মীরা দেবী এ কাজে তাকে সহায়তা করতেন। দার্জিলিংয়ে স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুদের ছবি তুলেছেন। ১৯২৩ সালে বিয়ের পর বিলেত চলে যান। স্বামী প্রভাত চৌধুরী কিনে দেন কনটেসা নেটল ক্যামেরা। তাই দিয়ে চলে ছবি তোলা। মীরা দেবী রবীন্দ্রনাথেরও ছবি তুলেছিলেন। সেই ছবির কোণে কবির স্বাক্ষরও রয়েছে। মীরা দেবীর আরেকটি বিরাট অর্জন— তার তোলা রবীন্দ্রনাথের মুভি ফিল্ম। এর একটি অংশ সত্যজিত্ রায় তার তথ্যচিত্র ‘রবীন্দ্রনাথ’-এ ব্যবহার করেছেন। আর ইন্দিরা দেবী মূলত টেবিল টপ ফটোগ্রাফি করেছেন।

আরেকজন অন্নপূর্ণা গোস্বামী, তার কাজ বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। তার ক্যামেরায় সমাজের দারিদ্র্যপীড়িত ও নিচুতলার মানুষের জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে। রেললাইনের পাশে, বাস্তুহারা মানুষেরা ছিলেন তার আলোকচিত্রের বিষয়বস্তু। উদ্বাস্তু শিশু, পরিবার, দুর্ভিক্ষের সময় স্তূপ হয়ে থাকা চালের বস্তার ছবি তুলেছেন তিনি। এক কথায় বাঙালি নারী ফটোগ্রাফারদের কাজে তিনি নতুন যুগের সূচনা করেন। যদিও তিনি সেভাবে কোনো পেশাদার ফটোগ্রাফার ছিলেন না। তার জন্ম ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে। তার পিতা নিতীশচন্দ্র লাহিড়ী ছিলেন যশস্বী আইনজীবী ও কলম্বিয়া পিকচার্সের জেনারেল ম্যানেজার। ক্যামেরা চালানোর বাইরে কথাশিল্পী হিসেবেও তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। পেয়েছিলেন ‘সাহিত্য কুশলা, ‘সাহিত্য সরস্বতী’ প্রভৃতি সম্মানজনক উপাধি। মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

১৯৩৭ থেকে ১৯৪০ সময়কালে দেখা যায়, দুই ফটোগ্রাফার বোনের আবির্ভাব— মনোবীণা ও দেবলীনা সেন রায়। তাঁদের ছবি প্রকাশ হতো ইলাসট্রেটেড উইকলিতে। ১৯৫১ সালে প্রকাশিত ‘টুয়েন্টি ফাইভ পোর্ট্রেটস অব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’-এর অন্তর্ভুক্ত একমাত্র নারী ফটোগ্রাফার হচ্ছেন মনোবীণা দেবী। শৈশবে পিতার হাতেই দুই বোনের ফটোগ্রাফিতে হাতেখড়ি।

সচিত্র ভারত পত্রিকার ১৯৩৭ ও ১৯৩৮ সালের সংখ্যাগুলোয় আরো কয়েকজন নারী ফটোগ্রাফারের নাম পাওয়া যায়— ইলা মিত্র, কাননবালা চট্টোপাধ্যায়, বীথি রায়, বেবী চৌধুরী প্রমুখ।

সূত্র: সিদ্ধার্থ ঘোষের ছবি তোলা: বাঙালির ফোটোগ্রাফি-চর্চা, জুলি এফ. প্রফেসর, অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি