জামরুল ভাই আর আমি রোজ একসঙ্গে রিকশায় করে মতিঝিল যাই। আমি একটা বেসরকারি অফিসে ছোটখাটো চাকরি করি। জামরুল ভাইয়ের বারো রকমের ধান্ধা।
গোপীবাগের মেস থেকে আমার অফিসটা এত দূরে যে, হেঁটে গেলে ঘেমে নেয়ে যেতে হয়। আবার রিকশায় একা গেলেও পোষায় না। এজন্য রিকশাভাড়া রোজ জামরুল ভাইয়ের সঙ্গে শেয়ার করি।
জামরুল ভাই বয়সে আমার চেয়ে তিন-চার বছরের বড়। বুদ্ধিতে ঝুনা। এজন্য তার ব্যাপারে সতর্ক থাকি। এর পরও কীভাবে যেন আমার গাঁট চিপে কিছু টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রথমে বলেছে— এটা ধার। পরে বলে, ‘তোকে আমার স্লিপিং পার্টনার করেছি!’
আমি আঁতকে উঠে বললাম, ‘কি যা তা বলছ! আমি তোমার ইয়ে হতে যাব কোন দুঃখে!’
জামরুল ভাই বলল, ‘আরে, না না! ইংরেজিতে তুই এত উইক! তোকে চাকরি দিয়েছে কে? স্লিপিং পার্টনার হচ্ছে ব্যবসার নিষ্ক্রিয় অংশীদার। তুই টাকা দিয়েছিস ঠিকই, খাটাখাটনি সব আমার। মাঝখান থেকে লাভের ভাগ পাবি!’
‘কিন্তু সেটা কবে? লাভের দরকার নেই, আসলটাই দাও না।’
জামরুল ভাই হে-হে করে হেসে আমাকে তেহারির দোকানে নিয়ে ভরপেট খাওয়ায়। বলে, ‘লগ্নি যখন করেছিস, আখেরে ফল দেবে।’
জামরুল ভাইয়ের কথায় রস টস্টস্। আশায় বুক বাঁধি। ঢাকায় একলা আছি। এর মধ্যে জামরুল ভাই একটা ভরসা। রিকশাচালক মাঝে মধ্যে ভাড়া নিয়ে ঝামেলা করলে তার কাতলা-ধড় কাজে লাগে। ঈদের সময় কনুই চালিয়ে সেই বাসের টিকিট এনে দেয়।
আসলে আমরা অনেক কিছুই শেয়ার করি। চেইন ফুডশপের পিত্জা খেতে ইচ্ছা হলো, ভাগাভাগি করে সুন্দর খেয়ে নিই। পকেট টানটান, চটপটি, ফুচকা বা লাচ্ছি খেতে ইচ্ছা করছে, তখন আধাআধিতে পুষিয়ে যায়। ব্র্যান্ডের পোশাকের দোকানে বিশেষ ছাড়ের সময় শেয়ারে আমরা অন্তর্বাসও কিনি। এক প্যাকেটে তিনটা আন্ডারওয়্যার থাকে। দুজন দুটো নেয়ার পর বাকিটা নিয়ে টস করি।
এ আধাআধির মাঝে জামরুল ভাই একদিন পুরোটাই হাওয়া। মোবাইল ফোন অফ! ভাবি, কাহিনী কী?
দুদিন একলা রিকশায় যাতায়াত করে দেখি— গায়ে লাগছে। জামরুল ভাইকে মেসেজ পাঠাই। জবাব নেই। মনের মেঘ ভারি হয়। আগে দুজন যেতে যেতে রাজনীতি নিয়ে কি সুন্দর কথার খই ফোটাতাম। অমুক-তমুকের মুণ্ডু ছিঁড়তাম। এখন মুখ সুড়সুড় করে, শেয়ার করার সঙ্গী নেই। মাঝে মধ্যে জিভের লাগাম লুজ হয়ে যায়। রিকশাচালককে বলি, ‘দেখছ তো, সরকারি অফিসের লোকজনের কি মজা! দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি, বাকি পাঁচদিন ঝিমাইয়া ঝিমাইয়া কত টাকা নিতেছে! তোমার আর আমার খালি বাঁশ! বাজারে গেলে দুই মিনিটে পকেট খালি।’
রিকশাচালক সমঝদারের ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকায়, ‘হেগোর তো আসলে ছিল্লা দেওন যায়। আফনেগো লাইগা পারি না। অহনে ২০ টেকা ভাড়া বাড়াইলে তো এই আফনেই আমার চোপা ভাঙতে আইবেন!’
আমি মুখের লাগাম টানি।
আমার চাকরি একটা নিত্যপণ্যের প্রতিষ্ঠানে। অনলাইনে করা ফরমাশমতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিভিন্ন ডিভাইস দিয়ে আসি।
টিকাটুলির এক বাড়িতে পানির ফিল্টার নিয়ে গেলাম। প্যাকেট খুলে ডিভাইস ফিট করতে যাব, দেখি উপরের ঢাকনাটা ফাটা। খদ্দের মহিলা খাড়া দারোগা। ক্যানক্যানে গলায় বলেন, ‘যান, এক্ষুনি ঢাকনা বদলে আনুন। নইলে এক পয়সাও দেব না!’
অফিসে বসের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করি। সমস্যা শুনে বস খেঁকিয়ে ওঠেন, ‘ফাটা জিনিস নিয়ে যান, চোখ থাকে কোথায়?’
‘প্যাকেটের ভেতর ওটা দেখব কী করে, স্যার?’
‘অফিসে আসুন, দেখাচ্ছি!’
চাকরি ঝুলে যাওয়ার জোগাড়। মন খারাপ করে সিঁড়ি দিয়ে নামছি, পেছন থেকে মৃদু স্বরে ডাক, ‘একটু শুনুন।’
একটা শ্যামলা মেয়ে। হ্যাঁ, তাকে দেখেছি। এতক্ষণ ওই মহিলার সামনে আমার হেনস্তা হওয়া দেখছিল। এখন আবার কী বলতে চায়?
সে বলল, ‘আমি রূপা। এই বাসায় একটা মাছ কাটার মেশিন দিয়ে বিপদে পড়েছি। মহিলা একশ একটা ত্রুটি বের করছে। ফেরতও দেয় না, আবার টাকাও দেয় না। খুব ঝামেলায় আছি।’
টের পাই— আমিও যা, রূপাও তাই। মহিলার সমালোচনা করতে করতে আমরা এগিয়ে যাই। রিকশায় চেপে ক্রেতাকুলকে তুলাধোনা করি।
আমাকে মতিঝিলে নামিয়ে দিয়ে দিলকুশা যাবে রূপা। কথায় কথায় আবিষ্কার করি, আমার মেসের কাছেই থাকে সে। পরদিন থেকে রূপা আর আমি একই রিকশার সহযাত্রী হয়ে যাই।
রূপা দেখতে আহামরি কিছু না। কাটা কাটা কথা। এর পরও মনটা কেবল ‘রূপা রূপা’ করে। সেও কি মনে করে এ অধমকে প্রশ্রয় দেয়। রূপা দেশের ষোড়শী ফুটবল দলের চূড়ান্ত পর্বে যাওয়া নিয়ে গল্প বলে, আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি। সে ন্যান্সির জনপ্রিয় গানের কলি আওড়ায়, আমার কানে তা সুধা ঢালে।
দিনগুলো ভালোই কাটছিল, হুট করে জামরুল ভাই হাজির। কয়েক দিন আগেও যে মানুষটির দেখা পেতে ব্যাকুল ছিলাম, এখন সে খেজুর-কাঁটা। আমার শুকনো চেহারা দেখে জামরুল ভাই ভাবে— এ অভিমান। সে আমার কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘বুঝলি, গোটা জীবনটাই হচ্ছে একটা শেয়ারের খেলা। আজ একজনের সঙ্গে শেয়ার করছিস তো কাল আরেকজনের সঙ্গে শেয়ার করে চলতে হবে।’
আমি মনে মনে বলি, ‘যত যা-ই বল, রূপার সঙ্গে কিছু শেয়ার করতে দেব না।’
জামরুল ভাই বলে, ‘একটা জরুরি কল পেয়ে হুট করে চলে যেতে হয়েছিল। তুই তো জানিস, নানা রকম ধান্ধা করে চলি। শুভকাজে কেউ যাতে বাগড়া দিতে না পারে, এজন্য মোবাইলের সিম বদলেছিলাম। কিছু মনে করিস না, ভাই!’
অবাক হয়ে বলি, ‘শুভকাজ!’
‘হ্যাঁ, আমি বিয়ে করে ফেলেছি রে! মা-বাবা পছন্দ করা মেয়ে।’
আমার মন থেকে ভারি মেঘটা সরিয়ে দিয়ে চলে গেল জামরুল ভাই। আর কোনো দিন দেখা হবে কিনা কে জানে? আমার টাকাগুলোও হয়তো গেল! তা যাক, রূপা তো আছে!
এখন রোজ রূপার সঙ্গে যাই। বেশির ভাগ দিন রিকশাভাড়া পুরোটা আমিই দিই। কিন্তু গায়ে লাগে না।






