প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চ প্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ

 

দ্বিতীয় অধ্যায়

অনুবাদকরা এবং জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ

(প্রথমাংশ)

লিখনরীতির বিকাশে অনুবাদকরা যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। বিশেষ কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতিতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে তাঁদের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে খোদ ভাষার বিবর্তনে তাঁরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। ফরাসি দার্শনিক জাঁ লে রন দা’লেম্বার (১৭১৭-৮৩) তাঁর ‘Observations sur l’art de traduire’ (অনুবাদের শৈলী প্রসঙ্গে) নামক রচনায় বলেছেন, ‘ভাষার উন্নতি বিধানে সুসম্পন্ন অনুবাদ দ্রুততম এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায়।’  জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ, উন্নতি এবং প্রচার-প্রসারে অনুবাদকরা যেসব উপায়ে অবদান রেখেছেন, তা এ পরিচ্ছেদে খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে ইংরেজি, ফরাসি, সুইডিশ, জার্মান, গাবায়া ও হিব্রু এ ছ’টি ভাষায়।

এখানে যেসব কেস স্টাডি তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে আমরা দেখব, অনুবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রপঞ্চ নয়। বরং তা চরিত্রগত দিক থেকে জাতীয়তাবাদী, ভাবাদর্শগত এবং ধর্মীয় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত; আর এসব প্রকল্প ছিল প্রায়ই রাজন্যবর্গের আশীষধন্য। সেই পৃষ্ঠপোষকদের ক্ষমতা অথবা যে সংকটপূর্ণ পরিপ্রেক্ষিতে যেসব অনুবাদ সম্পন্ন হয়েছিল, তা অনুবাদকদের প্রণোদনা জুগিয়েছিল এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের কাজের বৈধতা দান করেছিল। অন্যদিকে সে কারণেই আবার তাঁদের পক্ষে যাঁর যাঁর ভাষা ও সংস্কৃতিতে ছাপ রেখে যাওয়া সহজ হয়েছিল।

গোড়াতেই আমরা ইংল্যান্ডের কথা বলব; বিদেশী নানা প্রভাব সে অঞ্চলের ভাষাকে সমৃদ্ধ করছে এবং একই সঙ্গে একটি সত্যিকারের স্বদেশী ভাষার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। ফ্রান্সে জাতীয়তাবাদ এবং শক্তিশালী রাজতন্ত্রগুলোর সম্মিলিত উপাদানগুলো অনুবাদ এবং বিদেশী মহত্ রচনাগুলোর স্বদেশীকরণে উত্সাহিত করেছে, প্রায়ই যার সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় ভাষার শক্তি-সামর্থ্য বৃদ্ধি এবং শৃঙ্খল-মুক্তি। খ্রিস্টীয় টেক্সটগুলোর অনুবাদই, আর কিছু নয়; জার্মানিতে একটি প্রমিত বা মান জার্মান ভাষার বিকাশ সূচিত করেছিল। এক্ষেত্রে মার্টিন লুথারের ব্যাপারটি বিশেষ মনোযোগ দাবি করে; তাঁর যাজকীয় ভূমিকার একেবারে বাইরে তিনি তাঁর দেশের একটি সাহিত্যিক ভাষা প্রতিষ্ঠা বা সৃষ্টির ক্ষেত্রে একজন প্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। সুইডেনেও একটি লিখিত স্বদেশী ভাষার উদ্ভব এবং খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করার ব্যাপারটি একই সময় ঘটেছিল। মধ্যযুগের শেষের দিকে সুইডিশ অনুবাদের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ভাডসেটনা নামের মঠটি একটি ব্যাপক অনুবাদ প্রকল্প বা উদ্যোগের পীঠস্থান ছিল, আর এ উদ্যোগটিই আধুনিক লিখিত সুইডিশ ভাষা বিকাশে সাহায্য করেছে। ইউরোপ মহাদেশের অনেক দেশের মতো আফ্রিকায়ও ভাষা ও ধর্ম অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল: খ্রিস্টীয় সুসমাচার প্রচারের উদ্দেশ্যে ঔপনিবেশিক আমলে আসা মিশনারিরা স্থানীয় ভাষাগুলোর প্রচার ও প্রসারেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। ক্যামেরুনের মেইগাঙ্গায় ‘গাবায়া অনুবাদ কেন্দ্র’ একটি জাতীয় ভাষার প্রচার ও প্রসারের ভাবাদর্শগত প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিল। বর্তমান অধ্যায়ে শেষ উদাহরণ হিসেবে যে ভাষাটিকে সেটার বিশেষ অবস্থানের কারণে বেছে নেয়া হয়েছে, তা হচ্ছে হিব্রু। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইহুদি জনগোষ্ঠীর পবিত্র ভাষা হিসেবে পরিচিত এ প্রাচীন ভাষাটিকে একটি নতুন জাতি বিংশ শতকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল। নতুন নতুন ভাষাতাত্ত্বিক সংস্থানের বিকাশে এবং হিব্রুকে সত্যিকারের একটি আধুনিক ভাষায় রূপান্তরের কাজে অনুবাদকরা এগিয়ে এসেছিলেন।

ইংল্যান্ডের জন্য একটি ভাষা

আমেরিকার কবি ও প্রবন্ধকার র্যালফ ওয়ালডো এমারসন বলেছিলেন, ‘ইংরেজি ভাষা একটি সমুদ্র এবং পৃথিবীর সব অঞ্চলের নদী সেখানে এসে মিশেছে।’ ইংরেজি একটি সংকর ভাষা; ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অসংখ্য শাখার একটি মিশ্রণ। ভাষাটির বিকাশের সঙ্গে মুহুর্মুহু আগ্রাসন ও আক্রমণের একটি সম্পর্ক রয়েছে, আর এটির ইতিহাস হচ্ছে বিজয় ও রূপান্তরের ইতিহাস। বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষা যখন ব্রিটেনে নানা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছিল, পরস্পরের সঙ্গে এসে মিলিত হয়েছিল, তখন অনুবাদ তার প্রথাগত মধ্যস্থতাকারী এবং সংকর-প্রজননকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল; বিশেষ করে সেই সময়ে, যখন অনুবাদকরা ঘটনার গতিধারা বদলে দেয়ার মতো কোনো অবস্থানে ছিলেন, তা সেটা তখন তাঁরা যে কর্তৃত্বমূলক অবস্থানে ছিলেন, সেটার কারণেই হোক অথবা যে কাজটি তাঁরা সম্পাদন করেছিলেন, সেটার প্রভাবসঞ্চারী প্রকৃতির কারণেই হোক। এ পর্বে চারজন ব্যক্তির অবদানের ওপর আলোক সম্পাত করা হবে: রাজা মহান আলফ্রেড, জিওফ্রে চসার, উইলিয়াম ক্যাক্সটন ও উইলিয়াম টিনডাল (কাজের গুরুত্ব ও জটিলতার কারণে তাঁদের কারো কারো কথা এ গ্রন্থে আরো বেশ কয়েকবার উল্লিখিত হবে: তৃতীয় অধ্যায়ে চসারের কথা, পঞ্চম ও অষ্টম অধ্যায়ে ক্যাক্সটনের কথা, এবং ষষ্ঠ অধ্যায়ে টিনডালের কথা)।

কেল্টরাই ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে প্রথম বসতি স্থাপন করে। ইতালীয় ও টিউটনিক জাতিগুলোর আগ্রাসনের মুখে এ ইন্দো-ইউরোপীয় জাতিটি পশ্চিমের দিকে পিছু হঠে যায়। জুলিয়াস সিজার ৫৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্রিটেন আক্রমণ করেন, যদিও ৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে সেভাবে রোমক বিজয়ের সূত্রপাত ঘটেনি। খানিকটা রোমকায়ন সত্ত্বেও লাতিন ভাষা কেল্টিককে প্রতিস্থাপিত করেনি, যেমনটা গঅলে ঘটেছিল এবং ৪১০ খ্রিস্টাব্দে রোমকরা চলে গেলে লাতিন ভাষার অবক্ষয় ঘটে।

ধারাবাহিক আরো বেশকিছু আগ্রাসন ঘটে ৪৪৯ খ্রিস্টাব্দে; এবারের কুশীলবরা হলো অ্যাঙ্গল, স্যাক্সন আর জুট নামের তিন টিউটনিক ট্রাইব। তারাই সেই জার্মানিক ভাষাটির প্রবর্তন করে, যা পরে ইংরেজির ভিত্তি রচনা করবে। কিন্তু শিগগিরই নতুন কিছু প্রভাবও এসে পড়ে: ৫৯৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেনে লাতিনের প্রত্যাবর্তন ঘটে। এবার বিজয় নয়, ধর্মান্তরের মাধ্যমে, যখন ক্যান্টারবেরির প্রথম আর্চবিশপ অগাস্টিন ইংল্যান্ডের মানুষকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করেন এবং ইংলিশ চার্চকে সুবিন্যাস্ত করতে শুরু করেন। উল্লেখ্য, ক্যান্টারবেরির অগাস্টিনকে, যিনি ৬০৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেছিলেন— সন্ত জেরোমের সমসাময়িক দক্ষিণ আফ্রিকার হিপ্পো রেজিয়াসের বিশপ এবং একজন ফাদার ও চার্চের ডক্টর অরেলিয়াস অগাস্টিনিয়াস বা সন্ত অগাস্টিনের (৩৫৪-৪৩০) সঙ্গে যেন আমরা গুলিয়ে না ফেলি। তৃতীয় শতকের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্ম ব্রিটেনে খানিকটা প্রসার লাভ করেছিল, কাজেই সেটি যে সে দেশে একেবারে অপরিচিত ছিল, তা বলা যাবে না। পঞ্চম শতকে সন্ত নিনিয়ান এবং সন্ত প্যাট্রিক যথাক্রমে স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে মিশনারি কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। আর সত্যি বলতে, অগাস্টিন ও তাঁর সন্ন্যাসীরা ব্রিটেনে এসে পৌঁছলে তাঁদের কাজ এ কারণে আরো সহজ হয়ে যায় যে, তাঁরা যেখানে অবতরণ করেছিলেন, সেই কেন্ট রাজ্যে এরই মধ্যে অল্প সংখ্যক খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী ছিলেন এবং রাজা এথেলবার্ট একজন খ্রিস্টান নারীকে বিয়ে করেছিলেন।

সে সময়ের মঠগুলোয়ই মূলত বিদ্যাচর্চা প্রসার লাভ করেছিল। বিদ্যাবত্তার ভিত্তি লাতিন হলেও, কিছু অনুবাদের কাজ আগেও হয়েছিল, যেগুলো ছিল প্রধানত ধর্মীয়। শেরবোরনের বিশপ একজন ধ্রুপদী পণ্ডিত আলডেহম (আনুমানিক ৬৪০-৭০৯) বাইবেলের অন্তর্গত স্তোত্রপুস্তক (Psalter) অনুবাদ করেছিলেন বলে বলা হয়, যদিও সে দাবির সমর্থনে কোনো প্রমাণ কেউ হাজির করতে পারেননি। লাতিন পদ্য বা শ্লোক ছাড়াও আলডেহম সম্ভবত কিছু কবিতাও রচনা করেছিলেন, যেগুলোয় পরে তিনি সুর সংযোজন করেন, তবে এসব কম্পোজিশনেরও কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি। বলা হয়ে থাকে, স্বদেশী ভাষায় গান গেয়ে তিনি লোকজন জড়ো করতেন, যাতে তিনি সমবেত মানুষের কাছে ধর্মীয় বিষয় প্রচার করতে পারেন। (ক্রমশ)

অনুবাদ: জি এইচ হাবীব