&dquote;&dquote;দেয়াল, টেবিল, শোকেসজুড়ে বিভিন্ন সময়ে তোলা নানা রকম ছবি, একজন আলোকচিত্রীর ঘর যেমন হবে— বাসার বসার ঘরটিও ঠিক তেমনি। সোফায় বসলে শুরুতে চোখ চলে যাবে কাঁধ খোলা ভেজা চুলের হাস্যোজ্জ্বল এক নারীর সাদা-কালো একটি আলোকচিত্রে। একটু দূরে খাবার টেবিলে বসেছিলেন সাইদা খানম। উপস্থিতি টের পেয়ে বললেন, ‘তোমার জন্য আজ আমার বিশ্রাম নেয়া হলো না। দুুপুরে খাবার পর আমি ঘণ্টাখানেকের জন্য একটু ঘুমিয়ে নিই।’ খুব আস্তে করে গুছিয়ে কথাগুলো বললেন তিনি। ১৯৩৭ সালে পাবনায় জন্ম নেয়া সাইদা খানম যে সময় হাতে ক্যামেরা তুলে নেন, তখন খুব কম নারীই এমনটা ভাবতে পেরেছিলেন। পাকিস্তান আমল ও স্বাধীন বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম আলোকচিত্রী। উত্তরে বলেছিলাম, ‘খুব বেশি সময় নেব না আপনার।’ বয়স এ মানুষটিকে অনেকটা কাবু করে ফেললেও আজো ক্যামেরা হাতে ছবি তুলতে বসে যান। টানা কথা বলতে পারেন না, হাঁপিয়ে ওঠেন। তাই থেমে থেমে কিছুক্ষণ পর পর বিরতি নিয়ে হলেও সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন তিনি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: রুহিনা ফেরদৌস

সাইদা বেগমের আলোকচিত্র: এস. এম. রহমান

আপনি তো বাংলাদেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী। পঞ্চাশের দশকে একা একজন মেয়ে ক্যামেরা কাঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বিষয়টি নিশ্চয়ই খুব কঠিন ছিল?

আমার পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুরে হলেও পাবনায় নানাবাড়িতে আমার বড় হওয়া, ওখানেই জন্ম। নানা খান বাহাদুর মোহম্মদ সোলায়মান মেয়েদের শিক্ষা-প্রগতির ব্যাপারে কাজ করতেন। আর আমার খালা মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা ছিলেন তখনকার দিনের প্রখ্যাত কবি, ভীষণ উদারমনা মানুষ ছিলেন তিনি। ছোটবেলায় আমি প্রায়ই অসুস্থ হতাম। তখন দোতলায় একটি ঘর ছিল আমার বিশ্রামকক্ষ, জানালা দিয়ে প্রকৃতির পরিবর্তন আর পাখিদের আনাগোনা দেখে দেখে সময় কাটত। মনে হতো প্রকৃতির এই দৃশ্যবদলের দৃশ্যগুলো আমি কীভাবে ধরে রাখতে পারব।

এ দৃশ্যগুলো ধরে রাখার জন্যই কি একসময় ছবি তোলা শুরু করলেন?

আমার নানা হঠাৎ করে খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চিকিত্সক বিধান চন্দ্র রায় তাঁকে হাওয়া বদলের কথা বললে নানাকে নিয়ে সপরিবারে আমরা ভারতের বিভিন্ন জায়গায় যাই। এর মধ্যে কয়েক বছর আমরা গিরিডিতে ছিলাম। এখানেই বালিকা থেকে কিশোরী অবস্থায় পা রাখি আমি।

ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগের কথা, কলকাতায় ‘লাইফ’ বলে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে গিয়েছি। গ্যালারিতে ঘুরছি, মুগ্ধ হয়ে একের পর এক ছবির সামনে দাঁড়াচ্ছি। ছবি দেখতে দেখতে আমি অনুভব করি, মানুষের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা— এ বিষয়গুলো আলোকচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরার মধ্যে যে শিল্পবোধ ফুটে উঠেছে, তা অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের চেয়ে কম শক্তিশালী নয়।

তার পর থেকেই কি ক্যামেরা হাতে নিলেন?

আমার সঙ্গে ছিল পারিবারিক বন্ধু প্রবাল বোস ও তার স্ত্রী কৃষ্ণা। ছবি নিয়ে কথা হচ্ছিল আমাদের। প্রবালের আপত্তি ‘আলোকচিত্র যে আর্ট’— এ বিষয়টা স্বীকার করায়। আমরা কথা বলতে বলতে রীতিমতো তর্কে লিপ্ত হলাম। আমি ওকে বলেছিলাম, ফটোগ্রাফি যে একটা শিল্প, তা আমি ছবি তোলার মাধ্যমে তোমাকে বুঝিয়ে দেব। এর পর আমি একটি কোডাক বক্স ক্যামেরা পাই। ক্যামেরাটি আমাকে দিয়েছিলেন লুত্ফুন্নেসা চৌধুরী, ঢাকার কামরুন্নেসা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন তিনি, তাঁর স্বামী ছিলেন দৈনিক সংবাদের সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী।

শুনেছি কাবুলিওয়ালার ছবিটা প্রথম তুলেছিলেন, সেই গল্পটা বলবেন?

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে দুজন কাবুলিওয়ালাকে দেখে আমি ওদের ছবি তুলি। আমার বয়স তখন ১৩ কি ১৪ বছর। ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাবুলিওয়ালা পড়ে চরিত্রটি ঘিরে ভীষণ আগ্রহ জন্মায়, একটা ভালো লাগাও ছিল। কিন্তু ছবি তোলায় ওরা আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমি একটু ঘাবড়ে যাই, তবে ট্রামের হুইসেল বেজে ওঠায় ওরা সেদিকে চলে যায়।

আমি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচি। বক্স ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে তুলতে মনে হতো, ছবির মধ্যে যে জিনিসটা পেতে চাইছি, তা ফুটিয়ে তুলতে পারছি না। তখন আমি যার কাছে ভালো কোনো ক্যামেরা দেখতাম, বলতাম— ‘তোমার ক্যামেরাটা আমাকে একটু দেবে?’ অনেকে দিয়েছিল, অনেকে দেয়নি। এ নিয়ে একদিন খুব মনোমালিন্য হয় একজনের সঙ্গে। মেজ আপা হামিদা খানম তখন পড়াশোনা করতে আমেরিকায় যাচ্ছেন, তিনি দেশে ফেরার সময় আমার জন্য রোলিকড ক্যামেরা নিয়ে আসেন। সেদিন আপা ক্যামেরাটি না এনে দিলে আমি বোধহয় আলোকচিত্রী হিসেবে কোনো দিন নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারতাম না।

সে সময়ে ঢাকায় কীভাবে আপনার ফিল্মগুলো ডেভেলপ করতেন?

দুটি মাত্র স্টুডিও ছিল। ডাস স্টুডিও ও জায়েদ স্টুডিও। আমি জায়েদে যেতাম ফিল্ম ওয়াশ করাতে। স্টুডিওর লোকটি আমার ছবির কম্পোজিশন দেখে মুগ্ধ হয়ে জার্মানি, আমেরিকা থেকে বের হতো এমন বিভিন্ন আলোকচিত্রের ম্যাগাজিন দিয়ে বললেন, ‘এখানে ছবির নিচে যে অ্যাপারচার ও এক্সপোজার লেখা থাকে, তা তুমি ভালো করে দেখবে এবং ছবির বিষয়বস্তু সম্পর্কে সচেতন হবে।’ ওটাই ছিল আমার শিক্ষালাভ। এখনকার দিনে ফাটোগ্রাফি শেখার জন্য বহুরকম প্রতিষ্ঠান রয়েছে, হাজারটা স্টুডিও আছে, তখনকার দিনে ছবি তোলা শেখার জন্য কিছুই ছিল না। সবকিছু ছিল অন্ধকারময়।

আপনি তো বেগম পত্রিকার জন্য ছবি তুলতেন?

বেগম পত্রিকার সঙ্গে আমি ১৯৫৬ সালে যুক্ত হই। সে সময় আমার একটা ছবি জার্মানির ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড কোলন প্রতিযোগিতায় জমা পড়ে। সেখানে আমি পুরস্কার পাই— এটাই ছিল আলোকচিত্রে আমার প্রথম পুরস্কার।

আমার খালা কবি মাহমুদা খাতুন একদিন আমাকে বেগমের অফিসে নিয়ে যান। সওগাতের সম্পাদক মোহাম্মাদ নাসিরউদ্দিন যখন শুনলেন আমি ছবি তুলি, খুব খুশি হলেন এবং বললেন, ‘তুমি বেগমের প্রচ্ছদের জন্য ছবি তুলবে, পাশাপাশি মেয়েদের বিভিন্ন কাজকর্ম, সভা-সমিতি, খেলাধুলার ছবি দেবে।’

&dquote;শিশু

তখনকার দিনে একা একটা মেয়ের ক্যামেরা হাতে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া, মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

তখন ঢাকা ছিল ছোট্ট একটা মফস্বল শহরের মতো, মেয়েরা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে স্কুল-কলেজে যেত। সে সময় আমি ক্যামেরা নিয়ে সারা ঢাকা ঘুরে বেড়িয়েছি। ছবি তুলতে কখনো কখনো শহরের বাইরে গ্রামগঞ্জে নদীর ধারে গিয়েছি। সে সময় এটা করা খুব সহজ ছিল না। মানুষের বাঁকা চাহনি, অকথ্য ভাষায় যা-তা শোনা থেকে শুরু করে ঢিলও ছুড়েছে আমাকে। তবে দমে যাইনি, আর এসব কথা বাড়িতে বলতাম না। তুমি শুরুতে আমার পরিবার নিয়ে জানতে চাইছিলে না, আমার পরিবার ছিল অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা। আমার মা-খালা ভীষণ প্রগতিশীল ছিলেন, তাঁরা কখনো আমাকে বাধা দেননি। তবে বাবা বলতেন, ‘তুমি দুটো জায়গায় ছবি তুলতে যাবে না। একটা হলো বিয়ের মজলিশ, অন্যটা স্টেডিয়াম।’

বেগমের জন্য তো খেলার ছবি তুলতে হতো আপনাকে?

হ্যাঁ, বাবার না-বলা দুটো জায়গার মধ্যে একটাতে যেতে হয়েছে আমাকে। স্টেডিয়ামে মেয়েদের বিভিন্ন খেলার ছবি তুলতাম। বাবার এ কথাটা আমি মেনে নেয়নি। তবে বিয়ের আসরে আমি কোনো দিন ছবি তুলিনি। তবে বেগমের প্রচ্ছদের জন্য কাঁধ খোলা, ভেজা চুলের যে ছবিটা তুলেছিলাম, তা নিয়ে বেশ বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। আমাদের বাড়ির সামনে এসে অনেকে প্রতিবাদও জানায়। ১৯৮২ সালে দিল্লিতে এশিয়ান গেমস অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় বেগমের হয়ে ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। বেগম ছাড়াও তখনকার দিনে যেসব খবরের কাগজ বের হতো, যেমন— অবজারভার, মর্নিং নিউজ, ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলায় আমার তোলা বিভিন্ন ধরনের ছবি ছাপা হতো।

রানী এলিজাবেথ ঢাকায় এলে আপনি তাঁর ছবিও তুলেছিলেন—

রানী এলিজাবেথের ঢাকায় আসার খবরে ছবি তোলার জন্য আমি খুব ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তখন বেগম পত্রিকা সম্পাদনা করতেন নূরজাহান বেগম, ভীষণ আদর করতেন, উত্সাহ দিতেন। বললেন, ‘আমাদের তো কোনো ক্ষমতা নেই, তোমাকে ছবি তোলার অনুমতি জুটিয়ে দিতে পারি না। তবে তুমি চেষ্টা করে দেখো পার কিনা।’ আমি তখন সচিবালয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করলাম। দায়িত্বে নিয়োজিত লোকেরা আমাকে খুব উত্সাহ দিত না। বলেছিল, ‘দেখি কী করা যায়।’ দিন গড়াচ্ছে আর আমার চিন্তা বাড়ছে। মনে আছে, রানী আসার আগে আমি প্রেস ফটোগ্রাফার হিসেবে কার্ডটা পেলাম। কি যে আনন্দ লেগেছিল! এটি পেয়ে ভীষণ গর্ব হয়েছিল।

&dquote;পিজি

আপনার আত্মজীবনী ‘স্মৃতির পথ বেয়ে’ বইয়ে সেদিনের ঘটনার কথা উল্লেখ আছে। তবু গল্পটা আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই...

আমি তখন শাড়ি পরতাম। সেদিন এয়ারপোর্টে শাড়ি পরে গিয়েছিলাম। পৌঁছে মনে হয়েছিল— ওখানে ২০০ আলোকচিত্রীর মধ্যে আমি একমাত্র বাঙালি মেয়ে, সঙ্গে দুটো ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছি। রানী যখন প্লেন থেকে নামলেন, তখন সবার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল কিন্তু আমার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ কাজ করল না। সে মুহূর্তে মনে হলো, এটা কী ঘটে গেল! বুদ্ধি করে সঙ্গে রাখা অন্য ক্যামেরাটায় হাই স্পিডের ফিল্ম লোড করে খুব দ্রুত ছবি তুলতে থাকলাম। খুব সুন্দর কিছু ছবি পেয়েছিলাম সেদিন। পরবর্তীতে রানী যখন আদমজী জুট মিল পরিদর্শনে গেলেন, তখন খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। আমি তাঁকে অভিবাদন জানালে তিনি হেসেছিলেন, মনে পড়ে। প্রেস ফটোগ্রাফার হিসেবে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ছবি তুলেছি আমি।

চিত্রালীর জন্যও তো কাজ করেছেন আপনি?

বেগম ছাড়াও চিত্রালীর সঙ্গে সংযুক্ত ছিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমি বেশ দুর্বল ছিলাম। তাই বছরে একবার কলকাতায় যেতাম চেকআপের জন্য। ডাক্তারি চেকআপ শেষে কলকাতার সিনেমা স্টুডিওতে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলতাম। নির্মল কুমার ঘোষ ছিলেন সে সময়ের গুণী সমালোচক। তিনি আমাকে চিত্রতারকাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দিতেন। নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে ‘শিউলী বাড়ি’র শুটিং হচ্ছিল, বিজন বিহারীর চরিত্রে অভিনয় করছিলেন উত্তম কুমার। আমি তাঁর ছবি তুলেছিলাম। চিত্রালীর পাশাপাশি বেগম পত্রিকায় তা ছাপা হয়। ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখার্জিসহ সে সময় অনেক তারকার ছবি তুলেছি। আর সুচিত্রা সেনের বাড়ি ছিল আমাদের পাবনার বাড়ির পাশে। আমরা ওকে রমা বলতাম। পাবনায় থাকতে ও শান্তিনিকেতনে পড়তে চলে যায়। পরে যখন ফিরে আসে, দেখলাম দারুণ সুন্দরী হয়েছে ও। কলকাতার স্টুডিওতে পরবর্তীতে আমাদের দেখা হয়েছে। ওর বাড়িতেও গিয়েছিলাম আমি।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে তো ঢাকাতেই পরিচয়?

তিনি তাঁর মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন— গ্রামে স্কুল-কলেজ করে দেবেন। সেজন্য ঢাকায় আসেন, বর্ধমান হাউজ এখন যেটা বাংলা একাডেমি, সেখানে থাকতেন। অনেকেই আসতেন, আসর চলত। আমি যেতাম বেগমের জন্য তাঁর ইন্টারভিউ নিতে। তিনি আমাকে কেন যেন খুব স্নেহ করতেন। বলতেন, ‘আমার সঙ্গে মাইহারে চলো, তোমাকে সরোদ শেখাব।’ তখন আমরা জয়নগরে থাকি, একদিন সাহস করে তাঁকে আমাদের বাড়িতে দাওয়াত দিলাম। তিনি রাজি হলেন। সকাল থেকে বাড়িতে নানা রকমের খাবার রান্না হলো। কিন্তু সেদিন খুব বৃষ্টি হওয়ায় আমাদের বাসার সামনে হাঁটুপানি জমে যায়, তাঁকে আর আনতে যেতে পারিনি। আর টেলিফোন না থাকায় যোগাযোগও করতে পারিনি। পরের দিন সকালে আমি খাবার নিয়ে বর্ধমান হাউজে যাই। খুব রেগে ছিলেন, আমি যখন টেবিলে খাবারগুলো রাখতে শুরু করলাম, তিনি বললেন, ‘খাবারগুলো নিয়ে যান। না হলে আমি ছুড়ে ফেলে দিবো।’ চোখ মুছতে মুছতে আমি বর্ধমান হাউজ থেকে বেরিয়ে আসি। সেদিন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমি আর কখনো বিখ্যাত মানুষের ইন্টারভিউ নিতে যাব না। এক বছর পর কলকাতায় গড়ের মাঠে গিয়েছি। সেদিন বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ বাজাবেন। তখন গ্রিন রুমে একটি স্লিপ পাঠালাম আমার নাম লিখে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আমি মনে মনে ভাবতাম কবে আবার আপনার সঙ্গে দেখা হবে।’

চিত্রালী পত্রিকার হয়ে সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন। এর পরের ঘটনা ইতিহাস। দীর্ঘদিন সত্যজিৎ রায়ের ছবি তুলেছেন। শুনেছি তাঁর স্ত্রী বিজয়া রায়ের সঙ্গেও আপনার সুসম্পর্ক ছিল?

&dquote;&dquote;আমার মনে হয়, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের ছবি তোলা। আমি ৩০ বছর ধরে ছবিগুলো তুলেছি। তাঁর মৃত্যুর পরে ঢাকায় দুবার এবং কলকাতার নন্দনে একবার ছবিগুলো নিয়ে এক্সিবিশন করেছিলাম। মানিকদার ওই ছবিগুলো দর্শক খুব পছন্দ করেছিলেন। একজন মন্তব্যের বইয়ে লিখেছিলেন, এত দিন ধরে সত্যজিৎ রায়ের কাজকর্মের ছবি দেখেছি কিন্তু এ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে আমরা তাঁর পারিবারিক জীবনকে খুঁজে পেলাম।

প্রথমবার যখন সত্যজিৎ রায়ের ইন্টারভিউ নিতে যাই, আমাকে সবাই খুব হতাশ করেছিল। বলেছিল, ‘তিনি খুব দাম্ভিক মানুষ, অহঙ্কারী, কথা কম বলেন, তোমাকে হয়তো ইন্টারভিউ করার সুযোগ দেবেন না।’ আমি কারো কথা শুনিনি। ভেবেছি, যে মানুষটা ‘পথের পাঁচালী’ বানিয়েছেন, তিনি প্রচণ্ড মানবদরদি, দাম্ভিক কেন হবেন!

আমি ফোন করলে দুদিন পরে যেতে বললেন আমাকে। তিনি তখন থাকতেন লেক টেম্পল রোডে। সন্ধ্যার একটু আগে আগে সময় দিয়েছিলেন। বাড়িটা ছিল তিনতলা, দরজার ফাঁক দিয়ে দেখি, বসে লিখছেন। আমার মনে হলো, এই মানুষটা পৃথিবী বিখ্যাত একজন পরিচালক, বড় মাপের ঝানু সাংবাদিক-ফটোগ্রাফাররা যার সাক্ষাত্কার নিতে ও ছবি তুলতে আসেন, সেখানে আমি অতি নগণ্য। সে মুহূর্তে মনে হলো, আমি বরং ফিরে যাই, ছবি তুলব না। কিন্তু তিনি আমার উপস্থিতি টের পেলেন, আমাকে ভেতরে আসতে বলে আবার লেখার মধ্যে ডুবে গেলেন। কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। আমার দিকে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কী যে দেখলেন, আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। এর পর ভীষণ বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি আমার সম্পর্কে কী জানতে চান?’

আপনি কী উত্তর দিয়েছিলেন?

এটা ছিল আমার জন্য বিরাট একটি প্রশ্ন, তিনি তখন সদ্য ‘কাঞ্চন জংঘা’ ছবির শুটিং শেষ করে দার্জিলিং থেকে ফিরেছেন। আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম, কাঞ্চন জংঘা ছবিটা সম্পর্কে আমি এখনো তেমন করে জানি না, এ ছবির কাহিনী আর অভিনয় শিল্পীদের সম্পর্কে যদি কিছু বলেন। তিনি যখন বলতে শুরু করলেন, তখন সে কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমি পরবর্তী প্রশ্ন করতে লাগলাম। এর পর তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন ঢাকা সম্পর্কে। বললেন, ‘ঢাকায় ছবি কেমন হচ্ছে?’ আমি বলেছিলাম ভালো ছবি করার চেষ্টা চলছে। তিনি ঢাকার স্মৃতিচারণ করে বললেন, ‘ছেলেবেলায় আমি একবার ঢাকায় গিয়েছিলাম, স্টিমারে করে ফিরছি, স্টিমার তখন পদ্মার উপরে, মা আমাকে ঘুম থেকে তুলে সূর্যোদয় দেখিয়েছিলেন।’

&dquote;&dquote;সেবার কোনো ছবি তুলেছিলেন সত্যজিৎ রায়ের?

তাঁর কথা শেষ হলে আমি ছবি তোলার কথা বলায় তিনি ভীষণ খুশি হলেন। বললেন, ‘আমাদের দেশের মেয়েরা এ লাইনে একেবারেই এগিয়ে আসে না।’ তার পর আমি যে-ই ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তুলেছি, সঙ্গে সঙ্গে পাশের রুম থেকে তাঁর স্ত্রী বিজয়া রায় ছুটে এলেন। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো কোনো অঘটন ঘটেছে। যখন দেখলেন আমি ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে আছি, তিনি হেসে ফেলেন। তিনি আমাকে চা-নাশতা খাওয়ালেন। বললেন, ‘তুমি যখনই ঢাকা থেকে আসবে, আমাদের বাসায় চলে এসো।’ হয়তো বিশ্বাস করবে না, এর পরে আমি কোনো দিন মানিকদার বাসায় আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে যাইনি। আমি সত্যজিৎ রায়কে মানিকদা বলতাম।

আর সত্যজিৎ রায় আপনাকে কী নামে ডাকতেন?

তিনি আমাকে আমার ডাকনাম বাদল বলে ডাকতেন। এর পর আমি যতবার তাঁর বাড়িতে গিয়েছি, মানিকদা নিজে এসে দরজা খুলে দিতেন এবং খুব খুশি হতেন আমাকে দেখে। আমি প্রতি বছর একবার করে কলকাতায় যেতাম, তাঁর ‘মহানগর’, ‘চারুলতা’ এবং ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় উপস্থিত থেকে ছবি তুলেছিলাম।

&dquote;&dquote;ছবির শুটিংয়ের সময় তিনি ছবি তোলার অনুমতি দিতেন?

চারুলতার শুটিংয়ের সময় অন্য কোনো রিপোর্টার বা ফটোগ্রাফারকে অনুমতি দেননি। শুধু আমাকে ও একজন ব্রিটিশ শিল্পীকে অনুমতি দিয়েছিলেন। যখন তখন আমরা ছবি তুলতে পারতাম।

পরবর্তীতে মানিকদার পরিবারের কাছের মানুষ হয়ে যাই আমি। অনেক সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়েছি। মানিকদা শেষবার অসুস্থ হয়ে যখন হাসপাতালে, কাউকে চিনতে পারতেন না। তখন বাইরের কাউকে দেখা করার অনুমতি দেয়া হতো না। আমি মঙ্কুদিকে (বিজয়া রায়কে আমি মঙ্কুদি বলে ডাকতাম) বললাম, আমি কি একবার মানিকদাকে দেখতে পারি না? তিনি আমাকে বললেন, ‘সকালে আমাদের বাড়িতে এসো, আমি তোমাকে নিয়ে যাব।’ পথে আসতে আসতে মঙ্কুদি আমাকে বললেন, ‘দ্যাখো বাদল, উনি অনেককে চিনতে পারেননি, ওনার অনেক নিকট বন্ধুকেও চিনতে পারছেন না। তোমাকে যদি চিনতে না পারেন, তুমি মন খারাপ করো না।’

হাসপাতালে যখন তাঁর কেবিনে গেলাম, চারপাশে অনেক যন্ত্রপাতি, মেশিন বসানো, এসব দেখে ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। মঙ্কুদি বললেন, ‘দ্যাখো, বাদল এসেছে।’ আশ্চর্য, মানিকদা আমাকে চিনতে পারলেন। বললেন, ‘বাদল, ভালো আছো তো।’ অন্য সময়ে দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ কথাটা বলতেন আমাকে। আমি অবাক হয়ে গেলাম, মঙ্কুদিও অবাক হয়ে গেলেন আমাকে কীভাবে চিনে এ কথাটা বললেন মানিকদা। তখন আমি তাঁর হাতটা ধরলাম, খুব ঠাণ্ডা ছিল হাতটা। বললাম, আপনি আবার ভালো হয়ে উঠবেন।

আপনি তো মাদার তেরেসারও ছবি তুলেছেন?

১৯৭৩ সালে যখন মাদার তেরেসা ঢাকা এলেন, তখন পুরান ঢাকার একটা আশ্রমে উঠেছিলেন। সকালে খবরের কাগজে তাঁর আসার খবর পড়ে আমি ক্যামেরা নিয়ে দেখা করতে চলে যাই। গিয়ে দেখলাম তিনি গাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন, আমি তাঁকে শ্রদ্ধা জানালে তিনি আমাকে দোয়া করলেন। এর পর আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। তিনি গাড়িতে ওঠার আগের মুহূর্তে আমাকে বললেন, আপনি আমাদের সঙ্গে আসেন। তাঁর এমন আচরণে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। এর পর আমরা তেজগাঁওয়ের শিশুদের একটা আশ্রমে যাই। সেদিন আমি তাঁকে কোনো প্রশ্ন করিনি। অসহায় যুদ্ধশিশুতে আশ্রমটা ভর্তি। তিনি ওই শিশুদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন, ওদের সঙ্গে খেলতে শুরু করলেন। আমার ক্যামেরায় সেসব দৃশ্য ধারণ করা আছে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ছবি তোলার অভিজ্ঞতা নিয়ে শুনতে চাই—

১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি আর্মির ছবি তুলতে গিয়ে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়, চারদিকে উত্সব উত্সব পরিবেশ। আমি আমার পরিবারের কয়েকজনের সঙ্গে শেরাটনের চৌমাথায় এসে দাঁড়ালাম। ক্যামেরা সঙ্গে ছিল, এদিক-ওদিক ঘুরে ছবি তুলছিলাম। পরিচিত কেউ একজন এসে বলল, ধানমন্ডিতে পাকিস্তানি আর্মিরা গোলাগুলি করছে। এর পর আমরা দেখলাম দূর থেকে পাকিস্তানি আর্মিরা মার্চ করতে করতে আসছে। আমি ভাবলাম আরেকটু কাছে আসার পর ছবি তুলব। হঠাৎ ওরা গুলি করতে শুরু করল। তখন শেরাটনের সামনে একটি বাড়ি ছিল, ছুটে গিয়ে সে বাড়িতে ঢুকে পড়ি আমরা।

আপনার ছবির নিশ্চয়ই অনেক প্রদর্শনী হয়েছে। কোনো বিশেষ প্রদর্শনী নিয়ে বলতে চান?

তিনটা প্রদর্শনীর কথা বলতে পারি— সত্যজিৎ রায়, মাদার তেরেসা আর শান্তিনিকেতন ও কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের উপরে করা। বহু বছর ধরে কণিকাদির সঙ্গে আমাদের পরিবারের একটা সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। আমার বড় ভাই আবদুল আহাদ (রবীন্দ্রসঙ্গীতজ্ঞ ও প্রখ্যাত সুরকার) স্কলারশিপ নিয়ে শান্তিনিকেতনে পড়তে যান। সেখানে কণিকাদির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। কিন্তু সে সময়ে সমাজে দুটি ভিন্ন ধর্মের নারী-পুরুষের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রচলন ছিল না বলে ওদের সম্পর্কটা পরিণতি পাইনি।

আলোকচিত্রী জীবনের কোনো বিশেষ মুহূর্তের কথা মনে পড়ে?

একটা ঘটনার কথা বলি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে আমি ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। এর আগে কখনো তাঁর ছবি তুলতে যাওয়া হয়নি আমার, দূর থেকে তাঁকে অনেকবার দেখেছি কিন্তু কাছে গিয়ে ছবি তুলতে সাহস হতো না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে আমি ছবি তুলতে গেলাম। ছবি তুলতে দেখে বঙ্গবন্ধু আমাকে বিদেশী ভেবেছিলেন, মনে করেছিলেন আমি অন্য রাষ্ট্র থেকে আসা কোনো নারী আলোকচিত্রী। আমি যে বাংলাদেশের মেয়ে, তিনি তা ভাবতেই পারেননি।

এ সময়ের নারী আলোকচিত্রীদের সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়?

আমরা যখন ছবি তুলতাম, তখন প্রকৃতির ওপর আমাদের নির্ভর করতে হতো। কখন সূর্যটা কোথায় থাকবে, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন কিনা। এখন তো সবকিছু অনেক উন্নত, আলোকচিত্রে মেয়েরাও অনেক এগিয়ে গেছে। খুশি লাগে যখন ওরা আমার কাছে আসে, কথা বলে, এটা-ওটা জানতে চায়। সেই সঙ্গে একটা দুঃখবোধও জাগে, এই যে মেয়েগুলো আসছে, আলোকচিত্র নিয়ে ভাবছে। কিন্তু যখন ওদের বিয়ে হবে, সঙ্গী স্বামীটি যদি এ কাজে বাধা দেয়, ওদের প্রতিভাটা আর টিকে থাকবে না, ওটা এখানেই শেষ হয়ে যাবে।