১৫ মে ২০১৭ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বিশততম জন্মজয়ন্তী।
ফাল্গুন ১৩১৮-এর প্রবাসীতে প্রকাশিত ‘পিতৃস্মৃতি’তে মহর্ষির কন্যা সৌদামিনী লিখেছেন:
‘পার্ক স্ট্রীটে যেদিন আমরা সকল ভাইবোনে মিলিয়া পিতার জন্মোৎসব করিতাম সেদিন আমাদের বড়ই আনন্দের দিন ছিল। সেদিন পরিবারের সকলেই একত্র হইতেন। তিনি মাঝখানে চৌকিতে বসিতেন। আমরা সকলে তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া ঈশ্বরের উপাসনা করিতাম— বড়দাদা সময়োচিত কিছু একটা লিখিয়া পাঠ করিতেন, রবি গান করিত। তিনি ফুল বড় ভালবাসিতেন বলিয়া সকলেই তাঁহাকে ফুলের তোড়া ফুলের সাজি আনিয়া উপহার দিতেন— আমরা ফুল দিয়া তাহার সমস্ত ঘরটি সাজাইয়া দিতাম। ...আমাদের সেই আনন্দের দিন আর আসিবে না, সেই পবিত্র সৌম্য মূর্তি আর দেখিতে পাইব না।’
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৫ মে ১৮১৭ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা প্রবল পরাক্রান্ত ঐশ্বর্যবান দ্বারকানাথ ঠাকুর, মাতা দ্বিগম্বরী দেবী। বিলাসিতা ও সম্ভোগে একজীবন অতিবাহিত করলেও মাত্র একুশ বছর বয়সে পিতামহী অলকাসুন্দরী দেবীর মৃত্যু তাঁকে বদলে দেয়। সংসার থেকে নিজেকে অনেকটা প্রত্যাহার করেই নেন। হতাশ হয়ে পড়েন পিতা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর।
ক্ষুব্ধ দ্বারকানাথ পুত্রকে ভর্ত্সনা করে বিলেত থেকে ইংরেজিতে লিখলেন (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলা ভাষান্তর):
‘...আমার সকল বিষয়সম্পত্তি নষ্ট হয় নাই ইহাই আমার আশ্চর্য বোধ হয়। তুমি পত্রিকার সহিত বাদ প্রতিবাদ করিতে ও সংবাদপত্রে লিখিতে ব্যস্ত, গুরুতর বিষয় রক্ষা ও পরিদর্শন কার্যে তুমি স্বয়ং যথোচিত মনোনিবেশ না করিয়া তাহা তোমার প্রিয়পাত্র আমলাদের হস্তে ফেলিয়া রাখ। ভারতবর্ষের উত্তাপ ও আবহাওয়া সহ্য করিবার শক্তি আমার নাই, যদি থাকিত আমি অবিলম্বে লন্ডন পরিত্যাগ করিয়া তাহা নিজে পর্য্যবেক্ষণ করিতে যাইতাম।...’
(সমীর সেনগুপ্তের রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন থেকে)
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি অসাধারণ ‘আত্মজীবনী’ রেখে গেছেন, যা মরণোত্তর প্রকাশিত। পুত্র রবীন্দ্রনাথের বিশাল সৃষ্টির কাছে দেবেন্দ্রনাথ ম্লান; যদি রবীন্দ্রনাথ না থাকতেন, তবে তাঁকে অধিকতর উজ্জ্বল মনে হতো।
দ্বারকানাথ ঠাকুরের পাঁচ পুত্র
বাংলার রেনেসাঁর প্রধান দুই পুরুষ রাজা রামমোহন রায় ও দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৭৯৭-১৮৪৬)।
দ্বারকানাথের সুন্দরী স্ত্রী দিগম্বরী দেবী বাংলাদেশের যশোরের মেয়ে। বিয়ের সময় দিগম্বরীর বয়স ৬ আর দ্বারকা ১৫। এই দম্পতির পাঁচ পুত্র: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভূপেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নগেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
দ্বারকানাথের প্রথম পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৫ মে ১৮১৭, মৃত্যুবরণ করেন ১৯ জানুয়ারি ১৯০৫। তিনি মহর্ষি হিসেবে সুখ্যাত, তিনি সুলেখক, সমাজ ও ধর্মসংস্কারক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সৌদামিনী ঠাকুরসহ বেশ ক’জন কৃতী সন্তানের পিতা।
দ্বিতীয় পুত্র নরেন্দ্রনাথ ঠাকুর অত্যন্ত স্বল্পায়ু পেয়ে ছিলেন, গবেষকদের কাছে তার সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য নেই।
তৃতীয় পুত্র গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮২০-এ জন্মগ্রহণ করেন, ১৯ ডিসেম্বর ১৮৫৪ সালে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তার মৃত্যু ঘটে। তিনি সংস্কৃতিমনা ছিলেন, যাত্রাদলের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, ‘বাবুবিলাশ’ নামে একটি নাটকও তিনি রচনা করেছিলেন।
ভূপেন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্বারকা-দিগম্বরী দম্পতির চতুর্থ পুত্র, জন্ম সম্ভবত ১৮২৬-এ, মৃত্যু ১৮৩৩, তের বছর বয়সে মায়ের মৃত্যুর দুদিন আগে তার অকালমৃত্যু ঘটে।
কনিষ্ঠ পুত্র নগেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৯-১৮৫৮) দ্বারকানাথের সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন। বিলেতি মেমদের কুপোকাত করার মতো সুপুরুষ ছিলেন। পিতার সঙ্গে বিলেতে সফরসঙ্গী হয়েছিলেন, মৌওজ ফুর্তিতে এতটাই মজে যান যে, দেশে ফিরতে চাননি। তার স্ত্রী ত্রিপুরা সুন্দরী আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘সে কিন্তু আমার দিকে চেয়েও দেখত না। আমি ত দেখতে ভালোছিলুম না।’
দেবেন ঠাকুর ও সারদা দেবীর সন্তানেরা
দেবেন-সারদা দম্পত্তির সন্তানসংখ্যা সাকল্যে ১৫। তাদের তালিকা:
প্রথম: একটি কন্যাসন্তান (স্বল্পায়ু; নামকরণ করা হয়নি)
দ্বিতীয়: দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর
তৃতীয়: সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
চতুর্থ: হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর
পঞ্চম: নীরেন্দ্রনাথ ঠাকুর
ষষ্ঠ: সৌদামিনী ঠাকুর
সপ্তম: জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর
অষ্টম: সুকুমারী ঠাকুর
নবম: পুণ্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
দশম: শরত্কুমারী ঠাকুর
একাদশ: স্বর্ণকুমারী ঠাকুর
দ্বাদশ: বর্ণকুমারী ঠাকুর
ত্রয়োদশ: সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর
চতুর্থদশ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পঞ্চদশ: বুধেন্দ্রনাথ ঠাকুর
সৌদামিনীর পিতা
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বল্পায়ু প্রথম কন্যাসন্তানের পর চারটি পুত্রসন্তানের জন্ম। তার পর সৌদামিনী। প্রথম কন্যার অকালপ্রয়াণের কারণে সৌদামিনীই জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে স্বীকৃত।
সৌদামিনী ঠাকুরের জন্ম ১৮৪৭-এ, মৃত্যু ১৯২০; বিয়ে ১৮৫৬তে সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়কে। ঠাকুরবাড়ির আচার মেনে সারদা ঘরজামাই-ই ছিলেন। সৌদামিনী-সারদা (সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের শাশুড়ির নামও সারদা) দম্পত্তির প্রথম সন্তান সত্যপ্রসাদ রবীন্দ্রনাথের দুই বছর আগে জন্মেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘বউঠাকুরানীর হাট’ শ্রীমতী সৌদামিনী দেবী শ্রীচরণেষুতে উৎসর্গীকৃত।
সৌদামিনী পিতৃস্মৃতি রচনা করেছেন।
‘পিতা শিলাইদহ জমিদারিতে পদ্মা নদীতে তাঁহার প্রিয় তিন চারিটি ছেলেকে লইয়া বেড়াইতে গেলেন। সেখানে থাকিতেই তিনি সংকল্প করিলেন, দূরে কোথাও নির্জনে গিয়া ঈশ্বর সাধনা করিবেন। সেখান হইতে ছেলেদের বাড়ি পাঠাইয়া তিনি সিমলায় চলিয়া গেলেন। ইহাদিগকে বাড়ি পাঠাইবার সময় তাঁহার চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল। তখনো সোম, রবি ও তাঁহার কনিষ্ঠ কন্যা জন্মগ্রহণ করে নাই। পিতা মনে করিয়াছিলেন হয়ত তাহার বাড়ি ফেরা আর ঘটিবে না।’
(সোম: সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর; রবি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; কনিষ্ঠ কন্যা: বর্ণকুমারী ঠাকুর।)
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বৈরাগ্য বোধ নিয়ে সিমলা গেলেন, তার ক’দিনের মধ্যে শুরু হয়ে গেল সিপাহী বিদ্রোহ। দীর্ঘদিন তিনি ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে রইলেন। চিঠিপত্র লিখে তিনি কোথায় অবস্থান করছেন তাও জানাননি। কলকাতায় একটি মর্মান্তিক রটনা হলো— দেবেন ঠাকুরকে সেপাইরা হত্যা করেছে। বাড়িতে শোকের মাতম শুরু হলো। আরো কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর দেবেন ঠাকুরের একটি চিঠি সবাইকে আশ্বস্ত করল যে, তিনি সুস্থই আছেন। এ সময় তাঁর নবম সন্তান পুণ্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুসংবাদ তিনি পাননি, তাঁকে জানানোরও কোনো উপায় ছিল না। পৌত্তলিকতা ছেড়ে ব্রহ্ম হয়ে যাওয়ায় পূজা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতেন। সৌদামিনী মা-বাবা দুজনকে জড়িয়েই লিখছেন:
‘পূজার সময় কোন মতেই পিতা বাড়িতে থাকিতেন না— এই জন্য পূজার উৎসবে যাত্রা গান আমোদ যত কিছু হইত তাহাতে আর সকলেই মাতিয়া থাকিতেন, কিন্তু মা তাহার মধ্যে কিছুতেই যোগ দিতে পারিতেন না। তখন নির্জন ঘরে তিনি একলা বসিয়া থাকিতেন।...
যে ব্রাহ্মমূহূর্তে মাতার মৃত্যু হইয়াছিল তাহার পূর্বদিন সন্ধ্যার সময় হিমালয় হইতে বাড়ি ফিরিয়া আসিয়াছিলেন। তাহার পূর্বে মা ক্ষণে ক্ষণে চেতনা হারাইতেছিলেন। পিতা আসিয়াছেন শুনিয়া বলিলেন, “বসতে চৌকি দাও।” পিতা সম্মুখে বসিলেন। মা বলিলেন, “আমি তবে চল্লেম।” আর কিছু বলিতে পারিলেন না। আমাদের মনে হইল স্বামীর নিকট হইতে বিদায় লইবার জন্য এ পর্যন্ত তিনি আপনাকে বাঁচাইয়া রাখিয়াছিলেন।’
নিরাকার ব্রহ্মে সমর্পিত দেবেন ঠাকুর সিমলা পাহাড় থেকে হঠাত্ বাড়ি ফিরলেন, বাড়িতে তখন সমারোহে জগদ্ধাত্রী পূজা চলছে, দিনটি ছিল বিসর্জনের। ‘তিনি বাটিতে প্রবেশ না করিয়া ব্রাহ্মসমাজে গিয়া বসিয়া রহিলেন।’ বিসর্জনের পর কেবল বাড়ি ফিরলেন। এর পর থেকেই ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রতিমা পূজা বিদায় নিতে শুরু করল।
সেকালে মেয়েদের লেখাপড়ার চল ছিল না। ‘বৈষ্ণব মেয়েরা কেহ কেহ বাংলা এমনকি সংস্কৃত শিক্ষা করিত— তাহাদেরই নিকট অল্প একটু শিখিয়া রামায়ণ, মহাভারত এবং সেকেলে দু’একখানা গল্পের বই পড়িতে পারিলেই যথেষ্ট মনে করা হইত।’
নারী শিক্ষায় বিশেষ আগ্রহ ছিল দেবেন্দ্রনাথের। সৌদামিনীকে মিশনারি মেয়েদের কাছে পাঠিয়েছেন; বেথুন স্কুল স্থাপিত হওয়ার পর যখন ছাত্রী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ল। তিনি সৌদামিনী ও তার খুড়তুতো বোনকে সেখানে পাঠিয়ে দেন।
নারীর জন্য নিষিদ্ধ ছাদ তিনি উন্মুক্ত করে দিলেন। দেবেন ঠাকুরের পিসতুতো ভাই চন্দ্রবাবু সামনের বাড়িতে বাস করতেন।
‘একদিন তিনি আমার পিতাকে বলিলেন, “দেখ দেবেন্দ্র, তোমার বাড়ির মেয়েরা বাহিরের খোলা ছাতে বেড়ায়, আমরা দেখিতে পাই, আমাদের লজ্জা করে। তুমি শাসন করিয়া দাও না কেন?” পিতা বলিলেন, “কালের পরিবর্তন হইয়াছে। নবাবের আমলে যে নিয়ম ঘটিত, এখন আর সে নিয়ম খাটিবে না। আমি আর কিসের বাধা দিব, যাঁহার রাজ্য তিনিই সব দেখিয়া লইবেন।”’
কম বয়সী মেয়েরা শাড়ির মতো এত বড় একটি কাপড় সামলাতে পারত না বলে তিনি তাদের শাড়ি পরা পছন্দ করতেন না। তাঁর নিজস্ব কল্পনা ও ডিজাইন অনুযায়ী দর্জিকে মেয়েদের জামা বানাতে হতো। সৌদামিনীর দুই বোন ‘অধিক বয়স পর্যন্ত’ অবিবাহিত ছিলেন বলে আত্মীয়রা দেবেন্দ্র-সারদা দম্পতিকে অনেক কথা শুনিয়ে যেতেন। সারদা দেবী বিচলিত হতেন, কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ কোনো কথা কানে তুলতেন না। দু-একটি বৈপরীত্য আমলে না নিলে মানতেই হবে, তিনি ছিলেন সেকালের আধুনিক মানুষদের অন্যতম।
জ্ঞানদানন্দিনীর শ্বশুর
মেধাবী পুত্র সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্য তাঁর বাবা যশোর থেকেই মেয়ে তুলে নিলেন। শ্বশুরবাড়ির অন্দরমহলে পালকি নামাতেই ভারী মোটা শরীরের শাশুড়ি সারদা দেবী সাত বছর বয়সী রোগা পাতলা ও ছোট মেয়ে জ্ঞানদাকে কোলে তুলে নিয়ে পুতুলের মতো ঘরের এক কোণে বসিয়ে রাখলেন।
‘আমি সমস্তক্ষণ কাঁদছিলুম। আমার শ্বশুর যখন যৌতুক করতে এলেন তখন একটু জোরে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলুম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন— কেন কাঁদছে? লোকে বললে— বাপের বাড়ি যাবার জন্য। তখন তিনি বললেন— চল পাঠিয়ে দেব। সকলে বলতে লাগলেন— দেখেছ কী সেয়ানা বউ। ঠিক তাঁকমাফিক চেঁচিয়ে কেদে উঠেছে, যখন শ্বশুর যৌতুক করতে এসেছে।’
কলকাতার ঠাকুরদের তুলনায় যশোরের নরেন্দ্রপুরের মুখুজ্জেরা তো দরিদ্রই। জ্ঞানদার বাবা অভয়চরণ মুখোপাধ্যায়। মেয়ের বিয়ের দু-তিন বছর পর অভয়চরণ ও তার স্ত্রী নিস্তারিণী কলকাতায় ভাড়া বাসায় উঠলেন। জ্ঞানদার মা মেয়েকে নেয়ার জন্য ঠাকুরদের বাড়িতে পালকি পাঠালেন। কিন্তু ভাড়া বাড়িতে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বউ যাবে, এটা কেমন কথা? সুতরাং জ্ঞানদার শাশুড়ি পালকি ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। জ্ঞানদা ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন স্ত্রীর এমন আচরণের কথা শুনতে পেলেন, অসন্তুষ্ট হয়ে ভেতর বাটিতে চলে এলেন এবং বললেন: ‘সত্যেন্দ্রর বউয়ের মা তাঁকে নিতে পালকি পাঠিয়েছেন, তুমি নাকি ভাড়া বাড়ি বলে তাকে যেতে দাওনি? ভাড়া বাড়ি কেন, মা গাছতলায় থাকলেও মায়ের কাছে যাবে, এখনি পাঠিয়ে দাও।— এ কথা শুনে আমার খুব আহ্লাদ হল। মায়ের কাছে গিয়ে শুধু তাঁকে মা বলে ডাকতে এত আনন্দ হচ্ছিল যে একটা আলাদা ঘরে গিয়ে মা মা বলতে লাগলুম।’
ব্রাহ্মসমাজের দেয়া মহর্ষি খেতাব তাঁর বৈরাগ্যের প্রকোপ আরো বাড়িয়ে দিল। তিনি পাহাড়ে পাহাড়ে ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়ে রইলেন। আর এদিকে সারদা দেবী কার্পণ্য করে বাজারের টাকা থেকে কিছুটা তুলে নিতেন। কর্তামশায় (দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর) পাহাড় ছেড়ে কবে বাড়ি আসবেন, কেবল এ কথা জানার জন্য দৈবজ্ঞের পেছনে পয়সা ঢালতেন।
কর্তামশায় তার পুত্রকে (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর) অনুমতি দিলেন জ্ঞানদাকে বোম্বে নিয়ে যেতে পারবে। ঘেরাটোপ দেয়া পালকিতে ঘিরে তাকে বোম্বের জাহাজে তোলা হলো।
কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জ্ঞানদার বিলেত গমনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
রবিঠাকুরের বাবা
রবীন্দ্রনাথের লেখায় বাবা দেবেন্দ্রেনাথ ঠাকুর বহুবার এসেছেন, কিন্তু যার হাত ধরে এই ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যে রবির জন্ম, এই আধুনিকতার যিনি উদ্গাতা সেই প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর অনালোচিত, অনুল্লেখিত রয়ে গেছেন তাঁর রচনায়। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণ ও আত্মজৈবনিক রচনার অনেকাংশ জুড়েই দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবস্থান। এ নিয়ে বিস্তারিত লেখার অবকাশ রয়েছে। রবির একটি কি দুটি উদ্ধৃতি, ১৩১৬ সালের লেখা থেকে:
আমার পিতা স্বভাবতই সুন্দরের উপাসক ছিলেন। জ্ঞানের দিক দিয়া ব্রহ্মকে উপলব্ধি করিবার সহায়তা তিনি উপনিষত্ হইতে পাইয়াছিলেন— রসের দিক দিয়া সুন্দরকে সেবা করিবার উপকরণ তিনি কোন্ শাস্ত্র হইতে সংগ্রহ করিতেন এই প্রশ্ন আপনার মনে জাগিয়াছে। ফরাসি দার্শনিক কুঁজ্যা গ্রন্থই তাঁহার অবলম্বন ছিল এ কথা ঠিক নহে— তত্ত্বশাস্ত্র ভক্তিবৃত্তিকে রস যোগাইতে পারে না। বৈষ্ণব ধর্মমত ও পদাবলি আমার পিতার হূদয়কে অধিকার করে নাই যে আমি জানি। তাঁহার রসভোগের সখা ছিলেন হাফেজ। তিনি নিজে কাব্য রচনা করিতে পারেন নাই তাঁহার সেই আকাঙ্ক্ষা মিঠাইয়াছেন হাফেজের গানে। উপনিষত্ তাঁহার ক্ষুধা মিটাইত আর হাফেজ তাহার তৃষ্ণা দূর করিয়াছিল।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছেলে রবিকে কীভাবে দেখেছেন? ১২৮৭ বঙ্গাব্দে পুত্রকে লেখা পিতার পত্র:
ওঁ
প্রাণাধিক রবি,
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ইংলন্ডে যাওয়া স্থির করিয়াছ এবং লিখিয়াছ যে আমি ‘ব্যারিস্টার হইব’। তোমার এই কথার উপরে এবং তোমার শুভ বুদ্ধির উপরে নির্ভর করিয়া তোমাকে ইংলন্ডে যাইবার অনুমতি দিলাম। তুমি সত্পথে থাকিয়া কৃতকার্য হইয়া দেশেতে যথা সময়ে ফিরিয়া আসিবে, এই আশা অবলম্বন করিয়া থাকিলাম।
...
তোমার থাকার জন্য ও পড়ার জন্য সেখানে যাইয়া যেমন যেমন ব্যবস্থা করিবে তাহার বিবরণ আমাকে লিখিবে। গতবারে সত্যেন্দ্র তোমার সঙ্গে ছিলেন, এবার মনে করিবে আমি তোমার সঙ্গে আছি। আমার স্নেহ জানিবে।
(্এই পত্রটিতে তাঁর জন্য আর্থিক বরাদ্দের বিষয় উল্লেখ আছে, পিতা দেবেন্দ্রনাথ পুত্র রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রতি মাসে অন্তত একটি চিঠি প্রত্যাশা করেছেন। আর দেখতে চেয়েছেন ব্যারিস্টার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে।
রবি পিতাকে হতাশ করেছেন। তিনি ব্যারিস্টার হতে পারেননি, আরো অনেক বড় কবি হয়েছেন।)
স্ত্রী শিক্ষার বৃদ্ধি ঘটুক, স্বাধীনতার নয়!
সেকালের প্রেক্ষাপটে শক্তিশালী ও অনমনীয় বিপ্লবী ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। শেরি-শ্যাম্পেন খেয়ে জাতিভেদের নিকুচি করে সত্য ধর্ম ব্রাহ্ম ধর্ম প্রতিষ্ঠা করলেন, দীক্ষিত হলেন, দীক্ষিত করলেন, এক জীবনের বিলাসব্যসন ছাড়লেন। তত্ত্ববোধিনী সভাস্থাপন করলেন, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা বের করলেন। ঘরে ও বাইরে নারী শিক্ষা উত্সাহিত করলেন। কিন্তু নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি রয়ে গেলেন অনমনীয় রক্ষণশীল। সমীর সেনগুপ্ত লিখেছেন: ‘তিনি স্ত্রী শিক্ষার সমর্থক ছিলেন, কিন্তু স্ত্রী স্বাধীনতার বিরোধী ছিলেন বললে অত্যুক্তি হয় না। সত্যেন্দ্রনাথ বিলাত থেকে পিতার অনুমতি চেয়েছিলেন পত্নীকে সেখানে নিয়ে যাবার, দেবেন্দ্রনাথ তদুত্তরে তাঁকে লিখে জানিয়েছিলেন, তিনি যেন পরিবারের মান মর্যাদায় হস্তক্ষেপ না করেন। যৌথ পরিবারের প্রথম কন্যা হিসেবে সরলা দেবী (দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতনি, স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা) যখন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে মহীশুরে চাকরি করতে গেলেন, দেবেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “সরলা যদি অঙ্গীকার করে জীবনে কখনো বিয়ে করবে না, তাহলে আমি তার তলোয়ারের সঙ্গে বিয়ে দিই যাবার আছে’।”
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর অকালপ্রয়াত কনিষ্ঠ ভ্রাতা নগেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তার বিধবা পত্নী ত্রিপুরাসুন্দরীকে মামলা-মোকদ্দমার জালে ফেলে যেভাবে হেনস্তা ও বঞ্চিত করেছেন তাতে মহর্ষির মাহাত্ম্য ধুলোয় মিশে যায়।
দেবেন্দ্রনাথের আরেক খ্যাতিমান নাতনি প্রথম ভারতীয় আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর কন্যা ইন্দিরা দেবীর স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে:
‘...যতদিন মহর্ষি ছিলেন, তাঁর অর্থবল ও চরিত্রবলে তিনি ঘরজামাই রেখে, কুলীনের ঘর ভাঙ্গিয়ে নিজ পরিবারে নিজ মত সমর্থন করেছেন... মজা এই যে, যেখানে কোনো বিশিষ্ট হিন্দুসমাজের বংশধরকে এঁরা স্বপরিবারভুক্ত করে সমাজচ্যুত করতেন, সেখানে তাদের কর্তৃপক্ষ অভিশাপ দিয়েছেন তাও যেমন শুনেছি আবার মহর্ষির পরিবারের কেউ তাঁর নিয়মভঙ্গ করলে তিনি অভিশাপ দিয়েছেন তাও শুনেছি।’
স্ত্রী মৃত্যুশয্যায়— এ বার্তা তাকে বিচলিত করেনি, তিনি ঘুরেফিরে তপস্যা করে নিজের সময়মতো বাড়ি ফিরেছেন। আবার স্ত্রী সম্ভোগ থেকে বিরত রয়েছেন পনের সন্তানের জন্ম সে সাক্ষ্য দেয় না।
বৈপরীত্যগুলো উপেক্ষা না করেও, তাঁকে নিয়ে ধর্মীয় প্রশস্তিগুলো আমলে না নিয়েও জোর দিয়ে বলা যায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা এবং ভারতের আধুনিকতার অন্যতম একটি স্তম্ভ।
দ্বিশত জন্মবার্ষিকীতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অশেষ শ্রদ্ধা।






