মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী তিনি তার মৃত্যুর পরে প্রকাশের নির্দেশ দিয়ে যান। গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের স্বত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। আত্মজীবনীতে দেখা যায় বিপুল বৈভবের উত্তরাধিকারী হয়েও তিনি ঋষির মতো সাধারণ জীবন বেছে নিয়েছিলেন। পুরো আত্মজীবনীতেই প্রকাশিত হয়েছে তার আধ্যাত্মিক চিন্তা ও ঈশ্বরপ্রেম। হাফিজের কবিতা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। মহর্ষির আত্মজীবনীর অংশবিশেষ—

 

ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ

আমি কাশী হইতে ফিরিয়া আসিয়া দেখি যে, আমাদের হাউস কার-ঠাকুর কোম্পানী টল্মল্ করিতেছে। হুণ্ডী আসিতেছে, তাহা পরিশোধ করিবার টাকা সহজে জুটিতেছে না। অনেক চেষ্টায়, অনেক কষ্টে, প্রতিদিন টাকা যোগাইতে হইত। এমন করিয়া আর কত দিন চলে? এই সময়ে এক দিন একটা ত্রিশ হাজার টাকার হুণ্ডী আসিল; সে টাকা আর দিতে পারা যাইতেছে না। সে দিন সন্ধ্যা হইল, টাকা জুটিল না। হুণ্ডীওয়ালা টাকা না পাইয়া হুণ্ডী লইয়া ফিরিয়া গেল। কার-ঠাকুর কোম্পানীর হাউসের সম্ভ্রম চলিয়া গেল, আফিসের দরজা সকল বন্ধ হইল।

১৭৬৯ শকের ফাগুন মাসে১ কার-ঠাকুর কোম্পানীর বাণিজ্য-ব্যবসায় পতন হইল। তখন আমার বয়স ৩০ বৎসর। প্রধান কর্মচারী ডি এম্ গর্ডন্ সাহেবের পরামর্শে সমস্ত পাওনাদারদিগকে ডাকিয়া একটা সভা করা গেল। ব্যবসায় পতনের তিন দিবস পরে হাউসের তৃতীয় তল গৃহে উঁহারা সকলে সমবেত হইলেন। ডি এম্ গর্ডন্ আমাদের দেনাপাওনার একটা হিসাব প্রস্তুত করিয়া এই সভাতে উপস্থিত করিলেন। সেই হিসাবে দেখান হইল যে, আমাদের হাউসের মোট দেনা এক কোটি টাকা, পাওনা সোত্তর লক্ষ টাকা; ত্রিশ লক্ষ টাকার অসংস্থান। তিনি সভার সম্মুখে বলিলেন যে, ‘হাউসের অধিকারীরা আপনার আপনার নিজের যে কিছু সম্পত্তি আছে, তাহাও ইহাতে দিয়া ইহার অসংস্থান পূর্ণ করিতে প্রস্তুত আছেন। এই হাউসের পাওনা ও সম্পত্তি, এবং ইঁহাদের জমিদারীর স্বত্ব, সকলি আপনারদের অধীনে আনিয়া আপন আপন পাওনা পরিশোধ করুন। কিন্তু একটি ট্রষ্ট-সম্পত্তি আছে, তাহাতে তাঁহারা অধিকারী নহেন, কেবল সেই সম্পত্তির উপরে আপনারা হস্তক্ষেপ করিতে পারিবেন না।’ গর্ডন্ এইরূপ বক্তৃতা করিতেছেন, আমি গিরীন্দ্রনাথকে বলিলাম, ‘গর্ডন্ সাহেব পাওনাদারদিগকে ভয় দেখাইতেছেন যে, আমাদের ট্রষ্ট-সম্পত্তিতে কেহ হস্তক্ষেপ করিতে পারেন না। এ সময় আমাদের নিজে অগ্রসর হইয়া বলা উচিত, “যদিও আমাদের দেনার দায়ে ট্রষ্ট-সম্পত্তি কেহ হস্তান্তর করিতে পারেন না, তথাপি আমরা এই ট্রষ্ট ভাঙ্গিয়া দিয়া ঋণপরিশোধের জন্য ইহাও ছাড়িয়া দিতে প্রস্তুত আছি।” যাহাতে আমরা পিতৃঋণ হইতে একেবারে মুক্ত হইতে পারি, সেই পথই অবলম্বন করা শ্রেয়। যদি অন্যান্য সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া ঋণ পরিশোধ না হয়, তবে ট্রষ্ট-সম্পত্তিও বিক্রয় করিতে হইবে।’

এদিকে, পাওনাদারেরা, কতকগুলা সম্পত্তির উপরে তাঁহাদের হস্তক্ষেপ করিবার ক্ষমতা নাই শুনিয়া বড় সন্তুষ্ট হইতেছেন না; কিন্তু যখন তাঁহারা অনতিবিলম্বেই শুনিলেন যে, কোন আইন-আদালতের মুখাপেক্ষা না করিয়া আমরা স্বেচ্ছাক্রমে অকাতরে ট্রষ্ট-সম্পত্তির সহিত আমাদের সকল সম্পত্তিই তাঁহাদের হস্তে দিতে প্রস্তুত আছি, তখন তাঁহারা স্তম্ভিত হইলেন। দেখিলাম, আমাদের এই প্রস্তাব শুনিয়া অনেক সহূদয় মহাজনের চক্ষু হইতে অশ্রুপাত হইল। আমাদের এই আসন্ন বিপদ দেখিয়া তাঁহারাও বিষণ্ন হইলেন। তাঁহারা দেখিলেন যে, এই হাউসের উত্থান ও পতনে আমাদের কোন হস্ত নাই; আমরা নির্দ্দোষ ও নিরীহ; আমাদের মস্তকে এই অল্প বয়সে এই দারুণ বিপদ পড়িল। আজ আমাদের এই ঐশ্বর্য্য বিভব, কাল আর ইহার কিছুই আমাদের থাকিবে না, ইহাই ভাবিয়া তাঁহারা দয়ার্দ্র হইলেন। কোথায় তাঁহাদের ক্ষতি হইয়াছে বলিয়া ক্রুদ্ধ হইবেন, না, তাঁহারা দয়ার্দ্র-হূদয় হইলেন। এই সময়ে তাঁহাদের হূদয়ে কোথা হইতে দয়া আইল? তিনিই ইঁহাদের মনে দয়া প্রেরণ করিলেন, যিনি আমার চিরজীবন-সখা।

তাঁহারা প্রস্তাব করিলেন যে, যখন ইঁহারা সকলি ছাড়িয়া দিলেন, তখন ইঁহাদের সম্পত্তি হইতে ভরণপোষণের জন্য ইঁহারা প্রতি বৎসর ২৫০০০ ্ পঁচিশ হাজার টাকা করিয়া পাইবেন। দেনাদার পাওনাদারদিগের মধ্যে এইরূপে একটা সদ্ভাব রহিয়া গেল। কেহ আর তখন আপনার পাওনার জন্য আদালতে নালিশ আনিলেন না। আমাদের সকল সম্পত্তি তাঁহারা আপন হাতে গ্রহণ করিলেন, এবং সেই বিষয় চালাইবার জন্য তাঁহাদের মধ্যের প্রধান প্রধান ব্যক্তিদিগকে লইয়া একটি কমিটি সংগঠিত করিলেন। সেই কমিটির একজন সম্পাদক হইলেন, তাঁহার বেতন এক হাজার টাকা হইল; তাঁহার অধীনে আরও কর্ম্মচারী থাকিল। এখন হইতে ‘কার-ঠাকুর কোম্পানী ইন্ লিকুইডেশন্’ নামে তাঁহাদের কার্য্য চলিতে লাগিল।

আমাদের সকল সম্পত্তির উপরে পাওনাদারেরা আপন কর্ত্তৃত্ব স্থাপন করিয়া সভাভঙ্গ করিলেন। আমরা দুই ভাই বাড়ী চলিলাম। গাড়ীতে যাইতে যাইতে আমি গিরীন্দ্রনাথকে বলিলাম, ‘আমরা তো বিশ্বজিত্ যজ্ঞ করিয়া সকলি দিলাম।’ তিনি বলিলেন, ‘হাঁ, এখন লোকে জানুক, আমাদের জন্য আমরা কিছুই রাখি নাই; তাহারা বলুক যে, ইঁহারা সকল ধন দিলেন, সর্ব্ববেদসং দদৌ৬।’ আমি বলিলাম যে, ‘লোকে বলিলে কি হইবে? আদালত তো শুনিবে না। আদালতে যে কেহ একজন নালিশ করিলেই আমাদের শপথ করিয়া বলিতে হইবে যে, আমরা সকলি দিলাম, আমাদের আর কিছুই নাই; নতুবা আদালত আমাদিগকে ছাড়িবে না। কিন্তু, যাবত্ অঙ্গে একটি চীর পর্য্যন্ত থাকিবে, তাবত্ রাজদ্বারে দাঁড়াইয়া শপথ করিয়া বলিতে পারিব না যে, সব দিলাম। এমনি সকলি দিব, কিন্তু শপথ করিতে পারিব না। ঈশ্বর ও ধর্ম্ম আমাদিগকে রক্ষা করুন, যেন ইন্সলেবণ্ট্ আইনে আমাকে মস্তক দিতে না হয়।’ এই সকল কথাবার্ত্তার আমরা বাড়ী পঁহুছিলাম।

আমি যা চাই, তাই হইল। বিষয়সম্পত্তি সকলি হাত হইতে চলিয়া গেল। যেমন আমার মনে বিষয়ের অভিলাষ নাই, তেমনি বিষয়ও নাই; বেশ মিলে গেল!

[দর্ আঁ হনা কে জুজ্. বরক্. অন্দর্ তলব্ ন বাশদ্

গর্ খি.র্মনে্ বেসোজ.দ্ চন্দে অ. জব্ ন বাশদ্।

দীবান্ হাফি.জ্. ১৮১।১]

‘সেই অভিলাষে—বিদ্যুতের প্রার্থনা ছাড়া আর কোন প্রার্থনা না থাকুক, যদি বিদ্যুত্ পড়িয়া ধনধান্য জ্বলিয়া যায়, তবে সে বড় আশ্চর্য্য নহে।’ ‘বিদ্যুত্ পড়ুক, বিদ্যুত্ পড়ুক’, বলিতে বলিতে যদি বিদ্যুত্ পড়িয়া সব জ্বলিয়া যায়, তবে তাহাতে আর আশ্চর্য্য কি? আমি বলি যে, ‘হে ঈশ্বর, আমি তোমা ছাড়া আর কিছু চাই না।’ তিনি প্রসন্ন হইয়া এ প্রার্থনা গ্রহণ করিলেন; গ্রহণ করিয়া আমার নিকটে প্রকাশ হইলেন, এবং আর সব কাড়িয়া লইলেন। ‘দমড়ীকী ঠুড্ডিয়াঁ মুয়েস্সর নহী ঁ, কে চিবাকে পানী পিয়ুঁ।’ যাহা প্রার্থনাতে ছিল, তাহা পূর্ণ হইয়া এখন কার্য্যে পরিণত হইল।

সে শ্মশানের সেই এক দিন, আর অদ্যকার এই আর-এক দিন! আমি আর-এক সোপানে উঠিলাম। চাকরের ভিড় কমাইয়া দিলাম, গাড়ী ঘোড়া সব নিলামে দিলাম, খাওয়া পরা খুব পরিমিত করিলাম; ঘরে থাকিয়া সন্ন্যাসী হইলাম। কল্য কি খাইব, কি পরিব, তাহার আর ভাবনা নাই। কাল এ বাড়ীতে থাকিব, কি, এ বাড়ী ছাড়িতে হইবে, তাহার ভাবনা নাই। একেবারে নিষ্কাম হইলাম। নিষ্কাম পুরুষের যে সুখ ও শান্তি, তাহা উপনিষদে পড়িয়াছিলাম; এখন তাহা জীবনে ভোগ করিলাম। চন্দ্র যেমন রাহু হইতে মুক্ত হয়, আমার আত্মা তেমনি বিষয় হইতে মুক্ত হইয়া ব্রহ্মলোককে অনুভব করিল। ‘হে ঈশ্বর, অতুল ঐশ্বর্য্যের মধ্যে তোমাকে না পাইয়া প্রাণ আমার ওষ্ঠাগত হইয়াছিল; এখন তোমাকে পাইয়া আমি সব পাইয়াছি।’

না; সেই প্রার্থনার ফলে [সেই বিদ্যুত্ পড়িয়া] আমার শস্যাগার (অর্থাত্ ধন-সম্পত্তি) ভস্মীভূত হইয়া যায়, তাহাতে বিশেষ আশ্চর্য্যের বিষয় কিছুই নাই।’ প্রথম পংক্তির অন্তিম অর্থ ‘না থাকুক’ বলার চেয়ে ‘ছিল না’ বলাই অধিক ঠিক।

এই সময়ে আমি সকালে দুই প্রহর পর্য্যন্ত গভীর দর্শন-শাস্ত্রের চিন্তায় নিমগ্ন থাকিতাম। দুই প্রহরের পর সন্ধ্যা পর্য্যন্ত বেদ বেদান্ত মহাভারত প্রভৃতি শাস্ত্রের আলোচনায়, ও বাঙ্গালা ভাষায় ঋগ্বেদের অনুবাদে, নিযুক্ত থাকিতাম। সন্ধ্যার সময় ছাদের উপর প্রশস্ত কম্বল পাতিয়া বসিতাম। সেখানে আমার কাছে বসিয়া ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসু ব্রাহ্মেরা, ধর্ম্ম-জিজ্ঞাসু সাধুরা, নানা শাস্ত্রের আলোচনা করিতেন। এই আলোচনাতে কখন কখন রাত্রি দুই প্রহরও অতিবাহিত হইয়া যাইত। সেই সময় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার প্রবন্ধ সকলও পরিদর্শন করিতাম।

হাউস পতনের তিন চারি মাস পরে গিরীন্দ্রনাথ একদিন আমাকে বলিলেন যে, ‘এত দিন চলিয়া গেল, কিন্তু ঋণের তো কিছুই পরিশোধ হয় না। কেবল সাহেবেরা বসিয়া মাহিয়ানা খাইতেছে। এ প্রকার ব্যবস্থাতে ঋণ যে পরিশোধ হইবে, তাহা তো আশা করা যায় না। এরূপ করিয়া চলিলে আমাদের ঘর বাড়ী বিক্রয় করিয়াও ঋণ হইতে নিষ্কৃতি পাইতে পারিব না। অতএব আমি পাওনাদারদের কমিটিতে এই প্রস্তাব করিতে চাই যে, যদি তাঁহারা সমুদায় কার্য্যের ভার আমাদের হাতে দেন, তবে আমরা আপনারা চেষ্টা করিয়া অল্প ব্যয়ে অনতি-দীর্ঘকালে ঋণ পরিশোধের একটা উপায় করিতে পারি।’ আমি বলিলাম যে, ‘এ তো বড় উত্কৃষ্ট প্রস্তাব।’ পরে আমরা পাওনাদারদিগের সভাতে এই প্রস্তাব উত্থাপন করিলাম। তাঁহারা আহ্লাদপূর্ব্বক বিশ্বস্ত চিত্তে ইহাতে সম্মত হইলেন। তাহার পরে কাজ কর্ম্ম চালাইবার ভার আমরা নিজে গ্রহণ করিয়া আমাদের বাড়ীতেই আফিস উঠাইয় আনিলাম, এবং সেই আফিসে এক জন সাহেব ও এক জন কেরাণী নিযুক্ত করিলাম। এখন আমাদের বাড়ীতে বসিয়াই কার-ঠাকুর কোম্পানীর ঘুড়ীর লক্ গুটাইতে লাগিলাম। মধ্যপথে এখন তাহা না ছিঁড়িলে হয়!