গুনে বলতে পারব মাকে জীবনে কতবার বাড়ির বাইরে যেতে দেখেছি। সেদিন ডাক্তারের কাছে যাওয়ার দিনটা সেই হিসাবের মধ্যে চলে এল। তারপর ডায়াগনস্টিক ল্যাব, এটা-ওটা কত্ত কি টেস্ট... মায়ের কোনো বিকার নেই; বাড়িতে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকার মতোই দেখাচ্ছিল তাকে, যেন কোনো সিনেমা দেখছে। যেখানে বসিয়ে দেয়া হয়েছে, তার সামনের দেয়াল কী মানুষজনের চলাচলের দিকে একভাবে তাকিয়ে ছিল। ওই রুমে রক্ত দিন, এই রুমে এক্স-রে, তিন তলায় গিয়ে সিটি স্ক্যান করে আসুন... একের পর এক নির্দেশে চাবি দেয়া পুতুলের মতো ওঠা-বসা করছিল। আজ মা বাইরে গেছে কম করে হলেও আট বছর পর। সম্ভবত সাত-আট বছর আগে একবার আমার ডেঙ্গুজ্বরের কারণে হাসপাতালে তাকে দিন চারেক থাকতে হয়েছিল। এই যে এত দিন পর পর মা বাইরে বের হয়, দ্রুত পরিবর্তনশীল এ শহরের প্রতিটি রাস্তার প্রতিটা মোড়ের আমূল বদলে যাওয়া, নিচু বাড়ি উধাও হয়ে সেখানে পায়রার খোপের মতো বাকসো তৈরি হওয়া, এরই মধ্যে রাস্তায় নামা নতুন কোনো যান, ভিমরুলের চাকের মতো গিজগিজ করা মানুষের দল—কোনো কিছু দেখেই অবাক হয় না। কোনো প্রশ্ন করে না। মায়ের সব কৌতূহল শুধু বাড়ির ভেতরকে কেন্দ্র করে। আজ বাইরে বেরিয়ে মায়ের মুখটা হাবাগোবা হয়ে গিয়েছিল। আমি কয়েকবার সেদিকে ফিরে দেখছিলাম। দেখতে অনেকটা মানসিক প্রতিবন্ধী গোছের মনে হচ্ছিল। আমি লক্ষ করেছি, চিন্তাশক্তিহীন মানুষের মুখ বোধশূন্য হয়; বিস্ময়, বিরক্তি কি উচ্ছ্বাস-আতঙ্ক—কিছুই চোখে-মুখে খেলে না। আমি যে তার দিকে কয়েকবার পাশ ফিরে তাকালাম, মা তা-ও খেয়াল করল না। অথচ বাড়িতে মায়ের মুখ একেবারে অন্য রকম, যাকে বলে সদা-সতর্ক। আমার দিকে তো বটেই, এমন কিছু নেই যে ব্যাপারে মায়ের খেয়াল নেই। মৌমাছির মাথার উপরে যেমন অ্যান্টেনার মতো দুটি তার সোজা উপরের দিকে উঠে থাকে, দেখলে মনে হয় ওগুলো নাড়িয়ে আগুপিছু বুঝে নিয়ে চলছে, মায়ের মাথার উপরেও ও রকম অদৃশ্য দুটি তার আছে। আর কেউ না জানলেও আমি জানি। আর মায়ের অ্যান্টেনা দুটি সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে, যখন নানা আমাদের বাড়িতে আসেন। মা তখন আমার কাছ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরে না। মায়ের এ ব্যাপারটা আমি ছোটবেলা থেকে খেয়াল করেছি।
লোকালয়ের মধ্যে অদ্ভুত এক বিচ্ছিন্ন জীবনে নানাই আমাদের বাড়ির একমাত্র অতিথি। তবে আমার নানা বলে যে আমাদের বাড়িতে যখন-তখন আসেন, তা নয়। তারও আসার নির্দিষ্ট কিছু দিনক্ষণ আছে। যেদিন আমাদের বাড়িতে খাবার শেষ হয়ে যায়, সেদিন নানা বাজারের বড় ব্যাগ নিয়ে আসেন। যেদিন আমাদের বাড়িভাড়া কি কোনো বড়সড় বিল দিতে হয়, তার ঠিক আগের সন্ধ্যায় নানা এসে টাকা দিয়ে যান। আর নানা এলে মা আমাদের দুজনের সামনে থেকে সরে না। মা হয়তো রান্না করছে, এমন সময়ে নানা এল। চাপানো রান্নার হাঁড়ির নিচে চুলা বন্ধ হয়ে গেল, মা আমার কাছে এসে বসে থাকল। কাপড় ধুতে থাকলে কাপড় সাবান-পানিতে ঘোলা হয়ে পড়ে থাকল। ঘর ঝাড়ু দিতে থাকলে ঘরের মাঝখানে গোটানো ধুলোর ছোট্ট ঢিবির পাশে ঝাড়ুটা গড়াগড়ি খেতে থাকল। ছোটবেলায় আমি ব্যাপারটা নিয়ে ভাবিনি বটে। তবে আমার স্মৃতিতে ছোটকাল থেকে একের পর এক দিনের দৃশ্যগুলো এমনই। খানিকটা বড় হলে টুকরো স্মৃতির সঙ্গে আরেক টুকরো জোড়া দিয়ে মালা গেঁথে নিয়েছি। তারপর দুলতে থাকা মালার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠেছি। কিন্তু মুশকিল ছিল, মাকে জিজ্ঞাসা করতে গেলে হয় এড়িয়ে যায়, নয়তো চুপ করে থাকে। আমার স্কুলের বন্ধুদের পরিবার কত অন্য রকম, বাবা-মা-ভাই-বোন নিয়ে তারা যেন অন্য গ্রহের জীব। তাদের মায়েরা কত জায়গায় যায়! তাদের মায়েরা আমার মায়ের চেয়ে ঢের বুড়িয়ে গেছে, প্রায়ই রঙিন চুলের গোড়ায় বেশির ভাগ পাকা চুল বেরিয়ে পড়ে। সেই হিসেবে আমার মাকে দেখলে যে কেউ বুঝবে সে আমার চেয়ে সামান্য বড়। এসব তুলনা করতে গিয়ে আমার মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন আসে। মা নীরব থাকে। কৌতূহল বাড়তে বাড়তে বাড়তে একসময় মরে যায়। কিন্তু স্মৃতি তো মরে না! নানা এসেছেন আর মা আমার কাছে নেই, এমনটা কোনো দিন হয়নি। এই যে দিনের পর দিন নানা বাজার করে দিয়ে যাচ্ছেন, এসে বসে থাকছেন, মা উঠে গিয়ে তাকে খাবার দেয় না, চলে যেতে চাইলে বসতে বলে না। বড় হতে হতে এসব আমার চোখে অস্বাভাবিক লাগত। যেহেতু নানা ছাড়া আমাদের বাড়িতে কেউ আসত না, যেহেতু আমাদের বাড়িটা পৃথিবীর দুর্গম কোনো দ্বীপের একমাত্র আবাস, যেখানে শুধু নানার নৌকা ভেড়ে, তাই দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ মানেই নানার আগমন। বাথরুমে থাকলে মাকে ভেজা শরীরেই কাপড় পরে বেরিয়ে আসতে হয়; শুধু আমার আর নানার মাঝখানে এসে বসার জন্য। এমনিতে নানার জন্য দরকারের বাইরে একটি কথাও মা খরচ করে না, আসে শুধু আমাদের মাঝখানে নীরব বসে থাকার জন্য। আর ঠিক ওই অবস্থায় তখন আমি মায়ের মাথার উপরে ক্রমাগত নড়তে থাকা, পর্যায়ক্রমে কিছু খুঁজতে থাকা অ্যান্টেনা দুটিকে স্পষ্ট দেখতে পাই। মাছির পুঞ্জাক্ষির মতো মা তখন আমাদের ঘরের আনাচে কানাচে, প্রতিটি দিকে একসঙ্গে দেখতে পায়।
ছোটবেলা আমি গান গাইলে, ছড়া কি যেকোনো কথা বললেই নানা হাসতে থাকতেন। নানা যত হাসতেন, মা তত গম্ভীর হয়ে যেত। ছোট্ট বাসাটার মধ্যে একলা থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠে আমি মনে মনে নানা আসার অপেক্ষা করতাম। ভাবতাম আজ নানা এলেই হয়েছে, আমি তার সঙ্গে বাইরে চলে যাব। নানা প্রায়ই আমাকে পার্কে কিংবা কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলতেন। আমি সে রকম একটা কোথাও যাওয়ার জন্য বরাবর তৈরি ছিলাম কিন্তু মা সেই কথা শুনলেই চমকে উঠত। কেঁপে উঠে চোখ বড় করে বলত, ‘না না, আমি নিজেই তোমাকে নিয়ে যাব কোনো দিন।’ সেই কোনো দিন আমাদের জীবনে কোনো দিনও আসেনি। বাইরে যাওয়ার কথা বললেই মনে হতো মা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ওদিকে নানার সঙ্গে যাব বলে জিদ ধরলে মা আমাকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে শোয়ার ঘরে বন্ধ করে রাখত। নানার অনুরোধ-অনুনয় কিছুই মা শুনতে পেত না তখন। কাঁদতে কাঁদতে একসময় আমার কান্না ফুরিয়ে যেত, ঘরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে মেঝেতে বসে থাকতাম। অনেকক্ষণ কান্নার শব্দ না পেলে মা দরজা খুলে দিত। আমি জানতাম ততক্ষণে নানা চলে গেছেন। তাই বেরিয়ে আসতাম না। পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসে ভাবতাম, বাবা বহু আগে মরে গেছে, বেশ হয়েছে। বেঁচে থাকলে এই পাগল মহিলার অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখলে এমনিতেই মরে যেত।
তবে বড় হতে হতে এসব আমার কাছে প্রতিদিনকার ঘটনা হয়ে উঠেছে। একসময় আমি জেনে গিয়েছি আমার জীবনটা এমনই। আমার জীবনটা আমার মতো, অন্যেরটা অন্যের। তবু প্রায়ই খামোখা আগুপিছু ভাবতে বসি আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবতেই থাকি। যেমন মাকে নিয়ে সেদিন ক্লিনিক থেকে বাড়িতে ফেরার পর থেকে ভাবছি তো ভাবছিই। মা তখন আমার কাছে এসে দাঁড়াল; বলল, ‘কী এত ভাবতেছিস তুই? আমার কিচ্ছু হবে না।’ চমকে উঠে বললাম, ‘সেইটা তো জানিই। সন্ধ্যায় রিপোর্ট দিবে। ডাক্তার কিছু ওষুধটসুধ দিতে পারে আর কী। তুমি আসলে নিয়মকানুন মানো না, সেজন্যই এত ঘন ঘন জ্বর হচ্ছে।’
‘হ্যাঁ, নিয়ম মানি না, বলছে তোকে! কিন্তু তেমন কিছু হয়ে যদি মরেটরে যাই, তাহলে একটা সমস্যা আছে।’
‘খালি একটা সমস্যা?’
‘না মানে, তাহলে মরার আগে তোকে একটা কথা...’
‘খালি একটা কথা? কী কথা, এখনই বলো দেখি...’
‘নাহ্, এখন না,’ এতক্ষণের সপ্রতিভ ভাব চলে গিয়ে মায়ের কণ্ঠস্বর দৃঢ় শোনাল। ঠিক যেমন দৃঢ়তার পরে আমাদের সব কথোপকথন ঘুরেফিরে একই বিন্দুতে এসে দাঁড়ায় আর সমাধানহীনতায় ভোগে। বুঝলাম, কথা বাড়ানোর মানে নেই।
সন্ধ্যায় রিপোর্ট আনতে গিয়ে দেখি ঝামেলা। ডাক্তার বললেন, টেস্ট রিপোর্ট দেখে কী সব সন্দেহ করছেন, তাই কালকে আরো কিছু টেস্ট করাতে হবে। বাসায় ফিরে মাকে বলতেই রেগে গেল, ‘আরে কিছুই হয় নাই আমার, এই দেখ এখন জ্বর নাই, আছে?’ মা আমার হাত টেনে তার কপালে রাখল, ‘এইসব হইল ডাক্তারদের পয়সা খাওয়ার ধান্দা।’ আমি বললাম, ‘না, মা, তোমাকে কাল যেতেই হবে।’ ঠোঁট উল্টিয়ে মা আমার কথা উড়িয়ে দিল। তারপর রাতে তুমুল জ্বর আসাতে পরের দিন সুড়সুড় করে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিল।
এরপর প্রতীক্ষার দুটি দিন যে কত ধীরে কাটল বলতে পারব না। দুদিন পরে গিয়ে রিপোর্ট আনলাম; মায়ের মাথায় টিউমার। ক্যান্সার এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে করার কিছু নেই, ভাবলেশহীন গলায় ডাক্তার জানিয়ে দিলেন, ‘হতে পারে দুই মাস। তবে ঘটনাটা দুই সপ্তাহ পরে ঘটলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।’ বলার আগে একবার অবশ্য জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনি কেন, বাড়ির বড় কেউ আসেনি?’ আমি তখন মায়ের মতো দৃঢ় গলায় বলেছি, ‘আমিই বড়। আমি কলেজে পড়ি।’ কিন্তু রিপোর্ট জানার পরে আর ততটা দৃঢ়তা নিয়ে ডাক্তারের দিকে তাকাতে পারিনি। আশেপাশের সবকিছুও ঝাপসা হতে শুরু করেছিল। ডাক্তারের কথার মানে হলো গিয়ে, এই পৃথিবীতে মা থাকবেন না আর আমি একলা পড়ে থাকব? তখন কেন যেন আমার নানার কথা একবারও মনে এল না। মা ছাড়া আমি একা, এই একমাত্র সত্য ভাবনাটা ডাক্তারের কথার বাতাসে ভীতসন্ত্রস্ত পাতার মতো থরো থরো কাঁপতে লাগল। চেয়ার থেকে উঠতে পারছিলাম না কিন্তু ডাক্তারের চেম্বারে তো আমি চিরকাল বসে থাকতে পারি না। সন্ধ্যানাগাদ ক্লিনিকের ফাইল হাতে বাড়ি ফিরলাম। মা অবহেলার চোখে ফাইলের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘হলো তো? শান্তি হয়েছে এবার?’ আমাকে কিছু বলতে না দেখেও মায়ের মুখ বদলাল না, যথারীতি টিভিতে মনোযোগী হলো। পাশে বসে আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মনোযোগ পেতে হলে বিজ্ঞাপন বিরতি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বিরতি হতেই মা টিভি বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল। মা কি তীক্ষ দৃষ্টিতে আমার মনের কথা বুঝে ফেলেছে? আমার শরীর গুলিয়ে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল। কিন্তু মায়ের নিষ্পাপ আর কৌতূহলী মুখের সামনে কেন যেন পাথর হয়ে গেলাম। ‘কী রে, কী হলো বললি না?’— মা জানতে চাইল। আমি একই রকমের পাথর। মা আমার ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলল, ‘আরে বাবা, ডাক্তার বললটা কী?’ আমি জানি উত্তরটা দেয়ামাত্র মায়ের মুখটা নানা আমাদের বাড়িতে আসার সময়ের মতো হয়ে যাবে; সব সাবলীলতা মুহূর্তে উধাও হয়ে যাবে। কলেজের ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় আমি একদিন দুটি ব্লটিং পেপারকে পানিতে আচ্ছামতো ডুবিয়ে ধরে ছিলাম আর মনে মনে বলছিলাম, পারলে পৃথিবীর সব ব্লটিং পেপার আমি এভাবে পানিতে চুবিয়ে রাখতাম; কারণ এদেরই কেউ আমার মায়ের মুখের ওপর থেকে হুট করে তাবৎ আনন্দ শুষে নিতে পারে। কিন্তু এখন কী বলব মাকে, বলব, তুমি মরে যাচ্ছ? বলব, শোনো, আর দু-তিন সপ্তাহ আছ; কী কী খেতে ইচ্ছে করে তোমার? কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তরে মা নিশ্চিত ‘না’ বলে দেবে।
‘কী হইছে, রিনি? খারাপ কিছু?’ মায়ের চিন্তিত মুখ আর ধীর প্রশ্নে আমি হড়বড় করে বলে বসলাম, ‘কী যেন একটা কথা মরার আগে তোমার আমাকে বলতেই হবে, মা?’ আমার ঘাড় থেকে মায়ের হাতটা গলে পড়ে গেল। কোলের উপরে পড়ে থাকা অসাড় হাতটার মতোই চোখ দুটিও স্থির হয়ে থাকল আমার দিকে।
‘কত দিন?’
‘কথাটা কী, মা?’
‘তুই আগে বল আমি আর কত দিন আছি।’
‘মানে, মানে, ডাক্তার বলল, যে কোনো দিন, সপ্তাহ কি মাস...’ জড়ানো জিভে শব্দগুলো হোঁচট খেতে খেতে বেরোল। বলে নিয়েই আমি মায়ের কোলে লুটিয়ে পড়লাম। আমরা দুজন কতক্ষণ কাঁদলাম, কে জানে। ফাঁকে ফাঁকে থেমে নিয়ে মা আমার মাথায় হাত বোলাতে লাগল। আদুরে গলায় বলল, ‘সবাই তো মারা যাবে রে, আগে আর পরে।’ পরক্ষণেই গলাটা হঠাৎ দৃঢ় হয়ে এল, ‘তবে কথাটা যে তোকে বলতেই হবে। না বলাটা অন্যায়, তা ছাড়া, তোরও তো নিজেকে বাঁচাইতে হবে। কিন্তু...’ তারপর আবার কান্না। মায়ের না-থাকার চিন্তা ছাপিয়ে তখন কোনো কথা বলা না-বলার ন্যায়-অন্যায়ের চিন্তা আমার মাথায় খেলল না। এরই মধ্যে সন্ধ্যার ফেলে যাওয়া আবছা আলো আমাদের মাঝখানে অদ্ভুত বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিল। কান্নার দমক যত কমে এল, মনের মধ্যে বাজতে লাগল, কি কথা, কি এমন কথা, কি সেই কথা! আসন্ন মৃত্যুর ভয়াবহতার চেয়েও জরুরি কি সে কথা? অথচ মুখে বললাম, ‘আমার এখন কিছু শুনতে ভালো লাগতেছে না, মা। শোনো, ডাক্তার বলছে কেমোথেরাপিতে কোনো কাজ হবে না, তবে চাইলে আমরা চেষ্টা করে দেখতে পারি। আমি কিন্তু কালকেই তোমাকে নিয়ে যাব। অসুখ হবে কিন্তু চিকিৎসা করব না, এটা কোনো কথা হলো?’
‘সেসব অনেক টাকার ব্যাপার, রিনি। ডাক্তার যখন বলছেই, তখন আর কেন অযথা...’
‘টাকা লাগলে সমস্যা কী? আমি নানাকে বলব যে...’
‘না।’
কোল থেকে আমার মাথাটা বেতের চেয়ারের উপরে ফেলে দিয়ে মা চলে গেল। সত্যিই তো, আমার টাকা নেই, আমি তো আসলে সে রকম বড় নই যেমনটা ডাক্তারকে বলেছি, তাহলে এখন মায়ের চিকিৎসা কী করে হবে? অন্ধকার ঘরে একভাবে কাঁদতে কাঁদতে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
ভোরে ঘুম ভেঙে দেখি মায়ের মুখটা আমার মুখের ঠিক সামনে। হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে মা আমার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। দুই চোখের পানি গাল বেয়ে গড়াচ্ছে। অবাক হলাম না। হাত বাড়িয়ে তার গলাটা জড়িয়ে ধরলাম। সে আমার কানে কানে বলল, ‘পৃথিবীটা খুব কঠিন জায়গা, রিনি।’ আমিও তার কানে কানে বললাম, ‘এটা তো অনেকবার বলছ, মা।’
‘বলছি?’
‘হুম।’
‘এখানে নিজেকে রক্ষা করা যে খুব কঠিন, সেটা বলছি?’
‘সেটাও বলছ।’
‘হায়েনার মতো মানুষ ঘরের ভেতরে! আমি মরে গেলে তোকে কে পাহারা দেবে বল তো? কেমন করে বাঁচাই তোকে আমি, কেমন করে বাঁচাই!’ কথাগুলো কানের কাছে ডুকরে ওঠা কান্নার মতো। আমি উঠে বসলাম। সামান্য ধমক আর আদর মিলিয়ে বললাম, ‘আমি কি বড় হইনি, মা? নিজেকে এখন নিজেই দেখে রাখতে পারি। আর ঘরের মধ্যে আমাকে পাহারা দিতে হবে কেন, বলো তো? আমি যখন কলেজ যাই, বাইরে থাকি, তখন কি তুমি আমাকে পাহারা দাও?’
‘বাইরের কিছু আমি জানি না। আমি তো ঘরের ভেতরের ভয়েই...’
‘ঘরে তো কোনো ভয় নাই। তুমি যে একটা কি না, খালি আবোলতাবোল কথা। বাদ দাও, আজকে ডাক্তারের কাছে যাব আমরা।’
‘ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না। আমি ঠিক আছি। আর ঠিক থাকতে থাকতেই কথাটা তোকে বলা দরকার।’
‘আচ্ছা, বলো তো শুনি কি সেই এত্ত জরুরি কথা!’
‘হ্যাঁ, জরুরি। খুব জরুরি।’
জরুরি অথচ মা চুপ। মনে হলো গোপনে দ্রুত কয়েকটা নিঃশ্বাস নিয়ে নিল। আমিও ধৈর্য ধরে থাকলাম, দেখি কী এমন বলে। সামান্য পেছনে সরে বসে মেঝের দিকে তাকিয়ে মা বলল, ‘তুই যাকে নানা ভাবিস, ওইটাই তোর বাবা।’
‘মানে?’ এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো আমি ঠিক শুনিনি। মা গম্ভীর হয়ে আরেকবার বলল, ‘মানে হলো, তোর নানাই তোর বাবা।’
‘তবে তাকে তোমার বাবা বলছ কেন এত দিন?’
‘আমারও বাবা।’
‘উহ্, মা, আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকতেছে না। অন্তত তুমি আমার মা তো, মা? আর আমার যে বাবাটা মারা গেছে, সে কে?’
‘আমি তোর মা। কোনো বাবা-টাবা মারা যায়নি তোর। তোকে ভোলানোর জন্য বলছি, যেন তুই সত্যিটা আন্দাজ করতে না পারিস। সত্যি হলো তোর নানাই তোর বাবা’—এক নিঃশ্বাসে বলে নিয়ে মা জোরে বাতাস টেনে নিল। দেখতে অস্বাভাবিক মনে হলো তাকে। মনে হলো মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। আমি তার মাথার পেছনে হাত রেখে বললাম, ‘তোমার কি বেশি খারাপ লাগতেছে, মা?’ মা সামান্য সোজা হয়ে ঘুমজড়ানো গলায় বলল, ‘আর হ্যাঁ, ওই লোকটা আমারো বাবা।’ বলেই মা চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ল নাকি অজ্ঞান হলো বুঝতে পারলাম না। ঘুম ভেবেই তার একটা হাত ধরে বসে থাকলাম। আমার মাথার ভেতরে একটা সাইক্লোন ছুটে গেল, যার কেন্দ্রবিন্দুতে নানার কাচুমাচু মুখ দেখতে পেলাম। আমাদের মাঝখানে সতর্ক মা বসে থাকলে ঠিক যেমন আলগা অপরাধের ছায়া নানার মুখের উপরে পড়ে থাকে। কিন্তু মন তো মানতে চাইল না; এসব কথার মানে কী! এটাই মায়ের জরুরি কথা? তার কি শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মাথাটাও খারাপ হয়ে গেল? ভাবতে ভাবতে এগোলাম আর বিভ্রান্তির পথ ধরে আবার শুরুর বিন্দুটিতে ফিরে এলাম, যেখানে মায়ের অস্পষ্ট কণ্ঠ বাজতে থাকল, ‘আর হ্যাঁ, ওই লোকটা আমারও বাবা।’ একভাবে কাটল কতক্ষণ, কত মুহূর্ত... জানি না; মায়ের উচ্চারিত শব্দগুলোর সঙ্গে তিন বছর আগের স্মৃতি মেলালাম, কখনো চলে গেলাম ১০ বছর আগে, ফিরে এলাম মাসকয়েক আগের কোনো দিনে, কোথাও কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়ল না। মায়ের নিত্যদিনের ব্যবহার আর তার শেষ কথাগুলো এক সুতোয় গাঁথা যেন! মাথার মধ্যে সাইক্লোনের বেগ বাড়ল, মনে হলো মুখ খুললেই কল্পিত প্রাণী ড্রাগনের মতো কল্পনার আগুন বাস্তব হয়ে ঘরের সব কোণে ছড়িয়ে পড়বে। কিংবা মুখ না-খুলতেই নিয়মের পৃথিবী থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে সাজানো আমাদের ঘরবাড়ি মায়ের কথার বিদ্যুতে এমনিতেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মানুষের মুখ আর ড্রাগনের মুখে আসলে কোনো পার্থক্য নেই। ড্রাগনের অস্তিত্ব হয়তো মানুষ মানুষকে ভেবেই গড়েছে।
মায়ের চোখের পাতা নড়ে উঠল, আমার হাতের মুঠোয় নড়ে উঠল আঙুলগুলোও। চমকে তাকালাম, আমাদের না আজ সকাল সকাল ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা! কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখে নিলাম। বাস্তবের সব প্রয়োজনকে উড়িয়ে দিয়ে মা উঠে বসল, আমার চোখের ভাষা পড়তে পেরেই হয়তো বলল, ‘আমি ঠিক আছি। ডাক্তারের কাছে যাইতে হবে না।’ আমি অমত করার আগেই আবার বলতে শুরু করল, ‘খুব ছোট ছিলাম তো, প্রথমদিকে বুঝতে পারি নাই। একটু বড় হইতেই বুঝছিলাম এটা কোনো বাবার স্পর্শ হইতে পারে না। বাবা ডাকলেই খাটের নিচে গিয়ে লুকাইতাম। মা ঝুল ঝাড়ার ঝাড়ু দিয়ে খুঁচায়ে বের করে আনত, রাগ করে বলত, বাবা ডাকতেছে যাও না কেন? বাইরে নিয়ে যাইতে চাইলেও একই ব্যাপার, যাব না বললে মা রেগে যাইত। মাকে কিছু বলব নাকি বাবারা এ রকমই হয়, এতে বলার কিছু নেই, এসব তো আমার জানা ছিল না।’
‘তারপর?’ যন্ত্রের মতো আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল। আমারই মধ্যে আমি দুই ভাগ হয়ে গেছি। অর্ধেক আমি শুনতে চাই, অর্ধেক আমি মায়ের মুখ চেপে ধরে বলতে চাই যে আমি আর নিতে পারছি না।
‘তারপর আর কী, এইভাবেই চলে গেল অনেক বছর। আমি তখন ১৫ হয়ে গেছি, কিছুদিন ধরে বাবার অত্যাচারও চরম বেড়েছে, কোনোভাবে এড়াইতে পারতেছি না। একদিন স্কুলে বসে সিদ্ধান্ত নিলাম এইবার মাকে বলব। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য, তার তিনদিন পরেই মা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেল। মাকে কী বলব, কীভাবে বলব সব কিছু প্রায় গুছায়ে আনছিলাম কিন্তু...’
আমি তখনো দু’ভাগ; আমার অর্ধেক লজ্জিত আমি হঠাৎ তীব্র হয়ে উঠল, ‘থাক আর বলবা না, আমি বুচ্ছি।’
‘না না, তারপর কী হইল শোন। কিছুদিন বাবা শান্ত, শোক নাকি অন্য কিছু বলতে পারব না। আমি কোথায় যাব সারা দিন ধরে বুদ্ধি করতে থাকি। রাতে দরজা বন্ধ করে কাঠ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকি। কিন্তু এত আতঙ্কের পরও কারো কাছে নিজের বাবাকে দানব হিসেবে তুলে ধরতে ইচ্ছা করে না। কিছুতেই করে না।’
‘মা, হইছে। আর না,’ এবারে আর আমি দ্বিধাবিভক্ত না। সত্যিই আমি আর শুনতে চাই না। কিন্তু মায়ের ততক্ষণে বাঁধ ভেঙে গেছে, ‘তারপর কবে থেকে যেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত...’
‘মা, থামো!’
‘আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করত। খুনও। কিন্তু জানিস কেন যেন সাহস হইল না কোনো দিন।’
আমার অবশ অবশ লাগল, কথা বলতে ইচ্ছে করল না। মা-ই বলে চলল, ‘তুই পেটে আসার পর থেকে বাবা আমাকে এই শহরে এই বাসাটায় এনে রাখল। আসলে আমি ঠিকমতো বুঝতেও পারি নাই তখন, অনেক ছোট ছিলাম তো। বোঝার পর থেকে আমি আর বাইরে বের হই নাই। মনে হইত সবাই তাকায়ে আছে, সবাই সব জেনে যাবে। সেই আতঙ্ক আমার মনে এমন বসা বসল যে আমি আর বাইরে বের হইতে পারলাম না। পরে লজ্জা-ভয়ের সঙ্গে যোগ হইল আরেক আতঙ্ক, বাবা তোর দিকে হাত বাড়াবে। আমার জীবনের লক্ষ্যই হইল আমি দেখতে চাই তোকে আর কেউ কিছু করুক না-করুক, বাবা যেন না করে।’
মায়ের হাত ছুড়ে দিয়ে আমি ঝট করে উঠে গেলাম। মাকে থামতে বলে লাভ নেই। মা-ও আমাকে অনুসরণ করতে লাগল, ‘এখন কথা হলো আমি মরে গেলে তুই একা, তোকে প্রথমে বুঝতে হবে যে বাসাটা তোর জন্য একটা...’
কলিং বেল বেজে উঠে মায়ের কথা থামিয়ে দিল। বেলের শব্দে আমরা দুজনই কেঁপে উঠলাম, যেন কোনো অতর্কিত আক্রমণ ধেয়ে আসছে আমাদের দিকে। আত্মরক্ষার জন্য পাগলের মতো দ্রুত হাতে আমি কিছু একটা খুঁজতে লাগলাম। মা আমার দিকে তাকিয়ে থাকল, দ্বিতীয়বার বেল বাজার পরও দরজা খুলতে গেল না। রান্নাঘরের সবখানে আমি তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলাম। খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেলাম আর বড়সড় ছুরিটা হাতে নিয়ে লাফিয়ে চলে গেলাম দরজার দিকে। দরজা খুলেই ছুরিটা তার বুক বরাবর বসিয়ে দিলাম। মুখ দেখার দরকার ছিল না, আমাদের বাড়িতে অন্য কেউ বেল বাজাবে না। ছুরি বের করে নিয়ে আবার বসালাম, তারপর আবার... আবার! শরীরটা লুটিয়ে পড়তেই উল্টো দিকের বাসার খোলা দরজায় দাঁড়ানো মহিলার চিৎকার কানে এল। সিঁড়ি বেয়ে ওপর-নিচ থেকে মানুষ জড়ো হতে সময় লাগল না। মা আমাকে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিল। কানে কানে বলল, ‘ভালো করছিস। এখন আর তোকে নিয়ে আমার চিন্তা নাই। পুলিশ আসলে বলবি আমি করছি। অসুবিধা নাই, কয়দিন পরে তো আমি এমনিতেই মারা যাব।’
পুলিশ এলে আমাকে কিছু বলতে হলো না। সামনের বাসার মহিলা আর জড়ো হওয়া লোকেরাই সব বুঝিয়ে দিল। স্বেচ্ছায় একঘরে হয়ে থাকা আমাদেরকে নিয়ে কত কথাই না বলল তারা। পুলিশ আমার কাছে কারণ জানতে চাইলে বললাম, ‘ধর্ষণ।’ উল্টো দিকের বাড়ির মহিলা শুনতেই বলে উঠলেন, ‘না না, কীসের ধর্ষণ, দরজা খুলেই ছুরি বসায়ে দিছে। আমি নিজ চোখে দেখছি। আহা রে, খুব ভালো ছিলেন ভদ্রলোক। প্রায়ই এখানে দাঁড়ায়ে আমার সঙ্গে দু’চার কথা বলতেন। এরা তার মেয়ে আর নাতনি। সবসময় উনি এদের খেয়াল রাখতেন, যখন যা লাগত সঙ্গে সঙ্গে এনে দিতেন। কিন্তু এরা মা-মেয়ে এক্কেবারে আলাদা, আমাদের কারো সঙ্গেই কথা বলে না। এই মেয়েটা কোনো কারণ ছাড়া খুন করে এখন মিথ্যা কথা বলতেছে।’ উপস্থিত লোকেরা মহিলার ভাষণে ওপর-নিচ মাথা দোলাতে লাগল। ভিড়ের মধ্য থেকে আরো তিন-চার জন এগিয়ে এল, নানা কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বড় ভালো লোক ছিল। মেয়ে আর নাতনির প্রয়োজন হলেই ছুটে আসতেন।’ ‘আর, ব্যবহার খুব ভালো ছিল ভদ্রলোকের।’ ‘আহ্হা রে, এইরাম হাসিখুশি লোকটারে কেমনে মারছে!’ ‘এই মাইয়ার ফাঁসি হওয়া উচিত। ইশ্, বড় ভালা মানুষ আছিলেন তিনি!’
পুলিশ তাদের কথা অগ্রাহ্য করে আমার কাছে জানতে চাইল, ‘কাকে ধর্ষণ করছে?’
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘কাউকে না।’






