বই বস্তুটি আধুনিক সভ্যতার দান। বিজ্ঞানসম্মত মুদ্রাযন্ত্র আবিষ্কৃত, নির্মিত ও প্রচারিত হওয়ার পর এ বস্তুটি সর্বজনগ্রাহ্য এবং এর বহুল প্রচারের ফলে এটি বর্তমান জগতের একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে ছিল পাথরে-খোদাই স্তম্ভলিপি বা শিলালিপি, তারপর তা প্রভৃতি ধাতুর ওপর উত্কীর্ণ শাসন বা দান-ঘটিত অনুজ্ঞ। মানুষ সভ্যতা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনের তাগিদে ভূর্জপত্র, তালপত্র ও তুলাপত্রের ব্যবহারের দ্বারা মনের ভাব লিপিবদ্ধ করার পদ্ধতি সে আয়ত্ত করতে থাকে। ফলে পুঁথির জন্ম হয়। দুষ্প্রাপ্যতা গুণে পুঁথি ছিল মহামূল্যবান বস্তু। এক বা একাধিক পুঁথি যে দেশে থাকত, দেশ-বিদেশ থেকে সেখানে শুধু নকলনবিশদের নয়, শ্রদ্ধাশীল পণ্ডিতদেরও সমাবেশ হতো, তারা পুঁথি আয়ত্ত করে স্বদেশের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতেন। ভারতবর্ষে প্রাচীন কালে যে পুঁথির প্রচলন ছিল না—মুখে মুখে এবং কানে শুনে যে ঋষিদের তপস্যালব্ধ জ্ঞান প্রচারিত হতো, তার প্রমাণ শ্রুতি ও স্মৃতিকথা দুটির মধ্যেই পাওয়া যায়। সৌতিক বৈশম্পায়ন প্রভৃতি প্রচারকেরা আজও বিখ্যাত হয়ে আছেন। প্রাচীন কালের লোকেরা সত্যিই ভাগ্যবান ছিলেন। পুঁথির সংখ্যা কম ছিল বলেই পুঁথির প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ছিল অসাধারণ। অধীত পুঁথি তারা নিঃশেষে আয়ত্ত করার অবকাশ পেতেন। বাহুল্যের হাটে আগ্রহ হারিয়ে তালকানা হয়ে পড়তেন না। পুঁথির মালিক হতে হলে গোটাটি নকল করতে হতো ও নকল করতে গেলেই সম্যক অনুধারণার প্রয়োজন হতো। ইউরোপে মুদ্রাযন্ত্রের আবির্ভাবের আগে পুঁথির সংখ্যা এত কম ছিল যে, কথিত আছে—সিসেবোর বক্তৃতা নকল করার জন্য ফ্রান্স থেকে রোমে ঘটা করে রাষ্ট্রদূত পাঠানো হয়েছিল। সমগ্র ফ্রান্সে এই মূল্যবান পুঁথির একটি সম্পূর্ণ কপি ছিল না। জেমরুসের পাদরি অ্যালবাটি প্রভূত পরিশ্রম করে এবং অবিশ্বাস্য রকমের মূল্য দিয়ে দেড়শ পুঁথি তার লাইব্রেরিতে সংগ্রহ করেছিলেন, এর দ্বারা ইউরোপের সম্পূর্ণ জ্ঞানভাণ্ডার তার আয়ত্তে এসেছিল। তার লাইব্রেরি একটা বিস্ময়ের বস্তু ছিল। ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে উইনচেস্টারের বিশপের সুবিখ্যাত লাইব্রেরিতে মাত্র ১৭খানি পুস্তক ছিল, তারও সবগুলো খণ্ডিত, সেন্ট সুইদিনের কনভেন্ট থেকে এক খণ্ড বাইবেল একবার ধার নেয়ার জন্য তাকে রীতিমতো একটা মূল্যবান চুক্তিপত্র সই করতে হয়েছিল। এই সময়ে কেউ যদি একটা বই খরিদ করতেন দেশ-দেশান্তর থেকে গণ্যমান্য গুণী ব্যক্তিরা এ ক্রয়-বিক্রয় অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করার জন্য উপস্থিত হয়ে আনন্দ লাভ করতেন।
লাইকোরনান পিথাগোরাস সোলন প্লেটো হিরোডোটাস স্ট্যানঘঘা প্রভৃতিকে কীভাবে জ্ঞান অর্জনের জন্য মিসর, পারস্য, ভারতবর্ষ প্রভৃতি ভ্রমণ করতে হয়েছিল, তার কাহিনী যেমন কৌতূহলোদ্দীপক, তেমনি বিস্ময়কর। এ সত্ত্বেও সেই বিরল পুস্তক-যুগে ভারতবর্ষে এবং ইউরোপে যে শ্রেণীর মনীষীদের আবির্ভাব ঘটেছিল, আজ বইয়ের ছড়াছড়ির মধ্যেও তার তুলনা মেলে না। পাথিনি, বেদব্যাস, শঙ্কর, প্লেটো, অ্যারিস্টটলের আবির্ভাব এ যুগে সম্ভব নয়। এর প্রধান কারণ এই যে আমরা গাদা গাদা বই পড়ি, কিন্তু জ্ঞান অর্জন করি না। চিন্তা করার দায়িত্ব আমরা অন্য লোকের অর্থাৎ গ্রন্থকারদের ওপর চাপিয়ে নিশ্চিত হয়ে আছি। বিবিধ খাদ্য আমাদের সম্মুখে থরে থরে সাজানো রয়েছে, আমরা খাবার আগ্রহে নয়, চোখের নেশায় এটা চাখছি ওটা চাখছি, কিন্তু কোনো খাদ্যই হজম করার মতো পরিশ্রম করছি না। পরিপাকের সময়ও দিচ্ছি না। মহাকবি শেকসপিয়র চাঁদের সম্বন্ধে বলেছেন, ‘And this our life exempt from public hawnta Finds tongues in trees, books in the running brooka, Sermons in stones and good in every thing.’
আমরা তারা নই, মুদ্রাযন্ত্রের কল্যাণে আমরা প্রাতঃকালে খবরের কাগজ থেকে শুরু করে মধ্যরাত্রে নৈশভোজনান্তিক হালকা গল্প পর্যন্ত একটার পর একটা গিলে খাচ্ছি, প্রতি মুহূর্তে আক্রান্ত হচ্ছি লক্ষ লক্ষ বইয়ের চটকদার বিজ্ঞাপন দ্বারা, কি পড়ব কি পড়ব না—এ ভেবে কূল-কিনারা না পেয়ে ফ্যাশনের খাতিরে কতগুলো চালু বইয়ে চোখ বুলিয়ে জ্ঞান অর্জন-স্পৃহা নিবৃত্ত করছি, কিন্তু আসলে আমাদের মনে ও মজ্জায় কিছুই প্রবেশ করছে না। আমরা এ যুগে সবাই বই পড়ার ব্যাপারে মন্দাগ্নি রোগে ভুগছি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এ বিষয়ে মহা মহা চিকিৎসক জন্মেছেন, তাদের উপদেশ ও ব্যবস্থায় সাধারণে কতটা আত্মস্থ হতে পেরেছে। প্লিনি, মেনকো, বেকন, এমার্সন, অ্যাডামস, টড, কবেট এবং বর্তমান কালে আর্থার কুইলার, আর্নন্ড বেনেট, ল্যাসেলস অ্যাবার, ক্রম্বি, মিডল্টন মারে, টিএম এলিয়ট প্রভৃতির সাহায্য ও নির্দেশে বইয়ের দুর্গম অরণ্যের মধ্যে সাধারণ মানুষে পথ খুঁজেও পেয়েছে, কিন্তু আমাদের এই দুর্ভাগ্য বাংলাদেশে তেমন পথ-প্রদর্শকের আবির্ভাব ঘটেনি। আমরা এই রাজ্যে সবে নতুন প্রবেশ করেছি বলে বিস্ময়ের ঘোর আমাদের কাটেনি। এই প্রচণ্ড বিস্ময়ের মধ্যেই আমাদের রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে ক্ষীণ আহ্বান-ধ্বনি উখিত হয়েছে, তিনি বাঙালি জাতিকে এই পুস্তক-কল্লোলের মধ্যে সাধ্যমতো তরঙ্গ তুলতে ডাক দিয়েছেন, মানব-সমাজকে আমাদের নিজস্ব কিছু সংবাদ দিতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কত নদী সমুদ্র পর্ব্বত উল্লঙ্ঘন করিয়া মানবের কণ্ঠ এখানে আসিয়া পৌঁছাইয়াছে— কত শত বৎসরের প্রান্ত হইতে এই স্বর আসিতেছে। এস এখানে এস, এখানে আলোকের জন্ম-সঙ্গীত গান হইতেছে।’ ‘অমৃতলোক প্রথম আবিষ্কার করিয়া যে যে মহাপুরুষ যে কোন দিন আপনার চারি দিকে মানুষকে ডাক দিয়া বলিয়াছিলেন—তোমরা সকলে অমৃতের পুত্র, তোমরা দিব্য-ধামে বাস করিতেছ—সেই মহাপুরুষের কণ্ঠেই সহস্র ভাষায় সহস্র বৎসরের মধ্য দিয়া এই লাইব্রেরীর মধ্যে প্রতিধ্বনিত হইতেছে!’ ‘এই বঙ্গের প্রান্ত হইতে আমাদের কি কিছু বলিবার নাই? মানব-সমাজকে আমাদের কি কোনো সংবাদ দিবার নাই? জগতের একতান সঙ্গীতের মধ্যে বঙ্গদেশই কেবল নিস্তব্ধ হইয়া থাকিবে?’
‘দেশ-বিদেশ হইতে অতীত বর্তমান হইতে প্রতিদিন আমাদের কাছে মানব জাতির পত্র আসিতেছে, আমরা কি তাহার উত্তরে দুটি চারটি চটি চটি ইংরেজি খবরের কাগজ লিখিব? সকল দেশ অসীম কালের পথে নিজ নিজ নাম খুদিতেছে, বাঙালীর নাম কি কেবল দরখাস্তের দ্বিতীয় পত্রেই লেখা থাকিবে? জড় অদৃষ্টের সহিত মানবাত্মার সংগ্রাম চলিতেছে, সৈনিকদিগকে আহ্বান করিয়া পৃথিবীর দিকে দিকে শৃঙ্গধ্বনি বাজিয়া উঠিয়াছে, আমরা কি কেবল আমাদের উঠোনের মাচার উপকার লাউ-কুমড়া লইয়া মকদ্দমা ও আপীল চালাইতে থাকিব?’ প্রায় ৬০ বছর আগেকার এই ডাক। এর আগে রামমোহন, মধুসূদন, ভূদেব, বঙ্কিম এবং এরপরে রবীন্দ্রনাথ, রামেন্দ্রসুন্দর বাংলাদেশের কিছু কথা পৃথিবীর মানব-সমাজকে শুনিয়েছেন, কিন্তু তাই কি যথেষ্ট? সৃষ্টির আদিকাল থেকে আহরিত পৃথিবীর জ্ঞান-ভাণ্ডারের পূর্ণ উত্তরাধিকারী আমরা, সে উত্তরাধিকারের মর্যাদা আমি রাখতে পারছি কই? তার জন্য দরকার মননশীলতা। ছাপা বই শুধু ইঙ্গিত দেয়, সেই ইঙ্গিত অনুযায়ী মানুষকে ভাবতে হয়, তবেই মানুষ কিছু দান করতে পারে। আজকের দিনে অসংখ্য বই সারি সারি সাজানো রয়েছে চারদিকে, কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, কোনটা পথ্য, কোনটা অপথ্য— এর মধ্য থেকে নিজের ক্ষমতা ও প্রয়োজন মতো বাছাই করে কাজে লাগানো সাধারণ পাঠকের কাজ নয়; এর জন্য প্রয়োজন সমালোচকদের সাহায্য। নিভৃত সাধনায় ঋষি মুখে বেদমন্ত্র উন্নীত হয়েছিল কিন্তু তাকে সর্বজনগ্রাহ্য করতে পেরেছেন সায়ণ তার টীকার সাহায্যে, বেদান্তসূত্রকে সহজ করেছেন শঙ্কর-রামানুজ, পুরাণ-ভাগবত বুঝতেও নীলকণ্ঠ প্রভৃতির সমালোচকদের নির্দেশ প্রয়োজন হয়েছে। ইংল্যান্ডের শেকসপিয়রকে সহজ ও বিশদ করেছেন হাজার খানেক টীকাকার, ব্রাউনিংকে বুঝতে ও বোঝাতে ব্রাউনিং-চক্রের কাজ এখনো শেষ হয়নি। পৃথক পৃথক কবিদের কাব্যরঙ্গ হূদয়ঙ্গম করার জন্য যেমন সমালোচকের প্রয়োজন, পৃথিবীর পুস্তক-গহনে পথ খুঁজে পাওয়ার জন্যও তেমনি তাদেরকে দরকার। এ যুগে বইকে বাদ দিয়ে কোনো মানুষের চলে না, চলা উচিত নয়।
একজন বিখ্যাত ইংরেজ মনীষী বলেছেন, পৃথিবীর যাবতীয় বিশিষ্ট লোকের অভ্যাস হচ্ছে অবিরাম বই পড়া। এই অভ্যাস ছাড়া সাধারণ থেকে বিশেষ হয়ে ওঠার আর কোনো পথ নেই। বেকন বলেছেন, Reading makes a full man; conversation a ready man writing an exact man’ অর্থাৎ গোটা মানুষ হতে হলে পড়া চাই। বেকন ‘গোটা’ বলতে যা বুঝেছেন প্রভূত অধ্যয়ন ও বইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় না থাকলে তা হবার জো নেই। বই পড়ে যে জ্ঞান লাভ হয়, ভগবদ্দত্ত প্রতিভার বলে তা আপনা থেকে অর্জিত হয় না; অতি মনস্বী দুয়েকজন মানুষ হয়তো নিজস্ব একটা পথ বের করতে পারেন, কিন্তু যখন আদিকাল থেকে যুগ যুগ ধরে মানুষের সমবেত চেষ্টায় প্রশস্ত পথ প্রস্তুতই রয়েছে, তখন চেষ্টা করে নতুন পথ গড়ার সার্থকতা কি? মানুষের জীবন সীমাবদ্ধ কিন্তু জ্ঞান অনন্ত, এই অনন্তকালের সমুদ্রে সাধারণ পাঠকদের সবার ভেলা হচ্ছেন টীকাকাররা, সমালোচকরা যারা নিজেরা সব দায়িত্ব নিয়ে অপরিসীম কষ্ট স্বীকার করে জটিল দুর্গম পথকে সাধারণের ব্যবহার উপযোগী করে তোলেন, যারা গন্ধমাদন বহন করে আনেন না, সেখান থেকে বিশল্যকরণী মৃতসঞ্জীবনী সংগ্রহ করে এনে সবাইকে দান করেন। জ্ঞানের ক্ষেত্রে সাহিত্যের ক্ষেত্রে গুরুকরণ যতটা দরকার, এমনটি জীবনের আর কোনো ক্ষেত্রেই নয়।
ইংরেজি সাহিত্য বা পৃথিবীর অন্যান্য সাহিত্য আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। বাংলা সাহিত্যের অপেক্ষাকৃত বিরল-সম্পদ অরণ্যে যথার্থ পথনির্দেশ করার লোকেরও অভাব আছে। অতীতে যেখানে বনস্পতির বাহুল্য, সেখানে আমাদের ভয় নেই, কারণ আমাদের অতীত অতি দূরবর্তী নয়। বৌদ্ধ গান ও দোহা বা চর্যাপদে আমাদের শুরু। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, ডক্টর প্রবোধচন্দ্র বাগচি, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও শ্রীমণীন্দ্রমোহন বসু এ সূত্রপাত যুগের যত দূর সম্ভব জ্ঞাতব্য তথ্য আমাদের দিয়েছেন। আঁধার তিমিরগর্ভ থেকে সংগৃহীত মণিগুলো ও কালি-ঝুলি আবর্জনার আবরণ মুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে স্বকীয় উজ্জ্বলতায় প্রকাশ পাচ্ছে। তারপর শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বাংলা ভাষার আদিতম খাঁটি নিদর্শন নিয়ে পণ্ডিত বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ মশায়ের চেষ্টায় আমাদের আয়ত্তাধীন হয়েছে। এরপরে বাংলা সাহিত্যে পদাবলি শাখা, মঙ্গল কাব্যশাখা ও অনুবাদ শাখা জড়াজড়ি হয়ে আছে। কিছুটা জট ছাড়িয়ে সাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করে দিয়েছেন নীলরতন মুখোপাধ্যায়, রমণীমোহন মল্লিক, সারদাচরণ মিত্র, কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, নলিনীকান্ত ভট্টশালী, দীনেশচন্দ্র সেন, নগেন্দ্রনাথ বসু, যোগেশচন্দ্র রায়, সতীশচন্দ্র রায়, অমূল্য বিদ্যাভূষণ, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়।
বাঙালি পাঠকরা চেষ্টা করলে এখন বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, রায়শেখর, গোবিন্দদাসের পার্থক্য বুঝতে পারবেন। রমাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ, মানিক গাঙ্গুলী ও ঘনরামের ধর্মমঙ্গল, কানা হরিদত্ত ও বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গল, কৃত্তিবাস ও জগত্গ্রামের রামায়ণ, কাশীদাস ও শ্রীকর নন্দীর মহাভারত, কৃষ্ণপ্রেম তরঙ্গিনী ও শ্রীকৃষ্ণ বিজয়ের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলবে না। তারা সহজেই বলতে পারবে, চণ্ডীদাস যেমন পদাবলি শাখার শ্রেষ্ঠ কবি, মঙ্গলকাব্যে তেমনি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী কবিকঙ্কণ, বলতে পারবে কাশীরাম দাস অনুবাদে অতুলনীয়, বলতে পারবে ভারতচন্দ্র প্রথম নিখুঁত ছন্দ ও শব্দশিল্পী। তারপর এসেছে চৈতন্য যুগ বাংলা কাব্য সাহিত্যের রৌপ্য যুগ। এই যুগে জীবনী শাখার বৃন্দাবন দাস, লোচন দাস, কৃষ্ণদাস কবিরাজ; পদাবলি শাখার বাসুদেব ঘোষ, গোবিন্দ দাস সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে। তারপর মাঝখানে রামপ্রসাদ ভারতচন্দ্রের প্রায় সমকালে বাংলাদেশে এসেছে কবির যুগ অপেক্ষাকৃত অন্ধকার যুগ। এই অন্ধকারেও আলোকপাত করে গেছেন কবিবর ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। ওদিকে পূর্ববঙ্গে যে অপরূপ কাব্যকথা সাহিত্য গড়ে উঠেছিল, চন্দ্রকুমার দে, দীনেশচন্দ্র সেনের চেষ্টায় সে অপূর্ব রস থেকেও বাঙালি পাঠক আজ বঞ্চিত নয়। অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে এসেছেন পাদরি কেরি। শুরু হয়েছে বাংলা সাহিত্যে গদ্য যুগ। এসেছে রামরাম বাবু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামমোহন ও কৃষ্ণমোহন। শুরু হয়েছে বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্ত থেকে শিল্প-সংগত করে সাহিত্য সৃষ্টিতার পর আধুনিক যুগ অর্থাৎ বাংলা সাহিত্যের সুর্বণ যুগের পত্তন; গুরু ঈশ্বর গুপ্ত, শিষ্য বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু। এরপরে বন্যা-স্রোতের মতো সাহিত্য ক্ষেত্রে ঢুকেছে বইয়ের স্রোত, ভালো-মন্দ মাঝারি নাটকই ছাপা হয়েছে হাজার হাজার, কবিতার বই ১০ হাজারের হিসাবে। রাজা রাজেন্দ্রলাল, কালীপ্রসন্ন, প্যারীচাঁদ, দ্বারকানাথ এক দিকে, অন্য দিকে রঙ্গলাল, মধুসূদন, বিহারীলাল। এল বঙ্গদর্শনের যুগ, সমালোচনার হস্তে অঙ্গনে অবতীর্ণ হলেন বঙ্কিমচন্দ্র, অসহায় বাঙালি পাঠক যেন অকূল সমুদ্রে কূল পেল। বঙ্কিমচন্দ্রের তীব্র কশাঘাতে যাচাই হতে লাগল ভালো-মন্দ; অনেক জঞ্জাল সাফ হয়ে গেল। এলেন রবীন্দ্রনাথ, তিনিও গুরু বঙ্কিমচন্দ্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সাধনা, নব পর্যায়, বঙ্গদর্শন মারফত দিকভ্রান্তদের দিক নির্ণয়ে সাহায্য করলেন। বিংশ শতাব্দীর দশক থেকে পশ্চিম সমুদ্র থেকে যে বেনোজল ঘরে ঢুকল, তারই ধাক্কায় বাংলাদেশের সাহিত্য প্রাঙ্গণ ভরে উঠল ভালো-মন্দ গাছে ও আগাছায়। এখন দিশেহারা পাঠককে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন দরদি সত্যনিষ্ঠ সমালোচকের। বাংলা সাহিত্যকে ভরাডুবি থেকে রক্ষা করার জন্য তাদের আবির্ভাব এবার প্রয়োজন হয়েছে।
[প্রবন্ধটি ‘মাসিক বসুমতী’ পত্রিকায় ১৩৫৫ বঙ্গাব্দে পৌষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল]
(বর্তমান বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে)






