ইউসুফ কার্শ। অনুবাদ: শওকত হোসেন

ইউসুফ কার্শের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষমতাবান ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের আচরণ এবং তার নাম ছড়িয়ে দেয়া বিভিন্ন ছবি তুলতে গিয়ে তিনি তাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছেন, তারই স্মৃতিচারণ এগুলো। বর্তমান রচনাটি কার্শের ইনসার্চ অব গ্রেটনেস গ্রন্থ থেকে সংকলিত।

 

দর্শকের কাছে ফটোগ্রাফার কিংবা তার সৃষ্টির কোনো অচেনা মুখাবয়বের ব্যাখ্যা একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্বের মুখাবয়বের ব্যাখ্যার মতো সমান অগ্রহের বিষয় হতে পারে কিনা, তাতে আমার সন্দেহ আছে।

তাই অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে আমাকে সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্টি জোগানো ফটোগ্রাফগুলো সুপরিচিত মানুষেরই ছিল। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রনায়ক, শিল্প খাতের প্রধান, যাজক, সমর নেতা, চিকিৎসক, রাজকুমারী ও রাষ্ট্রপতি।

১৯৩৬ সালে ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট প্রথম আমেরিকান প্রেসিডন্ট হিসেবে কানাডা সফরকালে কুইবেকের দুর্গে লর্ড টুইডসমুর এবং উইলিয়াম লিয়ন ম্যাকেঞ্জি কিংর সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন। স্বভাবতই আমি ওই ঐতিহাসিক ঘটনার ছবি তুলতে আগ্রহী ছিলাম, তবে ওখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করা তেমন কঠিন না হলেও ৫০ বা এর চেয়ে বেশি পত্রিকার ফটোগ্রাফারকে হাজির হতে দেখে রীতিমতো হতাশ হয়েছি। মাথার ওপর ফ্ল্যাশলাইটের ঝলক, ডানে-বামে শাটারের ক্লিক-ক্লিক আওয়াজে নিজের ক্যামেরায় ভালো কিছু করার ফুরসতই ছিল না।

যাহোক, লর্ড টুইডসমুরের বহরে আমার খুব ভালো একজন বন্ধু ছিল, অন্দরমহলের নিয়ন্তা। সেই আমাকে রাষ্ট্রনায়ক, কূটনীতিক এবং সাংবাদিকরা বিদায় নেয়ার পর টেরেসে থাকার পরামর্শ দিয়েছিল। সবুরে মেওয়া ফলে। ১ কি ২ ঘণ্টা পর লর্ড টুইডসমুর ও মিস্টার ম্যাকেঞ্জি কিংয়ের সঙ্গে এক ছেলের হাত ধরে হাজির হলেন প্রেসিডেন্ট। ফটো তুলতে রাজি হলেন তারা। খুব দ্রুত পোজ দিলেন। ছবি তোলার ভান করে তাদের ধন্যবাদ জানালাম, তারপর তারা শিথিল হতেই লর্ড টুইডসমুর তার স্কটিশ গল্প শুরু করলেন। এসব গল্পের জন্য সুনাম ছিল তার। তারা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে গল্প শোনার ফাঁকে আমি ছবি তুলে নিই।

এই ফটোগ্রাফের পটভূমিতে ম্যাকেঞ্জি কিং হাসিমুখে আনমনা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। আমার তোলা ছবিগুলোর মধ্যে এটা ছিল তার সত্যিকার মানবিক চেহারা ফুটে ওঠা অন্যতম ছবি। ওই মুহূর্তে তাকে সেভাবে চিনতাম না, পরে যেমনটা জানাশোনা হয়ে গিয়েছিল, তবে তখন থেকে অটোয়ার খুদে জগতে আগন্তুক ছিলাম না আমরা। ১৯৪০ সালে একবার কিংসমেয়ারে তার বাড়ি এবং আরেকবার তার অটোয়ার বাড়িতে, এই নিয়ে দুবার তার ছবি তুলেছি।

কোনো বিচারেই সহযোগিতা করার মতো সাবজেক্ট ছিলেন না ম্যাকেঞ্জি কিং। অনিবার্যভাবে যে মানুষটিকে দেখেছি, তাকে নয়, বরং নিজেকে যেভাবে কল্পনা করেন, সেভাবেই ছবি তোলা উচিত বলে মনে করতেন তিনি। নিজেকে তিনি কীভাবে দেখেন, সেটা কখনই আমার কাছে স্পষ্ট ছিল না।

কিং কেবল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেই নয় বরং কম্পোজিশনের ক্ষেত্রেও স্পর্শকাতর ছিলেন। প্রায়ই কেবল তার কাঁধ দেখানোর ইচ্ছার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে স্থূলদেহী হয়ে ওঠার প্রবণতার দিকে নজর যাওয়ার বিষয়টি এড়াতে চাইতেন। অবশ্য সেটা ঠিক রসিকতার ছলে উল্লেখ করেননি। ফলাফল বিচারের বেলায়ও খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি। একবার কেবল একটা প্রিন্টের ১ ইঞ্চির প্রায় আট ভাগের এক ভাগ ছেঁটে ফেলার অনুরোধ জানাতে কানাডা সফররত ডিউক অব কেন্টের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজ থেকে সরাসরি আমার স্টুডিওতে হাজির হয়েছিলেন, কারণটা আমাকে রীতিমতো তাজ্জব বানিয়ে দিয়েছিল।

আবার আমার তোলা তার ছবিতে জুড়ে দেয়ার মতো ডিটেইলসের ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহী ছিলেন ম্যাকেঞ্জি কিং। যেমন একবার কাছের একটা তাক থেকে কানাডিয়ান আলমানাক অ্যান্ড ডিরেক্টরির একটা কপি নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে আমার পরিকল্পিত কিংয়ের অবস্থানে রেখেছিলাম। ঝট করে উঠে তাকের কাছে গিয়ে ডিরেক্টরির কপি নিয়ে ফিরে আসেন তিনি।

মনে আছে, আরেকবার সিটিং শেষে চা পানের জন্য তার সঙ্গে থাকতে বলেছিলেন। তার ভৃত্য নিকোল (নিজেকে কিংয়ের নিকোল হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করত সে) আমার হাতে একটা কাপ তুলে দিয়ে আরেকটা কাপ প্রধানমন্ত্রীর হাতে দিয়ে আমার বসার জায়গার কাছেই দুটি ছোট কারাওয়ে বিস্কুটসহ একটা প্লেট রাখে। কোনো কারণে বিস্কুটগুলো বেশি ছোট ছিল বলেই হয়তো, অনেকটা বাদাম তুলে নেয়ার কায়দায় এক হাতে দুটো বিস্কুটই তুলে নিই। প্রথমটায় কামড় দিতে যাচ্ছি, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আমার চেয়েও ক্ষিপ্র ছিলেন। ‘দাঁড়াও, কার্শ!’ বলে উঠলেন তিনি, ‘ওগুলোর একটা কিন্তু আমার’—না হেসেই কথাটা বলেছেন তিনি।

যুদ্ধকালীন ইংল্যান্ড সফরের সময় কমপক্ষে ৪২টি প্রধান পোর্ট্রেট নিয়ে আমার আন্তর্জাতিক পোর্টফোলিওর ভিত্তি নির্মাণ করে ফেলেছিলাম তখন, জর্জ বার্নার্ড শর ফটো তুলতে আভোত সেন্টে যাই আমি। তার সেক্রেটারি আমার সঙ্গে দেখা করে প্রফুল্ল কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, আসবাবপত্র এক চুলও সরাতে পারব না আমি এবং পোর্ট্রেটের জন্য কেবল মিনিয়েচার ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারব। জানা গেল, এর আগে এক পেশাদার ফটোগ্রাফার বাতিগুলো ফিউজ করে গোটা বাড়ি অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছিল। সেক্রেটারিকে আশ্বস্ত করে বললাম, আমি সঙ্গে নিজস্ব ইলেকট্রিশিয়ান নিয়ে এসেছি, বাইরে অপেক্ষা করছে সে, এই ধরনের বিপর্যয় ঠেকাবে। আমাদের আলোচনার ভেতরই সতর্ক এবং ঋজু, অথচ টলমলভাবে একদিকে হেলে থাকা হাঁটার ঢঙে হাজির হলেন খোদ শ।&dquote;&dquote;

আমি বললাম, মিস্টার শ, দুনিয়া আপনার সেরা নাটকটি লিখতে বলে আপনার ঠোঁটজোড়া সেলাই করে দুই হাত পেছনে বেঁধে রাখতে জোর করে, তাহলে কেমন নাটক লিখবেন আপনি?

সরাসরি জবাব না দিয়ে কোমল কণ্ঠে জানতে চাইলেন তিনি, ‘তোমার দেশ কোথায় জানতে পারি?’

‘জ্বি, স্যার’—জবাব দিলাম। ‘জন্মসূত্রে আর্মেনীয় বলতে আমি গর্ব বোধ করি।’

‘গুড!’—বললেন তিনি। ‘গুড! আর্মেনীয়দের ভেতর আমার অনেক বন্ধু আছে। তবে তাদের স্বাস্থ্যবান এবং শক্তিশালী রাখার একমাত্র উপায় কিছুদিন পরপর নিশ্চিহ্ন করা!’

শেষ পর্যন্ত আমাকে নিখুঁত কম্পোজিশনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিয়েছিলেন তিনি।

প্রায়ই অভিনেতাদের ছবি তুলতে গিয়ে বিশেষ মুসিবতে পড়তে হয়েছে আমাকে, কারণ একজন অভিনেতাকে অভিনয় থেকে নিবৃত রাখা রীতিমতো কঠিন, বিশেষ করে ক্যামেরা হাজির থাকলে। ড্যানি কে থেকে শুরু করে বরিস কার্লফ থেকে গ্রেগরি পেক পর্যন্ত সবাই লেন্সের সামনে পড়লেই মঞ্চ অভিনেতা বনে যেতেন এবং প্রায়ই আসল ব্যক্তিত্ব বের করে আনতে প্রচুর সধৈর্য আলাপের দরকার হতো।

 

কার্শ নামের বেড়াল&dquote;&dquote;

এলিজাবেথ টেইলরের ছবি তোলার কথাও মনে আছে, তখন তার বয়স মাত্র ১৪ বছর। কিশোরীসুলভ সংকোচের কোনো চিহ্নই ছিল না তার ভেতর; কমনীয় চেহারার গভীর নীল চোখ, বড় বড় চোখের পাতা এবং কোমল অল্প বয়সের শরীরী বাঁকের এক আকর্ষণীয় শিশুই আমাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন—নারীত্বের লক্ষণ ফুটে ওঠা এক স্বপ্ন। প্রথমেই ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরিয়ে আনা ওর পোষা শিম্পাঞ্জির সঙ্গে পরিচিত হতে হলো। টেইলরের মুখ থেকে বাদাম নিয়ে খেত ওটা এবং তার ছোট ছোট মুক্তোর মতো চোখে যেন সত্যিকারের ভালোবাসা ফুটে উঠত। একটা পশুর সঙ্গে ওর পোর্ট্রেট করতে চেয়েছিলাম; আশপাশে তাকিয়ে প্যাটিওতে একটা ছোট সাদা-কালো বিড়াল বাচ্চা চোখে পড়তেই বললাম, ‘এলিজাবেথ, মাইকেলকে কোলে নেবে...?’ ‘মাইকেল?’ ‘হ্যাঁ, মাইকেল—ওই যে প্যাটিওতে বসে আছে।’ হাসল ও। ওটাকে ডাকতে বাইরে এলাম আমি। ‘এই যে, মাইকেল,’ আমার কাছে এল মাইকেল। তখনো এলিজাবেথকে কিছুটা অনিশ্চিত লাগছিল; পরে সে বলেছে, অল্প ক’দিন আগেই রাস্তা থেকে বিড়ালটাকে তুলে এনেছিল, তখনো নাম রাখেনি।

পরদিন এমজিএম স্টুডিওতে ছিলাম, এলিজাবেথ ছুটে এসে আমার হাত ধরল: ‘মিস্টার কার্শ, আপনাকে আমার গাড়ির কাছে যেতে হবে।’ গেলাম আমি; পেছনের আসনে দুটি কুকুর আর সামনের আসনে সেই খুদে সাদা-কালো বিড়ালটা। ‘মিস্টার কার্শ, বিড়াল ছানার দিকে ইঙ্গিত করে বলল এলিজাবেথ, ‘এটা হলো মাইকেল কার্শ টেইলর।’

সেই ১৯৪৬ সালেই ফ্র্যাঙ্ক ফ্লয়েড রাইটের প্রথম ছবি তুলি আমি। নিউইয়র্কে আমার হোটেল সুইটেই হয় সিটিং। রাস্তা থেকে সুবেশী হয়ে এসেছিলেন রাইট, তার গোলাকার প্রফুল্ল চেহারাকে ঘিরে বলয়ের সৃষ্টি করেছিল রুপালি চুল। তাকে দেখে উত্তর আমেরিকার জর্জ বার্নার্ড শর মতো লাগছিল, লোকের ভাবনাচিন্তা ওলটপালট ঘটিয়ে দিলেও ভাবতে বাধ্য করেন। সিগারেট খাচ্ছিলেন তিনি। ছবিতে খুদে একটা বিস্ময়বোধক চিহ্নের মতো সিগারেটটা যোগ করেছিলাম আমি।

আট বছর পরে ফের অ্যারিজোনায় রাইটের বাড়ি তেলিয়েসিন ওয়েস্টে তার ছবি তুলি আমি। প্রাণশক্তিতে কিছুটা ভাটা পড়লেও আগের চেয়ে ঢের অনুপ্রেরণাদায়ী হয়ে উঠেছিলেন। চারপাশে তরুণ শিষ্যদের একটা দল ছিল, তাদের কেউ কেউ অতিথিদের সম্মানে কনসার্টের আয়োজন করতেন। সত্যি কথা বলতে, সংগীত মোটামুটি মাঝারি মানের ছিল, কিন্তু তার ধারণা ছিল সফরে নামার পক্ষে দলটা বেশ ভালো।

মহান ব্যক্তিদের সাফল্য সম্পর্কে গভীর অনুভূতি নিয়েই তাদের কাছে যেতাম আমি, যেভাবে তারা আমাদের সবার জীবন সমৃদ্ধ করে তুলেছেন। কিন্তু স্রেফ গুরুত্ব্পূর্ণ বলেই কখনো ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে দেখে অযথা অভিভূত হয়ে গেছি বলে মনে হয় না।

 

একটা ফটোগ্রাফ

বিশ্বখ্যাত কারো ছবি তোলার সময় প্রায়ই যে প্রশ্নটা আমার সামনে এসে দাঁড়াত, সেটা হলো, আমি কি শুধু কিংবদন্তিকেই তুলে ধরব নাকি সাধারণ মানুষের জানা নেই বলে ধারণার কিছু হবে সেটা। আমি জানতাম, সচেতনভাবে মহৎ কিছুর ফটোগ্রাফ হতে পারত এমন কিছুকে দুর্বলতার মুহূর্তে পাল্টে ফেলতে চাইলে লাভ হবে না। এই ধরনের মুহূর্ত রেকর্ডের উপযুক্ত নয়।

সংগীতকারের ফটো তোলার দিকে আমার দুর্বলতা থাকলেও নিঃসন্দেহে উইন্সটন চার্চিলই আমার সবচেয়ে প্রিয় সাবজেক্ট ছিলেন। সিগার ছাড়া যুদ্ধকালীন বিখ্যাত ছবি বাদেও ১৯৫৫ সালে তাকে উইলিয়ামবার্গ পুরস্কার দেয়ার সময়ে তোলা দ্বিতীয় একটা ‘ছবি’ ছিল আমার কাছে।

পুরস্কার দেয়ার আগের দিন লন্ডনের ড্র্যাপারস হলে সরঞ্জাম বসিয়ে আলো পরখ করে রেখেছিলাম। সবকিছু ঠিকঠাক বলে মনে হয়েছে। কিন্তু হল সফরে আসা মন্ত্রী পরিষদের এক সদস্য তেমন একটা উৎসাহ জোগালেন না।

‘আপনি ঠিক জানেন, উইন্সটনের নাগাল পাবেন?’ জিজ্ঞেস করলেন তিনি। ‘জানেনই তো, তার তাল পাওয়া মুশকিল।’ ‘বেশ,’ আশান্বিত কণ্ঠে বলেছি আমি, ‘তিনি প্রধান অতিথি। অন্তত আসবেন, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।’

খানিক দেরিতেই এসেছিলেন স্যার উইন্সটন এবং অবশেষে স্রেফ ৮ মিনিট সময় পাই আমি। প্রথমে আমাকে যেন চিনতে পারেননি মনে হলো, কিন্তু ইলেকট্রনিক ফ্ল্যাশগুলোর ভেতর বিদ্যুৎ জমে ওঠার সংক্ষিপ্ত সময়ে সময় কী কী পরিবর্তন ঘটিয়েছে দেখার জন্য তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তিনিও দেখছিলেন আমাকে।

আমি জানতাম, উইলিয়ামবার্গ ফাউন্ডেশন আমার ছবি আছে, এমন একটা বই প্রকাশে আগ্রহী। দায়িত্বটুকু গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলাম। (আমার নির্দেশনায় দুজন সহকারীর আন্তরিক ছবির সাহায্যে আমার পোর্ট্রেটগুলোর পরিপূরক দেয়ার কথা ছিল) পরিস্থিতি সহজ করে তুলতে এই উপলক্ষে চেয়ারম্যান উইনথ্রপ রকেফেলার হাতে এক গ্লাস মদ নিয়ে চার্চিলের কাছে গেলেন। মহান ব্যক্তিকে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিতেই স্যার উইন্সটন বলে উঠলেন: ‘এটা কী?’&dquote;&dquote;

রকেফেলার বললেন, ‘শ্যাম্পেইন, স্যার।’ ‘কোন সময়ের?’

‘“পোল রজার” ৪৭, স্যার।’

চার্চিল বললেন, ‘গ্লাস হাতে ছবি তুলতে চাই না। সারা দুনিয়া আমার গুণের কথা জানে।’ বলে খপ করে মদের পেয়ালা ধরে নিমেষে গিলে ফেললেন। তিনি চাইলেও এই অবস্থায় তার ছবি তুলতে পারতাম না।

পরদিন চার্চিলের মেয়ে জামাই ডানকান স্যান্ডিজ চা খেতে তার অফিসে আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। চার্চিলের অনানুষ্ঠানিক এবং একটু দুঃসাহসী ফটোগ্রাফিক বিশদ ছবি তুলতে পারলে কত ভালো হতো জানানোর সুযোগ পেলাম তাকে। প্রশান্তি বা এমনকি রাগী অবস্থায় তার চেহারা, তার কানের গঠন, থুতনির আকার, ঘুমোনোর সময় হাতের ক্লোজআপ, মাথার পেছনটা। চার্চিলের ওপর আস্ত একটা বই তৈরি করতে পারি আমি। ধারণাটা স্যান্ডিজের মনে ধরল। তিনি বললেন, ‘আমাকে একটা চিঠি লিখেন, তার কাছে নিয়ে যাব আমি, তারপর প্রয়োজনীয় অ্যাপয়েনমেন্টের ব্যবস্থা করা যায় কিনা, দেখা যাবে।’

পরে আমাকে ফোন করে তিনি জানালেন, ‘হ্যাঁ, আগামীকাল বিকালে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা হয়েছে।’ দারুণ খুশি হয়েছি আমি।

সেদিনের সন্ধ্যাটা আমার পক্ষে বিশাল উদযাপনের ব্যাপার ছিল, তবে সৌভাগ্যক্রমে অ্যাপয়েন্টমেন্টের খবর আগেভাগে ফাঁস করিনি। মিস্টার চার্চিলের বাড়িতে যেতে ট্যাক্সিতে ওঠার ঠিক দেড় ঘণ্টা আগে তার সেক্রেটারি ফোন করে দুঃসংবাদ দিলেন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করা হয়েছে। শেষে তিনি স্বীকার করেছিলেন, ‘অটোয়ায় আপনার এক ধরনের উদ্ধত আচরণের কথা স্যার উইন্সটন চার্চিলের মনে পড়ে গেছে—সিগার নিয়ে একটা কিছু—এবং তার ধারণা হয়েছে, আপনার অনুরোধ মতো তার পক্ষে ফটোগ্রাফের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিশ্চিত করতে পারবেন না।’

পোর্ট্রেট তৈরিই করা হয় দেখার জন্য এবং প্রায়ই আমাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘কোন জিনিসটা মানুষকে আপনার তৈরি পোর্ট্রেট দেখতে চালিত করে বলে মনে করেন? আপনি একজন ভাষ্যকার, আপনার সেরা সাধ্যমতো ফটোগ্রাফির ভেতর দিয়ে কোনো ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরেন। আপনি দর্শকরা আপনার ছবি কীভাবে দেখবে বলে প্রত্যাশা করেন? আপনার কাজ থেকে তারা কি পাওয়ার আশা করতে পারেন? কোন জিনিসটা আপনার কাজকে যৌক্তিকতা দেয়? এটা সত্যি যে সবসময় নিজেকে সন্তুষ্ট করতে পারি না আমি, যারা আমার কাজ দেখছেন তাদের প্রত্যেকের কথা তো দুরস্ত। তবে আমি বলব, আদর্শ অবস্থায় আমি চাইব আমার ব্যাখ্যা থেকে সুবিবেচক দর্শক মহান ব্যক্তিত্বর সম্ভাব্য সবচেয়ে মোহনীয় পরিচয়, আন্তরিক পরিচয় লাভ করবেন। তিনি হেমিংওয়ে, শুইটজার, হেলেন কেলারের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন এবং সেসঙ্গে এই মহান মানুষগুলোকে বুঝতে পেরেছেন। এটাই অর্জন করতে চাই আমি। কোনো ফটোগ্রাফের কাজ শেষ করার পর আমার মনের ভেতরের কণ্ঠটা যখন বলে ওঠে, ‘এটা ঠিক হয়েছে’, তখন সন্তুষ্টির কোনো সীমা থাকে না আমার। হাবভাবে টাটকা ঝরনা বয়ে চলি আর ভাবি এটাই দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা জিনিস।