১২ জানুয়ারি সত্তরে পা দিলেন জাপানি ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামি। ৭০! কম হলো না খ্যাতিমান এ ঔপন্যাসিকের বয়স। ১৪টি উপন্যাস এবং গুটিকয় ছোটগল্প আছে তার ঝুলিতে। তার পরও এটা বলতে কোনো সমস্যা নেই যে তিনি সমকালের দুনিয়ার অন্যতম সেরা ঔপন্যাসিক। ১৯৮৭ সালে নরওয়েজিয়ান উড উপন্যাসটি দিয়ে মুরাকামি সাহিত্যের বিশ্বদরবারে জায়গা করে নেন। তার জন্মদিন উপলক্ষে লেখকদের প্রতি মুরাকামির পরামর্শগুলো স্মরণ করা যেতে পারে—
পড়া
আমার মনে হয়, একজন নবীন লেখকের প্রথম কাজ হচ্ছে গাদা গাদা উপন্যাস পড়া। এটা খুব সাধারণ ও পরিচিত পরামর্শ, তার পরও দেয়া উচিত কারণ এর চেয়ে আর কোনো প্রশিক্ষণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রথমেই আপনাকে উপন্যাস কীভাবে গঠিত হয়, সেটা বইয়ের পাতায় দেখতে হবে। তরুণ বয়সে আপনি যত বেশি উপন্যাসে চোখ বুলাতে পারেন, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হাতের কাছে যা পাবেন—মহান উপন্যাস, ততটা মহান নয় এমন উপন্যাস, বিশ্রী উপন্যাস—কোনো ব্যাপার নয় যতক্ষণ পড়তে থাকবেন। মাথায় যত বেশি গল্প নিতে পারেন নিয়ে নেবেন। নিজেকে অনেক মহান লেখার সঙ্গে পরিচিত করুন; এমনকি অনেক মধ্যম মানের লেখার সঙ্গেও। এটাই আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
—সো হোয়াট শ্যাল আই রাইট অ্যাবাউট, ২০১৫ সালে লিখিত মুরাকামির প্রবন্ধ
পর্যবেক্ষণ
লেখার আগে বিভিন্ন জিনিস ও ঘটনাকে বিশদভাবে পর্যবেক্ষণের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। চারপাশে কী চলছে, সেটা পর্যবেক্ষণ করতে হবে; মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে যতটা সম্ভব ঘনিষ্ঠ ও গভীরভাবে।
প্রতিফলন
যা দেখছেন, তার ওপরই প্রতিফলন করুন। এক্ষেত্রে একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার প্রতিফলিত করার মানে এই নয় যে আপনি যা এবং যাকে আপনি দেখছেন, তার ভুল-শুদ্ধ কিংবা দোষ-গুণ খুঁজতে লেগে যাওয়া। সচেতনভাবে ‘ভ্যালু জাজমেন্ট’ থেকে বিরত থাকুন—উপসংহার টানতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ার প্রয়োজন নেই। স্পষ্ট, সিদ্ধান্তমূলক উপসংহারে পৌঁছানোটা জরুরি নয়, তার চেয়ে প্রয়োজন কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতির হাকিকত তুলে ধরা। আমি যে দৃশ্য দেখেছি, যে মানুষের সঙ্গে মিশেছি, তাদের পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করতে আমি ব্যাকুল হয়ে থাকি। অনুভূতি যখন থিতিয়ে আসে, তখন আমি পেছনে ফিরে সেদিকে তাকাতে পারি; এবার আমি সেই ঘটনাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারি। শেষে যদি এবং যখন মনে হবে প্রয়োজন, তখন আমি নিজস্ব উপসংহার টানতে পারব।
পুরনো শব্দগুলো নতুন করে তুলুন
আমার সবসময়ের প্রিয় জ্যাজ পিয়ানিস্ট থেলোনিয়াস মংক। তাকে যখন কেউ প্রশ্ন করেন, আপনি পিয়ানোতে কীভাবে নির্দিষ্ট কোনো সুর তোলেন, তখন মংক তার কিবোর্ডের দিকে নির্দেশ করে বলেন, ‘নোটটা নতুন হতে পারে না। কিবোর্ডের দিকে তাকালে দেখবেন সব নোট আগে থেকেই সেখানে আছে। কিন্তু নোট আছে এটা মনে করে বসে থাকলে, সেগুলো ভিন্ন শব্দ করবে। আপনি যে নোট তুলতে চান, সেটাকেই নিতে হবে!’
লেখার সময় আমি মাঝে মাঝেই এ কথাগুলো স্মরণ করি এবং নিজেকে বলি, ‘এটা সত্য। নতুন কোনো শব্দ হতে পারে না। আমাদের কাজ হলো একেবারে সাধারণ শব্দগুলোকে নতুন অর্থ ও বিশেষ সুর দেয়া।’ এই ভাবনা আমাকে আবার আশ্বস্ত করে। এর অর্থ হলো যে বিস্তীর্ণ, অজানা দিগন্ত এখনো আমাদের সামনে ছড়িয়ে আছে। উর্বর ভূমি পড়ে আছে চাষ করার জন্য।
—জ্যাজ মেসেঞ্জার, ২০০৭ সালে লিখিত মুরাকামির প্রবন্ধ
নিজেকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করুন
লিখতে গেলে আমি কিছু ছবি দেখতে পাই এবং আমি সেগুলোকে একটি অন্যটির সঙ্গে যুক্ত করি। এটাই আমার স্টোরি লাইন। তারপর এই স্টোরি লাইন পাঠকের সামনে ব্যাখ্যা করি। যখন আপনি কিছু ব্যাখ্যা করবেন, তখন আপনাকে বিনয়ী হতে হবে। আপনার যদি মনে হয় এটা ঠিক আছে, তাহলে আমি বলব এটা খুবই অ্যারোগেন্ট ভাবনা। সহজ শব্দ এবং ভালো রূপক; ভালো অ্যালিগোরি। আমি এটাই করি। আমি খুব সতর্কভাবে পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করি।
—প্যারিস রিভিউর জন্য জন রে’র নেয়া সাক্ষাৎকার
স্বপ্নগুলো ভাগ করে নিন
স্বপ্ন দেখা ঔপন্যাসিকদের দিনের কাজ, কিন্তু আমাদের স্বপ্নগুলো শেয়ার করা তার পরও অনেক জরুরি কাজ। এই ভাগ করে নেয়ার মানসিকতা ছাড়া আমরা ঔপন্যাসিক হতে পারব না।
—২০১১ সালে এক পুরস্কার গ্রহণে সম্মতি দেয়ার প্রেক্ষিতে ভাষণ থেকে
বই লেখার ভালো ব্যাপার হচ্ছে, জেগে জেগে আপনি স্বপ্ন দেখতে পারবেন। যদি স্বপ্নটা সত্য হয়, তাহলে তা আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। বই লেখার সময় আপনি জেগে থাকেন; আপনি সময়, দৈর্ঘ্য, সবকিছু বেছে নিতে পারবেন। আমি সকালে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা লিখি এবং সময়মতো লেখা বন্ধ করি। জেগে দেখা স্বপ্ন না হয়ে সত্যিকার স্বপ্ন হলে আপনি এটা করতে পারতেন না।
লিখতে গিয়ে নিজেই খুঁজুন
আমি লেখার সময় এটা জানি না, কে লিখছে। পাঠক এবং লেখক একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে। যখন কাহিনী লিখতে শুরু করি, তখন জানি না এর উপসংহার কী হবে। সামনের পাতায় কী হবে আমি জানি না। ব্যাপারটা যদি হয় একটা খুনের ঘটনা, তাহলে আমি জানি না খুনি কে? বইটা আমি লিখছি খুনিকে খুঁজে বের করার জন্য। আমি যদি জানি খুনি কে, তাহলে গল্পটা লেখার কোনো প্রয়োজনই নেই।
—প্যারিস রিভিউর জন্য জন রে’র নেয়া সাক্ষাৎকার, ২০০৪
‘লেখা শুরু করার সময় আমার মাথায় কোনো পরিকল্পনা থাকে না। আমি গল্পটির জন্য অপেক্ষা করি। গল্পটা কেমন হবে কিংবা কী ঘটতে যাচ্ছে, সেটা আমি নির্ধারণ করি না। আমি অপেক্ষা করি। তবে নরওয়েজিয়ান উড বইটা ব্যতিক্রম ছিল। কারণ বইটা আমি রিয়ালিস্টিক স্টাইলে লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আসলে আমি লেখার সময় কিছু নির্ধারণ করি না।’
এই পরিকল্পনাহীনতার জন্য মুরাকামিকে অবশ্য বেশ পরিশ্রমও করতে হয়। সেটা নিজেই বলেছেন, ‘প্রথম খসড়াটা হয় খুব অগোছালো। আমাকে বারবার পরিমার্জন করতে হয়।’ এই প্রথম খসড়া লিখতে মুরাকামি সাধারণত ব্যয় করেন ছয় মাস এবং সেটা পরিমার্জন করতে আরো সাত-আট মাস।
ম্যাজিক
স্টিভেন স্পিলবার্গের ই. টি. ছবির সেই দৃশ্যটি স্মরণ করুন, যেখানে ই. টি. গ্যারেজ থেকে ফেলে দেয়া বিভিন্ন জিনিস আবর্জনার স্তূপ থেকে সংগ্রহ করে একটি ট্রান্সমিটিং ডিভাইস তৈরি করে। এসব জিনিসের মধ্যে আছে একটি ছাতা, একটি ফ্লোর ল্যাম্প, পাত্র, প্যান, একটা রেকর্ড প্লেয়ার—ছবিটি অনেক আগে দেখেছি, তাই সবকিছু আমার মনে নেই। ই. টি. এসব গৃহস্থ জিনিস ব্যবহার করে এক অদ্ভুতদর্শন যন্ত্র নির্মাণ করে, যা দিয়ে সে হাজার আলোকবর্ষ দূরে তার নিজের গ্রহে যোগাযোগ স্থাপন করে। সিনেমা হলে এই দৃশ্যটা দেখে আমি বেশ মজা পেয়েছিলাম, কিন্তু এখন আমি বুঝি যে একটা ভালো উপন্যাস লেখা আসলে ই. টির সেই যোগাযোগ যন্ত্র তৈরি করার মতোই। এখানে উপাদানগুলোর গুণাগুণ মুখ্য বিষয় নয়—যা দরকার, সেটা হচ্ছে ম্যাজিক। সেই ম্যাজিক থাকলে নিত্যদিনের সব থেকে সাধারণ ঘটনা এবং সরলতম ভাষা বিস্ময়কর সংবেদনশীলতা তৈরি করতে পারে।
প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে গ্যারেজ থেকে কী ফেলছেন। গ্যারেজ ফাঁকা থাকলে তো ম্যাজিক কাজ করবে না, কারণ তখন তো ফেলার মতো কিছুই আপনার কাছে নেই। আপনাকে অনেক জাংক জমিয়ে রাখতে হবে, যদি ই. টি. ডাকতে আসে!
— মুরাকামির প্রবন্ধ সো হোয়াট শ্যাল আই রাইট অ্যাবাউট?, ২০১৫
স্মৃতি প্রসঙ্গে
‘আমার বিশ্বাস স্মৃতিই হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এটা এক ধরনের জ্বালানি; স্মৃতি আপনাকে পোড়াবে এবং উষ্ণ রাখবে। আমার স্মৃতি হচ্ছে সিন্দুকের মতো। এই সিন্দুকে অনেকগুলো ড্রয়ার আছে। যখন আমি ১৫ বছরের বালক হতে চাই, তখন একটা নির্দিষ্ট ড্রয়ার খুলি এবং কোবেতে ১৫ বছরের আমার কিশোর জীবনকে দেখতে থাকি। আমি সেই সময়ের বাতাসের ঘ্রাণ পাই, আমি সেই মাটি স্পর্শ করতে পারি, গাছের সবুজ শ্যামলিমাও দেখতে পাই। এজন্যই আমি বই লিখতে চাই।’
‘স্মৃতি হচ্ছে ফিকশনের মতো, নাকি ফিকশনই স্মৃতির মতো। ফিকশন লেখা শুরু করলেই এ প্রশ্নটি আমার মনে আসতে থাকে; স্মৃতিকে মনে হয় এক ধরনের ফিকশন, কিংবা উল্টোটা। সবকিছুকে আপনি যত নিখুঁতভাবে আকার দিতে চেষ্টা করুন না কেন, প্রেক্ষিতটা এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকবে, যতক্ষণ না প্রেক্ষিতটাই সেখান থেকে উধাও হয়ে যায়। আপনার জন্য থাকবে একগাদা বিড়াল ছানা, যেগুলো একটি অন্যটির সঙ্গে গড়াগড়ি খাচ্ছে। জীবনশক্তিতে ভরপুর কিন্তু হতাশাজনকভাবে অস্থির। তারপর এগুলোকে এক জায়গায় করতে হবে বিক্রয়যোগ্য পণ্য হিসেবে।’
ফ্যান্টাসি
প্রতিবার বই লেখার সময় আমি ভিন্ন ভিন্ন জুতায় পা গলিয়ে দিই। কারণ, মাঝে মাঝে নিজস্ব অস্তিত্ব নিয়ে ক্লান্ত লাগে। এভাবে আমি কিছুটা মুক্তি পাই। এটা এক ধরনের ফ্যান্টাসি। আপনার মনে যদি ফ্যান্টাসি না থাকে, তাহলে বই লিখতে যাবেন কেন?
শৈল্পিক সংবেদনশীলতা ও শারীরিক শক্তিমত্তা
উপন্যাস লেখার সময় মুরাকামির দৈনন্দিন রুটিন কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। এ সময় তিনি ঘুম থেকে ওঠেন ভোর ৪টায়, এরপর ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা কাজ করেন। বিকালে ১০ কিলোমিটার দৌড়ান কিংবা ১ হাজার ৫০০ মিটার সাঁতার কাটেন (অনেক সময় দুটোই)। কিছুটা পড়াশোনা করেন, গান শোনেন এবং রাত ৯টায় ঘুমাতে যান। প্রতিদিন কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়াই তিনি এ রুটিন অনুসরণ করতে থাকেন। লেখক হিসেবে এ ধরনের দৈনন্দিন রুটিনের গুরুত্ব মুরাকামি নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন, ‘আমি কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়াই এ রুটিন অনুসরণ করি। এ পুনরাবৃত্তি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; এটা এক ধরনের সম্মোহন। আমি নিজেকে সম্মোহিত করি মনের গভীর স্তরে পৌঁছতে। এই পুনরাবৃত্তি দীর্ঘসময় ধরে রাখতে—ছয় মাস থেকে এক বছর—যথেষ্ট পরিমাণ মানসিক ও শারীরিক শক্তি প্রয়োজন। এ বিবেচনায় দীর্ঘ উপন্যাস লেখা হচ্ছে সার্ভাইভাল ট্রেনিংয়ের মতো। শৈল্পিক সংবেদনশীলতার মতো শারীরিক শক্তিও প্রয়োজন।






