স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ ছিল কবিতার যুগ। আর সেই কবিতার প্রধান উপজীব্য ছিল প্রেম ও দ্রোহ। সময়টা ছিল আশা ও আশা ভঙ্গের। ব্যক্তির আবেগ-অনুভূতির পাশাপাশি সমষ্টির না পাওয়ার বেদনা উচ্চগ্রামে উচ্চারিত হতো সে সময়ের কবিতায়।
এই সত্তর দশকের অন্যতম আলোচিত কবি আলেয়া চৌধুরী। তিনি একই সঙ্গে নির্মাণ করেছেন নিজেকে ও কবিতাকে। কবিতার জন্য জন্মশহর কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসেছেন, ঢাকা থেকে পাড়ি জমিয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। কবিতা তার ধ্যানজ্ঞান ও জীবনচর্চার অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
সত্তর দশকের প্রথমার্ধেই প্রকাশিত হয় আলেয়া চৌধুরীর প্রথম বই ‘জীবনের ইস্টিশনে’। তখনো অগ্রজ অনেক কবির বই প্রকাশিত হয়নি। এরপর আর থামেননি আলেয়া চৌধুরী। দেশে বা বিদেশে যেখানেই থাকুন না কেন, পত্রিকা-রেডিও, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস সংস্থা কিংবা শিশু পরিচর্চাকেন্দ্র—জীবিকার জন্য যেখানেই কাজ করুন না কেন, কবিতাকে ভোলেননি। কবিতা হয়ে উঠেছে তার গভীরতম দুঃখ ও প্রগাঢ়তম বেদনার প্রকাশ।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘কবিকে পাবে না তুমি জীবন চরিতে।’ কবি আলেয়া চৌধুরীকে পাওয়া যায় তার অক্ষরবিন্যাসে, শব্দের দ্যোতনায় এবং পঙিক্তর পরতে পরতে। তিনি ব্যক্তির মধ্য দিয়ে সমষ্টির জীবন অবয়ব তুলে আনেন। তার কবিতায় বেদনার কথা আছে, সংগ্রামের কথা আছে, ভালোবাসার কথা আছে, আছে ভালোবাসাহীন পৃথিবীর কথাও। আপন অভিজ্ঞতায় তিনি জানেন এর সবকিছুই জীবনের অংশ। এ কারণে তিনি ঢাকার বস্তির উন্মূল মানুষের সঙ্গে হার্লেমের বাসিন্দাদের মৌলিক কোনো পার্থক্য দেখেন না। উভয়ের মাথার ওপরের আকাশ ছায়াহীন, পায়ের নিচের মৃত্তিকা নিষ্ফলা এবং চারপাশের মানুষগুলো হয়ে ওঠে নির্দয়, নিষ্ঠুর। এ কারণেই মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ কবি টনি মারিসনের সঙ্গে কবি আত্মীয়তা অনুভব করেন।
আলেয়া চৌধুরী বারবার তার কবিতার বাঁক বদল করেছেন। কবি অসীম সাহা তার কবিতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছেন:
আলেয়া চৌধুরীতে আপাদমাথা কবি। জীবনের যাত্রাপথে নানা ঘূর্ণির আবর্তনে দিশেহারা এক পর্যটকের মতো তিনি তীরের নিশানা খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়েছেন, হতোদ্যম হয়ে যাননি কখনো। তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন স্বদেশের ধূলিকণা গায়ে মেখে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। অবশেষ থিতু হয়েছেন মার্কিন মুলুকে। কিন্তু যে অতীতকে তিনি পেছনে ফেলে গিয়েছেন, তাকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যাননি। তার কবিতা, তার গ্রাম ও শহর তার অন্তহীন শ্রম ও ঘাম মেশানো শ্রমিক জীবন এবং দুঃখের দিনের বন্ধু-বান্ধব কাউকে তিনি ভুলে যাননি।
এ পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে আলেয়া চৌধুরীর ১২টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে বইগুলো হলো জীবনের ইস্টিশনে, দুঃখের সমান সরল রেখা, যুদ্ধহীন নিরাময় পৃথিবী চাই, হূদয়ে বাংলাদেশ, আমি হার্লেমের নিগ্রো, দ্রোহী, তুমি, যুদ্ধ, Mother, The man father of Bangladesh, God kissed it, Poems about truth।
এ ১২টি বইয়ের সমন্বয়ে ২০১৭ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার ‘কবিতা সমগ্র’।
প্রথম থেকে শেষ বইটি পাশাপাশি রেখে পড়লে আলেয়া চৌধুরীর কবিতার বিবর্তনটি ধরা পড়বে। যেমন জীবনের ইস্টিশনে বইয়ে তিনি লিখেছেন—
যে প্রেম একদিন ফুল এবং মানুষের
মধ্যে স্থায়িত্ব চেয়েছিল
তার দিকেই তুমি ক্লান্তি ঢেলে দিলে
তৃণ জানে
একটি প্রেমের জন্য সভ্যতার কতটুকু
রক্ত ক্ষয় হয়েছিল
(তার দিকেই তুমি, জীবনের ইস্টিশনে)
আলেয়া চৌধুরী জীবনকে দেখেছেন, এঁকেছেন। জীবন কখনো সরল রেখায় না চললেও দুঃখের সরল রেখায় তিনি জীবনকে চালিত করেছেন। লিখেছেন—
আশা ছিল ফুল হব। তৃণ হয়ে
তোমাকে ছায়া দেব। আশা আঁধারে ডুবেছে
মৃত্যু এসে ঠুকরে খাচ্ছে চোখ।
(আশা ছিল ফুল হব, দুঃখের সমান সরল রেখা)
নারায়ণগঞ্জের টানবাজার পতিতালয়ে শবমেহের নামে ১৩ বছরের এক কিশোরীকে হত্যা করা হলে সারা দেশে প্রতিবাদ উঠেছিল। আলেয়া চৌধুরী তাকে শহীদ হিসেবে অভিষিক্ত করেছেন। লিখেছেন—
পতিতাবৃত্তি নামক শব্দের সঙ্গে
যুদ্ধ করতে করতে যে আজ ইতিহাস
যার মধ্যে প্লাবিত হয় বাঙালি নারীর
প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর
সে শিখিয়েছে বেঁচে থাকতে
নারীর মতো নয়, পুরুষের মতো নয়
মানুষের মতো।
(শহীদ শবমেহেরকে)
আলেয়া চৌধুরীর কবিতায় জীবনের কথা এসেছে ঘুরেফিরে। দেশ ও দেশের সীমার বাইরেও তিনি দেখেছেন মানুষের বেদনা ও সংগ্রামের কাহিনী। পৃথিবীর যারা লাঞ্ছিত-বঞ্চিত মানুষ, তাদের উপলব্ধি এক ও অভিন্ন। তার উপলব্ধি—
হাঁটতে হাঁটতে দেখে ফেলেছি
তেহরানের রাজপথে একজন গুলিবিদ্ধ
রক্তাক্ত হূিপণ্ড
দেখেছি দেয়ালে দেয়ালে অজস্র পোস্টার
উদ্ধত, ক্ষিপ্ত মানুষের চিৎকার
(আমি সুখ আর শান্তির খোঁজে এসেছি)
তার খেদোক্তি—
পৃথিবী সবচেয়ে ক্ষমাশীল রাজার দেশে
এসে দেখছিলাম
ছায়াহীন বেঁচে আছে বাগানের নরম বকুল
আমি কোথাও ক্ষমাশীল রাজার
সাক্ষাৎ পেলাম না
(ক্ষমাশীল রাজার দেশে)
কবি জীবনের তাগিদে, কবিতার প্রতি ভালোবাসার কারণে সমুদ্র ছিন্নভিন্ন করে আমেরিকার মাটিতে আশ্রয় নেন। তার পেছনে রয়েছে আশৈশব ক্ষুধাকে জয় করার দুর্জয় বাসনা। তিনি ক্লান্ত হন না, পরাজিত হন না। এ কারণেই লিখতে পারেন, ‘আমার ক্ষয় নেই, মৃত্যু নেই, জীবন্ত জীবন আমার। (তবু আমি জিতে যাই, দ্রোহী)
অসীম সাহা লিখেছেন—
আলেয়ার কবিতা সমষ্টির মঙ্গল সাধনায় যেমন অঙ্গীকারবদ্ধ; তেমনি ব্যক্তির প্রেমানুভূতি, কবিতার মৌলিক দ্যোতনা হিসেবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে মানবজীবন, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতিও দায়বদ্ধ।... তার কবিতায় মানব অনুভূতির সকল পরিমার্যকে যথাযথভাবে গ্রন্থিবদ্ধ করতে পেরেছেন। আর এখানেই কবি হিসেবে আলেয়া চৌধুরীর সার্থকতা।
কবিতা পাঠকরা একসঙ্গে আলেয়া চৌধুরীর ১২টি বইয়ে বাংলা ও ইংরেজি কবিতা পড়তে পারবেন। এ কবির সাফল্য কামনা করি।
কাব্যসমগ্র/ আলেয়া চৌধুরী
আগন্তুক
৩৪০, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেট কাঁটাবন, ঢাকা ১০০০
প্রচ্ছদ: সাগর আহমেদ
দাম: ৫২০ টাকা






