মানচিত্রের নিজেরই
যে ইতিহাস
আছে, সেটা
অনেক সময়
আমলে নেয়া
হয় না।
এ ইতিহাসে
একই সঙ্গে
পাওয়া যায়
মানচিত্রের প্রস্তুতকারক,
তাদের পৃষ্ঠপোষক
ও ব্যবহারকারীদের
নেটওয়ার্কের বিবর্তনের
সূত্র। জ্ঞানতাত্ত্বিক
প্রেক্ষিতে ‘নিখুঁত
দলিল’ হিসেবে
মানচিত্রের ব্যবহার
নিয়েও আলোচনা
আছে মানচিত্রের
ইতিহাসে। আরো
একটি গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় এড়িয়ে
যাওয়া বা
অস্বীকার করার
প্রবণতা আছে—ভারতবর্ষের
ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায়
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির অবদান।
কোম্পানির এ
ভূমিকাকে অনুধাবন
করতে চাইলে
দেখতে হবে
মানচিত্রের ব্যবহার
ও মানচিত্রগুলো
কী উপস্থাপন
করতে চাইছে—এ
বিষয়ে ঔপনিবেশিক
শাসনের শুরুর
দশকগুলোতে দক্ষিণ
এশীয় ও
ব্রিটিশদের নিজ
নিজ ধারণাকে।
এ ব্যবহার
ও ধারণাগুলো
ঔপনিবেশিক শাসনে
ধীরে ধীরে
বদলে গিয়েছিল।
ঔপনিবেশিক
শাসন শুরু
হওয়ার আগেই
ভারতবর্ষে অনেক
মানচিত্রের অস্তিত্ব
ছিল। এসব
মানচিত্রের ধরন
দুটো বিষয়ে
পরিষ্কার ধারণা
দেয়—ভারতবর্ষ
ইউরোপের মতো
বিস্তৃত ভূখণ্ড
ও বৈচিত্র্যের
আধার; অন্যদিকে
ভারতবর্ষের সঙ্গে
প্রাচীনকাল থেকেই
দুনিয়ার প্রভাবশালী
সভ্যতাগুলোর সঙ্গে
যোগাযোগ ছিল।
কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য
হলো যে
এসব মানচিত্রের
অনেকগুলোতে বিভিন্ন
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য
চিহ্নিত করতে
বিভিন্ন রঙের
ব্যবহার ছিল—হালকা
বাদামি রঙ
ব্যবহার করা
হতো সমতল
এলাকা বোঝাতে,
গাঢ় বাদামি
ব্যবহূত হতো
পর্বত, নীল
রঙ নদীর
জন্য, হাতির
দাঁতের রঙ
ব্যবহার করা
হত সমুদ্র
বোঝাতে। সে
সময়ের মানচিত্রের
ছিল সামরিক,
রাজস্ব আয়
ও ধর্মীয়
ব্যবহার। মধ্যযুগে
ভারতবর্ষে অন্তত
একটি বিশ্ব
মানচিত্রের অস্তিত্ব
ছিলঅ এতে
ছিল মানচিত্রের
৩৪টি পৃষ্ঠা।
এ মানচিত্র
তৈরি হয়েছিল
পারস্যের চোঙা
আকৃতির উপস্থাপনা
পদ্ধতিতে।
হিন্দু
পুরাণের ওপর
নির্ভর করে
তৈরি অন্তত
ছয়টি কসমোগ্রাফিক
ভূগোলক এখনো
টিকে আছে
ব্রিটেন ও
ভারতের বিভিন্ন
সংগ্রহশালায়। এগুলোর
মধ্যে সবচেয়ে
পুরনো ও
আকর্ষণীয়টি হচ্ছে
সেমা কর্ণের ভূগোল। এটি
পিতলের তৈরি
একটি কনটেইনার,
যার গায়ে
সূক্ষ্মভাবে খোদাই
করা আছে
পুরাণ অনুসারে
দুনিয়ার বিভিন্ন
উপাদান। এটি
টলেমি-পরবর্তী
সংস্কৃত জ্যোতির্বিদদের
হাতে পরিবর্তিত
হয়েছিল। এটি
বর্তমানে অক্সফোর্ডের
হিস্ট্রি অব
সায়েন্স মিউজিয়ামে
সংরক্ষিত আছে।
শিল্প ঐতিহাসিকরা
অনেক জৈন
চিত্রকর্মকে তীর্থযাত্রার
পথপরিচয় হিসেবে
শনাক্ত করেছেন।
কয়েক বছর
আগে সপ্তদশ
শতকের মধ্যভাগের
সমুদ্রগামী এক
নাবিকের ম্যানুয়াল
পাওয়া গেছে,
যাতে সি
চার্টও আছে।
এ থেকে
নেভিগেশনে মানচিত্রের
ব্যবহারের প্রমাণ
পাওয়া যায়।
বিচারসংক্রান্ত কাজে
সম্রাট আকবর
শাসনামলে (১৫৫৬-১৬০৫)
কর্তৃক মানচিত্রের
ব্যবহারের কথা
জানিয়েছেন তার
দরবারের পেটি
কর্মকর্তা আসাদ
বেগ কাজয়িনি।
আসাদ শাহজাহানের
দরবারেরও (১৬২৮-৫৮)
কাজ করেছেন।
আসাদ তার
স্মৃতিকথা তারিখ-ই
আসাদ বেগ
কাজয়িনিতে
উল্লেখ করেছেন,
আকবর তাকে
নিযুক্ত করেছিলেন
অবরুদ্ধ এক
দুর্গ থেকে
একজন রাজপুত
শাহজাদার পলায়নের
বিষয়টির তদন্ত
করতে। সেটা
করতে গিয়ে
আজম যা
করেছিলেন—
কয়েক গজ
লম্বা এক
টুকরো কাপড়
আনা হলো...এই কাপড়ের ওপর
ইরাজ দুর্গের একটি নকশা
আঁকা হলো।
এতে একদিকে
নদী এবং
অন্য তিনদিকে দেয়াল ও
দরজা দেখানো
হলো। চারদিকের সেনাশিবিরগুলোকেও নির্দেশ করা হলো
এবং বকশিকে
বলা হলো
প্রত্যেক শিবিরের সেনাধ্যক্ষের নাম
জায়গামতো লিখতে।
প্রত্যেককে তার
নিজ নিজ
মোহর লাগাতে
হলো অঙ্কিত
অবস্থানটিতে তিনি
ছিলেন তা
নিশ্চিত করতে।
বীর সিং
যে জায়গা
দিয়ে পালিয়েছিলেন, সেটাও আঁকা
হয়েছিল এবং
একই সঙ্গে
যে স্থানে
তিনি নদী
পার হয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট সবাই
যখন তাদের
অবস্থান নির্দিষ্টকরণসংক্রান্ত মোহর লাগালেন তখন আজম
বললেন, এই
কাপড়ের টুকরোটিই তিনি প্রতিবেদন হিসেবে সম্রাটের সামনে হাজির
করবেন।
ভারতীয়
মানচিত্রগুলোর কোনো
নির্দিষ্ট স্কেল
ছিল না।
তবে এটাও
উল্লেখ করা
প্রয়োজন যে
জেমস রেনেলের
আগে ইউরোপীয়দের
তৈরি করা
মানচিত্রের সর্বজনীন
কোনো নির্দিষ্ট
স্কেল ছিল
না। উদাহরণস্বরূপ
বলা যায়,
অ্যানভিলের কার্টে
ডি এল’ইন্দে
ছিল সে
সময়ে সবচেয়ে
নিখুঁত মানটিত্র।
এতে পরিমাপের
জন্য ছয়টি
ভিন্ন স্কেল
ব্যবহার করা
হয়েছিল। এমনকি
ভারতে জেমস
রেনেলের উত্তরসূরিরাও
বিভিন্ন নন-স্ট্যান্ডার্ডাইজড
স্কেল ব্যবহার
করেছেন। এ
কারণে রেনেল
ক্যাপ্টেন অ্যালেন
ও বিটসনের
তৈরি করা
মানটিত্র নিয়ে
খেদ প্রকাশ
করেছিলেন। অ্যালেন
ও বিটসন
১৭৯০-এর
দশকের শুরুর
দিকে ভারতীয়
উপদ্বীপে ব্রিটিশ
সেনাদের দুটি
অভিযানকে নির্দেশ
করতে মানচিত্র
তৈরি করেছিলেন।
কিন্তু এ
মানচিত্র দেখে
সাধারণ কোনো
মানুষের পক্ষে
কিছু বোঝা
সম্ভব ছিল
না।
রেনেল
মানচিত্র নিয়ে
কাজ করার
জন্য ভারতে
আসেননি। বাংলার
গভর্নর হেনরি
ভানসিট্টার্ট রেনেলকে
অনুরোধ করেছিলেন
তার বিভিন্ন
যাত্রাপথের চেহারা
ও উৎপাদিত
দ্রব্যের বিবরণ
নোট করে
রাখতে। একই
সঙ্গে তিনি
বলেছিলেন যাত্রাপথের
সব গ্রামের
নাম জার্নালে
তুলতে এবং
সম্ভব হলে
নদী ও
জলাশয়ের বিবরণসংবলিত
অঙ্কন করতে।
গভর্নর হেনরি
চেয়েছিলেন, রেনেল
যেন তার
এ জার্নালের
একটি কপি
তাকে দেন।
পরের বছর
হেনরির জায়গায়
বাংলার গভর্নরের
পদে আসীন
হন লর্ড
ক্লাইভ। সে
সময় ক্লাইভের
অনুরোধে বাংলার
প্রথম মানচিত্রটি
আঁকেন এবং
সেটা রবার্ট
ওরমের হিস্ট্রি অব
দ্য মিলিটারি ট্রানজাকশনস অব
দ্য ব্রিটিশ নেশন ইন
হিন্দুস্তান ফ্রম
দ্য ইয়ার
১৭৪৫ গ্রন্থের দ্বিতীয়
খণ্ডের অলংকরণের
জন্য। প্রভাবশালী
ক্লাইভের ব্যক্তিগত
সংগ্রহের জন্যও
কয়েকটি মানচিত্র
এঁকেছিলেন। এমনকি
অ্যানভিলের কার্টে ডি
এল’ইন্দেও ছিল
মানচিত্র নিয়ে
ব্রিটিশদের তুলনায়
বেশি ওয়াকিবহাল
ফরাসিদের জন্য
এবং এটা
তৈরি হয়েছিল
প্যারিসের এক
সরকারি দপ্তরের
দেয়ালে ঝুলিয়ে
রাখার জন্য।
এ সময়
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির আরো
অনেক সার্ভেয়ার
নিজেদের অবস্থানের
উন্নতির জন্য
হাতে আঁকা
অনেক মানচিত্র
তৈরি করেছিলেন,
যেগুলো তারা
করেছেন মূলত
দেয়ালে সাজিয়ে
রাখা সুন্দর
বস্তু হিসেবে।
এসব মানচিত্র
তারা সংসদ
সদস্য, শিক্ষিত
মানুষের বিভিন্ন
সংগঠনের সদস্য,
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির পরিচালক
ও প্রভাবশালীদের
ব্যক্তিগত সংগ্রহের
জন্য আঁকতেন।
এসব মানচিত্র
মোগল মিনিয়েচারের
মতো করে
দেয়াল সাজানোর
কাজে লাগানো
হতো। এ
চর্চা নিয়ে
কোম্পানি একসময়
রীতিমতো উদ্বিগ্ন
হয়ে ওঠে।
তাদের মনে
হয়, ভারতের
ভূগোল নিয়ে
তাদের আহরণ
করা এবং
তাদের অবস্থান
নিয়ে বিভিন্ন
তথ্য এসব
উন্মুক্ত করে
রাখা মানচিত্রের
মাধ্যমে সবখানে
ছড়িয়ে যেতে
পারে। এ
বিষয়ে সতর্কতা
জারি করে
লন্ডনের কোর্ট
অব ডিরেক্টররা
বাংলার গভর্নরের
কাছে ১৭৬৬
সালে একটি
চিঠিও পাঠিয়েছিলেন।
এর ঠিক
দুই বছর
পর একই
দপ্তর থেকে
আবার চিঠি
দিয়ে জানানো
হয় যে
ক্যাপ্টেন রেনেলের
তৈরি করা
চার্ট যেন
তাদের কাছে
পাঠানো হয়
এবং সতর্ক
করে বলা
হয়, তাদের
অনুমতি ছাড়া
যেন সেগুলোর
কোনো কপি
আর কারো
কাছে দেয়া
না হয়।
১৮০৯ সালে
কোম্পানি কড়া
নির্দেশনা জারি
করেছিল যে
সার্ভেয়াররা কাজ
শেষে তাদের
মানচিত্র জমা
দিয়ে ঘোষণা
দেবেন, তাদের
কাছে মানচিত্র,
পরিকল্পনা কিংবা
ফিল্ডবুকের কোনো
অতিরিক্ত কপি
নেই।
উনিশ
শতকের শেষ
পর্যন্ত এ
ধরনের নিষেধাজ্ঞা
অব্যাহত ছিল।
তবে নিষেধাজ্ঞা
থাকাকালীন মানচিত্র
ফাঁস হয়েছে—যত
না ব্রিটেনের
শত্রু ফ্রান্সের
কাছে তার
চেয়ে বেশি
কোম্পানির বোর্ড
সদস্যদের কাছে।
মূলত তারা
এগুলো পয়সা
খরচ করে
কিনতেন অথবা
ঘুষ হিসেবে
পেতেন। এমনকি
জেমস রেনেলের
জরিপের অনেক
কাজ ভারতে
কোম্পানির বড়
কর্মকর্তার ব্যক্তিগত
সম্পত্তি হিসেবে
ব্রিটেনে হাজির
হয়েছিল। কাকতলীয়ভাবে
তার অনেক
কাজ পাওয়া
গিয়েছিল এক
নারীর সংগ্রহে,
তারপর কোর্ট
অব ডিরেক্টরস
সেগুলো ১০০
পাউন্ডে কিনে
নিয়েছিল।
তাহলে
মানচিত্র ছাপা
কবে শুরু
হয়েছিল কিংবা
সাধারণ মানুষই
বা কবে
এ বস্তু
বোঝার মতো
শিক্ষিত হয়ে
উঠেছিল? শুনতে
কিছুটা অবাক
লাগলেও সত্য
যে উনিশ
শতকের আগে
ব্রিটেনের মানুষের
মধ্যে মানচিত্র
ব্যবহার কিংবা
বোঝাপড়ার আগ্রহ
ছিল না।
ভারতে উপনিবেশ
স্থাপনই ব্রিটিশ
নাগরিকদের মধ্যে
দক্ষিণ এশিয়া
বিষয়ে জানার
কৌতূহল সৃষ্টি
করেছিল আর
এ প্রেক্ষিতেই
দুয়ার খুলেছিল
তথ্য সরবরাহের
এক লাভজনক
বাণিজ্যের দ্বার।
ঠিক এর
পরিপ্রেক্ষিতেই প্রকাশিত
হয়েছিল জেমস
রেনেলের ম্যাপ অব
হিন্দুস্তান
(১৭৮২)।
এর ভূমিকায়
রেনেল লিখেছিলেন,
‘হিন্দুস্তানে ব্রিটিশদের
যুদ্ধের থিয়েটার
কয়েকটি প্রদেশে
সীমাবদ্ধ, দেশটির
সাধারণ ভূগোলের
প্রতি আগ্রহ
তেমন একটা
দেখা যায়
না। কিন্তু
এখন আমরা
সেখানে হয়
যুদ্ধ করছি
নয়তো মৈত্রী
গড়ে সমঝোতা
করছি...আ ম্যাপ
অব হিন্দুস্তান আমাদের
রাজনৈতিক সংযোগের
স্থানীয় পরিস্থিতি
এবং আমাদের
সেনা অভিযানের
বিশদ ব্যাখ্যা
করবে। এবং
আমাদের এসব
বিজয়ের গৌরব
নিশ্চয়ই সবার
জন্য দারুণ
আগ্রহের বিষয়।...’
এ সময়
থেকে মানচিত্র
মোটা কাগজে
ছাপিয়ে সংশ্লিষ্ট
কোনো বইয়ের
মধ্যে ভাঁজ
করে দেয়ার
রীতি চালু
হয়। এ
সময়ে ব্রিটিশদের
তুলনায় মানচিত্রের
ব্যবহার নিয়ে
ফরাসি নাগরিকরা
বেশি শিক্ষিত
ছিল। রেনেলের
ম্যাপ অব
হিন্দুস্তান ফরাসি
ভাষায় অনূদিত
হয়েছিল। মূলত
এ সময়
থেকেই মানচিত্র
দেয়ালে ঝুলিয়ে
রাখা সৌন্দর্যবর্ধনের
বস্তু থেকে
ভৌগোলিক উপস্থাপনার
অপ্রতিম মাধ্যম
হয়ে ওঠে।
দুনিয়ায় মানচিত্রের
ইতিহাসের এ
পর্বটি—দেয়ালে
ঝোলানো অ্যাস্থেটিক
বস্তু থেকে
গোপনীয় দলিল
এবং তারপর
উন্মুক্ত প্রকাশনা—ভারতবর্ষে
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক
শাসনামলে সম্পন্ন
হয়েছিল।
সূত্র: রিলোকেটিং
মডার্ন
সায়েন্স,
কপিল রাজ
অমিত
রহমান:
নন-ফিকশন লেখক





