৫০০ বছরের পুরনো একটি মানচিত্র, যা বিশ্ব ইতিহাসে টিকে থাকা প্রভাবশালী মানচিত্রগুলোর অন্যতম। ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন প্রথমবার আটলান্টিক পাড়ি দেন, সে সময় তিনি মানচিত্রটি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। ধারণা করা হয়, ভ্রমণ পরিকল্পনার সময় মানচিত্রটির একটি অনুলিপি ব্যবহার করেছেন কলম্বাস।
১৪৯১ সালে মানচিত্রটি আঁকা হয়েছিল, যা বিশ্বে টিকে থাকা প্রাচীন মানচিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। জার্মানির নুরেমবার্গ থেকে আসা ভূগোলবিদ ও মানচিত্রকার হেনরিকাস মার্টেলাস মানচিত্রটি অংকন করেন। ১৪৮০ থেকে ১৪৯১ সাল পর্যন্ত ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে তার বসবাস ছিল। এমন এক সময় তিনি মানচিত্রটি এঁকেছিলেন, যখন পৃথিবী সম্পর্কে পশ্চিমাদের ধারণা বর্তমান সময়ের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন রকম ছিল। পরবর্তী সময়ে তৈরি বিশ্ব মানচিত্রগুলোর ওপরও এটির বিপুল প্রভাব দেখতে পাওয়া গেছে। জার্মান মানচিত্র আঁকিয়ে মার্টিন ওয়াল্ডসিমুলারের ১৫০৭ সালে আঁকা বিখ্যাত মানচিত্রটিতেও এর প্রভাব দেখা যায়। এ মানচিত্রেই প্রথমবার ‘আমেরিকা’ নামটি ব্যবহার করা হয়।
মার্টেলাসের মূল মানচিত্রটিতে কয়েক ডজন চিহ্ন ও ল্যাটিনে কিছু লেখা ছিল। কিন্তু কালের সে াতে এগুলোর সিংহভাগই ম্লান হয়ে গেছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রকৃত মানচিত্রটির অনেক অস্পষ্ট লেখারই পাঠোদ্ধার করতে পেরেছেন গবেষকরা। মার্টেলাস মানচিত্রটি তৈরি করতে যে রেফারেন্স ব্যবহার করেছিলেন, পাঠোদ্ধারের প্রক্রিয়ায় সেগুলো সম্পর্কে নতুন সূত্র আবিষ্কার করেছেন তারা।
মার্টেলাস
ও কলম্বাস
তত্কালীন জনশ্রুতির বিপরীতে ১৫ শতকের ইউরোপীয়রা বিশ্বাসই করেননি, কলম্বাস বিশ্বের প্রান্তের দিকে যাত্রা করতে পারেন। কারণ সে সময় পৃথিবী গোল নয় বরং সমতল বলেই প্রচলিত বিশ্বাস ছিল। মার্টেলাসের মানচিত্র নিয়ে গবেষণাকারী দলের নেতৃত্বে থাকা ও মানচিত্রবিষয়ক পণ্ডিত চেট ভন ডুজের বলেন, সে সময়ে বিশ্ব সম্পর্কে ধারণার সঙ্গে যে আজকের ভাবনার বিস্তর তফাত রয়েছে, মার্টেলাসের মানচিত্রে তারই প্রতিফলন দেখা যায়।
মার্টেলাসের মানচিত্রে ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরের অবস্থানের ধারণা কম-বেশি সঠিক রয়েছে বা বলা যায় অন্তত চিনতে পারার মতোই আছে। কিন্তু আফ্রিকার দক্ষিণ দিকে আকার দাঁড়িয়েছে অনেকটা বুটের মতো, যার আঙুলের দিকটি পূর্বে নির্দেশ করছে। আবার এশিয়ার আকৃতিও বিকৃত হয়ে গেছে। এদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণে যে বিশাল দ্বীপটি চিহ্নিত করা হয়েছে, বর্তমানে সেখানে অস্ট্রেলিয়াকে খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এটি বরাতজোরে এমনটা ঘটে যেতে পারে বলে মনে করেন ভন ডুজের। কারণ মহাদেশটি আবিষ্কারে ইউরোপীয়দের তখনো এক শতাব্দী বাকি ছিল।
মানচিত্রে প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণের ফাঁকা অংশটি বেশকিছু কল্পনাপ্রসূত দ্বীপ দিয়ে পূরণ করেছেন মার্টেলাস, যা মূলত মানচিত্র আঁকিয়েদের শূন্যস্থান নিয়ে বিরক্তি জন্মানোর অংশ হতে পারে।
মার্টেলাসের ভূগোলবিষয়ক আরো একটি কুহক মানচিত্রটিকে কলম্বাসের যাত্রার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো মানচিত্রে জাপানের অবস্থান। যে সময়কালে মার্টেলাস মানচিত্র তৈরি করেছেন, তখন পর্যন্ত ইউরোপীয়রা জাপানের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে খুব বেশি ধারণা তারা রাখতেন না। এমনকি ইতালির বিখ্যাত অভিযাত্রী মার্কো পোলোর জার্নালেও দ্বীপটির অবস্থান সম্পর্কে তেমন কিছু উল্লেখ ছিল না। যদিও সে সময় তত্কালীন পূর্ব এশিয়া সম্পর্কিত তথ্যের সর্বোত্কৃষ্ট উৎস ছিল মার্কো পোলোর জার্নালগুলো।
মানচিত্রে মার্টেলাস জাপান নামক দ্বীপটির অবস্থান উত্তর থেকে দক্ষিণের দিকে দেখিয়ে ছিলেন আর এ তথ্যটিও সঠিক। মার্টেলাসের এ অনুমানও ভাগ্যের জোর বলেই মনে করেন ভন ডুজের। এর কারণ সে সময়কার জানাশোনা আর কোনো মানচিত্রে জাপানের অবস্থান এত নিশ্চিতভাবে দেখানো হয়নি। পরবর্তী সময়ে কলম্বাসের পূত্র ফার্দিনান্দ লেখেন, জাপানের অবস্থান উত্তর থেকে দক্ষিণের দিকে বলে বাবা বিশ্বাস করতেন, যা আসলে মার্টেলাসের মানচিত্রকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দিচ্ছে।
১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর ওয়েস্ট ইন্ডিজে অবতরণ করার পরই জাপানকে খুঁজতে শুরু করেন কলম্বাস। তখনো তার ধারণা যে, তিনি এশিয়ার দিকে যাওয়ার জন্য পথ খুঁজে পাওয়া লক্ষ্য অর্জন করে ফেলেছেন। জাপান কাছাকাছি কোথাও আছে বলে মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন তিনি। কারণ মার্টেলাসের মানচিত্রে ইউরোপ ও জাপানের মধ্যে যে ব্যবধানের উল্লেখ রয়েছে, কলম্বাস প্রায় সমপরিমাণ দূরত্বই ভ্রমণ করে ফেলেছিলেন বলে যুক্তি দেন ভন ডুজের।
ভন ডুজের বলেন, এটা ধরে নেয়া যুক্তিসঙ্গত যে, পরবর্তী যাত্রাগুলোয় কলম্বাস যখন মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের ভাটিতে ভ্রমণ করতেন, তখন ধরেই নিতেন, তিনি এশিয়ার উপকূল ধরে চলছেন, যেমনটা মার্টেলাসের মানচিত্রে অঙ্কিত ছিল।
টাইম
ক্যাপসুল পুনরুদ্ধার
১৪৯১ সালে অঙ্কিত মার্টেলাসের মানচিত্রের আকার সাড়ে ৩ ফুট বাই ৬ ফুট। সে সময় এমন একটি বিশাল মানচিত্র বিলাসিতারই বস্তু ছিল। ধারণা করা যায়, অভিজাত শ্রেণীর কোনো সদস্যের নির্দেশে এটি প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে ব্যক্তিটি কে হতে পারেন, তা বোঝার মতো চিহ্ন বা উৎসর্গ মানচিত্রে উল্লেখ নেই।
১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটি বেনামি দান থেকে মানচিত্রটি পায়। এর পর থেকে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাইনেকে রেয়ার বুক অ্যান্ড ম্যানুস্ক্রিপ্ট লাইব্রেরি’তেই ছিল।
এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানচিত্রের লেখাগুলো অস্পষ্ট হতে হতে প্রায় পটভূমির রঙের সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করেছে। ২০১৪ সালে ভন ডুজের ন্যাশনাল এনডাওমেন্ট থেকে অনুদান পান, যা তার ও সহযোগী একটি দলের সামনে মানচিত্রটির গোপন পাঠোদ্ধারে মাল্টিস্পেক্ট্রাল ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
মূলত এ পদ্ধতিতে মানচিত্রের সুস্পষ্ট দৃশ্যমানতা পেতে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোতে মানচিত্রটির শত শত ছবি তুলতে হয় এবং সঠিক তরঙ্গদৈর্ঘ্যের জন্য ছবিগুলোকে প্রসেস করা হয়।
গবেষক দলটি মার্টেলাসের মানচিত্রের লিজেন্ডগুলোয় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল ও সেখানকার বাসিন্দাদের বর্ণনা দেখতে পেয়েছেন। যেমন মধ্য এশিয়া নিয়ে একটি দুর্বোধ্য পাঠ্যে বলা হয়েছে, ‘এখানে
হিপ্পোপোডেস পাওয়া যায়: এদের আকৃতি মানবের মতো কিন্তু পাগুলোর ঘোড়ার।’ আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘মানুষের
মতো দানব, যাদের কান এত বড় যে, সেগুলো তাদের পুরো শরীরই আবৃত করতে সক্ষম’। মানচিত্রে উল্লিখিত বহু কল্পিত প্রাণীর বর্ণনা প্রাচীন গ্রিক গ্রন্থে খুঁজে পাওয়া গেছে।
গবেষকরা সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য আফ্রিকার অভ্যন্তরে খুঁজে পেয়েছেন। ভন ডুজের বলেন, মার্টেলাস মানচিত্রে বহু বিবরণ ও জায়গার নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যেগুলোর সঙ্গে এক ইথিওপীয় প্রতিনিধির যোগসূত্র পাওয়া যায়, যিনি ১৪৪১ সালে ফ্লোরেন্স সফর করেছিলেন। ভন ডুজের বলেন, আমার জানা মতে ১৫ শতকের আর কোনো ইউরোপীয় মানচিত্রে আফ্রিকার ভূগোল সম্পর্কে এ পরিমাণ তথ্য নেই। ইউরোপীয় অভিযাত্রী নয় বরং কেবল স্থানীয় আফ্রিকানদের কাছ থেকেই এমন তথ্য পাওয়া সম্ভব।
এছাড়া মার্টেলাসের মানচিত্রটি পরবর্তী সময়ে আরো বিখ্যাত দুটি কর্টোগ্রাফিক অবজেক্টের গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল বলে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন। এর একটি হলো, ১৪৯২ সালে জার্মান বস্ত্র ব্যবসায়ী ও মানচিত্র আঁকিয়ে মার্টিন ভন বেহাইমের তৈরি টেরিস্ট্রিয়াল গ্লোব এবং দ্বিতীয়টি হলো মার্টিন ওয়াল্ডসিমুলারের ১৫০৭ সালের বিশ্ব মানচিত্র।
মার্টেলাস ও ওয়াল্ডসিমুলারের মানচিত্র দুটির তুলনা করলে ওয়াল্ডসিমুলারকে মার্টেলাসের মানচিত্র থেকে উদারভাবে অনুলিপি করতে দেখা যায়। তবে সে সময় এ ধরনের চর্চা সাধারণ বিষয় ছিল। মার্টেলাস নিজেই তার মানচিত্রে উল্লিখিত সাগর দানবের তথ্য ১৪৯১ সালে প্রকাশিত একটি এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে নিয়েছেন। আর এ সূত্রটি মার্টেলাসের ম্যাপটির দিনক্ষণ খুঁজে পেতে সহায়তা করেছে।
মিল থাকলেও মার্টেলাস ও ওয়াল্ডসিমুলারের মানচিত্র দুটিতে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মার্টেলাস ইউরোপ ও আফ্রিকাকে মানচিত্রের বাম প্রান্তে দেখিয়েছেন, যার পেছনে কেবল জলসীমাই রয়েছে। অন্যদিকে ওয়াল্ডসিমুলারের মানচিত্র আরো পশ্চিমে এগিয়েছে এবং আটলান্টিকের বিপরীত প্রান্তে নতুন স্থলভাগ দেখিয়েছে।
গ্রেগ
মিলার: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের লেখক





