ভূগোলবিদ্যা, সমরবিদ্যার পাশাপাশি সাহিত্যেও মানচিত্রের ভূমিকা আছে। কোনো মানচিত্রই বাস্তবের খাঁটি উপস্থাপন করতে পারে না। ঘরে বসে হিমালয়ের মানচিত্রে হাত বোলালে হিমালয় অনুভব করা সম্ভব নয়। অবশ্য সে মানচিত্র যদি লুইস ক্যারলের সিলভি
অ্যান্ড
ব্রুনো
কনক্লুডেড উপন্যাসে ম্যান হা’র পরিকল্পিত মাইল টু মাইল স্কেলে তৈরি হয়, তাহলে অবশ্য ব্যাপারটা কেমন হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে ম্যান তার সেই পরিকল্পিত মানচিত্রটি তৈরির কথা জানালে স্থানীয় কৃষকরা আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ তাতে পুরো জমি মানচিত্রের তলায় ঢাকা পড়বে, আটকে যাবে সূর্যের আলো। তাই ম্যান দেশকেই দেশের মানচিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল!
লুইস ক্যারলের এ কাহিনী তার কল্পনা। মানচিত্র নিজেও একটি কল্পনা। কোনো মানচিত্রই শতভাগ নিখুঁত নয়, কিংবা বাস্তবকে জীবন্ত করে তুলতে পারে না। যেকোনো মানচিত্রকে বুঝতে পাঠকের অবশ্যই কল্পনাশক্তির প্রয়োজন, কতগুলো প্রতীককে নিজের মনে বাস্তব হিসেবে কল্পনা করতে হয়। তাই সাহিত্যিকরাও তাদের কল্পনার কাহিনীতে মানচিত্রকে ব্যবহার করেছেন। অনেক লেখকই মানচিত্র ভালোবাসেন: কেউ মানচিত্র সংগ্রহ করেন, তৈরি এবং বর্ণনাও করেন। লিটারেরি কার্টোগ্রাফি নামের টার্মও আছে।
মানচিত্র রোমাঞ্চ, অভিযান, গুপ্তধন, যুদ্ধ এমনকি বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর সঙ্গেও সম্পর্কিত। রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের উপন্যাস ট্রেজার
আইল্যান্ড বিলি বোনস কিংবা জিম হকিন্স নয়, বরং শুরু হয়েছে একটি মানচিত্র দিয়ে। ১৮৮১ সালে স্কটল্যান্ডের বৃষ্টি আর ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় স্টিভেনসন ঘরে বসে ছবি এঁকে তার ১২ বছরের ছেলেকে আনন্দ দিচ্ছিলেন। সে সময়ের কথা লিখতে গিয়ে তিনি তার এক রচনায় লিখেছেন, ‘এ
রকম ছবি আঁকার সময় আমি একবার একটা দ্বীপের মানচিত্র তৈরি করে ফেলি। আমার মনে হয় মানচিত্রটা বেশ বিশদ এবং রঙিন করে এঁকেছিলাম। মানচিত্রটি আমার কল্পনাশক্তিকে একেবারে বাঁধ ভেঙে ভাসিয়ে নিয়েছিল। মানচিত্রে একটা পোতাশ্রয় ছিল যেটা আমাকে সনেট লেখার মতো সন্তুষ্টি দিয়েছে। তারপর আমার অবচেতন মনে দৈবনির্দিষ্ট নিয়তিতে রচিত হয়েছে ট্রেজার
আইল্যান্ড।
বৃষ্টির দিনে ঘরে বসে শখের খেয়ালে আঁকা মানচিত্রটি জন্ম দিয়েছিল দুনিয়াখ্যাত ক্ল্যাসিক ট্রেজার আইল্যান্ডের। মানচিত্রটি উপন্যাসের ন্যারেটিভ, চরিত্র—সবকিছুকেই প্রভাবিত করেছে। রবার্ট লুইস স্টিভেনসন লিখেছেন, যখন তিনি ট্রেজার আইল্যান্ডের মানচিত্রে গভীরভাবে মনোযোগ দেয়ার পর থেকে বইয়ের চরিত্রগুলো একে একে হাজির হচ্ছিল, তাদের বাদামি চেহারা ও অস্ত্রের ঝলকানি বিভিন্ন কোণ থেকে উঁকি দিচ্ছিল। তার কয়েক ইঞ্চিজুড়ে আঁকা ওই সমতল মানচিত্রের মধ্যে গুপ্তধনের সন্ধান, নিজেদের মধ্যে লড়াই করছিল।
আমেরিকান লেখক উরসুলা কে. লে গুয়েনের ফ্যান্টাসি দি
আর্থসি
ট্রিলজি শুরু হয়েছে একটি মানচিত্র দিয়ে। এ মানচিত্র উরসুলা নিজেই এঁকেছিলেন। ফ্যান্টাসি ও সায়েন্স-ফিকশন লেখকরা পেশাদার মানচিত্রকার না হলেও তাদের কল্পনার জগেক ফুটিয়ে তুলতে নিজেদের আঁকা মানচিত্রের দ্বারস্থ হয়েছেন।
দ্য লর্ড
অব
দ্য
রিংস খ্যাত জে. আর. আর টোলকিন তার কল্পনার ভূমি মিডল আর্থের মানচিত্র তৈরি করতে নিযুক্ত করেছিলেন পলিন বেনেসকে। এ পলিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মানচিত্র আঁকা শিখেছিলেন। তিনি তার আঁকা মানচিত্র-অলংকরণে মিডল আর্থের বনভূমি, বিভিন্ন এলাকা, পার্বত্য অঞ্চলকে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিভিন্ন চরিত্র, স্থাপনা এবং জীবের অলংকরণও করেছেন পলিন।
পলিনের আঁকা মানচিত্র টোলকিনের কল্পনার মিডল আর্থকে বুঝতে পাঠককে খুব সাহায্য করেছে। লেখক নিজেও পলিনের কাজে খুব খুশি হয়েছিলেন, এতটাই যে তিনি তাকে তার বন্ধু লেখক সিএস লুইসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। লুইসের ‘নার্নিয়া’ কাহিনীর জন্য পলিন মানচিত্র এঁকে দিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ঔপন্যাসিক লেভ গ্রসম্যানের ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’ (২০০৯)
এবং ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান কিং’ (২০১১)
উপন্যাসের জন্য বিশদ মানচিত্র তৈরি করেছেন রোলান্ড চেম্বারস।
জর্জ আরআর মার্টিন তার তুমুল জনপ্রিয় সিরিজ আ
সং
অব
আইস
অ্যান্ড
ফায়ার-এর জন্য মানচিত্রের পুরো একটি খণ্ড প্রকাশ করেছেন। এ সিরিজ শুরু হয়েছে দুনিয়াজুড়ে আলোড়ন তোলা ‘আ গেম অব থ্রোনস’।
হেনরি ডেভিড থরো ওয়ালডেন পুকুরের জরিপ করেছিলেন একটা মানচিত্র তৈরি করতে এবং মানচিত্রটি তিনি তার বিখ্যাত রচনা ওয়ালডেন -এ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। উইলিয়াম ফকনার তার উপন্যাস আবসালোম,
আবসালোম!-এর জন্য নিজেই ইয়োকনাপাটাফা কাউন্টির একটি মানচিত্র এঁকেছিলেন। ১০ বছর পর দ্য
পোর্টেবল
ফকনার-এর জন্য তিনি মানচিত্রটির কিছু পরিমার্জনা করেন এবং উল্লেখ করে দেন যে মানচিত্রটির স্বত্ব একমাত্র তার নিজের। এর সঙ্গে যুক্ত করে দেন কৌতূহলোদ্দীপক একটি নোট : ‘সার্ভেড
অ্যান্ড ম্যাপড ফর দিস ভলিউম বাই উইলিয়াম ফকনার।’
মার্কিন লেখক পিটার টার্শি তার ম্যাপস
অব
দ্য
ইমাজিনেশন
: দ্য রাইটার
অ্যাজ
কার্টোগ্রাফার গ্রন্থে লিখেছেন, সব লেখকই মানচিত্রকার, কারণ সব লেখাই এক রকমের মানচিত্র। তার মতে ভাষা হচ্ছে জমিন আর শব্দগুলো হচ্ছে মানচিত্রের রেখা ও বক্ররেখা।
এসএম
রশিদ: লেখক





