Through our maps, we willingly become a part of
their boundaries. If our home is included, we feel pride, perhaps familiarity,
but always a sense that this is ours.
If it is not, we accept our roles as outsiders, though we may be of the same
mind and culture. In this way, maps can be dangerous and powerful tools.
—Debbie Lee Wesselmann
মানচিত্র বা ম্যাপ। পরিচিত শব্দ। আরো বেশি করে পরিচিত তাদের কাছে, যারা অবসর সময়ে শখ করে ম্যাপ পাঠ করে থাকেন। কিন্তু মানচিত্র বানানো শুরু হলো কবে?
মানচিত্র আঁকা বা কার্টোগ্রাফি চর্চা মূলত শুরু হয় রেনেসাঁর কিছুদিন আগে, অর্থাৎ ১৫ শতক থেকে। ইউরোপীয়রা এ সময় গোটা পৃথিবীকেই কিছু রেখার আঁচড়ে বেঁধে ফেলে, যা পরিচিত হয় ম্যাপ নামে। কিন্তু মানচিত্র আঁকার পেছনে কী কারণ ছিল, সেটা বোধহয় অনেকেরই অজানা। মানচিত্র শুরুতে আঁকা হতো প্রধানত বিদেশে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের সাহায্যার্থে। পরে যখন শুধু বাণিজ্যে আর মন ভরল না এবং গোটা একটা দেশকেই জোর করে দখল করে নেয়ার ইচ্ছা জাগল ইউরোপীয়দের মনে, তখন মানচিত্র তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে গেল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদকে সাহায্য করা।
পোস্ট মডার্ন যুগের মানচিত্র, মানে আমরা এখন যে রকম ম্যাপ দেখি বা বানাই, সেগুলো কাগজের ওপর একটা জায়গার অবিকল প্রতিফলন। কিন্তু মধ্যযুগে যে ম্যাপগুলো তৈরি হতো, সেগুলোয় থাকত শুধু শহরের নাম, রাস্তার নাম, নদী, আর বন্দরের নাম। কারণ এগুলো আঁকা হতো বণিকদের জন্য, তাদের বাণিজ্যের সুবিধার্থে। কখনো কখনো আবার মানচিত্র আঁকা হতো স্বদেশিকতা আর ধর্ম প্রচারের জন্য। যেমন সেই বিখ্যাত ‘মাপ্পা মুন্ডি’ (ম্যাপ
অব দ্য ওয়ার্ল্ড), আঁকা
হয়েছিল ধর্ম প্রচারের জন্য। এ মানচিত্রের ওপর দিকটা থাকত পূর্ব দিকের সঙ্গে এক রেখায়, জেরুজালেমের দিকে মুখ করে। বর্ডারের ওপর দিকে থাকত যিশুর ছবি আর নিচে দক্ষিণ দিকে থাকত তথাকথিত ‘অশিক্ষিত জাতি’র প্রতিরূপ হিসেবে বিকৃত কিছু মানুষের ছবি।
মধ্যযুগে সব জায়গায় অবশ্য এক ধরনের মানচিত্র ব্যবহূত হতো না। বরং মানচিত্র বস্তুটি বিবর্তিত হয়েছে ধীরে ধীরে, বিভিন্ন সময়ে নানা পথিক আর বণিকের বর্ণনার ওপর নির্ভর করে। বিদেশের মানচিত্র যেমন প্রথম দিকে তৈরি হতো শুধু স্থলপথ আর জলপথের বর্ণনা শুনে, যেগুলো দিত বণিকরা—তাদের যাত্রার অভিজ্ঞতা থেকে। দেশগুলোর কোনো বর্ণনা থাকত না, কারণ নতুন এসব দেশের ভেতরে বণিকরা বিশেষ ঢুকত না; বন্দরেই বেচা-কেনা সেরে আবার জাহাজে উঠে পড়ে ফেরত চলে আসত। স্থলপথেও সেই একই গল্প; শহর বা গ্রামের ভেতরে বণিকরা ঢুকত না—নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসা সেরে ফিরে আসত। এ মানচিত্রগুলোয় থাকত অতিরঞ্জিত করে আঁকা রূপকথার ছবি-গল্প এবং ভয়ংকর সব দানবের নকশা, যার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল ছিল না। পরে ধীরে ধীরে ব্যবসায়ীরা অচিন দেশগুলোর ভেতরে ঢুকতে শুরু করে নতুন ব্যবসার খোঁজে; তখন তাদের সঙ্গে থাকত সেসব অসম্পূর্ণ ম্যাপ, যার ওপরে তারা লিখতে থাকত নতুন নতুন জায়গার নাম আর বর্ণনা। এভাবে কয়েকশ বছর ধরে তৈরি হতে হতে অনেক পরে মানচিত্র একটা পরিশীলিত রূপ পায়। তবে সঠিক কার্টোগ্রাফি তৈরি হয় আরো অনেক পরে, যখন ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ ধরে রাখার জন্য উপনিবেশগুলোর মানচিত্র তৈরি করাতে শুরু করে। এই মধ্যযুগীয় মানচিত্রগুলো তৈরির সময় অনেক কার্টোগ্রাফার (মানচিত্রকার) মিলে একটি মানচিত্র আঁকতেন, তাদের দেশের যে লোকেরা সেখানে গিয়েছেন, তাদের থেকে গল্প শুনে। কোনো এক অদ্ভুত কারণে ইউরোপীয়দের সেসব সদ্য-আবিষ্কৃত দেশের স্থানীয় বাসিন্দার কাছ থেকে গল্প শুনে মানচিত্র আঁকা হতো না—ফলে অনেক ভুলভ্রান্তি থেকে যেত সেগুলোয়। অনেক সময় লোকমুখে শোনা কোনো কাল্পনিক জায়গা মানচিত্রে স্থান পেয়ে যেত। যেমন ঊনবিংশ শতাব্দীর আফ্রিকার মানচিত্রে Mountains
of Kong বলে আস্ত একটা পর্বতমালা দেখানো হতো, যেটা বাস্তবে কখনো ছিলই না আফ্রিকায়। আরো মজার বিষয় হলো অনেক সময় ইচ্ছা করে ম্যাপে ভুল জায়গা বা ভুল বর্ণনা দেয়া থাকত, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের বণিক বা যাত্রীরা সেসব জায়গায় পৌঁছতে না পারে।
ইউরোপীয়দের প্রধান দুটো উপনিবেশ ছিল। একটি আফ্রিকা, অন্যটি ভারতীয় উপমহাদেশ। ভারতে বণিকরা আসত ইউরোপ থেকে—প্রাচীনকালের আর মধ্যযুগীয় নানা স্থলপথ আর জলপথ ধরে। স্থলপথ প্রধানত ছিল আরব দেশের মধ্য দিয়ে আর জলপথে উত্তর আফ্রিকার মধ্য দিয়ে আসতে হতো। পঞ্চদশ শতাব্দীতে তুর্কিরা পূর্ব দিকের সব স্থলপথ দখল করে নেয়ার পর খোঁজ শুরু হয় ভারতে আসার নতুন এক জলপথ আবিষ্কারের। অবশেষে পর্তুগিজ ক্যাপ্টেন ভাস্কো দা গামা ১৪৯৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে জলপথে ভারতের মাটিতে পা রাখেন। পৌঁছানোর কয়েক বছরের মধ্যেই পর্তুগিজরা পুরোদস্তুর বাণিজ্য শুরু করে ভারতের সঙ্গে। প্রথম দিকে তারা উপকূলীয় নগরীগুলোতেই থাকত। ভারতের অভ্যন্তরে ঢোকার প্রচেষ্টা শুরু হয় আরো অনেক পরে, ব্রিটিশদের আসার পর। ১৬১৪ সালে ব্রিটিশরা পর্তুগিজদের নৌবাহিনীকে পরাস্ত করে নিজেরাই পুরো বাণিজ্য ব্যবস্থাটা হাতে নিয়ে নেয়। এরপর ধীরে ধীরে বাণিজ্যের পাশাপাশি শুরু হয় ব্রিটিশদের ভারতে রাজ্যবিস্তার এবং সে সময় তাদের এ কাজে সাহায্য করে মানচিত্র নির্মাণবিদ্যা বা কার্টোগ্রাফি।
সপ্তদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশরা মূলত ভারতের তটরেখা এবং নদীগুলোর মানচিত্র তৈরি করে—প্রধানত বাণিজ্যের কথা মাথায় রেখে। পাশাপাশি স্থানীয় সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক মানচিত্র তৈরিও শুরু করে তারা, যাতে স্থানীয় বাসিন্দা এবং ব্যাপারীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়। অষ্টদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটিশদের নজর যায় সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের দিকে—ফলত নতুনভাবে ম্যাপিং শুরু হয়। লর্ড ক্লাইভ আর লর্ড ওয়েলেসলির সময় থেকেই ধীরে ধীরে ইংল্যান্ড ভারতের ছোট ছোট নানা রাজ্যগুলো থেকে জমি ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালাতে থাকে। সেই প্রচেষ্টার প্রথম বড় সাফল্য ১৭৫৭ সালে বাংলায় পলাশীর যুদ্ধ। একে একে নানা রাজ্য দখল করতে থাকে ব্রিটিশরা। আর দখল করার পর তাদের প্রধান কাজ ছিল রাজ্যটির একটি নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করা এবং রেললাইন আর টেলিগ্রাফের তার বসানো। এতে জায়গাগুলোর ওপর দখলটা আরো পোক্ত হয়। প্রয়োজন হলে দ্রুত খবর পাঠানো যায় এবং সৈন্য নামানো যায়। ১৮৩০ থেকে শুরু হয় পুরো ভারতের একটা বিশদ মানচিত্র তৈরি করার প্রকল্প, যেটা শেষ হয় ১৮৪৮-এ।
১৬৯০ সালে জব চার্নক তিনটি গ্রাম কিনে এবং মোগল শাসক আওরঙ্গজেবের কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা বার্ষিক রাজকর দিয়ে স্বাধীন ব্যবসা করার যে অধিকার আদায় করলেন, সেই থেকে ধীরে ধীরে বাংলার মাপজোখ শুরু করে ব্রিটিশরা। এর প্রায় ১০০ বছর পর যখন ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সালে বাংলায় রাজস্ব আদায়ের অধিকার জোগাড় করেন, তার পর থেকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মানচিত্র তৈরির কাজ জোর কদমে এগিয়ে নিতে শুরু করে। বাংলার সব অধ্যুষিত জমি, চাষের জমি, জঙ্গল, নদী থেকে শুরু করে জমির মালিক, চাষা ইত্যাদি বিশদভাবে ম্যাপিং করে রেকর্ড করা হয়। সে যুগে ম্যাপ তৈরি হতো কাপড়ের ওপর আর এর সঙ্গে তৈরি হতো জমির সব রেকর্ড, যার নাম ছিল লগবুক। এ ম্যাপ আর লগবুকগুলো লালা কাপড়ে মুড়ে জমা থাকত ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরেটের কাছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়াতেই শুধু বাংলা নয়, ব্রিটিশরা পুরো ভারতবর্ষের প্রতিটি শহর, নগরী, গ্রাম, নদী, পুকুর, পাহাড়, জঙ্গল, ইত্যাদির মানচিত্র বানিয়ে ফেলে। এরপর প্রতিটি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসেস অফিসারদের দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে উঠেছিল এ ম্যাপ এবং লগবুক পড়া, যাতে প্রশাসনের কাজে কোনো অসুবিধা না হয়। সেটা ছাড়াও ব্রিটিশরা একটা সার্ভে টিম তৈরি করে, যাদের কাজ ছিল প্রতিটি গ্রামে গিয়ে সেই গ্রামের জমি এবং তাদের মালিকের নাম রেকর্ড করা এবং তার ল্যান্ডস্কেপ ম্যাপ তৈরি করা। তখন বাংলায় ব্রিটিশদের অধীনে এ রকম ২০টি গ্রাম ছিল। প্রতিটি গ্রাম সার্ভে করতে সময় লাগত দুই থেকে তিন বছর। বিমান আসার পর ‘এরিয়াল সার্ভে’ হতো নিয়মিত সকালে এবং সন্ধ্যায়, যাতে প্রতিটি চাষের জমির দেয়ালের ছায়া দেখা যায় এবং মাপ নেয়া যায়।
এভাবে পুরো ভারতবর্ষকে নিখুঁতভাবে ম্যাপিং এবং রেকর্ডের বেড়াজালে বেঁধে ফেলে ব্রিটিশ সরকার। সারা দেশের মানচিত্র তাদের করায়ত্ত হয়ে ওঠে—শুধু ল্যান্ডস্কেপটুকু নয় সঙ্গে স্থানীয় সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক রূপরেখাটিও; যাতে উপনিবেশের ওপর তাদের নিজেদের সামাজিক, আইনি আর ধর্মীয় নিয়ম চাপানো যায়। ব্রিটিশদের বাড়ানো সৌহার্দের হাত না ধরলে ছিল ব্রিটিশদেরই বানানো আইনের রক্তচক্ষু, যার দৃষ্টি এসে পড়ত লাল কাপড়ে মোড়া নিখুঁত ম্যাপ আর জমির দলিলে। ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে গেলেই এক কলমের খোঁচায় জমির মালিকের নাম পাল্টে যেত রাতারাতি। সেই নতুন নাম তখন আবার লাল কাপড়ে মুড়ে চলে যেত ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরেটের ঘরে। এভাবেই মানচিত্র এবং রেকর্ডের সাহায্যে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে শাসন চালায় প্রায় ২০০ বছর। ১৯৪৭ সালে নিজেদের তৈরি মানচিত্রেই আবার নতুন রেখা টেনে, সীমান্ত বানিয়ে, ভারতবর্ষকে ভাগ করে বিদায় নেয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা।
মণিদীপা দে: ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভ্রমণবিষয়ক লেখক





