স্টিফেন হকিংয়ের জন্ম গ্যালিলিওর মৃত্যুর ঠিক ৩০০ বছর পর। সেদিন হকিংয়ের সঙ্গে দুনিয়ায় আরো দুই লাখ শিশু জন্মেছিল। তবে তাদের মধ্যে হকিং বাদে আর কয়জন জ্যোতির্বিদ্যায় আগ্রহী হয়েছিলেন, তা জানা যায় না।
অ্যামিওট্রফিক লেটারাল স্ক্লেরোসিস রোগটি লোউ গেহরিগ’জ ডিজিজ নামেও পরিচিত। এ রোগ সাধারণত মানুষের দেহে ধরা পড়ে ৫০ বছরের পর এবং এ রোগে আক্রমণের পাঁচ বছরের মধ্যে রোগী মারা যান। কিন্তু হকিংয়ের রোগ শনাক্ত হয়েছিল তার ২১ বছর বয়সে এবং তিনি তার ২৫তম জন্মবার্ষিকী দেখবেন, এমনটা কেউ ভাবতে পারেননি। সবাইকে ভুল প্রমাণ করে হকিংয়ের আরো পাঁচ দশক বেঁচে থাকা প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার নিউরোলজির সহযোগী অধ্যাপক লিও ম্যাকলাস্কি কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য, রোগের পরিবর্তনশীলতার এক অসম্ভব উদাহরণ। এ রোগ যাদের আছে, হকিং তাদের দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার আশা দেখিয়ে গেছেন।’
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ব্যাখ্যাকার এমন এক যুগে বেঁচেছিলেন, যখন প্রযুক্তি শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষের জন্য নানা বিস্ময়কর সহায়ক যন্ত্রপাতি উপহার দিচ্ছে। হকিং চলচ্ছক্তিহীন মানুষ। এ অবস্থায়ও বেঁচে থেকে তিনি ২৩০টির বেশি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ রচনা করেছেন। এমনকি বই লিখেছেন শিশুদের জন্যও। অগণিত বক্তৃতা দিয়েছেন। আমাদের অস্তিত্বের প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করেছেন। এ বছরের ১৪ মার্চ হকিং পরলোকে চলে গেছেন। এখন আমরা জানি, তিনি বই, প্রবন্ধ রচনা, বক্তৃতা করার পাশাপাশি নিজের একটা ব্যক্তিগত আর্কাইভও রাখতেন। জীবিত অবস্থায় এ আর্কাইভের অনেক টেক্সটই তার বক্তৃতা, সাক্ষাৎকার ও প্রবন্ধে রূপ নিত। আর্কাইভটি হকিং তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সচল রেখেছিলেন।
হকিং কেন আর্কাইভ রাখতেন? জীবদ্দশায় ‘বিগ কোয়েশ্চেন’গুলো নিয়ে হকিংয়ের ধারণা সম্পর্কে জানতে চাইতেন বিজ্ঞানী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, বড় বড় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষ। এসব ‘বিগ কোয়েশ্চেন’-এর জবাব দিতে গিয়ে নিজের ভাবনাগুলো হকিং আর্কাইভ করতেন। হকিংয়ের মৃত্যুর পর এ আর্কাইভ ঘেঁটে তার ভাবনা বা জবাবগুলোকে একাডেমিক সহকর্মী, পরিবার ও স্টিফেন হকিং এস্টেটের উদ্যোগে বই আকারে প্রকাশ হয়েছে। গত মাসে প্রকাশ হয়েছে বিগ অ্যানসারস টু দ্য বিগ কোয়েশ্চেন শিরোনামের বইটি। বইটির ভূমিকায় কিপ এস. থর্ন লিখেছেন, ‘বইটি বিগ কোয়েশ্চেনগুলোর জন্য হকিংয়ের জবাবের সংকলন। জবাবগুলো নিয়ে তিনি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজ করছিলেন।’
হকিং লিখেছেন, ‘‘মানুষ সবসময় ‘বিগ কোয়েশ্চেন’গুলোর জবাব চায়: আমরা কোথা থেকে এলাম? দুনিয়ার যাত্রা শুরু হলো কীভাবে? দুনিয়ার বাইরে কি আরো কেউ আছে?... আমার আশা একদিন আমরা এসব প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাব।”
হকিংয়ের লেখা যারা পড়েছেন, তারা জানেন, তার ভাষা সরল। বিজ্ঞানের মতো কঠিন, জটিল বিষয়কে তিনি সহজভাবেই ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেন। বিগ অ্যানসারস টু দ্য বিগ কোয়েশ্চেনের কথা মুখে লিখেছেন, ‘সমস্যা হলো, বেশির ভাগ মানুষ বিশ্বাস করে যে প্রকৃত বিজ্ঞান অত্যন্ত কঠিন ও জটিল, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। কিন্তু আমি তা মনে করি না।... বেশির ভাগ মানুষই মূল ধারণাগুলো বুঝতে পারেন, যদি সেগুলো সমীকরণ বাদ দিয়ে সরল ভাষায় বর্ণনা করা হয়। আমি সারা জীবন আনন্দসহকারে এ চেষ্টাই করেছি।’
হকিং বেড়ে উঠেছিলেন লন্ডনের হাইগেটের এক ভিক্টোরিয় বাড়িতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হকিংয়ের মা-বাবা বেশ সস্তায় বাড়িটি কিনেছিলেন। কারণ তখন সবাই ভাবছিলেন, লন্ডন শহর বোমায় সমতল হয়ে যাবে। যুদ্ধ চলাকালে সত্যি সত্যিই একটা ভি টু রকেট হকিংদের কয়েক বাড়ি পর আঘাত হেনেছিল। হকিং অবশ্য তখন মায়ের সঙ্গে বাড়ি থেকে বেশ দূরেই ছিলেন। কয়েক বছর পর হকিং যে রাস্তায় তার বন্ধু হাওয়ার্ডকে নিয়ে খেলতেন, সেখানে একটা বড় বোমা পড়ে। হকিং বন্ধু হাওয়ার্ডকে নিয়ে সেই বোমা বিস্ফোরণের ফলাফল নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। হকিং লিখেছেন, সেদিন যে কৌতূহল নিয়ে তিনি বোমা বিস্ফোরণ অনুসন্ধান করেছিলেন, তা বাকি জীবন তার সঙ্গে ছিল।
ছোটবেলায় সেন্ট অ্যালবানস স্কুলের সহপাঠীরা হকিংকে আইনস্টাইন নামে ডাকা শুরু করেছিল। হকিং লিখেছেন, ছাত্র হিসেবে তিনি সে সময় মোটেই ভালো ছিলেন না, কিন্তু তার পরও হয়তো বন্ধুরা তার মধ্যে এমন বিশেষ কিছু দেখেছিল, যে কারণে তারা তাকে আইনস্টাইন নামে ডাকত। বিগ কোয়েশ্চেন নিয়ে হকিংয়ের আগ্রহের শুরু এ সেন্ট অ্যালবানসেই। তিনি লিখেছেন, ‘সেন্ট অ্যালবানসে আমার ছয়-সাতজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তাদের সঙ্গে সব বিষয় নিয়ে আমার দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক হতো। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল রেডিও নিয়ন্ত্রিত মডেল থেকে ধর্ম। আমাদের আলোচনার একটা বিগ কোয়েশ্চেন ছিল, কীভাবে এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হলো? এ সৃষ্টি কি ঈশ্বর করেছেন?’
এ যুগে বিভিন্ন সমাজতত্ত্ববিদরা বিজ্ঞান নিয়ে বিতর্ক, অনীহা এমনকি বিজ্ঞানবিরুদ্ধতার আলাপ জোরেশোরেই শোনা যায়। দুনিয়ার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অনেক সমস্যা নিয়ে হকিং নিজেও সচেতন। কিন্তু সমস্যা সমাধানে তিনি বিজ্ঞানের ওপরই আস্থাশীল এবং মানুষের বিজয় নিশ্চিত করার ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। তার কথায়, ‘ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাবারের সংস্থান আমরা কীভাবে করব? নিরাপদ পানি সরবরাহ, নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনকে ধীরে করা কীভাবে সম্ভব হবে? আমি আশা করি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এসব প্রশ্নের জবাব নিশ্চিত করবে। কিন্তু এজন্য মানুষকে এসব সমাধান সম্পর্কে জ্ঞান ও বোঝাপড়া থাকতে হবে এবং এগুলো প্রয়োগ করতে হবে।’
বিগ অ্যানসারস টু দ্য বিগ কোয়েশ্চেন শিরোনামের বইটিতে ১০টি প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে—
ঈশ্বর আছেন কি?
সবকিছু কীভাবে শুরু হলো?
এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কি মানুষ বাদে আর কোনো বুদ্ধিমান জীবন আছে?
আমরা কি ভবিষ্যৎ অনুমান করতে পারি?
ব্ল্যাকহোলের ভেতরে কী আছে?
টাইম ট্র্যাভেল কি সম্ভব?
মানুষ কি পৃথিবীতে টিকে থাকবে?
মহাকাশে কি আমরা বসতি গড়ব?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষকে হার মানাবে?
ভবিষ্যেক আমরা কীভাবে রূপ দেব?
দুনিয়ার সৃষ্টি ও ঈশ্বরের ধারণা নিয়ে হকিংয়ের তত্ত্ব সম্পর্কে সবাই কমবেশি অবগত। তাই আলোচনা বরং অন্য প্রশ্নগুলো নিয়ে করা যাক। আমরা ভবিষ্যৎ অনুমান করতে সক্ষম কিনা, এটা নিশ্চয়ই দারুণ কৌতূহলোদ্দীপক এক প্রশ্ন। প্রশ্নের জবাবে হকিং বলছেন, ‘উত্তরটা একই সঙ্গে হ্যাঁ ও না। মূলনীতি অনুসারে, প্রকৃতির নিয়ম আমাদের ভবিষ্যৎ অনুমানকে অনুমতি দেয়। কিন্তু প্রায়োগিক ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় হিসাব-নিকাশগুলো খুব কঠিন হয়ে ওঠে।’ হকিং বলছেন, ‘প্রাচীনকালেই মানুষ কিছু প্রাকৃতিক নিয়মের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করেছিল। আর তাই জ্যোতির্বিদ্যার জন্ম হয়। ৩০০ বছরের বেশি সময় আগে নিউটন এ বিদ্যাকে দৃঢ় গাণিতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন। প্রকৃতির এ নিয়ম অনুসরণ করার ঘটনা থেকে জন্ম নেয় সায়েন্টিফিক ডিটারমিনিজম ধারণার। ধারণাটিকে প্রথম প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন ফরাসি বিজ্ঞানী পিয়েরে-সিমো ল্যাপ্লাস। ল্যাপ্লাসের মতে, আমরা যদি কোনো একটি সময়ে পৃথিবীর সব পার্টিকেলের অবস্থান ও গতি জানতে পারি, তাহলে আমরা অতীত বা ভবিষ্যতের যেকোনো সময়ে তাদের আচরণ পরিমাপ করতে পারব। বহুকাল এ মতই তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। অর্থাৎ তাত্ত্বিকভাবে ভবিষ্যৎ কিংবা অতীতকে দেখা সম্ভব ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, গত শতাব্দীতে ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ জানালেন, আপনি কোনো কণার অবস্থান ও গতি একই সঙ্গে পরিমাপ করতে পারবেন না।
আলোচনা শেষে হকিং লিখেছেন, ‘আমরা যদি একই সঙ্গে অবস্থান ও গতি অনুমান করতে যাই, তাহলে কোয়ান্টাম মেকানিকস আমাদের অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়। তার পরও এটি অবস্থান ও গতির একটি কম্বিনেশন অনুমানের নিশ্চিয়তা দেয়। কিন্তু এ ন্যূনতম নিশ্চয়তাটি অতি সাম্প্রতিক ধারণায় দ্বারা খারিজ হয়ে যায়। সমস্যা হলো, মাধ্যাকর্ষ স্থান ও সময়কে এতটাই বিচ্যুত করতে পারে যে এমন অনেক স্থান থাকতে পারে, যেগুলোকে আমাদের পক্ষে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষকে হার মানাবে? হকিংয়ের জবাব থেকে সরাসরি শোনা যাক—
‘আমি মনে করি, একটা কেঁচোর মস্তিষ্ক ও কম্পিউটারের কাজ করার পদ্ধতির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আমি আরো বিশ্বাস করি, বিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ ও কেঁচোর মস্তিষ্কের মধ্যে কোনো গুণগত পার্থক্য নেই। তাই তাত্ত্বিকভাবে কম্পিউটার মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে অনুকরণ করতে পারে এবং এমনকি তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কম্পিউটার যদি মুর’স ল অনুসরণ করা অব্যাহত রাখে, অর্থাৎ প্রতি ১৮ বছরে কম্পিউটারের গতি ও স্মৃতি দ্বিগুণ হতে থাকে, তাহলে ১০০ বছর পর যেকোনো সময় কম্পিউটার বুদ্ধিমত্তায় মানুষকে অতিক্রম করে যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে, তখন সে মানুষের সাহায্য ছাড়া নিজেই নিজেকে বারবার আরো উন্নত করতে পারবে। এরপর যেটা ঘটবে, সেটা হলো বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরণ, যা যন্ত্রে ব্যবহার হবে। তারপর এ যন্ত্রগুলোর বুদ্ধিমত্তা মানুষের চেয়ে এতটা বেশি হয়ে যাবে, যতটা বেশি বুদ্ধিমান মানুষ শামুকের চেয়ে নয়। এমনটা যখন হবে, তখন আমাদের এটা নিশ্চিত করতে হবে, কম্পিউটারের লক্ষ্য মানুষের লক্ষ্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ আছে। খুব বুদ্ধিমান যন্ত্রের ধারণাকে সায়েন্স ফিকশন বলে হেসে উড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা অনেক মানুষের আছে। কিন্তু এটা করা ভুল এবং এটাই হবে আমাদের মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল।’
এটা সবাই জানেন, স্টিফেন হকিং বিজ্ঞান ও মানুষের ক্ষমতা নিয়ে আশাবাদী মানুষ। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। সে দুশ্চিন্তার কিছুটা ওপরে উদ্ধৃত করা হয়েছে। আরেকটি বিষয় নিয়ে হকিং উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র। এসব অস্ত্র নিজের লক্ষ্যবস্তু নিজেই শনাক্ত করে তা খতম করতে পারে। হকিং স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘এটাই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধ করার উপযুক্ত সময়।’ চালকহীন গাড়ি কিংবা কম্পিউটারে গেমস খেলা সমাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগেরই দৃষ্টান্ত। আশঙ্কা প্রকাশের পাশাপাশি হকিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদও শুনিয়েছেন। ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ অবারিত; এ প্রযুক্তি বিকশিত হওয়ার পর আমরা কত কিছু অর্জন করতে পারব, তা আমরা অনুমান করতে পারি না। রোগ ও দারিদ্র্যকে নির্মূল করা সম্ভব হবে।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে হকিং যে উপসংহার টেনেছেন, সেটা বিজ্ঞানের দর্শনের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান সংযোজন। তার কথায়, ‘আগুন আবিষ্কারের পর আমরা আগুন লাগিয়ে নানা বিপদে পড়লাম। তখন আবিষ্কার হলো ফায়ার এক্সটিংগুইশার। এখন যুক্ত হচ্ছে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রযুক্তি, যেমন পারমাণবিক অস্ত্র, সিনথেটিক বায়োলজি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এসব প্রযুক্তি নিয়ে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করার আগে এগুলোকে কীভাবে সামলানো হবে, সেটা আগে ভাবা দরকার। কারণ এরপর হয়তো আর আমাদের ভাবার সুযোগ থাকবে না। আমাদের ভবিষ্যৎ হচ্ছে প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা এবং সেগুলোকে ব্যবহার করার ব্যাপারে আমাদের প্রাজ্ঞতা। এটা আমাদের নিশ্চিত করা খুব জরুরি যে প্রাজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে এবং তারই জয় হবে।’
মানুষ কি পৃথিবীতে টিকে থাকবে? এই প্রশ্নের জবাবে হকিং দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এ বছর জানুয়ারিতেও, মানে তার মৃত্যুর দুই মাস আগে তিনি নোট লিখেছেন। “পৃথিবী এখন বিভিন্ন দিক থেকে হুমকির মুখে আছে। তাই খুব বেশি আশাবাদী হওয়াটা আমার জন্য কঠিন। হুমকিগুলো খুব বড় এবং সংখ্যায় অসংখ্য।”
হকিংয়ের মতে, দুনিয়া মানুষের জন্য ছোট হয়ে আসছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ বিপজ্জনক হারে ভোগ করা হচ্ছে। মানুষই এই গ্রহকে জলবায়ু পরিবর্তন নামে এক ভয়ানক উপহার দিয়েছে। “আমাদের সবার কারণেই গ্লোবাল ওয়ার্মিং হচ্ছে। আমরা গাড়ি চাই, ঘুরতে এবং উন্নত জীবনমান চাই। সমস্যা হলো এসব কারণে কী ঘটছে, সেটা যখন মানুষ বুঝতে শুরু করবে, তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে। আমরা এখন দ্বিতীয় পারমাণবিক যুগ এবং অভূতপূর্ব জলবায়ু পরিবর্তনের খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি। এমন অবস্থায় বিজ্ঞানীদের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে— মানুষকে তথ্য দেয়া এবং আসন্ন প্রলয় সম্পর্কে বিশ্বনেতাদের উপদেশ দেয়া। বিজ্ঞানী হিসেবে আমরা পারমাণবিক অস্ত্রের বিপদটা ভালোভাবে বুঝতে পারি। মানুষের কর্মকাণ্ড এবং প্রযুক্তি যেভাবে জলবায়ুকে আক্রান্ত করছে, তাতে দুনিয়ার বুকে জীবন হয়তো চিরকালের মতো বদলে যাবে।” হকিং মনে করেন পারমাণবিক যুদ্ধই একালে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। অন্যদিকে দুনিয়ার বাইরে থেকে আসতে পারে আরেকটা বিপদ— পৃথিবীর সঙ্গে গ্রহাণুদের সংঘর্ষ। এবং এর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই। “আমাদের সঙ্গে এ ধরনের বড় একটি সংঘর্ষ হয়েছিল ৬০ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে। ধারণা করা হয় এই ঘটনাই ডায়নোসরকে নিশ্চিহ্ন করেছিল। হকিং মনে করেন আমাদের ভবিষ্যৎ দুনিয়াটা খুব ভিন্ন রকমের হবে।
মহাকাশে কি আমরা বসতি গড়ব? এ প্রশ্নের জবাবটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। প্রথমেই বলে নেয়া দরকার হকিং এ ব্যাপারে ইতিবাচক। তিনি মনে করেন, আরো বহু লক্ষ বছর মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য মহাকাশে পৃথিবী ব্যতীত অন্য কোনো গ্রহেও মানুষের বসতি গড়ে তুলতে হবে। “আমাদের কেন মহাকাশে যেতে হবে? চাঁদ থেকে কয়েকটা নুড়ি পাথর আনতে কেন এত অর্থ আর শ্রম ব্যয় করতে হবে? পৃথিবী কি বসবাসের জন্য যথেষ্ট নয়? এসব প্রশ্নের সহজ জবাবটি হলো মহাকাশ আমাদের চারপাশ থেকে ঘিরে আছে, তাই সেখানে আমাদের যাওয়া উচিত। সৌরজগেক অনুসন্ধান করা দরকার, যেন সেখানে মানুষের বসবাসের জন্য উপযুক্ত জায়গা পাওয়া যায়। পরিস্থিতিটা অনেকটা ১৪৯২ সালের আগের ইউরোপের মতো। মানুষ হয়তো তখন যুক্তি দিয়েছিল যে এত অর্থ ব্যয় করে কলম্বাসকে নিরর্থক এক অভিযানে পাঠানো হয়েছে।” হকিং মনে করেন আমরা মহাকাশ যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো মানুষ আরেক দেশে ভ্রমণের মতো করে মহাকাশ ভ্রমণ শুরু করবে। হকিংয়ের আশা আগামী ১০০ বছরের মধ্যে আমরা আমাদের সৌরজগতের যেকোনো জায়গায় পৌঁছাতে পারব। তবে বাইরের কোনো নক্ষত্রে পৌঁছতে আরো ৫০০ বছরের মতো সময় লাগবে। “অন্য কোনো গ্রহে মানুষের বসতি স্থাপন এখন আর সায়েন্স ফিকশন নয়। এটা এখন বৈজ্ঞানিক ফ্যাক্ট। আলাদা প্রজাতি হিসেবে মানুষের অস্তিত্ব বজায় আছে ২০ লাখ বছর ধরে। মানুষের সভ্যতা শুরু হয়েছিল ১০ হাজার বছর আগে। সভ্যতার উন্নয়ন দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলেছে। মানব সভ্যতাকে যদি আরো ১০ লাখ বছর টিকে থাকতে হয়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ সেখানে গিয়ে হাজির হবে, যেখানে আগে কেউ কখনো যায়নি। আমি সাফল্যের প্রত্যাশা করি, সেটা আমাকে করতেই হবে। কারণ আমাদের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই।”
দিন শেষে হুইলচেয়ারে জীবন কাটানো বিজ্ঞানী হকিংয়ের সংবেদনশীলতা দেখলে অবাক হতে হয়। বিজ্ঞানকে তিনি মানুষের কল্যাণেই দেখতে চান। “প্রত্যেক নর-নারী যেন ভালোবাসা এবং সুযোগে পূর্ণ পৃথিবীতে সুস্থ, নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ পান, সেজন্য আমাদের লড়াই করতে হবে। আমরা সবাই টাইম ট্রাভেলার, সবাই একসঙ্গে ভবিষ্যতের দিকে পথ চলছি। সবাই মিলে আমাদের এমন ভাবিষ্যৎ নির্মাণ করা উচিত, যেখানে আমরা আনন্দের সঙ্গে যেতে চাই। এবং এটা সম্ভব।”






