[সওগাত, মহিলা সংখ্যা- কার্তিক, ১৩৪০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত]
স্বর্ণকুমারী দেবী
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথিত-যশা বাঙালী মহিলা কবিগণের মধ্যে প্রথমেই স্বর্গীয়া স্বর্ণকুমারী দেবীর নাম করিতে হয়। তিনি কলিকাতার সুপ্রসিদ্ধ ঠাকুর পরিবারের সন্তান, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের কন্যা। ঠাকুর পরিবার বিশ্ব-বিজয়ী প্রতিভার আগার। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময় হইতে আজ পর্য্যন্ত এই পরিবারের প্রতিভাই নানা দিক দিয়া জগতের সম্মুখে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করিয়াছে।
বাঙলা ১২৬৫ সালে স্বর্ণকুমারী জন্মগ্রহণ করেন। অতি শৈশবকালেই তিনি স্বীয় প্রতিভার পরিচয় দিয়াছিলেন। তখন হইতে তিনি মুখে মুখে কবিতা রচনা করিতেন, ছড়া বাঁধিয়া ছন্দে কথা কহিতেন। সঙ্গীতের প্রতি বিশেষ অনুরাগ ছিল বলিয়া জীবনের প্রারম্ভেই সঙ্গীত-চর্চ্চায় অত্যন্ত কুশলী হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাঁহার কবিতার সাবলীল প্রকাশভঙ্গী ও অপূর্ব্ব বেগ-ব্যঞ্জনা দেখিলেই বুঝিতে পারা যায় কবিতায় ও গানে তাঁহার প্রতিভা কতখানি উঁচুদরের।
‘নিঃঝুম নিঝুম গম্ভীর রাতে
কম্পত পল্লব দক্ষিণ বাতে,
পেখল সজনী সতিমির রজনী
অম্বরে চন্দ্র ন তারকা ভাতি,
ঝিল্লী ধ্বনি কৃত, বন পরিপূরিত,
কলয়ত জাহ্নবী মৃদুল প্রপাতে।’
এ সঙ্গীতটি শুধু শব্দ ও সুরে সমন্বয় ঘটায় নাই, ইহা পূর্ণাঙ্গ কবিতাও বটে; এবং বোধ হয় এ জন্যই ইহা সর্ব্বজন বিদিত ও সর্ব্বজন প্রিয়।
“ওগো মধুর ছন্দা, হূদয়ানন্দ
জানিনা প্রভাত, না জানি সন্ধ্যা
তোমারি পর্ব্বে অর্ঘ্য রচিয়া
জীবন ধন্য মানি।
“আমি চাহিনা অন্য বিভব ঋদ্ধি
চাহিনা মুক্তি, চাহিনা সিদ্ধি
তোমারি প্রসাদ লভিবারে সাধ
তোমারি অমৃত বাণী।”
তাঁহার এই সাধনা সম্পূর্ণ সার্থক হইয়াছিল। উপরের লাইন কয়টি স্বর্ণ কুমারীর ‘গাথা’ নামক কাব্যগ্রন্থ হইতে উদ্ধৃত। ‘গাথা’ ১২৮৭ বাংলা সনে প্রথম প্রকাশিত হয়। সেই যুগে এই কাব্যগ্রন্থখানি বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছিল।
এইগুলি স্বর্ণকুমারীর রচিত কাব্যগ্রন্থ।— ১। গাথা, ২। কবিতা ও গান, ৩। বসন্ত-উৎসব (গীতিনাট্য), ৪। দেব কৌতুক ও যুগান্ত (কাব্যনাট্য), ৫। কনে বদল এবং ৬। গীতিগুচ্ছ। গাথায় চারিটি বিয়োগান্ত কাহিনী গ্রথিত হইয়াছে। ইহাদের বিষয় বস্তু প্রেমের ব্যর্থতা ও বিরহ-বিষাদ। প্রত্যেকটি গাথাই প্রসাদ গুণে অপূর্ব্ব, ইহাদের বর্ণনা, ভাষা ও ছন্দ স্বভাবদত্ত কবি-প্রতিভার পরিচয় দিতেছে। অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি ছোট, সরল অথচ রসপুষ্ট আঙুরের মতই পাঠকের তুষ্টিসাধন করে।
গদ্য সাহিত্যের দিক দিয়া স্বর্ণকুমারীর স্থান কাব্যের অপেক্ষা উচ্চে। তাঁহার রচিত প্রায় একশত গদ্য পুস্তক বঙ্গভাষায় শোভাবর্দ্ধন করিতেছে। তাঁহার জীবনের একটা গৌরবময় কীর্ত্তি ‘ভারতী’ পত্রিকা সম্পাদন। দুইবারে তিনি আঠারো বৎসরের জন্য এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। বাঙলা সাহিত্যে ‘ভারতীর’ দান সাহিত্যের প্রবলানুরাগী কোনো পাঠকের অবিদিত নাই। তাঁহার প্রতিষ্ঠিত ‘সখি সমিতি’ সেদিনের কলিকাতায় একটি বিশিষ্টতা অর্জ্জন করিয়াছিল। ইহা নারী-প্রগতিকে একটি অসাধারণ প্রেরণা দিয়াছিল।
অল্পদিন হইল স্বর্ণকুমারী পরলোক গমন করিয়াছেন। তাঁহার মৃত্যুতে বঙ্গের মহিলা-সাহিত্য যেরূপ ক্ষতিগ্রস্ত হইল তাহা অপরিশোধনীয়। তবু হতাশার কিছু নাই। তাঁহার নিজের ভাষায় বলিতে হয়, “পুরাতন চিরস্থায়ী নহে অথচ তাঁহার মৃত্যুও নাই। সে বর্ত্তমান নূতনে। নূতনে লীন হইতে না পারিলেই পুরাতনের মৃত্যু।”
স্বর্ণকুমারীর মৃত্যু ঘটিয়াছে, কিন্তু তাঁহার কবিতা অমর ও চিরন্তন!
গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী
স্বর্ণকুমারীর সমসাময়িক যে-মহিলা-কবি বাঙলা সাহিত্যকে গৌরবান্বিত করিয়াছিলেন, তিনি ঁগিরীন্দ্রমোহিনী দাসী,— স্বর্ণকুমারীর সখি। দুই জনেই একই সালে একই মাসে জন্মগ্রহণ করেন। স্বর্ণকুমারীর ন্যায় গিরীন্দ্রমোহিনীও অল্প বয়স হইতেই কবি-প্রতিভার পরিচয় দিয়াছিলেন। হয় তো প্রতিভাশালী ব্যক্তিরা একই নক্ষত্রের প্রভাবে জন্মগ্রহণ করিয়া থাকেন।
কিন্তু উভয়ের কাজের সুর একরকম নহে। স্বর্ণকুমারীর কবিতার বহিরাভরণ অপূর্ব্ব, তাঁহার প্রায় সমস্ত লেখাগুলিই ছন্দ-মাধুর্য্যে মনোহারী। গিরীন্দ্রমোহিনীর কবিতা আন্তরিক অভিজ্ঞতাপূর্ণ— ইহাদের গোড়াপত্তন জীবনের সুখ-দুঃখ, ব্যথা বেদনার উপর এবং সে জন্যই তাঁহার কবিতা পাঠকের নিকট অত্যন্ত মর্ম্মস্পর্শী। সেকালের শিক্ষিত ব্যক্তির মনের উপর তাঁহার কাব্যর প্রভাব অত্যন্ত বেশী করিয়া প্রতিভাত হইয়াছিল। তাঁহার অপূর্ব্ব সৃষ্টি-শক্তিতে মুগ্ধ হইয়া স্বর্গীয় কবি অক্ষয়কুমার চৌধুরী ও দেবেন্দ্রনাথ সেন তাঁহাকে আন্তরিক ছন্দো-শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পণ করিয়াছিলেন।
গিরীন্দ্রমোহিনীর কাব্য সাধনা শুরু হয় ‘গণেশ-বন্দনা’ লিখিয়া। দুঃখের বিষয় সে রচনা চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। তাহার পরবর্ত্তী দুইখানি কাব্যগ্রন্থ ‘ভারত-কুসুম’ ও ‘কবিতা-হার’ “জনৈক বঙ্গ মহিলা।” কৃত বলিয়া প্রথম প্রকাশিত হইয়াছিল। দুইখানি গ্রন্থই পাঠকবর্গের নিকট হইতে যথেষ্ট শ্রদ্ধা অর্জন করিতে সমর্থ হইয়াছিল। ‘বঙ্গদর্শনে’ কবিতা-হারের সমালোচনা করিতে যাইয়া বঙ্কিমচন্দ্র বলিয়াছেন, “শৈশবে যে কবি-প্রতিভার ক্ষীণ রশ্মি প্রকাশ পাইয়াছিল, কালে তাহাই বাঙলা কাব্য-সাহিত্যকে অপূর্ব্ব কিরণে উদ্ভাসিত করিয়াছে।” ‘কবিতা-হার’ পাঠে পুলকিত হইয়া দীনবন্ধু মিত্র মহাশয় গিরীন্দ্রমোহিনীকে স্বীয় নাটকাবলী উপহার প্রদান করেন।
“অশ্রুকণা” কবির তৃতীয় ও প্রধানতম গ্রন্থ এবং ইহাতেই তাঁহার সমগ্র কাব্যের মূলসূত্র ধরা পড়ে। স্বামীর মৃত্যুতে তিনি যে দুঃখ পাইয়াছিলেন তাহারই তাপে এই তপ্ত অশ্রুকণা ঝরিয়া পড়িয়াছে এবং তাঁহাকে বঙ্গ সাহিত্যে অমর করিয়া রাখিয়াছে। এই গ্রন্থখানি সম্বন্ধে অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী বলেন, “তাঁহার কাব্য, পড়িতে পড়িতে এমন মনে হয় না যে তিনি কাগজ কলম লইয়া কখনও কবিতা লিখিতে বসিয়াছিলেন— যেমন শিশিরকণা দুর্ব্বাদলে পড়িয়া মুক্তারূপে ফুটিয়া উঠে, সেইরূপ গিরীন্দ্রমোহিনীর কাব্যে তাঁহার কল্পনার উচ্ছ্বাসগুলি যেন অক্ষররূপে পরিণত হইয়াছে।... কল্পনাস্নিগ্ধ বিদ্যুতের ন্যায় উজ্জ্বল অথচ তীব্র নহে, লীলাময়ী অথচ দুরন্ত নহে, মুগ্ধকরী অথচ মর্ম্মভেদী নহে।”
“অশ্রুকণায়” কবি বলিতেছেন—
এ নয় সে অশ্রু রেখা,
মানান্তে নয়ন কোণে,
ঝরিতে যা চাহিত না
দেখা হলে ফুলবনে;
সে অশ্রু এ নয় সখা,
দীর্ঘ বিরহের পরে,
ফুটিয়া উঠিত যাহা
হাসির কমল থরে।
এ শোকাশ্রু !— নিরাশার যাতনা গরল ঢাকা,
এ শোকাশ্রু !— বাসনার অনন্ত পিপাসা-মাখা।
এ শোকাশ্রু !— হূদয়ের উন্মত্ত আবাহন।
এ শোকাশ্রু!— জীবনের জন্মান্ত আলিঙ্গন।
‘অশ্রুকণার’ প্রত্যেকটি কবিতার মধ্যে বেদনার করুণ সুর রহিয়াছে।
মোটের উপর গিরীন্দ্রমোহিনী দুঃখের কবি। মানুষের দুঃখের কারণ নানারকমের, নানা বিরুদ্ধ ঘটনার সংঘাতে ইহার উত্পত্তি। গিরীন্দ্রমোহিনীর দুঃখ ‘পাইয়া-হারাণোর’ বেদনায় সঞ্জাত এবং ইহা হইতেই তাঁহার মনে প্রশ্ন উত্থিত হইয়াছে, মৃত্যুর পরে মানুষ যায় কোথা এবং কেন এ জগতে কেহ সুখী কেহ দুঃখী? বুদ্ধদেবের কর্ম্মফল-বাদই তাঁহার সিদ্ধান্ত। অশ্রুকণার পরবর্ত্তী গ্রন্থ ‘আভাষ’— তত্পরবর্ত্তী গ্রন্থ ‘শিখা’, ‘সিন্ধুগাথা’, ‘স্বদেশসেবী’ ইত্যাদি। গিরীন্দ্রমোহিনী শুধু শোকের কবিতাই লেখেন নাই, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও বাৎসল্য রসের কবিতাও লিখিয়াছেন।
গিরীন্দ্রমোহিনীর প্রকৃতি ছিল একান্ত কবিজনোচিত। মিষ্ট-মধুর ভাষিণী, নিরাড়ম্বরা ও অগর্ব্বিতা গিরীন্দ্রমোহিনী স্বীয় পরিবারস্থ লোকদের ও বন্ধুদের খুবই আপনার লোক ছিলেন।
প্রমীলা নাগ
বিক্রমপুরের কবি প্রমীলা নাগ স্বনামখ্যাত মনোমোহন ও লালমোহন ঘোষের ভাগিনেয়ী। প্রমীলার প্রসিদ্ধিকাল বাংলা ১২৯৮—১৩১৫-১৬। ইনিও অতি অল্প বয়স হইতে কবিতা লিখিয়াছিলেন। পূর্ববঙ্গের অল্পসংখ্যক মহিলা কবিদের মধ্যে প্রমীলার স্থান অতি উচ্চে। কিন্তু ইহার কবি-খ্যাতির সম্পূর্ণ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, অকালমৃত্যুর জন্য ইনি প্রচুর খ্যাতি লাভ করিতে পারেন নাই।
প্রমীলা নাগের কবিতার বৈশিষ্ট্য দুঃখবাদে। জগতের কোনোদিকে চাহিয়াই তিনি কোনো আশার বাণী প্রত্যাশা করিতে পারেন নাই। যে দিকেই চাহিয়াছেন, শুধু দুঃখ, শুধু বেদনা, শুধু ম্লান বিপদের ছবি অমাবস্যা রাত্রির নিঃসঙ্গ পথিকের সম্মুখে পথ ভোলানো আলেয়ার মতো, তাঁহার নয়ন-সম্মুখে ভাসিয়া বেড়াইয়াছে। চারিদিকে একটা ব্যর্থ-আশার অথবা নিরাশার তিমির-দৃশ্যই তিনি প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। তাই গাহিয়াছেন,—
“আজ, কেহ নাই, কিছু নাই, বাসনা গিয়াছে মরে
জীবন-মৃতের সম একাকী রয়েছি পড়ে
কল্পনার প্রাণ নাই, হূদয় শ্মশান পুরে
স্মৃতি শুধু কেঁদে মরে আঁধারেতে ঘুরে ঘুরে।”
কিন্তু কোনো মানুষের জীবনের অবস্থাই তো একঘেয়ে, নিরানন্দ নয়; মানব-জীবনের স্বাভাবিক অভিব্যক্তিও ইহার পক্ষপাতী নয়। ইহাতে জোয়ার-ভাটা আছে, পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্ব আছে, অতিরিক্ত দুঃখ ভোগের মধ্যেও একটুখানি ক্ষীণ আনন্দের আভাষ আছে তাই প্রমীলার কণ্ঠেও শুনিতে পাই—
“অন্ধকার যামিনীর পরে
প্রথম সে চন্দ্রমার হাস
কুহেলিকা আঁধারের মাঝে
ঊষার সে অরুণ আভাষ।”
—এর গান এবং এজন্যই তাঁহার কাব্য কেবল hypochondriac নয়।
সরোজ কুমারী দেবী
১৮৭৫ খৃষ্টাব্দে সরোজ কুমারী জন্মগ্রহণ করেন— তিনি সুপ্রসিদ্ধ কথাশিল্পী শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত মহাশয়ের ভগিনী। অল্প লিখিয়া যাঁহারা বৈশিষ্ট্য অর্জ্জন করিয়াছেন সরোজ কুমারী তাঁহাদের মধ্যে বিশিষ্ট একজন।
‘হাসি ও অশ্রু’ তাঁহার প্রথম কবিতা গ্রন্থ, অন্যান্য গ্রন্থ— ‘অশোকা’ ও ‘শতদল’। ‘হাসি ও অশ্রু’ ভাব-সম্পদে ও লিপি-কৌশলে কবি-জনোচিত বলিয়াই মনে হয়। ইহার খণ্ড কবিতাগুলি প্রবল উচ্ছ্বাসহীন, স্নিগ্ধ এবং ইহাদের মধ্যে কবি-কল্পনাও কিছু আছে।
‘অশোকা’ প্রকাশিত হয় ১৩০৮ সালে। ইহার কবিতাগুলিকে তিনটি পর্য্যায়ভুক্ত করা যাইতে পারে। গীতি-কবিতা, বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্ট নায়ক
নায়িকাদের উদ্দেশ্যে লিপিত সনেটাবলী, এবং অনূদিত কবিতা সমূহ। অধিকাংশ কবিতাই ‘সরল ও মিষ্টভাবপূর্ণ।’
‘শতদল’, ভক্তিপূর্ণ কবিতায় শতদলের মতোই প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিয়াছে— সেগুলি বিচিত্রও বটে, সৌরভপূর্ণও বটে। বিধাতার উপর নির্ভর স্থাপন ‘শতদলের’ কবিতার বিশেষত্ব।
আরেকটি জিনিষ তাঁহার কবিতাকে মাধুর্য্য প্রদান করিয়াছে-তাহা দাম্পত্য প্রেম। মনে হয় পারিবারিক জীবনের শান্তিই তাঁহার কবিতাকে স্নিগ্ধতা প্রদান করিয়াছে।
দুঃখের কবিতা তাঁহার লেখায় নিতান্ত অল্পই যদিও মহিলারা সাধারণতঃ বিষাদপূর্ণ কবিতা লিখিতে ভালোবাসিয়া থাকেন। সামান্য দুঃখ যাহা তাঁহার কবিতায় আছে তাহা স্বীয় সন্তান-বিয়োগ জনিত দুঃখ।
হিরণ্ময়ী দেবী
স্বর্ণকুমারী দেবীকে যাঁহাদের মনে পড়িবে, তাঁহারা তাঁহার কন্যা হিরণ্ময়ীকে ভুলিতে পারিবেন না। ‘ভারতী’ পত্রিকা সম্পর্কে তাঁহাকে মনে পড়িবেই— তিনিই কিছুকাল ‘ভারতী’র সম্পাদকতা করিয়াছিলেন। স্বর্ণকুমারীর ‘সখি সমিতি’র তিনিই কর্ম্মকর্ত্রী ছিলেন। কাব্য-জগতে তিনি যথেষ্ট প্রখ্যাত না হইলেও তাঁহার এই সমস্ত কর্ম্ম ও অন্যান্য দেশহিতকর কার্য্যসমূহের জন্য তিনি দেশবাসীর স্মরণীয়া হইয়া থাকিবেন। সখি সমিতি লুপ্ত হইবার উপক্রম হইলে তিনি বিধবা আশ্রম খুলিয়া তাহাকে পুনর্জ্জীবিত করেন। আশ্রমবাসিনীদের সুশিক্ষার জন্য তিনি যে যত্ন নিয়াছেন তাহা অতুলনীয়।
হিরণ্ময়ী ইং ১৭৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১২ বৎসর বয়স হইতে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের জন্য কবিতা লিখিতে আরম্ভ করেন।
পনেরো বৎসর বয়সে তাঁহার বিবাহ হয়। তাঁহার অনেকগুলি সন্তান সন্ততি জন্মগ্রহণ করে কিন্তু অধিকাংশই অকালে মৃত্যু-কবলে পতিত হয়। বোধ হয় সন্তান-শোকই উত্তর কালে তাঁহার কবিতায় একটু ম্লান ছায়াপাত করিয়াছে।
কবিতায় যদি নিছক তত্ত্ব কথা থাকে, তাহা হইলে তাহা কবিতা না হইয়া হিতোপদেশ হইয়া দাঁড়ায়। হিরণ্ময়ীর সংখ্যালঘু কবিতাগুলি এ দোষে দুষ্ট ছিল না, কোনো গুরুতর সমস্যার মীমাংসা সেগুলিতে কদাচিৎ দেখিতে পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে দু একটি জীবন-রহস্যের কথা কবির মনে জাগে,— বস্তুতঃ কবির কবিতা জীবনেরই সমালোচনা। হিরণ্ময়ী সে রহস্য মাঝে মাঝে সুন্দররূপে বিশ্লেষণ করিয়াছেন।
দেখ চেয়ে একবার অসীম রহস্যময়
অনন্ত এ বিশ্ব
দেখ সেথা কিবা গায় কোন্ কথা বলে তোরে
প্রতি নব দৃশ্য।
ওই শোন সমস্বরে বলিছে হেথায় নাহি
বিলাপের স্থান,
এক যায় এক আসে নব নব মুখ ভাসে
স্মৃতি অবসান!
ইত্যাদি।
এই কবির পরবর্ত্তী বাক্যসমূহে যে সত্যটি রূপ পাইয়াছে তাহাকে poetic truth বলা যাইতে পারে।
মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্ব্ব পর্য্যন্ত হিরন্ময়ী সাহিত্য সাধনা ও দেশ সেবা করিয়া গিয়াছেন।
উমা দেবী
বিংশ শতাব্দীতে যে সমস্ত মহিলা কবি বাঙলা সাহিত্যকে গৌরবান্বিত করিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে রাধারাণী দত্ত, নিরুপমা দেবী, লীলা দেবী, উমা দেবী এবং আরো দুই একজন মাত্র বিশিষ্ট। ইঁহাদের মধ্যে উমা দেবীর বৈশিষ্ট্য আধুনিক কালের সাহিত্যিক রুচি সম্পন্ন ব্যক্তিদের বিস্মিত করিয়াছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁহার অকাল মৃত্যু, দেশের কাব্যরসিক সমাজকে হতাশ করিয়াছে। মৃত্যু কাহাকেও অমর করে, আবার কাহাকেও অমরত্ব হইতে বঞ্চিত করে। উমা দেবীর বেলায় শেষোক্তটিই সত্য।
উমা দেবীর পিতা অধ্যাপক মোহিতচন্দ্র সেন এবং মাতা সুলেখিকা সুশীলা দেবী। তাঁহারা উমা দেবীর অল্প বয়সেই তাঁহাকে সংসারের নানা আবর্ত্তের ঘূর্ণিপাকে ফেলিয়া পরলোক গমন করিয়াছেন। উমা দেবীর শৈশব তাই অত্যন্ত দুঃখে কাটিয়াছে।
উমা দেবীও অল্প বয়সেই কবিতা রচনায় হাত দেন। তাঁহার প্রথম কবিতা গ্রন্থ, ‘ঘুমের আগে’ চৌদ্দ-পনেরো বৎসর বয়সে প্রকাশিত হয়। ইহা শিশু মনের অপূর্ব্ব খাদ্য, তাহাদের মন-ভুলানো স্বপ্ন-কাহিনীর সু-অঙ্কিত রূপলেখা।
চল্লিশটি কবিতার সমষ্টি ‘বাতায়ন’ (বৈশাখ, ১৩৩৭) তাঁহার দ্বিতীয় গ্রন্থ। কবিতা-সঙ্কলন হিসাবে ইহাই তাহার একমাত্র কাব্যগ্রন্থ এবং ইহাই তাঁহার -swan song.
বাতায়নের কবি বিংশ শতাব্দীরই একজন মহিলা প্রতিনিধি। জীবনের ছোট-খাটো সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, আনন্দ-বেদনা এবং ছোট্ট জীবনের ছোট ছোট লীলাকে রূপায়িত করা আধুনিক কালের কবিতার বিশেষত্ব। উমা দেবীর রচনায় এ স্বাতন্ত্র্য সুস্পষ্ট এবং সু-অঙ্কিত। যে হূদয়াবেগ ও চিত্তানুভুতি সকল কালের সকল কবিতার প্রাণবস্তু, তাহা উমা দেবীর রচনায় সম্পূর্ণরুপে বর্ত্তমান এবং সেই জন্যই তাঁহার কবিতা অত্যন্ত হূদয়গ্রাহী। তাঁহার দৃষ্টি প্রকৃত স্রষ্টার কৌতূহলী দৃষ্টি!
কবি-সম্রাট রবীন্দ্রনাথ ‘বাতায়ন’ সম্বন্ধে লিখিয়াছেন— “এই ‘ছায়াছবির’ বানানো পদার্থগুলি তোমার বানানো পদার্থ নয়, এগুলি তোমার আপন দেখা বিষয়, তোমার দৃষ্টির ঔত্সুক্য ও প্রকাশের সরল নৈপুণ্য দিয়ে এর প্রত্যেকটিতে বিশিষ্টতা আছে।”
উমা দেবীর অকাল মৃত্যুতে শুধু বাঙলার মহিলা-সাহিত্য নয়, সমগ্র বাঙলা সাহিত্যই ক্ষতিগ্রস্ত হইল।
পঙ্কজিনী বসু
পঙ্কজিনী বসু ১৮৮৪ খৃষ্টাব্দে বিক্রমপুরের শ্রীনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তেরো বৎসর বয়সে তাঁহার বিবাহ হয় এবং বিবাহের অনতিকাল পর হইতে তাঁহার কবিতা রচনার ক্ষমতা বিকশিত হইতে থাকে। কিন্তু সে শক্তি বিকাশের পূর্ণতায় না পৌঁছাইতেই পঙ্কজিনীর অকাল মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুকালে (১৩০৬ বাং) তিনি মাত্র সতেরো বৎসরে পদার্পণ করিয়াছিলেন।
তাঁহার বয়স যেমন অল্প ছিল, পড়াশুনাও সেইরূপ সামান্য ছিল। পিতৃগৃহে মাত্র রামায়ণ, মহাভারত ও টডের রাজস্থানের বঙ্গানুবাদই পাঠ করিবার সুযোগ পাইয়াছিলেন। অবশ্য স্বামীগৃহ তাঁহার পড়াশোনার আরেকটু সুযোগ সুবিধা হইয়াছিল, কিন্তু তাহাও খুব বেশী নয়। কিন্তু যাঁহার ভিতরে প্রতিভা আছে অনেক সময়ে তাঁহাকে বেশি পড়াশোনার জন্য বসিয়াও থাকিতে হয় না।
১৩০৮ সালে তাঁহার প্রথম কবিতা পুস্তক প্রকাশিত হয়। কিন্তু যাঁহার তত্ত্বাবধানে ও যাঁহার ভূমিকা সম্বলিত হইয়া তাহা প্রকাশিত হয় তাঁহার আকস্মিক মৃত্যু হওয়ায় সে পুস্তক প্রকাশিত হইলেও প্রচারিত হয় নাই— সেজন্য ১৯১৬ সালে ইহার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। পুস্তকটির নাম ‘স্মৃতিকণা’। ইহার কবিতাগুলি চারিভাগে বিভক্ত। (১) আধ্যাত্মিক ও ধর্ম্ম বিষয়ক, (২) প্রেম বিষয়ক, (৩) সামাজিক, (৪) প্রকৃত ঘটনা ও আত্মবিষয়ক। জীবিত কালে তাঁহার দুই চারিটি কবিতা ‘নব্য ভারত’ ও সখী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
পঙ্কজিনীর প্রতিভা ধর্ম্মভাব সম্পন্ন। তাঁহার বেশীর ভাগ কবিতাতেই জীবন মৃত্যুর সমস্যা ফুটিয়া উঠিয়াছে। পরলোকতত্ত্ব ও আত্মার অমরত্ব ইহাদের বিষয় বস্তু। প্রত্যেক ধর্ম্মই এসব বিষয় লইয়া কম-বেশী আলোচনা করিয়াছে। পঙ্কজিনী মৃত্যুর পরবর্ত্তী রাজ্যে শান্তি খুঁজিয়াছেন, স্বর্গ নিশ্চয়ই আছে ইহাই তাঁহার বিশ্বাস।
“না, না, স্বর্গ নিশ্চয় যে আছে
চিরশান্তি সুখময় স্থান,
অপ্রেম, অশান্তি, শোক, দুখ
সেথা গেলে হইবে নির্ব্বাণ।”
জগতের বড় বড় কবিগণ অনেক সময়ে সুখ কোথায় আছে তাহা খুঁজিয়া ফিরিয়াছেন। পঙ্কজিনী সুখ খুঁজিয়াছেন বহির্জগতে নয়, অন্তর্জগতে। আপনার অন্তরই হইল পঙ্কজিনীর মতে সুখের আবাসস্থল।
পঙ্কজিনীর কতকগুলি কবিতা বাঙালী চরিত্রের প্রতি নিষ্ঠুর ব্যঙ্গোক্তি। বাঙালী চরিত্রের বাগাড়ম্বর, নিরর্থক আস্ফাালন এবং বাহ্যিক বাবুয়ানা, তাঁহার হাতে যে কষাঘাত প্রাপ্ত হইয়াছে তাহা অত্যন্ত সুতীব্র ও ক্ষমাহীন। পঙ্কজিনী বাঙালীর অক্ষম জীবন যাপনের গ্লানি সহিতে পারেন নাই।
পঙ্কজিনীর কবিতায় একটা বিশ্ব-মানবতার আভাষও পাওয়া যায়। Whitman Democracyi গান গাহিয়াছেন, পঙ্কজিনী দুঃস্থ দরিদ্রের ওপর সবলের অত্যাচারকে শ্লেষোক্তি করিয়াছেন। এবং এজন্যই তাঁহার জীবনে একটা সেবাবৃত্তি জাগিয়া উঠিয়াছিল, পরের জন্য সেবাময়ী কল্যাণী মূর্তি তাঁহার অন্তরে পথ খুঁজিয়া বেড়াইয়াছিল।
পঙ্কজিনীর জীবনে কবি-প্রতিভা বিকশিত হইবার প্রচুর সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু অকাল মৃত্যু তাঁহার জীবনকে সে সুযোগ প্রদান করে নাই।
কামিনী রায় বি-এ
এই প্রবন্ধ লিখিবার সময় বঙ্গের শ্রেষ্ঠ মহিলা কবি কামিনী রায়কে অতীতের বাঙ্গালী মহিলা কবি দলের অন্তর্ভুক্ত করিতে হয় নাই। কিন্তু লেখা প্রেসে দিবার পর সহসা সংবাদ পাইলাম গত ২৭শে সেপ্টেম্বর প্রাতঃকালে তিনি নিউমোনিয়া রোগে তাঁহার কলিকাতার হাজরা রোডস্থ ভবনে দেহত্যাগ করিয়াছেন। মৃত্যুকালে তাঁহার বয়স ৬৯ বৎসর হইয়াছিল।
বাঙ্গলার কাব্য-সাহিত্যে তাঁহার স্থান যে কত উচ্চে ছিল দেশের পাঠক সমাজের নিকট তাহা অবিদিত নাই।
১২৯৮ সালে কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন তাঁহার ‘যমুনা-কল্পনা’ পাঠ করিয়া তাঁহার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং যমুনা-শীর্ষক একটি কবিতা লিখিয়া তাঁহার করে অর্পণ করেন।
চুয়াল্লিশ বৎসর পূর্ব্বে ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বই “আলো ও ছায়া’ পাঠ করিয়া কবিবর হেমচন্দ্র মুক্তকণ্ঠে কবির সুখ্যাতি করেন এমন কি তিনি বলেন, “বইটি পড়িতে পড়িতে... স্থল বিশেষে হিংসারও উদ্রেক হইয়াছে।” সে সময়ে পুস্তকে কবির নাম ছিলনা।
কামিনী রায়ের বিরাট কবি-প্রতিভার সম্পূর্ণ পরিচয় প্রদান করিবার মত স্থান এ ক্ষুদ্র প্রবন্ধে নাই। তাঁহার “কবিতাগুলির প্রধান গুণ, তাহার কোনোখানে অস্পষ্টতা দোষ নাই, ভাবের জটিলতা নাই— ছন্দের আড়ষ্ট ভাব নাই— তাহা অবান্তর চিন্তা-তরঙ্গে পাঠকের চিত্তপীড়ার উদ্রেক করে না, তাহা লঘু, স্বচ্ছ, নির্ম্মল।”... তাঁহার কবিতা যে কিরূপ আন্তরিকতাপূর্ণ, নিম্নে উদ্ধৃত দু’এক টুকরা দৃষ্টান্ত হইতেই তাহা বুঝা যাইবে।
পতিতের উদ্দেশে তিনি লিখিয়াছেন:—
“বর্ত্তিকা লইয়া হাতে, চলেছিল একসাথে,
পথে নিভে গেছে আলো, পড়িয়াছে তাই,
তোমরা কি দয়া ক’রে, তুলিবেনা হাত ধ’রে,
অর্দ্ধদণ্ড তারি লাগি থামিবে না, ভাই?
তোমাদের বাতি দিয়া, প্রদীপ জ্বালিয়া নিয়া,
তোমাদেরি হাত ধ’রি হোক অগ্রসর;
পঙ্কমাঝে অন্ধকারে, ফেলে যদি যাও তারে,
আঁধার রজনী তার রবে নিরন্তর।”
অন্যত্র—
“পথ ভুলে গিয়াছিল, আবার এসেছে ফিরে,
দাঁড়ায়ে র’য়েছে দূরে, লাজে ভয়ে নতশিরে;
সম্মুখে চলেনা পদ, তুলিতে পারেনা আঁখি,
কাছে গিয়ে হাত ধ’রে ওরে তোরা আন্ ডাকি।”
অবশ্য এরূপ টুকরা দৃষ্টান্তে তাঁহার মত কবির পরিচয় দিতে চেষ্টা করা ধৃষ্টতা— আমরা পাঠকগণকে তাঁহার কাব্যগ্রন্থগুলি পাঠ করিয়া দেখিতে অনুরোধ করি।






