বিক্ষোভকারীরা যখন সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে জমায়েত হলো, ভারতীয় বাহিনী সিকিমে ঢুকে রাজাকে কার্যত ক্ষমতাহীন করতে তার সম্মতি আদায় করল।

রানী হোপের গ্যাংটক প্রাসাদ বরাবরই প্রাচ্য ও প্রতীচ্য সংস্কৃতির মিশেল। একদিকে প্রাচীন বুদ্ধবন্দনা, অন্যদিকে একইভাবে গৃহীত হচ্ছে বিটলদের গানের রেকর্ড। রানী— সিকিমের ভাষায় যাকে বলা হয় জিয়ালমো, তিনি তার নিজের দেশ ও নাগরিকত্ব ছেড়ে নবগৃহীত দেশে শিল্প ও সংস্কৃতির উন্নয়নে কাজ করছিলেন। একপর্যায়ে সিকিমের কার্পেট লর্ড অ্যান্ড টেইলরের ডিপার্টমেন্ট স্টোরে বিক্রির ব্যবস্থা করেছেন। মিস কুকের বন্ধুরা জানাচ্ছেন, রাজার সঙ্গে তার তালাক নিয়ে এখনো কিছু শোনা যায়নি।

তবে এটা ঠিক, তিনি আর সিকিমে ফিরে যাবেন না

গ্যাংটকের সঙ্গে বাঙালি পাঠকের বেশি পরিচয় সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা সিরিজের ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’ বইটি দিয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঠিক আগের বছর ১৯৭০-এর ‘শারদীয় দেশ’-এ রগরগে এ গোয়েন্দা কাহিনী প্রকাশিত হয়েছিল। বই আকারে পরের বছর ১৯৭১-এ। পাঠকের স্মৃতিতে গ্যাংটক মানেই গণ্ডগোল।

গণ্ডগোলের চূড়ান্ত রূপটি দেখা দেয় ১৯৭৫-এ; সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক এবং গ্যাংটকে রাজপ্রাসাদ অবরোধ ও দখল করে সিকিম নামের পুরো দেশটিকেই ভারত আঁচলতলে টেনে নেয়, সিকিমের স্বাধীন অস্তিত্ব লোপ পেয়ে তা পরিণত হয় ভারতের ২২তম প্রদেশে।

রাজা গৃহবন্দি হন। রানী অশনিসংকেত দেখে ১৯৭৩-এ নিজের দুই সন্তান ও রাজার প্রথম স্ত্রীর গর্ভের এক সন্তান নিয়ে আমেরিকায় পাড়ি দেন এবং প্রায় অজ্ঞাত অবস্থায় অবৈধভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। একদা রানী জন্মসূত্রে আমেরিকারই নাগরিক ছিলেন। কিন্তু গ্যাংটক প্রাসাদে রাজরানী হওয়ার বাসনা নিয়ে নিজ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। ওদিকে রাজার সঙ্গে গৃহবন্দি ক্রাউন প্রিন্সও। মার্কিন কন্যা গ্রেস কেলিও রানী হয়েছিলেন— মোনাকোর রানী। তাকে সিকিমের রানীর মতো দেশ ছাড়তে হয়নি। তবু তাকে বলা হয়েছে ‘দ্য হিমালয়ান গ্রেস কেলি’।

তাকে আরো বলা হয়েছে ‘দ্য হিমালয়ান লেডি অ্যান্তোইনেত’। তবে তার ভাগ্য ভালো তাকে গিলোটিনে প্রাণ দিতে হয়নি। লেডি অ্যান্তোইনেত ছিলেন শেষ ফরাসি সম্রাজ্ঞী।

সিকিমের শেষ রানীর আত্মজীবনী ‘টাইম চেঞ্জ’ ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয়েছে। হোপ মেধাবী নারী। নিউইয়র্ক জীবনে সংগ্রাম করে আবার দাঁড়িয়েছেন। লেকচারার হিসেবে কাজ শুরু করেন, পুস্তক সমালোচক, ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখক এবং শেষ দিকে আরবান হিস্ট্রিয়ান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

১৮ বছর বয়সের রূপকথা স্বপ্ন একসময় দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠলেও হোপ কুক গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দেখিয়েছেন রানী পরিশ্রমী নারীও বটেন।

এতিম হোপ কুক থেকে প্রিন্সেস, তারপর রানী

হোপ কুক সান ফ্রান্সিসকোতে আইরিশ-আমেরিকান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা জন কুক উড়োজাহাজ চালনার প্রশিক্ষক; মা হোপ নয়েসও উড়োজাহাজ চালাতেন।

হোপ কুকের জন্মের কিছুকালের মধ্যে জন কুক স্ত্রী-সন্তান ফেলে রেখে চলে যান। হোপের বয়স তখন দুই, মায়ের ২৫; একটি উড়োজাহাজে একক উড্ডয়নের সময় এটি বিধ্বস্ত হয় এবং হোপ নয়েসের মৃত্যু ঘটে। বাবা চলে গেছেন, মা নিহত; হোপ কুক যথার্থ এতিম। তবে মায়ের দিকটা বিত্তবান হওয়ায় তাকে অর্থকষ্টে পড়তে হয়নি। তাকে আনা হয় নিউইয়র্কে নানা উইনচেস্টার নয়েসের বাড়িতে। তিনি ছিলেন একটি আন্তর্জাতিক শিপিং ব্রোকারেজ ফার্মের মালিক। দুজন গভর্নেসের হাতে লালিত হন। বয়স যখন ১২ বছর, তখন নানার মৃত্যু হয়। তার আইনি অভিভাবক হন মামা ও মামী। মামা ইরান ও পেরুর রাষ্ট্রদূত ছিলেন।

হোপ কুক তেহরানে আমেরিকান স্কুলেও পড়াশোনা করেন। সারাহ লরেন্স কলেজে এশিয়ান স্টাডিজ পড়ার সময় অভিনেত্রী জেইন আলেকজান্ডারের সঙ্গে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে থাকতেন। সে সময় গ্রীষ্মকালীন অবকাশে দার্জিলিংয়ের উইন্ডামেয়ার হোটেলের লাউঞ্জে যুবরাজ প্যালডেন থনডাপ ন্যামজিয়ালের সঙ্গে সাক্ষাৎ। যুবরাজ বয়সে তার প্রায় দ্বিগুণ, ৩৬ বছর, সম্প্রতি স্ত্রীহারা। দুজনই হাহাকারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। দুজনেরই নিঃসঙ্গ শৈশব। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আরো দুই বছর পর ১৯৬১-তে বাগদান, ১৯৬৩-তে তাদের বিয়ে। বিয়ের অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ১৪ জন ধর্মগুরু লামা। অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রদূত জন কেনেথ গল ব্রেইথসহ বহু বিশিষ্টজন বিয়েতে অতিথি হিসেবে অংশ নেন। এ বিয়ে নিয়ে দ্য নিউইয়র্কার ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিন বিশেষ প্রতিবেদন বের করে। বিয়ের আগে হোপ কুককে মার্কিন নাগরিকত্ব বিসর্জন দিতে হলেও ধর্মান্তরিত হতে হয়নি। তবে হোপ কুক বৌদ্ধ ধর্মাচারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। ৪ এপ্রিল, ১৯৬৫ রাজকুমার ন্যামজিয়াল সিকিমের রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হলেন; প্রিন্সেস হোপ হলেন রানী হোপ। তাদের দুটো সন্তান হলো।

রাজা তার একজন বেলজিয়ান বান্ধবীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখেন, তা বিরোধের কারণ হয়ে ওঠে। হোপ কুক পরবর্তী সময়ে রাজার অত্যধিক মাদকাসক্তি এবং বহু নারীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ তোলেন। হোপ কুক নিজেও একজন আমেরিকান যুবকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, একজন ভারতীয় মেজর জেনারেলের সঙ্গে তার সম্পর্কের স্বীকারোক্তি দেন। ভারত যখন সিকিম অধিকার করে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে তখন থেকেই হোপ কুকের বিরুদ্ধেও প্রচারণা শুরু করে। তিনি সিআইএর এজেন্ট, তিনি রাজাকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি মার্কিন স্বার্থে কাজ করেন ইত্যাদি। ১৯৭৩-এ রাজপ্রাসাদ বিরোধীদের দখলে চলে যাওয়ার পর মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সহায়তায় তিনি দেশ ছাড়েন। আমেরিকায় এসে নিজের নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধারে বহু চেষ্টা-তদবির করার পর একটি প্রাইভেট বিল পাস করার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড তাতে সম্মতি প্রদান করেন; তার পরও ১৯৮১ পর্যন্ত তিনি নাগরিকত্ব ফিরে পাননি।

১৯৮০-তে স্বামীর সঙ্গে তালাক চূড়ান্ত হয়। ক্ষমতাচ্যুত রাজা ন্যামজিয়াল ১৯৮২ সালে নিউইয়র্কে মারা যান।

টাইম চেঞ্জ— অ্যান অটোবায়োগ্রাফি&dquote;&dquote;

হোপ কুক তার আত্মজীবনীতে বিমান চালাতে গিয়ে বিধ্বস্ত বিমানে নিহত মা সম্পর্কে লিখছেন—

‘আমি জানি না কেউ তার শরীরের টুকরোটাকরা আদৌ পেয়েছে কিনা; কিংবা আমি জানি না কোথায় তাকে সমাহিত করা হয়েছে।’

এ সম্পর্কে কেউ তাকে কিছু বলেনি, বলতে চায়নি। এ তথ্য না জানার কারণে মায়ের সঙ্গে তার এবং মায়ের সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্কটা কেমন করে ছিন্ন হলো, সে চিত্রটি তিনি কল্পনায় আঁকতে পারছিলেন না।

তার মা চালাচ্ছিলেন একটি ছোট্ট উড়োজাহাজ, পাইপার কাবের ট্যাংকে তেল তেমন ছিল না, আকাশে ওড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তা বিধ্বস্ত হয়। তার বাবা উড্ডয়ন প্রশিক্ষক ছিলেন বটে, কিন্তু তেমন কোনো কাজের লোক ছিলেন না। ১৯৪০ সালে হোপের জন্মের পর পরই সবাইকে ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যান।

তার নানার বিশাল অ্যাপার্টমেন্টে বড় লাইব্রেরি; নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন মানুষ সেখানে বই পড়ে সন্ধেটা কাটায়।

‘লাল চামড়া দিয়ে মোড়ানো একটি ডেস্কে আমার নানা তার লেখালেখির কাজ করতেন। তার চারপাশে বাদামি-সোনালি চামড়ায় বাঁধাই করা খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু। তিনি বলেছেন, এগুলো ক্ল্যাসিকস। শেলফে এগুলো যে আসলে বই, তা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগে গেছে।’

কঠোর অনুশাসনের জীবন তার। যদি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা ঠিকঠাক বলতে না পারতেন, তাহলে একজন গভর্নেস কোট-হ্যাঙ্গার দিয়ে মারতেন। অন্যজন তার দুই হাত বেঁধে রাখতেন, যাতে তিনি নিজের যৌনাঙ্গ স্পর্শ না করেন।

ভারতে এসে তার মনে হয়েছে, এত সুখী আমি কখনো ছিলাম না। দ্বিতীয়বার যখন সিকিমের ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে দেখা, প্রিন্স তাকে ভালোবাসার প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই হ্যাঁ। ... আমি তার বিষণ্ন চোখের প্রেমে পড়ে গেলাম।’

‘আমার হূদয় বিস্ফোরিত হলো... প্রাচ্যই আমার বাড়ি... আমাকে কোনো না কোনোভাবে ভারতের কাছেই থাকতে হবে।’

‘আমার মনে হয়েছে আমি একটি পরিবার চাই, আমি বাসাটি ভরে তুলতে চাই, এটাকে সত্যিকারের বাড়িতে পরিণত করতে চাই। আমি এবং আমার স্বামী যে বিষণ্নতার মধ্যে বেড়ে উঠেছি, আমাদের সন্তানদের তা স্পর্শ করতে দেব না।’

নেহরুর মৃত্যুর পর সিকিমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হতে শুরু করে। রাজার মাদকাসক্তি এবং নারী আসক্তি দুই-ই বেড়ে যায়। ১৯৭৩-এর ২৩ আগস্ট তাকে শেষবারের মতো আলিঙ্গন করে হোপ কুক নিজের দুজন এবং সতীনের কন্যাকে নিয়ে তার স্বপ্নের সিকিম, স্বপ্নের প্রাচ্য ছেড়ে গেলেন।

হোপ কুক বলেছেন, একটি ওয়ানওয়ে রাস্তায় ক্রাউন প্রিন্স (তার সতীনের ছেলে) গাড়ি চালাচ্ছিল। উল্টোদিক থেকে একটি দ্রুতগামী ট্রাক এসে তার গাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়, ক্রাউন প্রিন্সের মৃত্যু হয়। তিনি মনে করেন, এটি আসলে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ভারতপন্থীরা নিশ্চিত হতে চাইছিল যেন রাজপরিবারের কেউ অবশিষ্ট না থাকে— কেউ যেন রাজ্যের দাবি না জানায়।

হোপ কুক তার আমেরিকান প্রেমিকের জন্য আকুলতার কথা বলেছেন। ভারতীয় জেনারেলের প্রতি আসক্তির কথাও অস্বীকার করেননি।

রাজা প্যালডেন থনডাপ ন্যামজিয়াল

দ্বাদশ ও শেষ রাজা ন্যামজিয়ালের জন্ম গ্যাংটকের রাজপ্রাসাদে ২৩ মে, ১৯২৩। ছয় বছর বয়সে কালিম্পংয়ের সেন্ট জোসেফ’স কনভেন্টে ভর্তি হন, কিন্তু ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হওয়ায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। আট থেকে ১১ বছর পর্যন্ত বৌদ্ধ পুরোহিত হওয়ার জন্য পড়াশোনা করেন। তাকে মনে করা হতো পুনর্জন্মপ্রাপ্ত বৌদ্ধ ধর্মীয় ত্রাতা। তিনি পুনরায় স্বাভাবিক পড়াশোনা শুরু করেন; দার্জিলিংয়ের সেন্ট জোসেফ’স কলেজে ভর্তি হন। সিমলার বিশপ কটন কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সিকিমের একাদশ রাজা তার বাবা স্যার তাশি ন্যামজিয়ালের অভ্যন্তরীণ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫০ সালে তিব্বতের লাসার একটি অভিজাত পরিবারের মেয়ে স্যামিও সাঙ্গিদাকিকে বিয়ে করেন। তাদের দুই সন্তান। ১৯৫৭ সালে তার মৃত্যু হয়।

১৯৬৩ সালে আমেরিকান মেয়ে সারাহ লরেন্স কলেজের ছাত্রী হোপ কুককে বিয়ে করেন। এ বিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বহুল আলোচিত হয়। হোপ কুক হয়ে ওঠেন হিমালয়ান প্রিন্সেস, তারপর হিমালয়ান কুইন। তাদের দুটি সন্তান। ১৯৭৩-এ সিকিমে যখন অশান্ত রাজনৈতিক অবস্থা সৃষ্টি হয়, রাজা বন্দি হন, হোপ কুক সন্তানদের নিয়ে নিউইয়র্ক চলে আসেন। ১৯৮০ সালে ক্ষমতাচ্যুত রাজা ও রানীর বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটে। তার আগেই ভারত তাকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে সিকিমকে নিজস্ব প্রদেশে পরিণত করে।

১৯৮২ সালে নিউইয়র্ক সিটির মেমোরিয়াল স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

ম্যানহাটনের ইস্ট সাইডে হিমালয়ের রানী

নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ ১৬ মে, ১৯৭৪: সারাহ লরেন্স কলেজের গ্র্যাজুয়েট হোপ কুক হিমালয়ের সিকিম রাজত্বে রানী হয়েছিলেন। তিনি তার স্বামীকে ছেড়ে এসেছেন এবং লোকচক্ষুর আড়ালে ম্যানহাটনের ইস্ট সাইডে বসবাস করছেন।

৩৩ বছর বয়সী মিস কুক ৪৯ বছর বয়সী রাজা প্যালডেন থনডপ ন্যামজিয়ালকে ছেড়ে চলে এসেছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে রাজা বলেছেন, ‘ওখানে সে অসুখী ছিল।’ ১৯৬৩-এর মার্চে মিস কুকের বিয়েটা ছিল আন্তর্জাতিক, বহুল আলোচিত ঘটনা। তিনি তার দুই সন্তানকে এখানে একটি প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন। রাজার প্রথম স্ত্রীর সংসারের মেয়ে প্রিন্সেস ইয়াংচেন ডলমা কিডনির কঠিন অসুখ নিয়ে এখানে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

মিস কুকের বন্ধুদের কাছে জানা গেছে, তিনি তার সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তার আশঙ্কা তাদের অপহরণ করা হতে পারে। তাই তিনি ঠিকানা কাউকে বলতে তাদের নিষেধ করেছেন। তারা বলেছেন, মিস কুক তার সমসাময়িকদের সঙ্গে তেমন মেলামেশা করছেন না। তিনি তার রাষ্ট্রদূত মামার বয়স্ক বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। কৈশোরে তিনি তার আন্টির সঙ্গে ভারত সফরে গিয়েছিলেন এবং হিমালয় তাকে মোহিত করেছিল। পরে যখন একা একা আবার ভারতে এলেন, হিমালয় দেখতে গেলেন, দেখা হলো তার আগামী দিনের স্বামীর সঙ্গে। তাদের বাগদান হলো ১৯৬১ সালে, পরের বছরই তাদের বিয়ে করার কথা। কিন্তু গণক জানিয়ে দিল, ১৯৬২ সাল রাজকুমারের বিয়ের জন্য শুভ নয়। সুতরাং তারা পরের বছর ১৯৬৩ সালে বিয়ে করলেন।

একসময় মিস কুক বললেন, তিনি বিশ্বাস করছেন যে পূর্বজনমে তিনি সিকিমে বাস করতেন। এ বিশ্বাস নিয়ে তিনি তার স্বামীর মতোই হয়ে গেলেন, যাকে নিয়ে মনে করা হতো তার মধ্য দিয়ে পূর্বে প্রয়াত কোনো পবিত্র বুদ্ধ ধর্মাবলম্বীর পুনর্জন্ম ঘটেছে।

তিন হাজার বর্গমাইলের দেশটিতে নেপালিরা যখন তার স্বামীকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করল, তিনি তার স্বামীকে ছেড়ে আমেরিকা চলে এলেন। তারা মনে করত, আমেরিকান স্ত্রীর প্রভাবে রাজা সিকিমকে ভারত নির্ভরশীলতা থেকে সরিয়ে নিয়ে আসছেন।

বিক্ষোভকারীরা যখন সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে জমায়েত হলো, ভারতীয় বাহিনী সিকিমে ঢুকে রাজাকে কার্যত ক্ষমতাহীন করতে তার সম্মতি আদায় করল।

রানী হোপের গ্যাংটক প্রাসাদ বরাবরই প্রাচ্য ও প্রতীচ্য সংস্কৃতির মিশেল। একদিকে প্রাচীন বুদ্ধবন্দনা, অন্যদিকে একইভাবে গৃহীত হচ্ছে বিটলদের গানের রেকর্ড। রানী— সিকিমের ভাষায় যাকে বলা হয় জিয়ালমো, তিনি তার নিজের দেশ ও নাগরিকত্ব ছেড়ে নবগৃহীত দেশে শিল্প ও সংস্কৃতির উন্নয়নে কাজ করছিলেন। একপর্যায়ে সিকিমের কার্পেট লর্ড অ্যান্ড টেইলরের ডিপার্টমেন্ট স্টোরে বিক্রির ব্যবস্থা করেছেন।

মিস কুকের বন্ধুরা জানাচ্ছেন, রাজার সঙ্গে তার তালাক নিয়ে এখনো কিছু  শোনা যায়নি। তবে এটা ঠিক, তিনি আর সিকিমে ফিরে যাবেন না।

 

আমার নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিন&dquote;&dquote;

হোপ কুক তখনো মিসেস হোপ ন্যামজিয়াল, সিকিমের স্বেচ্ছানির্বাসিত শেষ রানী। তিনি তার আমেরিকান নাগরিকত্ব ত্যাগ করে রাজরানী হওয়ার বাসনা নিয়ে সিকিমের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি রানীও হয়েছেন।

এ যাত্রা ভিসায় অনুমোদিত অবস্থানকাল পেরিয়ে যাওয়ার পর তার ডিপোর্টেশনের পালা। কিন্তু তিনি চান ডিপোর্টেশন আদেশ রহিত হোক। সরকার তার নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিক।

তিনি কংগ্রেসম্যান জন স্টিমিংটনকে লিখলেন, তার বিষয়টি যেন সুরাহা করতে সহায়তা করেন।

নির্বাসিত রানীর আবেদন থেকে উদ্ধৃত—

আমি, মিসেস হোপ ন্যামজিয়াল ওরফে হোপ কুক আমার বহিষ্কারাদেশ রহিত করতে এবং আমার আমেরিকান নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধার করতে নিম্নলিখিত বিবৃতি দিচ্ছি—

১৯৪০-এর ২৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্লান্সিসকোতে আমার জন্ম। আমি মিস্টার ও মিসেস জন কুকের সন্তান। আমার বয়স যখন প্রায় দুই বছর, আমার মায়ের মৃত্যু হয়। তখন আমার নানা-নানী মিস্টার ও মিসেস উইনচেস্টার নয়েস আমাকে নিউইয়র্ক সিটিতে লালন-পালন করেন। তারাই আমার আইনসঙ্গত অভিভাবক। কিন্তু উভয়ের মৃত্যুর পর আমার বয়স যখন ১৪ বছর, আমার আংকেল ও আন্ট মিস্টার ও মিসেস সেলডেন শ্যাপিন আমার অভিভাবক হলেন।&dquote;&dquote;

মিস্টার সেলডেন শ্যাপিন নেদারল্যান্ডস, ইরান এবং অন্যান্য দেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন।

আমি যুক্তরাষ্ট্রের যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছি সেগুলো হলো— নিউইয়র্কের দ্য শ্যাপিন স্কুল, ভার্জিনিয়ার গ্রিনওয়েতে দ্য ম্যাডেরিয়া স্কুল, নিউইয়র্কের ব্রোংকসভিলে অবস্থিত সারাহ লরেন্স কলেজ।

আমার আংকেল সেলডেন শ্যাপিন যখন ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন, আমি তেহরানের আমেরিকান স্কুলে এক বছর পড়াশোনা করেছি। সেখান থেকে আমি হাই স্কুল ডিপ্লোমা লাভ করি। আমি নিউইয়র্কের সারাহ লরেন্স কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব আর্টস ডিগ্রি অর্জন করি।

আমি ১৯৬৩ সালে সিকিমের ক্রাউন প্রিন্সকে আমার স্বামী হিসেবে বরণ করে নিই। সিকিমের আইন অনুযায়ী আমাকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়। সিকিম একটি ছোট্ট দেশ, সেখানে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ নেই। আমি আমার আমেরিকান শিক্ষা ও আদর্শ নিয়ে সেখানে যখন আমার মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করি, আমি চাইনি কেউ আমাকে হিমালয়ের ‘আমেরিকার সম্প্রসারিত’ হাত মনে করুক। আমি সিকিমের অংশ হয়ে সেখানে থাকতে চেয়েছি, সেখানকার চমৎকার মানুষের সঙ্গে আমি অংশগ্রহণ করেছি, আনন্দ ভাগাভাগি করেছি। আমার সন্তান প্যালডেন সেখানে ১৯৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করে। হোপ লিজামের জন্ম হয় ১৯৬৮-তে। আমি তাদের গ্রামের স্কুলে কৃষক ও স্বল্প আয়ের সরকারি কর্মচারীদের সন্তানদের সঙ্গে পড়াশোনা করতে পাঠাই। আমি গ্যাংটকে এলিট স্কুলগুলোর একটিতে তাদের ভর্তি করতে পারতাম, কিন্তু আমি তা করিনি। কারণ আমি চেয়েছি আমার সন্তানরা সিকিমের অংশ হিসেবে তৃণমূল থেকে বেড়ে উঠুক।&dquote;&dquote;

আমাদের রাজপ্রাসাদটি ছিল ছোট, এটা ছিল সবার জন্য খোলা। যেকোনো সময় কেউ আসতে, বসতে, কথা বলতে, খেতে এবং আমাদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারত।

অবর্ণনীয় নির্মমতার মধ্য দিয়ে ১৯৭৩-এর এপ্রিলে সেই সৌহার্দ, সেই অন্তরঙ্গ, প্রিয় বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল। উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে সেই নির্মমতার জন্য দায়ী করা গেলেও আমি তো জানি সিকিমের মানুষের চরিত্র এমন নয়, তারা উচ্ছৃঙ্খল ও নিষ্ঠুর নয়, তারা কখনো ক্ষতিকর জনতায় রূপান্তর হতে পারে না— এ অদৃষ্টপূর্ব ভয়ঙ্কর নির্মমতার উৎস এবং প্ররোচনা কোত্থেকে এসেছে, এ নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না।

জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। সিকিমের সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য আমি এবং অন্যরা একসঙ্গে যেসব কাজ শুরু করেছিলাম— শিক্ষা, কুটির শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, সমাজকর্ম— সব তছনছ হয়ে গেল। আমেরিকায় আমার জন্ম বলে আমি হয়ে গেলাম অপপ্রচারকারীদের সহজ টার্গেট, তারা আমাকে জড়িয়ে মন্দ কথা বলতে শুরু করল। সিকিমের জন্য আমার যে ভালোবাসা, তা তাদের কাছে মেকি হয়ে গেল। আমার সিকিমে অবস্থান একই সঙ্গে সিকিম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আমার জন্য মঙ্গলের পরিবর্তে অমঙ্গলের কারণ হয়ে দাঁড়াল। ১৯৭৩ থেকে দিনের পর দিন আমাদের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকল। আমার যে সন্তানরা গ্রামের পথে ও শহরের আনাচে-কানাচে মুক্ত শিশুর মতো ঘুরে বেড়াত, তাদের জীবন ভয়ঙ্কর হুমকির সম্মুখীন হলো। গত দুই বছরে এ আতঙ্ক চরম আকার ধারণ করল। খুন, অপহরণ, কথিত জনতার কারাগারে নির্যাতন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেল। সংঘবদ্ধ যুবকদের গ্যাং এসব নির্মমতা চালিয়ে যাচ্ছিল।

এই ফেব্রুয়ারিতে (১৯৭৫) আমার স্বামী ও আমার জ্যেষ্ঠ সত্পুত্র তেনজিং ন্যামজিয়ালকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়।&dquote;&dquote;

কয়েক মাস আগে তাদের ট্রুপস আমাদের রাজপ্রাসাদে ঢুকে আমার স্বামী ও ক্রাউন প্রিন্স তেনজিং ন্যামজিয়ালকে গৃহবন্দি করে ফেলে।

আমি যখন সিকিমে ছিলাম, আনুগত্যের সঙ্গে আমার সাধ্যমতো নিজেকে উৎসর্গ করে সেবা প্রদান করার চেষ্টা করেছি। মার্কিন নাগরিকত্ব বিসর্জন সম্ভবত আমার সর্বোচ্চ আত্মোৎসর্গের একটি। এখন আমি আন্তরিকভাবে আমার মার্কিন নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার এবং আমার সন্তানদের নিয়ে একটি ভালো জীবনযাপনের এবং তাদের মধ্যে আশা, আত্মবিশ্বাস ও আদর্শ পুনরায় রোপণ করার সুযোগ প্রার্থনা করি।

এখানে আসার পর আমি ও আমার সন্তানরা এক ধরনের নিরাপত্তা ও মূল খুঁজে পেতে শুরু করেছি। সিকিমে যা কিছু ঘটেছে তার জন্য ভীষণ উদ্বেগ ও চাপ যেমন অনুভব করি, তেমনি এখন আমেরিকার অংশ হতে পেরে আমরা আনন্দিত।

সবশেষে আকুল আবেদন, আমাকে যেন ডিপোর্টেশনের শিকার হতে না হয়; আমার নাগরিকত্ব যেন ফিরিয়ে দেয়া হয়।&dquote;&dquote;

সিকিম রাজতন্ত্রের অবলুপ্তির গণভোট প্রহসন

সিকিম রাজতন্ত্রের বয়স অন্তত ৩০০ বছর। উনিশ শতকের ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসনের সময় থেকে সিকিম একটি ‘প্রিন্সলি স্টেট’ হিসেবে স্বীকৃত। সে সময় এ রাষ্ট্র রক্ষার দায়িত্ব ছিল ব্রিটিশ-ভারতীয় সরকারেরই। ১৯৪৭-এ ব্রিটিশের বিদায় ঘটল। ১৯৫০ সালে চুক্তির মাধ্যমে সিকিম তার সীমান্তের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা এবং প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ভারতকে দিয়ে একটি ‘প্রটেক্টোরেট’ রাষ্ট্রে পরিণত হলো। ১৯৭৪-এর সাধারণ নির্বাচনে ভারতপন্থী সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস বিজয়ী হয়। নতুন সরকার রাজার ক্ষমতা হ্রাস করতে চাইলে রাজা প্যালডেন থনডাপ ন্যামজিয়াল (কুক হোপের স্বামী) তা নাকচ করে দিলেন। ভারতের সরাসরি প্রণোদনা এবং নতুন সরকার ১৯৭৪-এর মে মাসে ‘গভর্নমেন্ট অব সিকিম অ্যাক্ট’ পাস করে, যার মূল লক্ষ্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ও নির্ভরতা বাড়ানো। ১৯৭৪-এর ৪ জুলাই সিকিম পার্লামেন্ট নতুন সংবিধান পাস করে, যেখানে নিজেদের দেশকে তারা ভারতের রাজ্য হিসেবে বর্ণনা করে। ভারতের চাপে রাজা এ সংবিধানে সই করতে বাধ্য হন।

(এটাই হচ্ছে ৪ জুলাই ফ্যালাসি— ১৯৮ বছর আগে এমন ৪ জুলাই আমেরিকা স্বাধীন হয়, আর এমনই দিনে স্বাধীন সিকিম ভারতে অঙ্গীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

 

৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪ ভারতের লোকসভা সিকিমকে ‘অ্যাসোসিয়েট স্টেট’ অভিহিত করে। আর ৮ সেপ্টেম্বর রাজ্যসভা প্রস্তাব পাস করে যে সিকিমকে রাজ্যের মর্যাদায় ভারতে অঙ্গীভূত হতে হবে। সেদিনই রাজা অবাধ ও নিরপেক্ষ গণভোট অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। গণভোটে রাজতন্ত্র ও সিকিমের ভাগ্য নির্ধারিত হবে।&dquote;&dquote;

৫ মার্চ, ১৯৭৫ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সিকিমকে ভারতে ঢুকিয়ে আহ্বান জানায়, রাজা আবারো গণভোট অনুষ্ঠানের কথা বলেন।

৯ এপ্রিল ভারতীয় সৈন্যবাহিনী গ্যাংটকে প্রবেশ করে রাজপ্রাসাদ অবরোধ করল, একজন গার্ডকে হত্যা করে বাকিদের নিরস্ত্র করল এবং রাজাকে গৃহবন্দি করল।

১০ এপ্রিল, ১৯৭৫ সিকিম পার্লামেন্ট তাদের দেশটিকে ভারতের অংশ করতে পূর্ণসম্মতি জানিয়ে দিল। গণভোট না হলেও চলত। তবু বৈধকরণের জন্য যেমন তেমন গণভোট বেশ কাজের।

সিকিমের যেসব স্থানে জিপে পৌঁছতে কমপক্ষে দুদিন লাগে, অবিশ্বাস্য কম সময়ে সেসব স্থানের ভোটের হিসাবসহ গণভোটের ফল বেরিয়ে গেল।

রাজতন্ত্র উচ্ছেদ ও ভারতের অঙ্গরাজ্য হওয়ার পক্ষে ৫৯ হাজার  ৬৩৭ (প্রদত্ত ভোটের ৯৭.৫৫%) এবং বিপক্ষে ১ হাজার ৪৯৬ (২.৪৫%) ভোট পড়ল। গণভোটের ইতিহাসে এ এক প্রহসন। রাজার সমর্থকরা বলেছেন, ৮০ শতাংশ ভোটার বহিরাগত ভারতীয়।

সিকিমকে ভারতীয় সীমান্তে ঢুকিয়ে ফেলা ইন্দিরা গান্ধীর সাফল্য, কিন্তু তার পরের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই এর নিন্দা জানালেন। রাজা বললেন, গণভোট অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নিরপেক্ষ কোনো সংস্থাকে দেয়া উচিত ছিল, সিকিম প্রশাসন বা ভারতীয় নির্বাচন কমিশনকে কখনো নয়। তা-ই হয়েছে।

আমেরিকায় অবস্থানকারী রানী হোপ কুক বলেছেন, এ নির্বাচন সম্পূর্ণ ‘বেআইনি ও অসাংবিধানিক’।&dquote;&dquote;

এতে চীন ক্ষেপে গেল। বলল, এ অন্যায় জবরদখল বরদাস্ত করা হবে না। ইন্দিরা গান্ধীও কড়া জবাব দিলেন— চীনও একইভাবে তিব্বতকে নিজেদের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলেছে। মার্কিন সরকার বলল, এটাই অনিবার্য ছিল, ভারত ঠিক কাজটিই করেছে।

স্বাধীন সিকিম অবলুপ্ত হয়ে ভারতের ২২তম প্রদেশে পরিণত হলো। এন্ড্রু ডাফের ৫৯৯ রুপি দামের বই ‘সিকিম: রিকুয়েম ফর হিমালয়ান কিংডম’ দীর্ঘ আলোচনায় এটাও আলোকপাত করেছে হোক কুকের রানী হিসেবে চ্যালেঞ্জ ছিল মোনাকোর রানী গ্রেস ক্যালির চেয়ে অনেক বেশি, তার সংসার ভাঙার পেছনে নিজেদের সম্পর্কের টানাপড়েনের চেয়ে বেশি কাজ করেছে সিকিমের ঘাড়ের ওপর ভারতের তপ্ত নিঃশ্বাস। সিকিমে নিযুক্ত ভারতীয় প্রশাসক নরি রুস্তমজি ভারতের সিকিম হরণের অনেক আগে দেশটির ঐতিহাসিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্ভাগ্য নিয়ে ‘অ্যা হিমালয়ান ট্র্যাজেডি’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

৭৮ বছর বয়সী হোপ কুক এখন ব্রুকলিনে বসবাস করছেন।