উরসুলা লিন্ডসি। অনুবাদ: শওকত হোসেন

নাগিব মাহফুজের সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল আমার। সেটা ছিল ২০০৬ সালের শীতকাল। সাড়ে তিন বছর ধরে কায়রোয় থাকছিলাম আমি। মাহফুজের এক পুরনো বন্ধু গামাল আল-গিতানি আমাকে তার সাপ্তাহিক সমাবেশগুলোর একটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। মা’দির উপকণ্ঠে হলিডে ইনে গিয়েছিলাম আমি। চার লেন ট্রাফিকের উল্টো দিকে নীল নদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে হোটেলটা। সদর দরজায় মেটাল ডিটেক্টর ছিল। ১৯৯৪ সালে এক তরুণ উগ্রবাদী তাকে হত্যার চেষ্টার পর থেকে অর্ধশতাব্দ ধরে যেসব ক্যাফেতে তিনি বন্ধুবান্ধব আর সতীর্থ লেখকদের সঙ্গে দেখা করতেন, সেগুলোয় আর পা রাখতেন না মাহফুজ।

একটা ছোট দল ছিল সেটা। কারো নাম মনে নেই আমার। নিশ্চিতভাবেই নাগিবের জনাকয় পুরনো বন্ধু আর আমার মতো নবীন ভক্তরা ছিল। কায়রোর একজন মুখচেনা মানুষও ছিলেন সেখানে, সাদা স্যুট পরতে পছন্দ করতেন তিনি, মধ্যবয়স্ক, কয়েক দশক ধরে নাগিবের জীবনী লিখছেন বলে দাবি করেছেন।

মাহফুজের বয়স তখন ৯৪ বছর। বেশ বড় একটা ওভারকোটে আবৃত তিনি। ফলে ছোটখাটো, প্রবীণ সহানুভূতিশীল কচ্ছপের মতো লাগছিল তাকে। বলতে গেলে অন্ধ আর বধির হয়ে গেছেন তিনি। একজন সঙ্গী পাশে বসে কানের খুব কাছে চেঁচিয়ে কথা বলছিলেন। কুঁকড়ে থাকার মতো হয়ে গেছে তাঁর ডানহাত, ১২ বছর আগে একটা গাড়িতে বসে থাকার সময় এক তরুণ তার কাছে এসে হাত বাড়িয়ে গলায় ঘাই মেরেছিল, এটা তারই পরিণতি। এরই মধ্যে প্রবীণ মাহফুজ সামনে ঝুঁকে বসে থাকায় তার হবু ঘাতক অল্পের জন্য মহাধমনির নাগাল পায়নি।

হলিডে ইনের সেদিনের সন্ধ্যায় টার্কিশ কফি ও একটামাত্র সিগারেট খেয়েছেন মাহফুজ। এসব আচার ও কথোপকথন তার পক্ষে কঠিন হয়ে ওঠার ব্যাপারটা ছিল স্পষ্ট। তাকে যারা সমীহ করে এবং তার সম্পর্কে অনেক উঁচু ধারণা রাখে, তারাই তাকে ঘিরে রেখেছিল। তাকে আমোদিত রাখতে যারপরনাই চেষ্টা করছিল সবাই। তিনি প্রলম্বিত কর্কশ হাসি দিচ্ছিলেন যখন, তার হাড়সর্বস্ব ছোট চেহারাটা ছেলেমানুষের মতো ঝলমল করে উঠছিল। মনে হয় আমাকে আমার প্রিয় লেখকদের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। শেক্সপিয়র আর প্রুস্তকে পছন্দ করার কথা বলেছিলেন। একসময় জানতে চাইলেন তার চিলড্রেন অব দি অ্যালি ‘ধর্মের বিরুদ্ধে’ মনে করি কিনা। এ বইয়ের বাইবেল ও কোরানের ঘটনাবলির পরোক্ষ বর্ণনাকে ধর্মদ্রোহী বিবেচনা করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য গুম-খুনের পথে নিয়ে গেছে।

হতভম্বের মতো বললাম, না, বইটাকে আমি ধর্মবিরোধী ভাবি না। তার কৃশ, কিঞ্চিৎ হতাশ হাসির কথা ভুলব না। আরো সৎ বা কৌতূহলোদ্দীপক কিছু বলবেন ভেবেছিলাম; যেমন— ‘ভাবলেও আমি পরোয়া করি না।’

গ্রন্থিল হাতে অনেক কষ্টে দ্য কায়রো ট্রিলজির একটা কপি স্বাক্ষর করে আমাকে দেন মাহফুজ। নতুন করে লেখার উপায় সম্পর্কে নিজেকে অনেক বছর তালিম দিয়েছেন, কিন্তু কয়েক বছরের বিরতির পর ফের ক্ষয় দেখা দিয়েছিল। ওই গ্রীষ্মেই মারা যান তিনি।

প্রায় শতবর্ষী হয়েছিলেন নাগিব মাহফুজ। এর বেশির ভাগ সময়ই লিখেছেন: ছোটগল্প, নাটক, মিসরের চাঙ্গা চলচ্চিত্রজগতের জন্য চিত্রনাট্য এবং মিসরের বিভিন্ন নেতৃস্থানীয় সাময়িকী ও পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বেরোনো ও ক্ল্যাসিকে পরিণত উপন্যাস। ১৯৮৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। এখনো তিনিই এ সম্মানের অধিকারী একমাত্র আরব।

নাগিব মাহফুজকে মিসরের আধুনিক বিবেক-নির্মাতা শিল্পীদের অন্যতম বললে মোটেই অতিরঞ্জন হবে না। এতটাই যে তার রচনা ও মেজাজ যে কারো কাছে নিখাদ মিসরীয়ই ঠেকে— দেশ, কায়রো ও জন্মস্থানের মহল্লার সঙ্গে তার পরম একাত্মতা, তার নির্মমতা, সতর্কতা এবং প্রফুল্লতা; শিশা ও উম কুলসুমের জন্য ভালোবাসা আর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে খোশালাপ— এ খাদহীনতা ফুটিয়ে তুলতে তার নৈপুণ্যই এর কারণ কিনা নিশ্চিত হতে পারে না কেউ। বলা হয়, মাহফুজ এত বেশি লিখেছেন এবং সাহিত্যের এত অসংখ্য বিষয়ে পুরোধা ছিলেন, যা মিসরীয় লেখকদের সামাজিক বাস্তববাদ থেকে শুরু করে অস্তিত্ববাদ, চেতনাপ্রবাহ, রূপক কাহিনী ইত্যাদিসহ গোটা আধুনিক সাহিত্যের উত্তরাধিকার জুগিয়েছে। কিন্তু প্রকরণ নিয়ে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সত্ত্বেও ধারণাগত দিক থেকে অনড় ছিলেন মাহফুজ। সামাজিক ও ক্ষমতার পরিবর্তনসহ মিসরের জাতীয় পরিচয় ও উন্নয়ন, মিসর কী ছিল, কী হতে পারত এবং এখনো কী হতে পারে, তা-ই নিয়ে ভাবিত ছিলেন তিনি। চিলড্রেন অব দি অ্যালিতে (তার বেশির ভাগ রচনার মতোই) কিছু ভৌগোলিক ও মনস্তাত্ত্বিক এলাকা বারবার ঘুরেফিরে আসে: মরুভূমি— যেখানে অপরাধ ও প্রত্যাদেশের ঘটনা ঘটে, যেখানে একঘরে করে রাখা বা বহিষ্কৃতরা— ভয়ঙ্কর নিয়তি— সময় কাটাতে বাধ্য হয়। কেবল পুরুষের জায়গা কফি হাউজ, যেখানে গল্প বলা হয়, গুজব আর কৌতুক চালাচালি হয়, অহমে ঘা লাগে আবার সেরে যায়। সবার উপরে গলিপথ, ছেলেবেলা থেকেই যে জায়গাটি তার চেনা, পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় নাটক মঞ্চায়নের জন্য পছন্দের মঞ্চ— মাহফুজের পক্ষে এক এবং অদ্বিতীয়।

তবু এসব এলাকা কল্পনাকারী মাহফুজকে প্রধান রাষ্ট্রীয় খবর কাগজ আল-আহরামে ‘আ পয়েন্ট অব ভিউ’নামে প্রকাশিত বিভিন্ন কলামের সংকলন পর্যালোচনায়, মাহফুজের নিজস্ব বর্ণনায় তিনি রাজনীতিতে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন: ‘আমি যাই লিখি না কেন তাতে আপনি রাজনীতি পাবেন,’ আল-গিতানিকে বলেছেন তিনি; গিতানি তাদের কথোপকথন মজলিস মাহফুজিয়া নামে একটি বইতে সংকলন করেছেন। তার বিভিন্ন কলামে রাজনীতি উঠে এসেছে: ব্যক্তিস্বাধীনতার উদার সমর্থক তিনি। প্রায় সবসময়ই মধ্যপন্থী, প্রগতি ও যুক্তিবাদের সমর্থক এবং জাতীয়তাবাদী।

এসব কলামে তিনি যা নন, সেটি হলো লেখক। কলামগুলো ভীষণ রকম মামুলি, মাহফুজ যেন-বা তার মেধার পুরোটাই উপন্যাসের জন্য তুলে রাখছেন। রশীদ আল-ইনানির লেখা বইটির ভূমিকা বিষয়টি স্পষ্ট করে দিচ্ছে: ‘মাহফুজের সাংবাদিকতায় পাঠক যে জিনিসটা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, সেটা হচ্ছে ভাষার সৌন্দর্য, রচনাশৈলীর আভিজাত্য, কল্পনাশক্তি... তার শিল্পগুণের কিছুই এ রচনায় ফুটে ওঠেনি।’ বাস্তবিকই তার দৈনন্দিন সতর্কতা ও মিতভাষের সঙ্গে সাহিত্যিক উচ্চাভিলাষের আপাত বৈসাদৃশ্য কলামগুলো মূলত মাহফুজের রচনা ও জীবনসংক্রান্ত রহস্যকেই আরো জোরালো করে তুলেছে।

সারা জীবন সেন্সরশিপের ভেতর সুকৌশলে এগিয়ে গেছেন মাহফুজ। এমনকি স্বয়ং সেন্সরের কাজও করেছেন। তবু মিসরকে নিয়ে সাহসী এবং সঠিক কায়দায় লিখে গেছেন। আজীবন সরকারি কর্মচারী ছিলেন; এক জাতীয় প্রতীক, যার রচনা জাতীয় পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তার পরেও দেশের আশা ব্যাহত হওয়াকেই তার পুনরাবৃত্ত ধারণা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

১৯১১ সালে জন্ম মাহফুজের, কায়রোর ঐতিহাসিক মহল্লা, চার হাজার বছরের পুরনো মসজিদ, সুবিশাল তোরণ আর সরু গলিপথে ভরা আল-গামালিয়ায় বড় হয়েছেন। তার পরিবার মিসরের উদার জাতীয়তাবাদী দল ওয়াফদের সমর্থক ছিল। এ দলটিই ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল। ওয়াফদদলীয় নেতা সা’দ জগলুল তার বাড়িতে সম্মানিত মানুষ ছিলেন। সরকারি আমলা বাবা এমনভাবে পরিবার ও দেশের কথা বলতেন, যেন ‘ব্যাপারটা একই’ এবং জগলুল, মিসরীয় রাজা, ব্রিটিশদের কথা বলার সময় তাদের ‘তার ব্যক্তিগত বন্ধু’র মতো মনে হতো।

১৯১৯ সালে ব্রিটিশরা জগলুলকে নির্বাসনে পাঠালে দেশ কয়েক মাসব্যাপী প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। পাড়ার ভেতর দিয়ে বিশাল মিছিলগুলো যাওয়ার— এবং অনেক সময় ব্রিটিশ বাহিনীর ভয়ঙ্কর শক্তির মোকাবেলার— সময় মাহফুজ জানালা দিয়ে দেখতেন। বেশ কয়েক বছর পর, মাহফুজের বয়স তখন ১২ বছর, গামালিয়া ছেড়ে উদীয়মান আব্বাসিয়া এলাকায় থিতু হয় তার পরিবার। কিন্তু জীবনের অবশিষ্ট পুরো সময়টাই আক্ষরিক কি কল্পনায় সেই ছেলেবেলার মহল্লাতেই ফিরে গেছেন তিনি। গলির জগৎ— সামাজিক অঞ্চল, মানবীয় মঞ্চ ও রাজনৈতিক রূপক হিসেবে— তার বেশির ভাগ রচনাকেই অনুপ্রাণিত করবে।

১৯২২ সালে মিসরকে নামমাত্র স্বাধীনতা দেয়া হয় এবং পরের বছর ফিরে আসার অনুমতি দেয়া হয় জগলুলকে। ১৯২৭ সালে মৃত্যুর আগে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দুটো সরকারের নেতৃত্ব দেন তিনি। ব্রিটিশরা মিসরের ক্রমবর্ধমান হারে দুর্বল ও অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা রাজতন্ত্রকে খাড়া রেখে পর্দার আড়াল থেকে দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। তারপর ১৯৫২ সালে অব্যাহত ইংরেজ উপস্থিতি ও রাজা ফারুকের অনৈতিক জীবনযাপনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে একদল তরুণ মিসরীয় কর্মকর্তা রাজতন্ত্র উত্খাত করে মিসরকে সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। এ কর্মকর্তাদের একজন জামাল আব্দেল নাসের অচিরেই দেশের প্রেসিডেন্ট হন। দুই বছর পরে সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে আরব জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডাবাহী হয়ে দাঁড়ান তিনি। নাসেরও একদলীয় ব্যবস্থা চালু, গণমাধ্যমের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং ইসলামপন্থী ও ভিন্ন মতাবলম্বী কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে দমননীতির পথ বেছে নেন।

অভ্যুত্থানের সময় মাহফুজের বয়স ছিল ৪০ বছর, ততদিনে প্রতিষ্ঠিত লেখক হয়ে গেছেন তিনি। বিপ্লবীদের বহু সামাজিক পুনর্বণ্টন নীতিকে সমর্থন দিলেও সামরিক শাসন সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। ১৯২০-এর দশকের উদারনৈতিক রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুঃখ বোধ করেছেন। আসলে সবসময়ই ১৯২০-এর দশককে মিসরের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে সর্বসেরা সময় মনে করতেন তিনি: উন্মত্ত জাতীয়তাবাদ ও রোমান্টিক আশাবাদের একটা সময়। তার বিখ্যাত পারিবারিক গাথা দ্য কায়রো ট্রিলজি এ সময় শুরু হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সর্বোচ্চ বিন্দুতে শেষ হয়েছে। ট্রিলজির প্রথম উপন্যাস প্যালেস ওয়াক শেষ হচ্ছে স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল করার সময় ব্রিটিশের গুলির আঘাতে নিহত পরিবারের সোনার ছেলে, সক্ষমতা ও নীতিবান প্রতিশ্রুতিশীল এক তরুণ ফাহমিকে দিয়ে। তার মৃত্যুর প্রবল ক্ষতি পরিবার আর পূরণ করতে পারেনি। একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক মিসরের আশাও নস্যাৎ হয়ে যায়।

সাহিত্যিক সংস্কৃতিহীন একটা পরিবারে বেড়ে উঠেছেন মাহফুজ। ছেলেবেলার এক বন্ধুর কাছ থেকে বই ধার করতেন। সমবয়সী অন্য ছেলেদের মতো রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাসই পছন্দ ছিল। প্রিয় পেপারব্যাক বই অতি কষ্টে নকল করে তাতে নিজের জীবনের কিছু বর্ণনা ঠেসে দিয়ে শেষে লক্ষণীয়ভাবে স্বাক্ষর জুড়ে দিয়ে প্রথম ‘লেখালেখি’ শুরু করেছিলেন তিনি।

এক অর্থে মাহফুজের উপন্যাসগুলো নকল করে ‘লেখালেখি’র শখেরই ধারাবাহিকতা ছিল। ১৯২০-১৯৩০-এর দশকের মহান চিন্তকদের, তাহা হোসেন এবং তৌফিক আল-হাকিমের মতো বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা করতেন তিনি এবং হোসেনের অধীনেই কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্রে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অবশ্য গ্র্যাজুয়েশনের পর মত পাল্টে পশ্চিমের প্রায় সব মহান লেখক ও নাট্যকারের রচনা পড়ে প্রচলিত দৃঢ়তা ও শৃঙ্খলার সঙ্গেই ঔপন্যাসিক হওয়ার সিদ্ধান্তের পথ মাড়ান। তার প্রিয় লেখকরা হলেন: শেক্সপিয়র, প্রুস্ত ও টলস্টয়; ইবসেন, চেকভ, টমাস মান এবং ইউজিন ও’নীলও তার পছন্দ ছিল। তার মতে, হেমিংওয়েকে অতিমূল্যায়ন করা হয়েছে। ফকনার ‘প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জটিল’।

সব শিল্পকর্মই অনুকরণ, কিন্তু মাহফুজ পরে যেমন উল্লেখ করেছেন, পাশ্চাত্য শিল্প প্রকরণকে আপন করে নিতে ইচ্ছুক উন্নয়নশীল দেশের শিল্পীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঝুঁকিপূর্ণ।

১৯৩০-এর দশক নাগাদ মাহফুজ বিভিন্ন সাময়িকীতে গল্প প্রকাশ শুরু করেন এবং মিসরের ফারাও আমলের পটভূমিতে উচ্চাভিলাষী উপন্যাসের সিরিজ লেখার কাজে হাত দেন। এসব বই ব্রিটিশ দখলদারি সম্পর্কে মাহফুজের রচনার পরোক্ষ কায়দা ছিল। কিন্তু ১৯৪০-এর দশকে এ প্রকল্প বাদ দিয়ে সমসাময়িক মিসরের দিকে নজর ফেরান তিনি। সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল এটা। ১৯৪৭ সাল নাগাদ মিদাক অ্যালি বের করার সময় শিরোনামের গলি থেকে শুরু করে তার উপন্যাসের সব প্রধান উপাদানই উপস্থিত ছিল। গদ্যের সৌন্দর্যের পাশাপাশি মাহফুজের রচনার বড় শক্তি তার কাহিনীর বহুস্তর। এসব কাহিনীতে বর্ণিত গলিপথগুলো জনাকীর্ণ, সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যময় খুদে বিশ্ব, যেখানে ব্যক্তিগত ভবিতব্য, রাজনৈতিক বিরোধ ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটে চলে। এটা একাধারে শনাক্তযোগ্য একটা জায়গা, যেখানকার বাসিন্দারা যুদ্ধ করে, ষড়যন্ত্রে মাতে এবং কষ্ট পোহায়; আবার একই সঙ্গে মিসরের বৃহত্তর জাতীয় প্রেক্ষাপটে এক শিল্পানুগ অবস্থানও।

লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের বাস্তবের মোকাবেলা ও চিত্রায়ণ করা উচিত বলে মাহফুজ বিশ্বাস করতেন।

মিদাক অ্যালি একটি দুঃসাহসী ও জোরালো রচনা হলেও কেবল কায়রো ট্রিলজি প্রকাশের পর প্রায় এক দশক ব্যবধানে মাহফুজ খ্যাতি লাভ করেন। ছেলেবেলার মহল্লার রাস্তার নামে— প্যালেস ওয়াক, প্যালেস অব ডিজায়ার এবং শুগার স্ট্রিট— বিভিন্ন পর্বে ভাগ করা মাহফুজের কাহিনী শুরু মধ্যবিত্ত পরিবারের মা আমিনা মাঝরাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠার ভেতর দিয়ে। স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় থাকার সময় ‘কাঠের জাফরি কাটা খাঁচায় ঢুকে ওকে রাস্তা থেকে দেখা থেকে রক্ষা করা খাঁচার ছোট ছোট গোলাকার ফোকর দিয়ে বাইরে তাকায়।’ এ সীমিত দৃষ্টিসীমা থেকে কায়রো সম্পর্কে আমাদের ধারণা ক্রমে মাহফুজের জটিল পরিকল্পিত ব্যাপক বৈচিত্র্য আয়ত্তে না আসা অবধি প্রসারিত হয়ে চলে। শত শত পৃষ্ঠা জুড়ে আমরা কেবল আরো দূরে, নতুন নতুন মহল্লা, আমিনার পরিবারের নতুন প্রজন্ম, নতুন নতুন ধারণা ও প্রত্যাশার দিকে এগিয়ে যাই। ওর সন্তানদের জীবনের ভেতর দিয়েই স্মরণীয় ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনগুলো ফুটে ওঠে।

প্যালেস ওয়াকের সূচনায় আমিনার স্বামী মদ, নারী আর সংগীতপ্রেমী আল-সায়ীদ আহমেদ বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ফুর্তি শেষে বাড়ি ফিরছে; সফল বণিক সে। অথচ ছেলেদের বেলায় দারুণ কঠোর। স্ত্রীকে এমন বশ মানিয়ে রেখেছে যে বহু আগেই মহিলা ‘বিশ্বাস করে নিয়েছে সত্যিকার পৌরুষের, স্বেচ্ছাচার আর মাঝরাত অবধি বাইরে কাটানোই সাধারণ বৈশিষ্ট্য।’ সব কপটতা, নিষ্ঠুরতা আর ক্যারিশমা নিয়ে পিতৃতন্ত্র সম্পর্কে মাহফুজের চিত্রায়ণ এতটাই স্পষ্ট যে আজো ‘আল-সায়ীদ’ আরব দুনিয়ায় ভীষণ দাপুটে পুরুষের সংক্ষিপ্ত নাম হয়ে আছে। পরিবারের সবচেয়ে ছোট ছেলেটি, কামালই লেখকের সবচেয়ে বড় আত্মজৈবনিক চরিত্র। প্রথম বইতে ছোটবেলায় তাকে বাবার প্রত্যাখ্যানের ভয়ে আড়ষ্ট, জুুলুমের শিকার হতে দেখি আমরা। ট্রিলজির শেষ দিকে একতরফা প্রেমে তাড়িত দর্শনের শিক্ষক সে। শিক্ষিত, স্বাধীন কিন্তু অসুখী— নাস্তিক এবং বিচ্ছিন্ন বুদ্ধিজীবী, যে মনে করে জীবন আসলে তেমন কিছু নয়। পরে আল-গিতানিকে মাহফুজ বলেছেন, ‘কামালের সংকট এবং তার দুর্ভোগ আমারই সংকট ও দুর্ভোগ।’

ট্রিলজির তরুণতম প্রজন্ম কামালের ভাস্তেরা দেশের জন্য করণীয় বিষয়ে ঢের বেশি আত্মবিশ্বাসী। ওদের একজন কমিউনিস্ট, এক নারী সমবয়সী কমরেডকে বিয়ে করেছে। অন্যজন মুসলমি ব্রাদারহুডের সদস্য। ওদের মাধ্যমে মাহফুজ পরবর্তী দশকগুলোয় দেশের প্রত্যক্ষ করতে যাওয়া দুটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের আগাম পূর্বাভাস দিয়েছেন। রাষ্ট্রের এ বিরোধিতা মোকাবেলার উপায়েরও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে দুই তরুণের— ‘যে আল্লাহর উপাসনা করে আর যে করে না’— গ্রেফতারের ভেতর দিয়ে ট্রিলজির শেষ উপন্যাস শুগার স্ট্রিট শেষ হয়েছে। ‘জীবনে সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে চাইলে সবার আগে তোমাকে সরকারের গোলামি করতে হবে,’ মন্তব্য করছে কামাল।

কায়রো ট্রিলজি বিশ শতকের মাঝামাঝি বিশেষ করে উপনিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে থাকা দেশগুলোয় সামাজিক পরিবর্তনের চোখ ধাঁধানো গতি এবং কড়া মূল্য মেটানোর ব্যাপারটা তুলে ধরেছে। মাহফুজের পরবর্তী রচনা চিলড্রেন অব দি অ্যালি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের উপন্যাস। ঐতিহাসিক পরিবর্তনের প্রধান শক্তিগুলোর বিবরণ দেয়ার বদলে কার্যত এটা সময়ের চৌহদ্দির বাইরে অবস্থান করে আদৌ সত্যিকারের পরিবর্তন সম্ভব কিনা, সেই প্রশ্ন তুলছে।

বাবার সুখময় বাড়ি ও উদ্যান থেকে প্রথমে একজন এবং পরে আরেক ভাইয়ের বহিষ্কারের ভেতর দিয়ে উপন্যাসের শুরু। (যথারীতি মন্দ ভাইটি ভালোটির চেয়ে অনেক বেশি কৌতূহলোদ্দীপক) ওদের বহুগুণে বেড়ে ওঠা উত্তরসূরিরা পূর্বপুরুষ প্রাচীরের ওধারের অদৃশ্য বাসিন্দা গাবলাভির প্রাসাদের ধারে দুঃখ-দুর্দশায় জীবন কাটায়। মানুষটা প্রিয়, ভয়ঙ্কর, ভীতিকর এবং দুর্বোধ্য। এক লোভী তত্ত্বাবধায়কের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে তার এস্টেট; ঠগরা শাসন করে এবং তার উসিলায় মানুষের ওপর ডাকাতি করে। উপন্যাসের গলিপথের বাসিন্দারা বছর পরিক্রমায় গাবলাভির সঙ্গে দেখা হওয়ার বা তার কথা শোনার দাবি করে অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব দেয়া বিভিন্ন নেতাকে অনুসরণ করে। এ নেতারা বিভিন্ন পয়গম্বরের কথা মনে করিয়ে দেয় (সর্বশেষ চতুর্থ জন নেতা, আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিভূ)। কিন্তু বিদ্রোহ সফল হওয়ার পর একটি নতুন শাসকদল প্রতিষ্ঠিত হলেও পরের অধ্যায়ের সূচনা নাগাদ সবকিছু ফের আগের অবস্থায় ফিরে যায়; সেই তত্ত্বাবধায়ক, সেই ডাকাত দল, সেই দুর্ভোগ।

মাহফুজ উপন্যাসটিকে ‘মেটাফিজিক্যাল’ বলে উল্লেখ করেছেন। প্রত্যাদেশ, বিদ্রোহ, ধ্বংস ও নিপীড়নের চক্র হয়ে এগিয়ে যায় এটা। ‘বিস্মৃতি আমাদের গলির মহামারী কেন?’ প্রশ্ন করছে কথক। এবং কাহিনীতে এক ধরনের অধিবিদ্যিক মাত্রা থাকলেও এর চরিত্রগুলো মানুষ। ওদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়— ওদের ভালোবাসা, দুঃখ, আর মৃত্যু— তীক্ষ আঁচড়ে আঁকা হয়েছে। শত্রুরা হত্যার জন্য নিয়ে যাচ্ছে, এমন এক লোক সম্পর্কে মাহফুজ লিখছেন: ‘এক গভীর পরম দুঃখবোধ ঘিরে ধরেছে ওকে। এমনকি ওর ভীতিকেও গ্রাস করে নিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন পথিবীর বুকে অন্ধকারই টিকে থাকবে।’ স্ত্রীর গভীর প্রেমে আপ্লুত আরেকজন বাসররাতে স্ত্রীর কাছে যাচ্ছে। ‘ওকে অসাধারণ লাগছে, কোমল ত্বক আর ঝলমলে সুন্দর দেখাচ্ছে; মুক্তোর মতো আলোয় দেয়ালগুলোও ওকে দেখছে।’

১৯৫৯ সালে আল-আহরাম পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ আল-আযহারের নজর কেড়ে নেয়। উপন্যাসটিকে ব্লাসফেমাস ঘোষণা করে তারা। কিন্তু নাসেরের আস্থাভাজন আল-আহরামের সম্পাদক মোহামেদ হাসানিন হেইকাল শেষ পর্যন্ত এটির প্রকাশনা চালিয়ে যান। কিন্তু এরপর মাহফুজ মিসরে আর উপন্যাসটি প্রকাশের চেষ্টা করেননি। বেশ কয়েক দশক বাদে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর নতুন করে রেডিক্যাল ইসলামপন্থীদের কাছে এটি প্রত্যাখ্যাত হয়। এরাই ১৯৯০-এর দশকে রাষ্ট্রকে সহিংস চ্যালেঞ্জ করে বুদ্ধিজীবী মহলের সদস্যদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে।

বইটি আরব ও মুসলিম দেশগুলোয় এখনো টাটকা রয়ে যাওয়া একটা প্রশ্ন তুলে ধরেছিল: রাজনীতি ও ধর্মের ভেতর সম্পর্ক কেমন আছে আর কেমন হওয়া উচিত? চিলড্রেন অব দি অ্যালিতে ধর্ম একাধারে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ, আবার এর আবরণও বটে। প্রতিটি ধর্মের পার্থিব স্বার্থ গোপন করে সেটা আদায় করার কৌশল তুলে ধরায় মাহফুজের ধর্মহীনতা গড়ে উঠেছে— কেবল ইসলাম নিয়ে আলোচনা করেননি তিনি। উপন্যাসটি আবার একটি দল কীভাবে নিষ্ঠুরতা, আতঙ্ক, ক্রোধ কিংবা সাহসিকতাকে আয়ত্ত করার বেলায় দক্ষ, সেটাও তুলে ধরেছে।

স্পষ্ট দৃষ্টি কিন্তু ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি কখনো কখনো মাহফুজের কলামেও চোখে পড়ে। চারপাশে কপটতা এবং মাঝারি মান প্রত্যক্ষ করা ক্রুদ্ধ এক তরুণীকে মাহফুজ লিখছেন: ‘মিস, আশা করি আপনার আদর্শবাদিতার কিছুটা বিসর্জন দিয়েছেন। কিন্তু সামান্য অংশ নয়। আপনি যে সমাজের দিকে চোখ ফেরাচ্ছেন, সেটি বৈষম্য, যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও সংকটে আক্রান্ত। দয়া করে পরিচ্ছন্ন, অভিজাত আর সুস্বাস্থ্যের কোনো ছবি আশা করবেন না। জেনে রাখবেন সেরা মানুষগুলো— বাকি সবার সঙ্গে— ভয়ঙ্কর ঝোঁকে তৈরি হয় এবং তারা বিপুল পরিমাণ স্বার্থপরতা, অহঙ্কার ও প্রলোভন বহন করে।’

বেশির ভাগ সময় মাহফুজ সোজাসাপ্টা, সরল এবং নির্মম। অনেক সময় নিজের উদার ও গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেন। দুর্নীতিসংক্রান্ত এক কলামে তিনি লিখেছেন: ‘পুলিশ অফিসার, তথ্যদাতা, জেলখানা আর ফাঁসিকাঠের চেয়ে রাজনৈতিক দল ও মিম্বরের চাহিদা অন্তত এ মুহূর্তে আমাদের কমই হবে।’

এদিকে সময়ের অনেক ঘটনা সম্পর্কে মাহফুজ রশীদ এল-ইনানির ভাষায় ‘বিবেচনাপ্রসূত নীরবতা’ বজায় রাখেন। ১৯৭৭ সালের রুটি-দাঙ্গা সম্পর্কে তার কিছুই বলার নেই (আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল আরোপিত কৃচ্ছ্রসাধনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের মতো ছিল সেটা।) এবং যেন আনোয়ার সাদাত সরকারের রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দাবি বিনা আপত্তিতেই মেনে নিয়েছেন তিনি।

 শেষতক মিসরের বেশির ভাগ বিপ্লব ও শাসকগোষ্ঠী সম্পর্কে নিজের কথা বলেছেন মাহফুজ, কিন্তু সেটা তার নিজ সময়ে, নিজের মতো করে (এবং অনেক সময় প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর কারণে সৃষ্টি হওয়া নিরাপদ দূরত্বে থেকে)। স্মৃতিকথা গ্রন্থে আল-গিতানি মাহফুজের উত্তর দিতে অনিচ্ছুক বিভিন্ন প্রশ্ন উপেক্ষা করা কিংবা দীর্ঘ সময় চুপ থেকে কেবল আলাপ এগিয়ে যাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত ওই প্রসঙ্গে মন্তব্য করে সবাইকে চমকে দেয়ার স্বভাবের কথা বলেছেন। তার জীবনের বহু গুরুত্বপর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের বেলায় একই ধরনের বিলম্ব রয়েছে এবং কেবল গল্পেই মাহফুজ ঋদ্ধ, মৌলিক ও জটিল কিছুতে নিজের রাজনৈতিক ধারণা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। ১৯৬০-এর দশকে রচিত তার উপন্যাসগুলোয়— অ্যাড্রিফট ইন দ্য নাইল, দ্য থিফ অ্যান্ড দ্য ডগস, মিরামার— নাসেরের ঘাটতি আর স্বেচ্ছাচারী ঝোঁক সুস্পষ্ট হয়ে ওঠার সময় ১৯৫২ সালের বিপ্লব-পরবর্তী মোহমুক্তি এবং ঘৃণা ধরে রেখেছেন মাহফুজ। বইগুলো হত্যাকাণ্ড ঘিরে আবর্তিত এবং এই ‘নয়ের’ (noir) বৈশিষ্ট্য স্থির পরিস্থিতিরই অংশ। ১৯৬০-এর দশকের উপন্যাসগুলো অসম্ভব এবং অন্যায় জগতের পটভূমিকায় রচিত, যেখানে লোকে এখন আর জানে না কী বিশ্বাস করতে হবে এবং নিজেদের কাজ নিয়ে অন্তহীন বিতর্কে মেতে থাকে, নীতি নিয়ে দ্বিতীয় চিন্তা করে এবং এমনকি নিজেদের বাস্তবতায়ও সন্দিহান। নাসেরের আমলের সুস্পষ্ট কিন্তু সাংকেতিক সমালোচনায় এ গল্পগুলো বেশ দুঃসাহসী।

১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের কাছে মিসরের পরাজয় এবং ১৯৭০-এ নাসেরের মৃত্যুর পর বিগত শাসকগোষ্ঠীর খামতি নিয়ে আরো বেশি খোলামেলা লেখালেখি করেছেন তিনি। ১৯৭৪ সালের উপন্যাস কারনাক ক্যাফে বিভিন্ন ক্যাফেতে গোয়েন্দাগিরির শিকার হওয়ার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত। ‘আমরা সবাই অদৃশ্য শক্তির এক যুগে বাস করছি— গুপ্তচরের দল আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাসেই ভেসে বেড়াচ্ছে, প্রকাশ্য দিবালোকে ছায়া,’ বলছে কথক। নামকাওয়াস্তে ক্যাফেতে সমবেত উপন্যাসের ছাত্রদের মনে বিদ্রোহের কোনো প্রবণতা ছিল না, কিন্তু তার পরেও ওদের কারারুদ্ধ করে নিপীড়ন চালানো হয় এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে তথ্য জোগাতে বাধ্য করা হয়। ১৯৫২ সালের বিপ্লবের সন্তান ছিল ওরা, বিপ্লবে যাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করা হয়েছে। তৃতীয় দফা কারাভোগের পর বেরিয়ে এসে একটি চরিত্র ইসরায়েলের কাছে আরব দেশগুলোর শোচনীয় পরাজয়ের কথা জেনে নিশ্চিত হয়ে যায় যে, ‘আমরা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যার ভেতর বাস করে আসছিলাম।’

সব মিসরীয়র মতো মাহফুজও ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের অপ্রত্যাশিত পরিণামে ধাক্কা খেয়েছেন। তবে মিসরের ইসরায়েলকে পরাজিত করার ক্ষমতা না থাকলে রাজনৈতিক নিষ্পত্তির চেষ্টা করা উচিত বলে যুক্তি দেখিয়েছেন। ১৯৭৯ সালে সাদাতের জেরুজালেম সফর এবং মিসর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তির সমর্থন করেছেন তিনি। সম্ভবত এটাই তার সবচেয়ে দুঃসাহসী অবস্থান ছিল। পরে গোটা আরব বিশ্বে তার বই নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছিল।

সাদাত ক্ষমতাসীন থাকার সময়কালটি মিসরের ইতিহাসের অন্যতম অস্থির পর্ব ছিল। ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি ও অর্থনীতির উদারীকরণ এবং পরিণামে সৃষ্ট বল্গাহীন দুর্নীতির বিপুল বিরোধিতা ছিল। কিন্তু মাহফুজের কলাম থেকে এসবের কিছুই জানার উপায় ছিল না কারো। মাহফুজ যখন সাদাতের আমলের কঠিন চিত্র তুলে ধরেন, তাও দ্য ডে দ্য লিডার ওঅজ কিল্ড (বর্তমান অনুবাদক কর্তৃক অনূদিত ও ঐতিহ্য প্রকাশিত) নামে এক উপন্যাস মারফত; ১৯৮১ সালে আততায়ীর হাতে সাদাতের মৃত্যুর পর এটি বের করেন তিনি। তুলনার দিক থেকে সাদাতের মৃত্যুর ছয়দিন পর পত্রিকায় প্রকাশিত ‘এরাজ অ্যান্ড লিডারস’ নামে রচিত নিবন্ধটি অদ্ভুতভাবে নির্লিপ্ত ছিল। স্কুল টেক্সট বইয়ের আদলে নাসের, সাদাত ও নয়া রাষ্ট্রপতি মুবারকের তারিফ করেছেন তিনি এবং প্রত্যেকেই প্রয়োজনের মুহূর্তেই মিসরকে নেতৃত্ব দিতে সামনে এগিয়ে এসেছেন বলে উল্লেখ করেছেন।

নতুন শাসকের পক্ষে সেরা কিছু করার ক্ষেত্রে কলামটা একজন দরবারি লিপিকারের কর্মকাণ্ড। মাহফুজ হয়তো স্বার্থপর হয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু কিছুটা আন্তরিকও ছিলেন। মিসরীয় বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের মতো মাহফুজের জাতীয়তাবাদের মানে ছিল গলিতে বাস করে মরুভূমির বুনো এলাকায় ঘুরে বেড়ানো। আসলে মিসরের স্বার্থের প্রতি তার আনুগত্য ও ব্যক্তিগত একাত্মতার কারণে সমালোচনার সময় সমালোচনাকে যৌক্তিক করে তুলতেন তিনি।

মুবারকের বছরগুলোয় গল্পে মাহফুজের রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমবর্ধমান হারে মৌন হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে প্রবীণ এ লেখক বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অতীত কিংবা অন্তরে নজর ফিরিয়েছেন। ‘আমাদের গলিতে আমিই প্রথম লেখকের পেশা বেছে নিয়েছি, যদিও আমার জন্য তা বহু ঘৃণা ও পরিহাস ডেকে এনেছে, চিলড্রেন অব দ্য অ্যালির কথক বলছে আমাদের। ‘নির্যাতিত ও অভাবীদের আবেদন আর অভিযোগ লেখাই আমার কাজ... এত অসংখ্য লোকের গোপন কথা আর দুঃখের কথা আমি জানি, নিজেই বিষণ্ন এবং ভগ্নহূদয় মানুষ হয়ে গেছি।’ মাহফুজ স্বয়ং আদৌ বিষণ্ন ছিলেন না। তবে একবার আল-গিতানিকে বলেছিলেন, মিসরীয়রা যতদূর পর্যন্ত মনে করতে পারে, তারা হতাশ হয়ে এসেছে।

আশার মুহূর্তগুলোকে— ১৯১৯ ও ১৯৫২ সালের বিপ্লব— অনিবার্যভাবেই আপস, ব্যর্থতা আর নির্যাতন অনুসরণ করেছে: ‘আমরা নিঃশ্বাস নেয়ার মুহূর্তে দেখতে পাই কেউ একজন আমাদের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আমাদের শ্বাস ছিনিয়ে নিয়ে আমাদের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে।’ তবু তিনি বলেছেন, তার সব রচনা ছিল ‘ব্যর্থতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম’, যে সংগ্রামে তিনি কখনো হাল ছাড়েননি।

 

[উরসুলা লিন্ডসি উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি এবং রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করেন। বুলাক পডকাস্ট পরিচালনা করেন তিনি।]