গত বছর ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এ অংশ নিতে এসেছিলেন স্কটিশ ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডালরিম্পল। তখনই কথা হয়েছিল ‘দ্য হোয়াইট মুঘল’, ‘দ্য লাস্ট মুঘল’ বইগুলোর লেখকের সঙ্গে। সেবার ডালরিম্পল কথা বলেছেন নিজের লেখালেখি, ব্যক্তিজীবন ও ভারতের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রিদওয়ান আক্রাম

আপনার প্রথম চারটি বই-ই তো ভ্রমণের। তো হঠাৎ করে নিজের পরিচিত ক্ষেত্র পরিবর্তন করে ইতিহাস লিখতে গেলেন কেন?

উইলিয়াম ডালরিম্পল: প্রথম দিকে বেশ ঘুরে বেড়াতাম। লেখার উপাদান সংগ্রহ করতাম। সঙ্গে লেখালেখিও চলত। আমার প্রথম সন্তান ইবি জন্মের আগের দুই দশক ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছি। কাজ করেছি যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদদাতা হিসেবে। সংবাদ সংগ্রহের জন্য যেতে হয়েছে শ্রীলংকা, কাশ্মীর, ফিলিস্তিন। গোলাগুলির মধ্যেও পড়তে হয়েছে। বয়সটা ছিল এমন যে গুলিকে ফাঁকি দিতে পারলে ভালোই লাগত। তবে সেটা তো সব দিন সম্ভব নয়। একদিন হয়তো গুলি লেগে যেতে পারত। এর মধ্যে ১৯৯৪ সালে আমাদের মেয়ে ইবির জন্ম হয়। সে বছর আমার দ্বিতীয় বই ‘সিটি অব জিনস: আ ইয়ার ইন দিল্লি’ প্রকাশিত হয়। তো সে সময় আমার মনে হলো, সন্তানের জন্য হলেও আমাকে কোথাও থিতু হয়ে বসা উচিত। চাইছিলাম সন্তানদের বড় হওয়া দেখতে। আর স্থিতিশীল একটা কাজেরও প্রয়োজন ছিল। আরেকটা বিষয় খেয়াল করলে দেখবেন, আমার ভ্রমণ গ্রন্থগুলোয় ইতিহাস চলে আসে। আবার আমার ইতিহাসের বইগুলোও অন্য অর্থে ভ্রমণের কথাও বলে। তো খুব একটা ক্ষেত্র পরিবর্তন হয়েছে, তা কিন্তু বলা যাবে না।

আপনার প্রথম ইতিহাসের বই ‘দ্য হোয়াইট মুঘল’ বের হয় ২০০২ সালে। তো এ বই লেখার বিষয়ে কীভাবে আগ্রহী হলেন?

নামটায় ‘মুঘল’ থাকলেও বইটি কিন্তু দিল্লির সেই বিখ্যাত মোগলদের নিয়ে নয়। ঘটনাস্থল হায়দরাবাদ। এক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্তকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল জেমস একিলিস কার্কপ্যাট্রিকের (১৭৬৪-১৮০৫) প্রেম হয় সেখানকার উচ্চবংশীয় এক মোগল নারী খায়রুননিসার সঙ্গে। তাকে বিয়ে করার জন্য ধর্মান্তরিত হন জেমস। তাদের প্রেমকাহিনী বেশ আলোড়ন তুলেছিল সে সময়ে (১৮০০ সাল)। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির হর্তাকর্তারা বিষয়টা তেমন পছন্দ না করলেও নিজেদের সম্পর্কটা চালিয়ে গিয়েছেন কার্কপ্যাট্রিক। তার দায়িত্ব ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে হায়দরাবাদের শাসক নিজামের সম্পর্কোন্নয়ন ও কোম্পানির স্বার্থ দেখা। কিন্তু জেমস বেশি অনুগত ছিলেন নিজামের। তো হায়দরাবাদ ভ্রমণের সময় এ ভদ্রলোক সম্পর্কে জানতে পারলাম। ইন্ডিয়া অফিসে খোঁজখবর করতেই পেয়ে গেলাম ‘কার্কপ্যাট্রিক পেপারস’। এসবের মধ্যে ছিল নিজের আর তার ভাইয়ের মধ্যে আদান-প্রদান করা চিঠিসহ অন্যান্য দলিলপত্র। দুই বছর ধরে কার্কপ্যাট্রিকের ওপর কাজ করেছিলাম। তারই ফল হচ্ছে ‘দ্য হোয়াইট মুঘল’।

বইটিকে আসলে কীভাবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন আপনি? এটাকে কি রাজনৈতিক ইতিহাস, নাকি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দুই নর-নারীর প্রেমকাহিনী?

আসলে আমি এ বইয়ের মাধ্যমে সে সময়কার সামাজিক ইতিহাস লিখতে চেয়েছি। আবার রাজনৈতিক ইতিহাসও বলতে পারেন। তো সে সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস পাশ কাটিয়ে মূলত ব্রিটিশরা কীভাবে ভারতীয় সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল, সেটাই আসলে দেখাতে চেয়েছি। এর আগে মনে করা হতো, নানা ধরনের পার্থক্য থাকার কারণে এ দুই ভিন্ন দেশীয় মানুষের মধ্যকার সম্পর্কটা ছিল সাদা-কালো। কিন্তু বাস্তবতা ছিল একেবারে অন্য রকম।

এটার ওপর তো একটা প্রামাণ্যচিত্রও হয়েছিল। উপস্থাপনাও করেছিলেন আপনি।

হ্যাঁ, বিবিসি করেছিল। ২০১৫ সালে।

এ বই লিখতে গিয়ে তো আপনার এক পূর্বপুরুষের খোঁজ পেয়ে গেলেন, যিনি কিনা কার্কপ্যাট্রিকের মতো এক মোগল নারীকে বিয়ে করেছিলেন। সে হিসাবে তো আপনি নিজেকেও একজন মোগল বলতে পারেন।

হা-হা-হা! সেটা বলতে পারেন। আমার শরীরে আবার বাঙালি রক্তও আছে। তো ফিরে আসি আমার সেই পূর্বপুরুষের প্রসঙ্গে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল জেমস ডালরিম্পল হায়দরাবাদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন। ১৭৮০ সালে এক যুদ্ধে হায়দার আলী ও টিপু সুলতানের হাতে পরাজিত হয়ে বন্দি হন। ১৮০০ সালে উনি হায়দরাবাদে মারা যান। তার কবরও রয়েছে সেখানে। তিনি বিয়ে করেছিলেন মাসুলিপাটনামের নবাবের কন্যা মতি বেগমকে। এ মতি বেগমের চাচাতো কিংবা মামাতো বোন হচ্ছেন সম্রাট মমতাজ মহল। তাদের পাঁচজন সন্তানও ছিল। জেমস ডালরিম্পলের মৃত্যুর পর আমার পরিবারের ইতিহাস থেকে ধীরে ধীরে তার নাম সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে। এ বইয়ের কাজ না করলে হয়তো কখনো জানতেও পারতাম না।

আপনার স্ত্রী অলিভিয়া ফ্রেজারের পূর্বপুরুষও ভারতীয় বংশোদ্ভূত?

ঠিকই বলেছেন। ওর পূর্বপুরুষ ও জ্ঞাতি উইলিয়াম ফ্রেজার ছিলেন দিল্লি ব্রিটিশ রেসিডেন্ট। মোগল দরবারের ব্রিটিশ দূতের দায়িত্ব পালন করতেন এ রেসিডেন্টরা। ১৮০৫ সালে তিনি দিল্লি আসেন। সে সময়কার মোগল সম্রাটরা দরবার চালালেও বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে অনুমতি নিতে হতো এ ব্রিটিশ রেসিডেন্টদের কাছ থেকেই। উইলিয়াম ফ্রেজার ছিলেন স্কটিশ। তবে দীর্ঘদিন ভারতে থাকার ফলে এখানকার জীবনযাত্রা গ্রহণ করেছিলেন। রাজপুতদের মতো তিনি গোঁফে তা দিতেন। তার হারেমে ছিল অনেক ভারতীয় স্ত্রী। তারা তাকে অসংখ্য সন্তান উপহার দিয়েছিলেন।

আর বিয়েগুলো কি মুসলমান আর ব্রিটিশদের মধ্যে বেশি হতো?

সেটা বলতে পারেন। সে সময়কার সমাজের উঁচুতলার মুসলমানরা অনেক বেশি উদার ছিলেন ব্রিটিশদের সঙ্গে বিয়ে-শাদির ব্যাপারে।

ভারতে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে ইংরেজরা এ দেশীয় মেয়েদের বিয়ে-শাদি করত। কিন্তু উনিশ শতকের প্রথম দিকে এসে সে প্রথা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। কেন এমনটা হলো? তখন কি ভারতবর্ষে ইংরেজ নারীদের আসা শুরু হয়ে গিয়েছিল?

ঠিক বলেছেন। তবে প্রথাটা যে হুট করে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তা কিন্তু নয়। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আপনার কাছে পরিষ্কার হবে। ১৭৮০ সালের দিকে তিনজনের মধ্যে একজন, ১৭৯০ সালের দিকে চারজনের মধ্যে একজন, ১৮০০ সালের দিকে পাঁচজনের মধ্যে একজন, ১৮২০ সালের দিকে ছয়জনের মধ্যে একজন ইংরেজ বা ইউরোপীয় এ দেশীয় নারীদের বিয়ে করত। সূচকটা দেখে বুঝতে পারছেন, এখানে বিয়ে করতে ইচ্ছুক সাদা চামড়াদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছিল। ১৮৩০ সালের দিকে এসে এ প্রথা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। আপনি যেমনটা বললেন যে ইংরেজ নারীরা ভারতবর্ষে আসা শুরু করার জন্য এ প্রথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কিনা? আদতে ইংরেজ নারীরা ১৮৪০-৫০-এর দশকে এ অঞ্চলে আসা শুরু করে। কিন্তু দেখতে পাই, তার দুই দশক আগেই এ প্রথা বিলুপ্তির পথে হেঁটেছিল। আর এটার পেছনে আসলে মূলত কাজ করেছে ইংরেজদের ক্ষমতা প্রাপ্তি ও খ্রিস্টীয় ধর্মের প্রতি অনুরাগ বৃদ্ধি। সেসবের সঙ্গে অন্য আরো অনেক ছোটখাটো ব্যাপার তো ছিলও।

এরপর তো ২০০৬ সালে প্রকাশ করলেন আপনার আরেকটি আলোচিত বই ‘দ্য লাস্ট মুঘল, দ্য ফল অব আ ডাইনেস্টি, দিল্লি ১৮৫৭’। মোগলদের সম্পর্কে আগ্রহী হলেন কেন? যদি নির্দিষ্ট করে বলি, শুধু শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে নিয়ে কেন লিখতে গেলেন? কেন বাবর নয়, কেনই বা শাহজাহান নয়?

দিল্লির বাসিন্দা আমি। এ বইয়ের গল্পটা এ শহরের কথাই বলে। আর এ শহরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মোগলদের নাম। অসাধারণ এক রাজবংশ। বাবর বলেন, আকবর বলেন কিংবা শাহজাহান— এ বিখ্যাত সম্রাটদের নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। অনেক গল্প খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষ মোগল সম্রাটকে নিয়ে খুব কমই লেখা হয়েছে। ওনাকে নিয়ে যখন কাজ করা শুরু করি, তখন খুবই কম লেখা পেয়েছি ওনাকে নিয়ে। সেই ধারাবাহিকতায় এখন কাজ করছি সম্রাট শাহ আলমকে নিয়ে। তার সম্পর্কেও খুব কম লেখালেখি হয়েছে। প্রথম দিককার ছয় মোগল সম্রাটকে নিয়ে নতুন কোনো তথ্যের ভিত্তিতে লেখাটা খুব কঠিন। বরং পরের দিকের মোগল সম্রাটদের নিয়ে তেমন একটা কাজ বলতে গেলে হয়নি। ফলে আমার জন্য নতুন তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করা বেশ সোজাই বলা চলে।

আপনি তো বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থান নিয়েও বই লিখছেন। সেখানে কি বাংলাদেশ থাকছে?

শুধু বাংলাদেশ বললে ভুল হবে। সে সময়ের পুরো বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একদম প্রথম দিককার (১৭৬০-৭০) কার্যক্রম নিয়ে লিখছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, এ সময়টায় পুরো বাংলায় নির্মমভাবে লুটতরাজ করেছে ব্রিটিশরা। ঐতিহাসিক তথ্য সংযোজনের কারণে আমার বইয়ের একটা বড় অংশজুড়েই থাকছে দিল্লি আর বাংলা। বলতে পারেন, বইটার অর্ধেকটা থাকবে দিল্লি আর অর্ধেকটায় বাংলা।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সম্পর্কে আমাদের এখানে কেমন তথ্য পেতে পারেন বলে মনে হয় আপনার?

দুঃখজনকভাবে সে সময়কার বাংলার নথিপত্রের বেশির ভাগ হয় পাওয়া যাবে লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি অথবা ন্যাশনাল আর্কাইভস অব ইন্ডিয়ায়। কিছু রেকর্ড আর কলকাতার হাইকোর্টেও পাওয়া যায়। ঢাকার সম্ভবত খুব কমই নিজস্ব সংগ্রহ আছে। থাকার কথাও না। কেননা সে সময়ে সারা ভারতবর্ষের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সম্পর্কিত বেশির ভাগ নথিপত্র পাঠিয়ে দেয়া হতো ইংরেজদের মূল শাসনকেন্দ্র কলকাতায়। সেখান থেকে লন্ডনে।

বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভসে কি গিয়েছিলেন?

না, এ যাত্রায় যাইনি। সত্যি বলতে কি, লন্ডন আর দিল্লির দুই আর্কাইভস থেকে এত্ত এত্ত তথ্য পাওয়া গিয়েছে যে সেগুলো থেকে বাছাই করতেই আমাকে বেশ বেগ পেতে হবে। এরপর বাংলাদেশে এসে খোঁজখবর করাটা আমার জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে যাবে।

আপনার নতুন বই “কোহিনূর: দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট ইনফেমাস ডায়মন্ড” (২০১৭) নিয়ে কিছু বলুন।

ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে এ পর্যন্ত যত সব গল্প পেয়েছি, তার মধ্যে কোহিনূরের গল্প মনে হয় সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এ হীরাটি পাওয়ার জন্য এটির মালিকেরা যেসব কার্যকলাপ করেছে, তা সত্যিই ‘লর্ড অব দ্য রিং’-এর কথাই মনে করিয়ে দেয়। মোগলদের প্রিয় রত্ন কোহিনূর পারস্যরাজ নাদির শাহরে মাধ্যমে চলে যায় ইরান, সেখান থেকে আফগানিস্তানের দুরানি শাসকদের কাছে। তাদের কাছ থেকে আবার ভারতের শিখ মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের কাছে। দ্বিতীয় অ্যাংলো-শিখ যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ১৮৪৯ সালে এটি চলে আসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। পরে নিজেদের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে (১৮৫০ সাল) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্যের রানী ভিক্টোরিয়াকে উপহার দেয় কোহিনূর।