ইতালির বলোনিয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ের বেত্তিসিয়া
গোত্জাদিনি (১২০৯-১২৬১)
সম্ভবত ইউরোপের
প্রথম নারী
গ্র্যাজুয়েট, যিনি
সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে
আইনের শিক্ষকও
ছিলেন। তিনি
যথেষ্ট সুন্দরী
ছিলেন। তার
ছাত্ররা তার
দিকে তাকিয়ে
অন্যমনস্ক হয়ে
পড়ত বলে
তিনি এক
ধরনের হিজাব
ব্যবহার করতেন।
তাকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রথম নারী
শিক্ষকের মর্যাদা
দেয়া হয়।
নেপলস বিশ্ববিদ্যালয়ে
কনস্ট্যান্স ক্যালেদনা
১৪১৫ সালে
মেডিকেল ডিগ্রি
অর্জনকারী প্রথম
নারী। ষোড়শ
শতাব্দীতে ইসাবেলা
ইয়োসা স্পেনের
একটি বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে প্রথম
নারী হিসেবে
ধর্মতত্ত্বে ডক্টরেট
ডিগ্রিধারী হন।
১৬৭৮ সালে
এলেনা পিস্কোপিয়া
পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে দর্শনে
ডক্টরেট লাভ
করেন। ১৭৩২
সালে ইতালীয়
নারী লরা
বাসি বলোনিয়া
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
ডক্টরেট ডিগ্রি
নিয়ে এখানেই
পদার্থবিজ্ঞানে শিক্ষাকতা
করেন, তিনিই
কোনো বিজ্ঞান
একাডেমির প্রথম
নারী সদস্য।
১৮১৮ সালে
ইউরোপীয় মিশনারিরা
ভারতে প্রথম
কেবল নারীদের
জন্য স্কুল
স্থাপন করেন।
১৮৩৯ সালে
নারীদের উচ্চতর
ডিগ্রি প্রদানের
জন্য যুক্তরাজ্যে
বেডফোর্ড কলেজ
প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৮৭০ সালে
যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল
ও ক্যালিফোর্নিয়া
বিশ্ববিদ্যালয় নারীদের
ভর্তির নিষেধাজ্ঞা
প্রত্যাহার করে
নেয়। ১৮৭১
সালে ভারতে
প্রথম নারী
শিক্ষক প্রশিক্ষণ
কলেজ স্থাপিত
হয়। যুক্তরাষ্ট্রের
প্রথম নারী
ডক্টরেট হেলেন
হোয়াইট বস্টন
বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রিক
ভাষা ও
সাহিত্যে। ১৮৭৯
সালে কলকাতায়
স্থাপিত বেথুন
কলেজের প্রথম
গ্র্যাজুয়েট ১৮৮৩
সালে। ১৯০৪
সালে প্রথম
অন্ধ নারী
হেলেন কেলার
র্যাডক্লিফ কলেজ
থেকে গ্র্যাজুয়েট
হন।
১৮৮২ সালে
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে প্রথমবারের
মতো দুজন
নারী গ্র্যাজুয়েট
হন—চন্দ্রমুখী
বসু ও
কাদম্বিনী গাঙ্গুলি।
চন্দ্রমুখী বসু
ব্রিটিশ ভারতের
প্রথম এমএ
ডিগ্রি নেন
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে ১৮৮৪
সালে। তিনি
বেথুন কলেজে
শিক্ষকতা শুরু
করেন, প্রিন্সিপাল
হলেন। বাস্তবিকই
তিনি দক্ষিণ
এশিয়ায় কোনো
আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কলেজের
প্রথম নারীপ্রধান।
ব্রিটেন বহু
বিষয়ে পৃথিবীর
যেকোনো দেশের
চেয়ে এগিয়ে
থাকলেও নারী
শিক্ষায় এবং
উচ্চতর শিক্ষায়
ইউরোপীয় অনেক
দেশের চেয়ে
পিছিয়ে ছিল।
১৮৬৯ সালের
মে মাসে
নয়জন ছাত্রী
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে গ্র্যাজুয়েট
হওয়ার পরীক্ষায়
বসেন। তাদের
একজন লুই
ক্রিগটন লেখক
ও ঐতিহাসিক;
তিনি ১৮৮০
দশকে ন্যাশনাল
ইউনিয়ন অব
ওমেন ওয়ার্কসের
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত
হন। অন্য
একজন সিরাহ
পার্কার রেমন্ড
মানবাধিকার প্রবক্তা।
আরেকজন হেলেনা
নরমানটন ব্রিটেনের
প্রথম ব্যারিস্টার।
ম্যাভিস ব্যাটি
হলেন ক্রিপ্টোগ্রাফার।
তিনি দ্বিতীয়
মহাযুদ্ধের সময়
জার্মান কোড
ল্যাঙ্গুয়েজ ডিকোড
করে মিত্র
শক্তিকে সহায়তা
করেন। অন্য
পাঁচজনের তেমন
কোনো বিশেষ
প্রতিষ্ঠা হয়নি।
অবশ্য এ
পাঁচজনের মধ্যে
পরীক্ষায় পাস
করে গ্র্যাজুয়েট
হতে পারেননি
তিনজন।
শুরু থেকেই
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
নামের সঙ্গে
‘প্রাচ্যের
অক্সফোর্ড’ যোগ
করার একটা
প্রবণতা ছিল।
অক্সফোর্ড ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮২৫
বছর আগে
প্রতিষ্ঠিত হলেও
নারী শিক্ষার
স্বীকৃতির প্রশ্নে
ঢাকার চেয়ে
বেশি এগিয়ে
নেই। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম
ছাত্রী লীলাবতী
নাগ ১৯২৩
সালে ইংরেজিতে
এমএ ডিগ্রিধারী
হন। আর
অক্সফোর্ডের ছাত্রী
অ্যানি রজার্সের
বিএ ও
এমএ ডিগ্রি
আনুষ্ঠানিকভাবে অক্সফোর্ড
বিশ্ববিদ্যালয় স্বীকার
করে নেয়
১৯২০ সালের
অক্টোবরে। যদিও
তিনি পরীক্ষায়
পাস করেছিলেন
আরো ৪০
বছর আগে
১৮৭৭ সালে।
অক্সফোর্ড যে
ম্যান্ডেট নিয়ে
যাত্রা করেছিল
তাতে নারীকে
অন্তর্ভুক্ত করার
সুযোগ ছিল
না।
১৯২০ সালের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আইনের (১৯২০
সালের ২৭
নম্বর আইন)
একটি ভালো
দিক হচ্ছে
এ বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থী হতে,
শিক্ষক হতে,
এখানে চাকরি
পেতে পুরুষ
না নারী,
হিন্দু না
মুসলমান না
অন্য কোনো
ধর্মের, আশরাফ
না আতরাফ,
ব্রাহ্মণ না
নমঃশূদ্র, শ্বেতাঙ্গ
না কৃষ্ণাঙ্গ—এসব
মোটেও বিবেচ্য
নয়। কিন্তু
বাস্তবতা ভিন্ন,
সাত শতাধিক
ছাত্রের মধ্যে
একজন বা
দুজন নারী
ভর্তি করতে
বিশ্ববিদ্যালয় আগ্রহী
হয়নি। প্রাচ্যের
অক্সফোর্ড হয়ে
পাশ্চাত্যের অক্সফোর্ডকেই
অনুসরণ করতে
হতো, যদি
না পাশ্চাত্য
দেশীয় ফিলিপ
হার্টগ ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম
ভাইস চ্যান্সেলর
হতেন।
লীলাবতী নাগের
কথা লিখতে
গিয়ে ইতালির
বেত্তিসিয়া গোত্জাদিনি
থেকে শুরু
করে চন্দ্রমুখী
বসু হয়ে
অ্যানি রজার্স
পর্যন্ত বেশ
কজন নারী
গ্র্যাজুয়েটের নাম
লিখেছি এবং
তাদের অনেকের
সম্পর্কেই কমবেশি
পাতা উল্টে
দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রথম ছাত্রী,
প্রথম নারী
গ্র্যাজুয়েট, প্রথম
নারী এমএ
কিংবা প্রথম
নারী পিএইচডি
হওয়ার গৌরব
তাদের কাউকেই
নিশ্চিত নিরাপদ
ও আরামদায়ক
জীবন থেকে
সরিয়ে আনেনি,
বরং অনেককেই
সে জীবনের
দিকে ধাবিত
করেছে আর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রথম ছাত্রী,
প্রথম নারী
এমএ লীলাকে
নিয়ে গেছে
আত্মত্যাগের জীবনে,
আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে,
নির্যাতিত কারাজীবনে।
ব্রিটিশ ভারতের
প্রথম নারী
গ্র্যাজুয়েট ও
এমএ চন্দ্রমুখী
বসুকে নারীর
প্রশ্নে নিষেধাজ্ঞা
থাকার কারণে
বিশেষ অনুমতি
নিয়ে এমএ
পরীক্ষা দিতে
হয়। তিনি
বেথুন কলেজে
শিক্ষকতার এক
পর্ব শেষ
করে দেরাদুনে
চলে যান
এবং বাংলায়
আর ফেরেননি।
লীলাবতী নাগের
জীবন যারা
পর্যালোচনা করেছেন,
এটা সবার
কাছেই প্রতীয়মান
হয়েছে যে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রথম ছাত্রী
হলেও, প্রথম
নারী এমএ
হলেও সাধারণত
শিক্ষার্থীদের যে
জীবনবোধ এবং
উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকে
তার কোনোটাই
তার ছিল
না। তিনি
ছিলেন ভিন্ন
ধারার আত্মত্যাগী
নারী। লুই
ক্যারলের ‘এলিস’
ছিল অক্সফোর্ডের
প্রথম নারী
গ্র্যাজুয়েট ও
এমএ অ্যানি
রজার্সের জীবনের
শৈশব আদর্শ,
এটা এক
ধরনের স্বপ্ন
ও উদ্ভাবনের
জীবন, তিনি
বেছে নেন
শিক্ষকতার জীবন।
প্রথমে অক্সফোর্ড
হাই স্কুলে
এবং পরে
অক্সফোর্ডের সেন্ট
অ্যান্ড কলেজে
শিক্ষকতা করে
জীবন পার
করেন।
কিন্তু লীলার
জীবন চন্দ্রমুখী
বসুর স্বাচ্ছন্দ্যের
জীবনে নয়
আবার অ্যানি
রজার্সের স্বপ্নের
জীবনও নয়।
তিনি জানতেন
বিশ্ববিদ্যালয়, ডিগ্রি
এগুলো হচ্ছে
উপলক্ষ। তার
জীবনটা সংগ্রামের,
নিবেদনের, উজ্জীবনের
ও জনকল্যাণের।
১৯১৭ সালের
২ অক্টোবর
ঠিক ১৭
বছর বয়সী
লীলাবতী বাবাকে
লিখছেন: ‘আমার
ক্ষুদ্র শক্তি
যদি একটু
লোকের উপকার
করতে পারত,
তবে আমি
নিজেকে ধন্য
মনে করতাম।
সত্যি বলছি
এ আমার
বক্তৃতা নয়,
এটা আমার
প্রাণের কথা।
এই আমার
Ideal—আশীর্বাদ
করো যদি
এ জন্মে
কিছু করতে
না পারি
আবার যেন
আমার প্রিয়
ভারতবর্ষেই জন্মগ্রহণ
করি। একে
সেবা করে
এ জন্মের
আশা মেটাতে।’
১৯০৮-এর
১১ আগস্ট
ভারতবর্ষের স্বাধীনতার
অমর শহীদ
ক্ষুদিরাম বসুর
যখন ফাঁসি
হলো লীলার
বয়স তখন
আট বছর।
তিনি চিঠির
এই ভাষা
পেলেন কোথায়?
সারা বাংলাজুড়ে
গীত সেই
গানে—
একবার বিদায়
দে মা
ঘুরে আসি/হাসি
হাসি পরব
ফাঁসি দেখবে
ভারতবাসী। পুনর্জন্মের
কথা পীতাম্বর
দাসের সেই
গানের শেষের
অনুচ্ছেদে:
দশ মাস
দশ দিন
পরে
জন্ম নেব
মাসির ঘরে
মাগো
তখন যদি
না চিনিস
মা
দেখিস গলায়
ফাঁসি।
লীলা যে
বাবাকে চিঠিতে
এসব কথা
লিখলেন তিনিও
তেমনি একজন
দুর্বিনীত মানুষ,
যিনি মুন্সীগঞ্জে
ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন
চাকরির ঝুঁকি
নিয়ে শ্বেতাঙ্গ
সাহেবকে সাজা
দিয়েছেন। তিনি
ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট
গিরীশচন্দ্র নাগ।
লীলা যখন
বেথুন কলেজের
ছাত্রী, তিনি
প্রতিবাদ করলেন,
নতজানু হয়ে
বড়লাটের পত্নীকে
শ্রদ্ধা জানাবেন
না। তিনি
এ প্রথার
পরিবর্তন চাইলেন।
পরিণত বয়সে
১৯৬৪ সালে
লীলা বললেন,
‘চির
বিপ্লবীর জীবন
চাই, মানুষকে
ভালোবাসি, চিরদিন
বেসেছি, আমার
সকল কাজের
উৎসাহ তাই,
কিন্তু ভালোবাসা
আমার বন্ধন
নয়, প্রেরণা
ও আনন্দ।’
লীলাবতী নাগের
জন্ম ২
অক্টোবর ১৯০০,
সেকালের আসামের
গোলাপাড়ায় (বর্তমানে
বাংলাদেশের মৌলভীবাজার
জেলা)।
বদলি সূত্রে
আসাম সিভিল
সার্ভিসের গিরীশচন্দ্র
নাগ ঢাকায়
এলেন, ঢাকায়
ঠিকানা বকশিবাজারে।
১৯০৭-১১
পর্যন্ত লীলা
পড়লেন ব্রাহ্ম
স্কুলে, ১৯১২-১৭
পর্যন্ত ঢাকায়
ইডেন গার্লস
স্কুলে। ১৯১৭-তে
ম্যাট্রিকুলেট হলেন।
১৯২১ পর্যন্ত
কলকাতার বিখ্যাত
বেথুন কলেজে;
ইংরজিতে অনার্স
নিয়ে মেয়েদের
মধ্যে প্রথম
হয়ে বৃত্তি
ও পদ্মাবতী
স্বর্ণপদক নিয়ে
সাফল্যের সঙ্গে
বেরিয়ে এলেন।
ততদিনে প্রতিবাদী
লীলার এক
সঙ্গোপন বৈপ্লবিক
জীবন শুরু
হয়ে গেছে।
সদ্য স্থাপিত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
ইংরেজিতে এমএ
করতে এলেন।
সেকালে যারা
নিজেদের প্রগতিশীল
বলে দাবি
করতেন, নিজের
নারী-স্বজনদের
উচ্চশিক্ষা দূরে
থাক সাধারণ
শিক্ষার প্রশ্নেও
তারা রক্ষণশীল
আচরণ করতেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
ভর্তি হতে
লীলা নাগ
সরাসরি সাক্ষাৎ
করেছিলেন উপাচার্য
ফিলিপ হার্টগের
সঙ্গে। ভাইস
চ্যান্সেলর ফিলিপ
হার্টগ লীলার
প্রত্যয়ে মুগ্ধ
হয়ে বিশেষ
অনুমতি প্রদান
করে তাকে
ইংরেজি স্নাতকোত্তর
প্রথম বর্ষে
ভর্তি করে
নেন। সিরাজুল
ইসলাম চৌধুরীর
লেখায় পেয়েছি
সেই নারী
বিরানকালে লীলাকে
সঙ্গ দিতে
ভাইস চ্যান্সেলরের
স্ত্রী তার
পাশে গিয়ে
বসতেন। সাহিত্যিক
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
লিখেছিলেন, ‘তিনিই
ছাত্রীরূপে নবীন
কালের দূতের
মতো আবির্ভূত
হয়ে মেয়েদের
জন্য সেখানে
শিক্ষার দ্বার
উন্মুক্ত করে
দেন।’
লীলা নাগ
সে সময়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ঢাকা হলে
সংযুক্ত ছিলেন।
হলে ভর্তির
রেজিস্ট্রারে লেখা
ছিল—Leelabati Nag, Admission
serial No-25, English Department, Address: Vill-Panch gram, Rajnagar, Sylhet,
Age-20 years; Father’s Address, Bakshibazar, Dacca. (সূত্র:
লীলা
নাগ,
দীপংকর মোহান্ত)
সে সময়
আইন বিভাগের
ডিন এবং
জগন্নাথ হলের
প্রভোস্ট নরেশ
সেনগুপ্তের কন্যা
সুষমা সেনগুপ্ত
অনার্স শ্রেণীতে
ভর্তি হন।
লীলা ১৯২৩
সালে দ্বিতীয়
শ্রেণীতে এমএ
ডিগ্রি নেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
তার শিক্ষক
অধ্যাপক পিকে
গুহ তার
সম্পর্কে লিখেছেন:
‘কল্যাণীয়া
শ্রীমতী লীলা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
ইংরেজি বিভাগে
আমার স্নাতকোত্তর
ছাত্রী ছিলেন...
শ্রীমতী লীলার
আচার-ব্যবহারে
এমন একটি
শালীনতা ছিল
যে, প্রথম
হতেই তিনি
সকলের শ্রদ্ধা
অর্জন করেন।
ক্লাসে তিনি
একটি মাত্র
মেয়ে। অধ্যাপকেরা
বিস্ময় ও
আনন্দে লক্ষ
করতেন যে
মেয়েটি একাগ্র
মনে ও
নিবিষ্ট চিত্তে
শিক্ষকদের প্রত্যেকটি
কথা বুঝতে
চেষ্টা করতেন
এবং নত
মস্তকে তার
সবটাই লিপিবদ্ধ
করেন।... আমি
Shakespeare-এর
Sonnets
সম্বন্ধে কিছু
পড়াশোনা করে
ঐ বিষয়ে
ক্লাসে কয়েক
দিন আলোচনা
করেছিলাম। কী
বলেছিলাম তার
অনেকটা ভুলে
গিয়েছিলাম। পরে
শ্রীমতী লীলার
নোট বইয়ের
সাহায্যে সব
লিখে রাখি।
শ্রীমতী লীলা
খুব দ্রুত
লিখতে পারতেন।
এমন পরীক্ষার
এক প্রশ্নপত্রে
সাতটি প্রশ্নের
মধ্যে পাঁচটির
উত্তর চাওয়া
হয়েছিল। শ্রীমতী
ঐ নির্দেশনাটি
লক্ষ না
করে সাতটি
প্রশ্নেরই উত্তর
লিখে ফেলেন।
আমি সেই
বিষয়টির পরীক্ষক
ছিলাম। দেখলাম
যে সব
উত্তরই সন্তোষজনক
হয়েছে এবং
একটিও রচনায়
অশুদ্ধি নেই।’
তিনি আরো
লেখেন, ‘অসাধারণ
ব্যক্তিগত আকর্ষণী
শক্তি, সংগঠক
প্রতিভা, দেশের
সর্ববিধ কল্যাণ
প্রচেষ্টার অদম্য
আগ্রহ ও
উৎসাহ তার
জীবনকে এ
অপূর্ব জ্যোতিতে
বিভূষিত করেছে।’
(অজয় রায়ের
প্রবন্ধ থেকে)
তারপর শুরু
হয় প্রতিষ্ঠান
গড়ার জীবন।
শিক্ষা ছাড়া
নারীমুক্তি অলীক
স্বপ্নই থেকে
যাবে, সুতরাং
তাদের জন্য
স্কুল-কলেজ
খুলতে হবে,
সামাজিক সাংস্কৃতিক
সংঘ তৈরি
করতে হবে।
তাদের সচেতন
করতে, তাদের
অধিকার জানাতে
এবং তাদের
কল্যাণ নিশ্চিত
করতে পত্রিকা
বের করতে
হবে।
ততদিনে তিনি
দীপালি সংঘ
প্রতিষ্ঠা করেছেন।
৮ ফেব্রুয়ারি
১৯২৬ রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর ঢাকায়
এসে দীপালি
সংঘ পরিদর্শন
করলেন এবং
অভিভূত হয়ে
লিখলেন: ‘এশিয়ায়
এত বড়
মহিলা সমাবেশ
আর কোথাও
দেখি নাই।’
দীপালি সংঘের
সূচনাকালের ১২
নারী সদস্য:
মিসেস আর
সি রায়,
মিসেস অমল
বসু, মিসেস
এম চৌধুরী,
মিসেস ফুল্গু
গুপ্ত, মিস
লীনা নাগ,
মিস বিনা
দত্ত, মিসেস
লতিকা রায়,
মিসেস লীলা
রায়, মিসেস
এস দাশগুপ্ত,
মিসেস মনোরমা
বসু, মিসেস
কমলা বসু,
মিসেস বীনা
দত্তা।
১৯৩১ সালে
প্রকাশ করলেন
জয়শ্রী, ‘নববর্ষে
(১৩৩৮ বঙ্গাব্দ)
এই নতুন
প্রচেষ্টার আরম্ভ
করিলাম। বাংলার
মহিলাদের মুখপাত্র
স্বরূপ কোনো
পত্রিকা এ
পর্যন্ত ছিল
না। এই
অভাব দূর
করিবার প্রয়াসে
জয়শ্রী প্রকাশিত
হইল।’
১৯৩১ সালের
২৮ অক্টোবর
জয়শ্রী
অফিসে
পুলিশ হানা
দিল, সম্পাদককে
শাসাল, ১৯৩৫-এ
নিষিদ্ধ করে
দিল। লীলা
নাগ দীর্ঘ
সময়ের জন্য
কারাবন্দি হয়ে
রইলেন। বিনা
বিচারে দীর্ঘকাল
কারাবন্দি থাকার
রেকর্ড তখন
পর্যন্ত তারই।
তিনি ঢাকা,
রাজশাহী, মেদিনীপুর,
সিউড়ি ও
হিজলি জেলে
আটক থাকেন।
জেলা প্রশাসনের
বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
করেন, অনশন
করেন। সে
সময় যারা
তার সান্নিধ্যে
এসেছেন প্রত্যেকের
জীবনেই তার
বিশাল প্রভাব
পড়েছে। কারাবন্দি
হওয়ার আগে
মাস্টারদা সূর্য
সেনের নেতৃত্বে
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার
লুণ্ঠন মামলা
চালিয়ে নেয়ার
জন্য তিনি
বড় অংকের
টাকা পাঠিয়েছেন।
জেল থেকে
বেরিয়ে ১৯৩৯
সালে একদা
ক্লাসমেট এবং
বিপ্লবী দিনের
সঙ্গী অনিল
রায়কে বিয়ে
করেন। অনিল
রায়ের বিপ্লবী
জীবন পৃথক
প্রবন্ধের দাবি
করেন। এখানে
কেবল লেখা
কয়েকটি বইয়ের
নাম উল্লেখ
করছি: জাগ্রত
পারস্য, সমাজতন্ত্রীর
দৃষ্টিতে মার্ক্সবাদ,
নেতাজির জীবনবাদ,
হেগেলীয় দর্শন,
ধর্ম ও
বিজ্ঞান, নেতাজির
ডাক, বিবাহ
ও পরিবারের
ক্রমবিকাশ। ইংরেজিতে
লেখা তার
দুটি গ্রন্থ—পার্টি
অ্যান্ড লিডারশিপ,
হোয়াট নেতাজি
স্ট্যান্ডস ফর।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন
তেমনি বিপ্লবী
দলে যোগ
দিতেও নারীর
বাধা ছিল,
মনে করা
হতো পুরুষের
বিপ্লবী সাধনা
ও ধ্যান
নারীর কারণে
বিঘ্নিত হবে।
লীলা ও
অনিল রায়
প্রমাণ করলেন
পাশাপাশি নারী
ও পুরুষের
বিপ্লব চালিয়ে
যাওয়া সম্ভব।
লীলা নাগ
বিয়ের পর
লীলা রায়
হলেন। তাদের
বিপ্লবী ও
রাজনৈতিক জীবন
অবশ্যই ভিন্ন
ও সম্পূর্ণ
নিবন্ধের দাবিদার।
তেমনি দাবিদার
লীলার প্রতিষ্ঠান
গড়ার জীবন।
দীর্ঘদিন অজ্ঞান
অবস্থায় থেকে
লীলা রায়ের
জীবনাবসান ঘটে
১১ জুন
১৯৭০।
[এ নিবন্ধে
ব্যবহূত উদ্ধৃতিগুলো
লীলা নাগ
স্মারকগ্রন্থ থেকে
নেয়া হয়েছে]
এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা





