জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আজ অতীতের দিকে চোখ ফিরালে নানা স্মৃতি এসে ভিড় জমায়। ৮৬ ছোঁয়া বয়সে দেখতে পাই রাস্তায় মহিলাদের স্লোগানমুখর মিছিল, স্বদেশপ্রেমের কোনো কৃত্রিমতা ছিল না কারো কাজকর্মে ও চিন্তাভাবনায়, পরনের কাপড়ও দেশী বস্ত্রালয়ের। স্বদেশকে উপলব্ধি করেছি জন্মদাত্রী মায়ের মতো। আশালতা সেন, সরলা বালা দেব, লীলা নাগ, লাবণ্যলতা চন্দ, জোবেদা খাতুন প্রমুখ ব্যক্তিত্বের আদর্শবাদী কর্ম আমাকে করেছিল ঘরছাড়া। আন্দোলনে জুুগিয়েছিল শক্তি। সেকালের কেউ আজ আর ইহজগতে নেই, রয়ে গেছে অবিনাশী সব কীর্তি; কিন্তু দুঃখ লাগে যখন দেখি তারা উপেক্ষিত সমাজের নানা স্তরে ও কাজে। আমাদের ‘লীলাদির’ জন্মশতবর্ষ বড় নীরবেই চলে যাচ্ছে। তিনি সেকালে জাতীয় রাজনীতিতে বিরাট ভূমিকা পালন করেছিলেন। সে অনুপাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে সম্মান জানানো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। কিন্তু যখন দেখি দেশের বিদগ্ধজনেরা সে দায়িত্ব পালন করছেন, তখন মনে ভরসাই জাগে। আমরা একদিন এ বিপ্লবী নেত্রীর কাছ থেকে দেশপ্রেম শিখেছিলাম বলে এখনো নানাভাবে তাকে মনে পড়ে। তখন ১৯৩৯ সাল। নতুন করে (ব্রিটিশবিরোধী) আন্দোলনের পরিবেশ সৃষ্টি নিয়ে নেতা-নেত্রীদের ঘুম নেই। নানা কৌশলে কাজ চলছে। চলমান আন্দোলনে অধিক হারে নারীর অন্তর্ভুক্তি বা অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য নারী নেত্রীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নিয়ে ‘শ্রীহট্ট মহিলা সংঘ’ ২৪-২৭ ফেব্রুয়ারি চার দিনব্যাপী সুরমা উপত্যকায় মহিলা সম্মেলন করেছিল বিপুল আয়োজনে। লীলা নাগ ছিলেন সে সম্মেলনের সভানেত্রী। সে সম্মেলনে তাকে প্রথম দেখার সুযোগ হয়। লম্বা, উজ্জ্বল, গোলগাল চেহারার মধ্যে বুদ্ধিদীপ্ত চক্ষু দুটি চশমায় ঢাকা। এক নজর দেখলে কেউ চোখ ফেরাতে পারবে না। তিনি যে তেজী স্বভাবের মহিলা তা দেখেই বুঝেছিলাম। সভানেত্রীর ভাষণটি ছিল সুদীর্ঘ ও জ্বালাময়ী। তা শুনে কোনো নারীর পক্ষে ঘরে থাকা সম্ভব বলে মনে হয়নি। এটা শুধু ভাষণ নয়, যেন সাহিত্য রসে মিশ্রিত কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর বক্তৃতা, সমাজের চুলচেরা বিশ্লেষণ। সেখানে নারীদের অবস্থান ও করণীয় রয়েছে। আমাকে তা গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এ যাত্রায় কোনো কথা হয়নি। সম্মেলনের পর বারবার তাকে কল্পনায় দেখেছি, মনের অলিন্দে বাজতে থাকে সেই কথা, ‘আমাদের সর্বপ্রথম কর্তব্য—মেয়েদের সংঘবদ্ধ হওয়া। সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন এই জন্য যে বিচ্ছিন্নভাবে মেয়েরা নিজেদের এবং জাতির জন্য যা করেছেন বা করবেন, তাতে উদ্দেশ্যসিদ্ধি কিছুতেই হবে না। কাজেই জাতির কল্যাণ যাদের কাম্য তাদের উচিত অবিলম্বে সংঘবদ্ধ হওয়া। এ সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আজ সবারই মুখে শোনা যায়, কিন্তু খুব মুষ্টিমেয় লোকই এ মর্ম গ্রহণ করে থাকেন বলে আমার বিশ্বাস।’ পরে


সরলাদি (সরলা বালা দেব) ও জোবেদাদির (জোবেদা খাতুন) মুখ থেকে তার বিশাল কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জেনেছি। বাইরে কংগ্রেসের ভেতর বা নারী জাগরণের মধ্যে কাজ করলেও আসলে তিনি ছিলেন বিপ্লবী সংগঠন ‘শ্রীসংঘের’ নেত্রী। তারা সিলেটে ওয়েলফেয়ার সোসাইটির মাধ্যমে বিপ্লববাদী কাজ করতেন। সে সময় তিনি ছিলেন একনিষ্ঠভাবে সুভাষপন্থী। সিলেটে তখন বিপ্লবী ও সুভাষপন্থী বহু মেয়ে সক্রিয় ছিলেন।

১৯৪০ সালের দিকে লীলা নাগ পুনরায় সিলেটে এসে মহিলা সংঘে সারা দিন কাটিয়েছিলেন। সরলা বালা দেব ছিলেন তার আত্মীয় এবং তার সঙ্গে সেখানে গিয়ে সাক্ষাৎ করেছিলাম। সাধারণ সিলেটি ভাষায় অতি আপনজনের মতো বলেছিলেন, ‘কেমন লাগে কাজকাম।’ এর পরদিন ছিল স্থানীয় রসময় স্কুলে এক সভা। লীলা নাগ শেখ ঘাটে অবস্থিত ‘শ্রীহট্ট মহিলা সংঘের’ অফিস থেকে হেঁটে সেই স্কুলে যাওয়ার পথে সকালে আমার জামতলার বাসায় ওঠেন এবং জলযোগ করেন। আমার সম্পর্কে সব জেনে বলেছিলেন—‘গান্ধীর শিষ্যনি...।’ বিনীত চিত্তে উত্তর দিয়েছিলাম—‘প্রথম গান্ধীর চরকা নিয়ে নামি। হরিজন পত্রিকা পড়ি । তাই ঝুঁকে পড়েছি।’ আমি সুতা কেটে খদ্দরের কাপড় পরিধান করায় তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, সেকালের বিপ্লবী দলের তরুণীরা রসময় স্কুলের মাঠে লাঠি-ছোরা খেলা শিখতেন। আমি কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এসবে না গেলেও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি।

লীলা নাগ সবসময় নিজের পল্লীর খোঁজখবর নিয়েছেন, যা অন্যদের মধ্যে বিরল। যখন পাঁচগাঁয়ে এসেছেন তখনই ‘মহিলা সংঘে’ গিয়েছেন। ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের সময় তিনি ও অরুণা আসফ আলী গোপনে সিলেট এসে তিনদিন মহিলা সংঘে ছিলেন। ভারত ছাড় আন্দোলনে আমাদের করণীয় সম্পর্কে সব নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাদের আলোচনায় মনে হয়েছিল সারা ভারত তারা পরিভ্রমণ করেছেন এবং এবার একটা ফল হবে। লীলা নাগ আমাদের অশেষ সাহস জুগিয়েছিলেন। ফলে সিলেটে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন এক অগ্নিরূপ ধরেছিল। তাতে মহিলাদের ভূমিকা উল্লেখ করার মতো। আমাদের এক কর্মী তো জেলা জজের চেয়ার দখল করে বসেছিলেন। আমরাও সে আন্দোলনে কারাবাসের স্বাদ পেয়েছিলাম।

১৯৪৬ সালে নোয়াখালীর ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর মুহূর্তে লীলা নাগ সেখানে ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট’ নামে সেবাপ্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন। যেখানে পুরুষরা যেতে ভয় করত, সেখানে ছিল তার অবাধ যাত্রা। আমি দাঙ্গার অনেক পরে কংগ্রেসের কর্মী হিসেবে সেবাকাজে গিয়েছিলাম। আমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছার সময় লীলা নাগের ক্যাম্পে বিশ্রাম


নিয়েছিলাম। তখন তিনি পল্লী পুনর্গঠনকাজে দূরের কোনো এক গ্রামে কর্মরত ছিলেন। আজ হয়তো ভাবা যাবে না যে তখন পোড়ামাটিতে কী করা হয়েছিল কিংবা নির্যাতিত মহিলাদের কী করে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। সেই কঠিন সময়ে একদিন জগজীবন রাম ফরিদগঞ্জে এসেছিলেন। আমি রামগঞ্জ থেকে সভায় গিয়েছিলাম, তখন সেখানে লীলা নাগ উপস্থিত ছিলেন। নোয়াখালীতে যারা এসেছিলেন সবাই তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি আমার কাজকর্মের খোঁজ নিয়েছিলেন। সেদিন তার চোখে-মুখে দেখেছিলাম ক্লান্তির ছাপ। তিনি যেমন উৎসাহ দিয়েছেন, তেমনি নিজেও কাজ করেছেন। শুনেছি ১৯৪৭ সালে তিনি সাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশভাগের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠে কথা বলেছিলেন।

ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তানি সরকারের রোষানলে পড়ে তাকে প্রিয় মাতৃভূমি ছাড়তে হয়েছিল। এরপর আর দেখা হয়নি। তবে ঢাকায় তার প্রতিষ্ঠান ‘নারী শিক্ষা মন্দির’-এর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। লাবণ্যলতা চন্দ তখন অসহায় নারীদের সাহায্য করতেন, যা লীলা নাগ পূর্বে সৃষ্টি করে রেখেছিলেন।

আমি জীবনসায়াহ্নে দাঁড়িয়ে পেছনের দিকে তাকালে অনেক কিছুই দেখতে পাচ্ছি। লীলাদির সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখ। সেই বজ্র কণ্ঠ। নারী জাগরণে কিংবা বাংলাদেশের সমাজ উন্নয়নে তার চিন্তাকর্ম নিয়ে কোনো গবেষণা হয়েছে বলে শুনিনি; শুধু আংশিক জীবনীগ্রন্থ ছাড়া (দীপংকর মোহান্ত প্রণীত)। বাংলাদেশ ও বিভিন্ন জায়গায় তার গড়া প্রতিষ্ঠান বেনামে চলছে। তাকে যথার্থভাবে মূল্যায়ন না করলে দেশ ও মাটির উন্নয়ন সার্থক হবে বলে মনে হয় না।

 

লেখাটি (ঈষৎ সংক্ষেপিত) সাহিত্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত লীলা নাগ: শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি শীর্ষক স্মারকগ্রন্থ থেকে সংকলিত