মানব ইতিহাসের ঠিক কোন অধ্যায়ে এসে সমাজ আষ্টেপৃষ্ঠে পুরুষতন্ত্রের কাছে বাঁধা পড়ে গিয়েছিল, সেটি বিস্তর আলোচনার দাবি রাখে, তবে এ কথাও বলতে হবে যে সভ্যতার সময়রেখায় প্রতিটি যুগেই কিছু মানুষ ছিলেন প্রাগ্রসর। এ অগ্রদূতরা প্রথাগত ধ্যান-ধারণার শেকলে বাঁধা পড়েননি, গেয়ে গেছেন শেকল ভাঙার গান। তার ফলেই মুক্তির পথে আরো কিছুদূর হেঁটে যেতে পেরেছেন তাদের অনুজেরা।

এমনই এক প্রাগ্রসর, বাংলার নারীমুক্তির অন্যতম অগ্রদূত বিপ্লবী লীলা নাগ। তিনি আজ সবার কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী হিসেবে। ১৯২১ সালে মেধাবী লীলা যখন বেথুন কলেজে বিএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করে ‘পদ্মাবতী’ স্বর্ণপদক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়তে আসেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। যদিও তত্ত্বগতভাবে যেকোনো লৈঙ্গিক পরিচয়ের ব্যক্তিরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ব্যাপারে কোনো বাধা ছিল না। কারণ Dacca University Act, 1920 (XVII of 1920)-এর ৫ নং ধারায় বলা ছিল—“The university shall be open to all persons of either sex and of whatever race, creed or class.”

তবে বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের ভর্তির বা পড়াশোনার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। সে সময় বেশ ভেবেচিন্তেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন লীলা নাগ। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে ‘মেয়েরা কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না’ এ মর্মে কথা বলতে তিনি দেখা করেন ঢাবির তত্কালীন ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে। লীলার একাগ্রতা ও দৃঢ়তায় কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন উপাচার্য পিজে হার্টগ বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে অগ্রসর হন। সবশেষে বিশেষ অনুমতি নিয়ে সুষমা সেনগুপ্তের সঙ্গে প্রথম দুই নারী শিক্ষার্থীর একজন হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন লীলা নাগ।

লীলার এই একটি দৃঢ় পদক্ষেপে বাংলার নারীমুক্তির ইতিহাসে সূচিত হয় নতুন যাত্রা। এর আগে সুযোগের অভাবে পূর্ব বাংলার রক্ষণশীল সমাজে বেড়ে ওঠা নারীরা উচ্চশিক্ষার ইচ্ছা থাকলেও এক প্রকার বিড়ম্বিত অবস্থায়ই দিন কাটাতেন। লীলার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ১৯২১-৫২ সাল পর্যন্ত মোট ৭১১ জন নারী শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। সঙ্গে বাংলার নারীদের জন্য স্থাপিত হয়েছিল মুক্তির পথে আপসহীন থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

নারীমুক্তির পথে লীলা নাগের যাত্রা এখানেই সমাপ্ত হয়ে যায়নি, যেমন এর শুরুটিও ঘটেছিল এ ঘটনার অনেক আগেই। এখানে লীলা নাগের শৈশব-কৈশোরের বেড়ে ওঠা ও তার পারিবারিক অবস্থার কথা উল্লেখ করতে হয়। এ কথা বলতেই হবে, লীলা নাগের উদারপন্থী ভাবধারা মুক্তভাবে বিস্তৃতি লাভ করতে পেরেছিল আদর্শবান পিতা-মাতার ছত্রচ্ছায়ায় শিক্ষিত, অভিজাত ও সংস্কৃতিমনা একটি পারিবারিক আবহে তার বেড়ে ওঠার কারণেই। তবে ভোগবাদী বিলাসিতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের মাঝে জীবন কাটানোর সুযোগ গ্রহণে সায় দেয়নি লীলার মন। তিনি বেছে নিয়েছেন আজীবন সংগ্রামের পথ। সে সংগ্রাম নারীমুক্তির সংগ্রাম বটে, পরবর্তী সময়ে তা বিস্তৃত হয়েছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মাতৃভূমি রক্ষার লড়াই পর্যন্ত।

১৯০০ সালের ২ অক্টোবর জন্ম হয়েছিল লীলা নাগের। প্রবেশিকা পাস করেন ঢাকার ইডেন স্কুল থেকে। তারপর ভর্তি হন কলকাতার বেথুন কলেজে। সেখানেই মূলত তার আদর্শ ও চিন্তাধারাগুলো একটি মূর্ত রূপ নিতে শুরু করে।

উচ্চশিক্ষিত ও আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারে বড় হয়ে ওঠার ফলে লীলা নাগ যেমনভাবে এগিয়ে যেতে পেরেছিলেন, তার ফলে তিনি বাংলার আপামর নারীদের কথা ভুলে যাননি। এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে শুরুতেই তিনি মনোযোগ দেন বাংলার অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া নারীসমাজের উন্নয়নে। তার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দীপালি সংঘ’, নারীদের সচেতন ও একই সঙ্গে স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্দেশ্যেই যা চালিত হতে থাকে। ১৯২৩ সালে ১২ জন সহযোগী নিয়ে লীলা প্রতিষ্ঠা করেন এ নারী সংঘ।

লীলা সম্পর্কে সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন তার ‘স্মৃতিকথা’ নামক প্রবন্ধ সংকলনে লিখেছিলেন, ‘এঁর মত সমাজ-সেবিকা ও মর্যাদাময়ী নারী আর দেখি নাই। এঁর থিওরি হল, নারীদেরও উপার্জনশীলা হতে হবে, নইলে কখনো তারা পুরুষের কাছে মর্যাদা পাবে না। তাই তিনি মেয়েদের রুমাল, টেবিল ক্লথ প্রভৃতির উপর সুন্দর নক্সা এঁকে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। এইসব বিক্রি করে তিনি মেয়েদের একটা উপার্জনের পন্থা উন্মুক্ত করে দেন।’

এই দীপালি সংঘে শহরের নানা প্রান্ত থেকে এসে একত্রিত হয়ে যোগ দিতে থাকে নারীরা। তারা নারীমুক্তির কথা যেমন ভাবতেন, তেমনই বিদেশী শাসকদের হাত থেকে দেশমাতৃকার মুক্তির কথাও ভাবতে শুরু করেন। বাংলার আরেক অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারও এ সংঘের সদস্য ছিলেন। এখান থেকেই তিনি নিয়েছিলেন বিপ্লবের পাঠ।

দীপালি সংঘ নারীদের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি তাদের কুটির শিল্প বিষয়ে প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যশিক্ষা, পাঠচক্র তৈরি, চিত্তবিনোদন, খেলাধুলা, অভিনয়ের মতো বিষয়ে যুক্ত করেছিল। স্পষ্টভাবেই সংগঠনটি পরিচালনা করা হয়েছিল বাংলার নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে। লীলা রায়ের কথা থেকেই তার ইঙ্গিত মেলে—‘...অল্প ব্যয়ে সেলাই শিখিবার জন্য দর্জি, চিত্রাঙ্কন শিখিবার জন্য শিক্ষক, সঙ্গীত ও বিবিধ বাজনা শিখিবার জন্য ওস্তাদ এবং খেলনা ইত্যাদি প্রস্তুত করা শিখিবার জন্য একজন নিপুণা মহিলাকে রাখা হয়েছে।’

ঢাকায় তখন নারীদের মধ্যে দীপালি সংঘের দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রভাব ছিল। এ সংঘকে নিয়ে নারীরা গানও রচনা করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুকুমার দত্ত বলেছিলেন, ‘ঢাকা শহরে স্বাধীনতা আন্দোলনে ইহা (দীপালি সংঘ) প্রথম আলোর অভ্যুদয়।’

লীলা নাগ বুঝতে পেরেছিলেন শোষণ, অবহেলা ও বঞ্চনার নাগপাশ ছিন্ন করতে নারীদের প্রয়োজন শিক্ষা ও সচেতনতার। ঢাকায় নারীশিক্ষার বিকাশে সমমনা ব্যক্তিদের একত্রিত করে লীলা নাগ প্রতিষ্ঠা করেন দীপালি স্কুল, নিউ হাই স্কুল, নারীশিক্ষা মন্দির, শিক্ষাভবন ও শিক্ষানিকেতন। লীলা নাগের প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলো আজও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। তার দীপালি হাইস্কুলের নাম বদল হয়েই আজ হয়ে উঠেছে কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল। আর নারীশিক্ষা মন্দিরের নাম বদলে আজ হয়েছে শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়। দীপালি স্কুল ছাড়াও ঢাকায় মোট ১২টি অবৈতনিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। ঢাকার বাইরে কলকাতা, সিলেট ও মানিকগঞ্জে তিনি মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

মেয়েদের মধ্যে রাজনীতি, বিজ্ঞান নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে দীপালি সংঘের উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছিল পাঠাগার। নারীদের জন্য আরো তৈরি করেছিলেন ছাত্রীনিবাস, ব্যায়ামাগার, কর্মজীবী নারী হোস্টেল। নানাভাবে সমাজে নিপীড়িত নারীদের সহায়তায় তৈরি করেছিলেন নারী রক্ষা ফান্ড।

লীলা রায়ের অন্যতম একটি কাজ ছিল জয়শ্রী পত্রিকা প্রতিষ্ঠা। তার সম্পাদনায় মূলত নারীরাই সামলাতেন এ পত্রিকা। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিপ্লবের অপূর্ব সম্মেলন আমরা দেখতে পাই লীলা নাগের কর্মময় জীবনে। ১৯২৬ সালের দুটি ঘটনা এখানে উল্লেখ্য। প্রথমটি একটি যুব সম্মেলন অনুষ্ঠান, যেখানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন বিখ্যাত বাঙালি সমাজবিজ্ঞানী বিনয়কুমার সরকার। সেখানে লীলা নাগ পুরুষ প্রধান হিন্দু সমাজে প্রচলিত সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত্র ‘দায়ভার’ প্রথার বিরুদ্ধে ভাষণ দেন। এছাড়া কথা বলেন নারীর ভোটাধিকার ও সর্বক্ষেত্রে সমানাধিকার নিয়েও।

দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো, ওই একই বছরে যখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের আগমন ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ৮ ফেব্রুয়ারি দীপালি সংঘের মেয়েরা কবিগুরুকে আন্তরিক সংবর্ধনা জানায়। সে সময় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘এশিয়ায় এত বড় মহিলা সমাবেশ আর দেখি নাই।’ লীলা নাগের কর্মশক্তির পরিচয় পেয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে শান্তিনিকতনে একটি নির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব নিতেও অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু নারীমুক্তি আর বিপ্লবের পথে এরই মধ্যে যাত্রা করা লীলার পক্ষে সম্ভব হয়নি সে অনুরোধ রক্ষা করা।

তত্কালীন সামাজিক অবস্থায় ইংরেজিতে এমএ পাস করা নারী হিসেবে তার ভবিষ্যৎ ছিল উজ্জ্বল। লোভনীয় পদে চাকরি করে মসৃণ একটা পথ ধরে জীবন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ আর সম্ভাবনা দুটিই তার ছিল। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই মাতৃভূমি রক্ষা ও নারীর জাগরণের স্বপ্নের মতো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেনি লীলা নাগের কাছে। ফলে তিনি বেছে নিলেন বিপ্লব ও সংগ্রামের জীবন। আদর্শের পথে সুযোগ্য সঙ্গী হিসেবে লীলা নাগ জীবনে পেয়েছিলেন বিপ্লবী অনিল চন্দ্র রায়কে। তার হাত ধরেই প্রথম নারী হিসেবে সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠনে যুক্ত হয়েছিলেন লীলা।

সে সময় অনেক বিপ্লবী মুখে নারী স্বাধীনতার বুলি আওড়ে গেলেও সবাই যে মনে ও মননেও নারী স্বাধীনতার চিন্তাকে ধারণ করতে পেরেছিলেন, তেমন নয়। তাই বিপ্লবী সংগঠনগুলোতে নারীদের অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে অনেক পুরুষ বিপ্লবীরই দ্বিমত দেখা দিত। নারীদের অংশগ্রহণ ছিল না শ্রীসংঘের মতো সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠনেও। সে সময় অনিল রায়ের বাকিবতণ্ডায় সব বিরোধিতা ঘুচে যায়, শ্রীসংঘে স্থান করে নেন লীলা নাগ। পরবর্তী সময়ে এই সংগঠনে বেশ জোরালো ভূমিকা পালন করেছিলেন এ নারী।

দেশভাগের সময় দাঙ্গা শুরু হলে নারীরাও যখন নির্যাতন-অত্যাচারের শিকার হতে থাকেন, সে সময় এ নারীদের পাশেও দাঁড়িয়েছেন লীলা নাগ। নারীদের আত্মরক্ষার শিক্ষা দিতে নিয়েছেন নানা কর্মসূচি। নোয়াখালীর দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের সহায়তা দিতে তিনি এগিয়ে গিয়েছেন।

আজীবন মুক্তির পথে লড়াই করে যাওয়া এ মহীয়সী নারী জীবনে বহুবার পড়েছেন প্রশাসনের রোষানলে। বিনা বিচারে গ্রেফতারও হয়েছেন। সেসবের প্রভাব পড়েছিল তার স্বাস্থ্যের ওপরও। ১৯৭০ সালের ১১ জুন পৃথিবী থেকে বিদায় নেন অগ্নিকন্যা লীলা নাগ। তবে এরই মধ্যে তিনি যেন ঘটিয়েছেন একটি যুগের পরিবর্তন। লীলা নাগরা যে পথ তৈরি করে দিয়ে গেছেন, জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে সেই পথ ধরেই হেঁটে যাচ্ছেন বাংলার নারীরা।

 

দেবযানী মোদক: লেখক