আলুর গল্প শুরু করা যায় দুভাবে—আন্দিজ পর্বতমালা কিংবা ভ্যান গখের জগদ্বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য পটেটো ইটারস’ দিয়ে। আলুর জন্ম আন্দিজে আর পটেটো ইটারসে ভ্যান গখ মানুষের জীবনে আলুর ব্যঞ্জনাকে মূর্ত করে তুলেছেন। সে হিসেবে আলু আন্দিজ থেকে ভ্যান গখের চিত্রকর্মে পৌঁছেছে। ভ্যান গখ ইমপ্রেশনিস্ট ছিলেন, চিন্তায় দ্রোহী। বুর্জোয়া শহুরে জীবনের পরিবর্তে তিনি গ্রাম, কৃষককে তার আঁকার বিষয়বস্তু করে তোলেন। হল্যান্ডে প্রান্তিক মানুষের মতো জীবন কাটানোর সময়ই তিনি ঠাণ্ডা, শক্ত মাটির ওপর বেঁচে থাকা কৃষকের জীবনকে আঁকতে শুরু করেন। সে সময় ভ্যান গখ নিজেকে কৃষকদের জীবনের চিত্রকর বলে বিবেচনা করতেন। তিনি শহুরে চিত্রকর্মের বিকল্প সৃষ্টি করেছিলেন। ভাই থিওকে ভ্যান গখ লিখেছিলেন, ‘দিনের পুরোটা সময় কৃষকদের জীবন পর্যবেক্ষণ করে আমি তাদের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে গিয়েছি যে অন্য কিছু সম্পর্কে চিন্তা করার অবকাশ আর আমার নেই।’ উল্টোভাবে আলুও সর্বোচ্চ শৈল্পিক চেহারা পেয়েছে ভ্যান গখের চিত্রকর্মেই। ১৮৮২-৮৫ সালের মধ্যে ভ্যান গখ ১৮টি চিত্রকর্ম ও ২০টির বেশি ড্রইং করেছিলেন আলুকে প্রাধান্য দিয়ে। ভ্যান গখ ‘দ্য পটেটো ইটারস’ আঁকা শুরু করেছিলেন ১৮৮৫ সালের এপ্রিলে এবং শেষ করেন মে মাসে। অনেকদিন পর্যন্ত ভ্যান গখ এটিকে তার সেরা কাজ বলে বিবেচনা করেন।

‘দ্য পটেটো ইটারস’-এর জন্ম নেদারল্যান্ডসের নুয়েনেনে। নুয়েনেনের কৃষকদের জীবন পর্যবেক্ষণ করেই ভ্যান গখ ‘দ্য পটেটো ইটারস’ এঁকেছিলেন। ছবিতে দেখা যায়, একটি কৃষক পরিবার টেবিলে খেতে বসেছে। তাদের মুখগুলো আকারে বড়, অনাহারক্লিষ্ট, মাটিতে মাখামাখি, যেন মাত্রই মাঠের কাজ থেকে উঠে এলেন। খাবারের পদ হলো আলু আর কফি। ‘দ্য পটেটো ইটারস’ ছিল ভ্যান গখের প্রথম উচ্চাভিলাষী শিল্পকর্ম, যা দিয়ে তিনি নিজের ধারণাকে জানান দিয়েছিলেন। সমাজ ও শিল্প নিয়ে নিজস্ব ধারণাকে তিনি এ চিত্রকর্ম দিয়েই জানান দিয়েছিলেন।

নভোচারীরা যখন মহাকাশ সফরে যান, তখন তাদের খাবারের তালিকার আবশ্যিক একটি নাম আলু। গবেষণা সংস্থা নাসা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছে, মহাকাশযাত্রায় নভোচারীদের স্বাস্থ্যরক্ষায় আলু বিভিন্ন কারণে অপরিহার্য। আলু মঙ্গল গ্রহে জন্মানোর চেষ্টাও শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো মহাকাশ বিজ্ঞানীরা কোনোদিন তাদের সফল হওয়ার সংবাদটি দিতে পারবেন। তবে মঙ্গল কিংবা আরো দূরের কোনো গ্রহে গেলেও আলুর জন্ম, উৎস পৃথিবী নামের গ্রহের আন্দিজ পর্বতমালা। আরো শত শত বন্য প্রজাতির উদ্ভিদের মতো আলুও সেখানে জন্মাত। সেই বন্য আলু প্রজাতির পাতা কিংবা টিউবার কোনোটাই খাওয়া সম্ভব ছিল না, কারণ সেগুলো তখন বিষাক্ত। তাই এটা ধারণা করাটা কঠিন, ঠিক কীভাবে এবং কেন মানুষ আলু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিল। কিন্তু ইতিহাসের কালপর্বের কোনো একটি সময়ে সেটা অবশ্যই হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায়, খাওয়ার উপযোগী আলুর চাষ শুরু হয়েছিল আট হাজার বছরের বেশি আগে। সেই সময় থেকে আন্দিজের কৃষকরা শত শত খাওয়ার উপযোগী আলুর প্রজাতি উৎপাদন করেছেন। তারা অন্তত এক হাজার প্রজাতির আলুর নামকরণ করেছেন, যেগুলোর খাদ্যগুণ ভিন্ন এবং তাদের চাষের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা, আর্দ্রতার ভিন্নতা আছে; রোগেরও ভিন্নতা আছে। এই হাজার নামের মধ্যে অনেকগুলো সদৃশ। তবে আন্দিজে মোট অন্তত ৪০০ প্রজাতির আলু উৎপাদন হতো। আন্দিজে মানুষের অস্তিত্ব আলু ছাড়া হয়তো সম্ভব হতো না।&dquote;&dquote;

আলু গাছের ফুল হয় বেগুনি রঙের। কিছু বিবরণী থেকে জানা যায়, ফ্রান্সের রানী মারি আন্তোয়নের (১৭৫৫-৯৩) এ ফুল এত পছন্দ হয়েছিল যে তিনি সেগুলো চুলে গুঁজেছিলেন। তার স্বামী ষোড়শ লুই (১৭৫৪-৯৩) ফুল রেখেছিলেন তার পোশাকের বোতামঘরে। লুই কিছুদিনের জন্য একটি ফ্যাশনকে উৎসাহ দিয়েছিলেন, যেন অভিজাতরা তাদের পোশাকে আলুর ফুল ব্যবহার করেন। এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল ফরাসি কৃষকদের আলু চাষে এবং ফরাসিদের ডিনারে আলু খেতে উৎসাহ দেয়া। ১৮ শতকে আলু তখনো ফরাসিদের ডিনার টেবিলে সেভাবে ওঠেনি।

ধান, গমের পর আলু এখন দুনিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শস্য। কিন্তু ১৮ শতকে এ আলু ছিল কারো জন্য আভিজাত্য, কারো জন্য ভীতিকর কিছু আর কারো কাছে অজানা কোনো খাবার।

২৫ কোটি বছর আগে দুনিয়া একটি অখণ্ড বিরাট স্থলভাগ ছিল, যা প্যানজিয়া নামে পরিচিত। ভূ-তাত্ত্বিক শক্তির প্রভাবে প্যানজিয়া ভেঙে যায় এবং মহাদেশগুলোর সৃষ্টি হয়। বহু বছর পর কলম্বাসের অভিযান প্যানজিয়াকে আবার জোড়া দিয়েছিল। এ অভিযানের মাধ্যমে বহুদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়। ষোড়শ লুইয়ের পোশাকে আলুর যে প্রজাতির ফুল সৌন্দর্য বাড়িয়েছিল, সেটা পেরু থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ফ্রান্সে পৌঁছেছিল। একই সঙ্গে এ আলু ছিল কলম্বাসের অভিযানে বিনিময় হওয়া এবং অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকের একটি।

শস্যদানার চেয়ে আলুর টিউবারের উৎপাদনক্ষমতা বেশি। ধান বা গমের গাছ বেশি লম্বা হলে ভার সইতে না পেরে মাটিতে ভূপতিত হয়। কিন্তু আলু জন্মায় মাটির নিচে, তাই এর ফলন বেশি হলেও কোনো সমস্যা হয় না। ২০০৮ সালে লেবাননের এক কৃষক ২৫ কেজি ওজনের আলু ফলিয়েছিলেন।

অনেক গবেষকই এ বিষয়ে একমত যে আলুর আগমন উত্তর ইউরোপের দুর্ভিক্ষের ঘটনার অবসান ঘটিয়েছিল। ইতিহাসবিদ উইলিয়াম এইচ &dquote;&dquote;ম্যাকনিল ইউরোপের জন্য আলুর তাত্পর্য আরো অনেক বেশি বলে মনে করেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে আলুর কারণেই ইউরোপীয় সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, ‘ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাবারের সংস্থান করে আলু গুটিকয় ইউরোপীয় জাতিকে ১৭৫০ থেকে ১৯৫০-এর কালপর্বে পুরো দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়।’ সহজ কথায় আলুই পশ্চিমা ক্ষমতার উত্থান ঘটায়। ১৭৫০-এর দশকে ইংলিশ বোর্ড অব এগ্রিকালচার ঘোষণা করে, ‘আলু, পানি ও লবণ মিলেই মানুষের জন্য পূর্ণ পুষ্টি জোগাতে পারে।’

উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে আলুকে গ্রহণ করার মাধ্যমে আধুনিক কৃষির যাত্রা হয়, যা অ্যাগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি নামে পরিচিত। কলম্বাসের অভিযানে কেবল যে আলু বিনিময় হয়েছিল তাই নয়, বরং দুনিয়ার প্রথম শক্তিশালী সারও এসেছিল পেরু থেকে, যার নাম পেরুভিয়ান গুয়ানো। আলুর ক্ষেত্রে যখন কলোরাডো পটেটো বিটল আক্রমণ করল, তখন উদ্বিগ্ন কৃষকরা প্রথম কৃত্রিম বালাইনাশক ব্যবহার করেন, যা ছিল এক ধরনের আর্সেনিক। এ আর্সেনিকসমৃদ্ধ বালাইনাশক আরো শক্তিশালী ও কার্যকর করতে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে শুরু হলো আধুনিক পেস্টিসাইড শিল্পের যাত্রা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে উন্নত শস্য, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার ও রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার নিয়ে আসে সবুজ বিপ্লব। শুরু হয় কৃষি উৎপাদনের বিস্ফোরণ। ইলিনয় থেকে ইন্দোনেশিয়া সবখানে শুরু হয় বড় আকারের কৃষি খামারে উৎপাদন।

১৮৫৩ সালে ভাস্কর আন্দ্রেয়াজ ফ্রিডরিখ জার্মানির ওফেনবার্গে স্যার ফ্রান্সিস ড্রেকের একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। ভাস্কর্যে দেখা যায়, এ ইংরেজ অভিযাত্রীর ডান হাত একটি তলোয়ারের বাঁট ধরে আছে আর বাম হাতে একটি আলু গাছ। ভাস্কর্যের নিচে লেখা আছে—

‘স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক’

ইউরোপে আলু ছড়িয়ে দিয়েছিলেন&dquote;&dquote;

১৫৮৬ সালে।

দুনিয়ায় যে লক্ষ লক্ষ মানুষ

চাষাবাদ করে, তারা তার স্মৃতিকে

আশীর্বাদ করে।

১৯৩৯ সালে নািসরা এ ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে বিদেশী সংস্কৃতি বিনাশের নামে। তবে এটি শিল্পের ওপর আক্রমণ হলেও ইতিহাসের ওপর নয়। কারণ স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক মোটেই ইউরোপে আলুর প্রচলন করেননি।

মিসরীয়রা যেমন পিরামিড তৈরি করেছে, আন্দিজ অঞ্চলে ইনকারাও উঁচু মন্দির তৈরি করেছিল। ইনকা জাতি আন্দিজ অঞ্চলের শাসনক্ষমতা দখল করে মহাসড়ক ও সমৃদ্ধ নগর গড়ে তোলে। শেষমেশ স্প্যানিয়ার্ডদের আক্রমণ আর ছড়ানো রোগে ইনকারা ধ্বংস হয়ে যায়। আন্দিজ অঞ্চলে এক পর্বত থেকে আরেক পর্বতে জীবনধারা ভিন্ন হলেও একটি বিষয় ছিল সাধারণ—আলু। বন্য অবস্থায় থাকা আলুতে কিছু বিষাক্ত উপাদান থাকত। তাপ দিলে অনেক উপাদান নষ্ট হলেও সোলানাইন ও টোমাটাইন নষ্ট হতো না। আন্দিজের পার্বত্য এলাকায় এক ধরনের ছাগল আলু খাওয়ার আগে মাটি চাটত। এ মাটির আলুর বিষ ছাগলের পাকস্থলীতে শোষণ করে নিত। স্থানীয় মানুষও এ পদ্ধতি অনুকরণ করে। তারা আলু, কাদা ও পানি দিয়ে একরকম ঝোল তৈরি করে খেত। এখনো পেরু ও বলিভিয়ায় বন্য আলু খাওয়ার জন্য মাটির গুঁড়ো বিক্রি হয়। আন্দিজের মানুষ আলু সিদ্ধ, ভর্তা করে খেত আজকের আধুনিক রন্ধন প্রক্রিয়ার মতোই।&dquote;&dquote;

আজকের দিনেও আন্দিজ গ্রামে আলু তোলার উৎসব হয়, যেমনটা কয়েকশ বছর আগেও হতো। আলু তোলার পর জমিতে মাটি দিয়ে ১৮ ইঞ্চি উঁচু ইগলু আকারের মাটির ওভেন তৈরি করা হয়। এ ওভেনে কাঠের টুকরো, গোবর, খড় জ্বালানো হয়। আগুন গনগনে হওয়ার পর ছাইয়ের মধ্যে আলু দেয়া হয়। এরপর সেই আলু লবণ ও কাদা মিশিয়ে খাওয়া হয়। এ আলুর রোস্টের ঘ্রাণ বাতাসে আন্দিজ পর্বতমালায় মাইলের পর মাইল ছড়িয়ে পড়ে।

এ অঞ্চলে স্প্যানিয়ার্ডদের প্রথম দলটি পা রেখেছিল ১৫৩২ সালে ফ্রান্সিসকো পিজ্জারোর নেতৃত্বে। তারা দেখেছিল, স্থানীয়রা গোলাকার অদ্ভুত এক খাবার খাচ্ছে। নতুন ধরনের এ খাবারের কথা স্প্যানিশদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে গেল। তিন দশকের মধ্যে স্প্যানিশ কৃষকরা ক্যানারি আইল্যান্ড থেকে ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস (এগুলো সবই তখন স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের অংশ) পর্যন্ত আলু রফতানি শুরু করল।

আলুর প্রথম বৈজ্ঞানিক বিবরণ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। একই সঙ্গে সুইস ন্যাচারালিস্ট গ্যাসপার্ড বাওহিনো সে বছরই আলুর বৈজ্ঞানিক নাম নির্ধারণ করেন Solanum tuberosum esculentum, যা পরবর্তী সময়ে সাধারণ রূপ ধারণ করে Solanum tuberosum।&dquote;&dquote;

ক্যারিবিয়ার তাইনো গোষ্ঠী মিষ্টি আলুকে বলত ‘বাটাটা’। নামটি পর্তুগিজরাও গ্রহণ করেছিল। স্পেনে এ বাটাটা কুয়েচুয়ান ভাষার ‘পাপা’ শব্দটির সঙ্গে মিশে যায়। কুয়েচুয়ান আন্দিজের মানুষের ভাষা। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে স্প্যানিশে সাধারণ আলুর নাম হয়ে যায় ‘পাটাটা’। বিভিন্ন ধাপে আলু ইংরেজিতে হয় পটেটো আর স্প্যানিশ পাটাটা।

ইউরোপীয়রা শুরুর দিকে আলুকে বেশ সন্দেহের চোখে দেখত। তাদের সন্দেহ ছিল, এটি কামোদ্দীপক আবার কারো কারো মনে হতো, আলু জ্বর ও কুষ্ঠ সৃষ্টি করে। তার পরও ইউরোপীয়দের যথেষ্ট আগ্রহ ও ইচ্ছা না থাকলেও আলু ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৭৪৪ সালে প্রুশিয়ায় দুর্ভিক্ষ আঘাত হানে। রাজা ফ্রেডরিখ দ্য গ্রেট ছিলেন আলুর ব্যাপারে উৎসাহী। তিনি কৃষকদের আলু খেতে পরামর্শ দিলেন। ইংল্যান্ডে এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছিল ১৮ শতকে। কৃষকরা আলুর বিরোধিতা করতে শুরু করেন। কারণ তারা আলুকে রোমান ক্যাথলিজমের এক অগ্রবাহন বলে মনে করতেন। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনের স্লোগান ছিল, ‘নো পটেটো, নো পপারি!’

ফ্রান্সে আলুর প্রচলনে যে মানুষটির নাম সবার আগে আসে, তিনি আন্তোনে পার্মেন্তিয়ার (১৭৩৭-১৮১৩)। সাত বছর সেনাবাহিনীতে ছিলেন, যুদ্ধে প্রুশিয়ানদের হাতে পাঁচবার বন্দি হয়েছেন। বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি মূলত আলু খেতেন এবং এভাবেই বন্দি অবস্থায় সুস্বাস্থ্য ধরে রেখেছিলেন। এ সুস্বাস্থ্যের রহস্য সমাধান করতেই তিনি যুদ্ধের পর একজন অগ্রগণ্য পুষ্টিবিদ হয়ে ওঠেন। বাকি জীবন তিনি আলুর প্রচার-প্রসারে কাটিয়ে দেন। পার্মেন্তিয়ার কাজ শুরু করার সময় একটা সুযোগও পেয়েছিলেন ভালো রকমের। রাজা ষোড়শ লুই ১৭৭৫ সালে সিংহাসনে বসেন। তিনি ক্ষমতা নিয়েই শস্যের দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ তুলে নেন। রুটির দাম বেড়ে যায়। এ গোলমাল ‘আটা যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। ৮২টি শহরে ৩০০ গোলমাল হয়েছিল। পার্মেন্তিয়ার অবিরতভাবে বলছিলেন, আলু খাওয়া শুরু করলেই রুটি নিয়ে ঝামেলা শেষ হবে। আলুর প্রচারণায় তিনি একের পর এক পাবলিসিটি স্টান্টও করছিলেন।&dquote;&dquote;

সপ্তদশ শতকে ইউরোপীয় নাবিক, বণিক, মিশনারি, সৈনিকরা আলুকে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে আসে। মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত মত হলো পর্তুগিজদের হাতেই ভারতীয় উপমহাদেশে আলু আমদানি হয়। ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা আলুকে সমতলের পর ভারতের উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা এবং শ্রীলংকায় নিয়ে যায়। ঐতিহাসিক দলিল জানায়, ১৬৭৫ সাল নাগাদ এ অঞ্চলে আলু প্রথম সবজি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় সুরাট ও কর্ণাটকে। ১৮২৮ ও ১৮৩০ সালে যথাক্রমে শিমলা ও নীলগিরিতে আলুর চাষ শুরু হয়।

ভারতে বসবাসকারী ইউরোপীয়রা আলু কমবেশি খেতই। তাদের পর এ অঞ্চলে মুসলিম ও হিন্দুরা আলুকে সহজেই গ্রহণ করে নেয়। সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিকরা বলেন, ভারতবর্ষের সংস্কৃতিতে গ্রহণ করার যে মানসিকতা ছিল, তার একটি উদাহরণ রান্নাঘরে আলুর সহজ প্রবেশাধিকার। ভারতে আলুর খাদ্য সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় ওলন্দাজদের বেশ ভূমিকা ছিল। আর আলুর জাতের বৈচিত্র্য এনেছিল ব্রিটিশরা।

এ উপমহাদেশে আলুর প্রথম খামার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৮৩০ সালে, দেরাদুুনে। বোঝাই যাচ্ছে আলু তখনো আন্দিজের পার্বত্য এলাকার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসেনি। তবে সেই উনিশ শতকেই ভারতে সমতলভূমিতে আলু চাষের বন্দোবস্ত হয়ে গিয়েছিল।&dquote;&dquote;

উনিশ শতকের মধ্যভাগে ইংল্যান্ডের লোভী, নিপীড়ক জমিদাররা আয়ারল্যান্ডের বেশির ভাগ জমি দখল করে নেয়। তখন স্থানীয় গরিব কৃষকরা আলু খেয়েই জীবনধারণ করতেন। আলুকে তারা বলতেন ‘ব্রেডরুট’। বেঁচে থাকার জন্য লাখ লাখ আইরিশের একমাত্র উপায় তখন আলু। এরপর এল এক বিনাশী ছত্রাক। এর আক্রমণে আলুর গায়ে প্রথম দিন কালো হয়ে যায় এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে দুর্গন্ধযুক্ত একটা পচা বস্তুতে পরিণত হয়। পরপর তিন বছর ‘গ্রেট পটেটো ব্লাইট’-এর আক্রমণে আয়ারল্যান্ডের সব আলু নষ্ট হয়ে যায়। প্রায় ১০ লাখ আইরিশ অনাহারে মারা যায়। দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচতে লাখ লাখ মানুষ দেশান্তরী হয়। ১৮৪৫ থেকে ১৮৪৯ সময়কালে চলে ইতিহাসের অন্যতম ভয়ানক এ দুর্ভিক্ষ। সে সময়ে এক বিবরণীতে লেখা হয়েছিল, ‘মানুষ আগাছা, পোষা প্রাণী, এমনকি মানুষের মাংসও খেয়েছে। রাস্তাঘাট কংকালে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। ঈশ্বর মানুষের সহায় হোন।’ এক দশকের মধ্যে আয়ারল্যান্ডের জনসংখ্যা অর্ধেক হয়ে যায়। এ সময় দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচতে যারা আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন ৩৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির পূর্বপুরুষরাও।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, স্প্যানিশ অভিযাত্রীরাই ইনকাদের দেশ থেকে আলু ইউরোপে নিয়ে এসেছিল। এভাবে ১৬ শতকের মধ্যভাগে আলু ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপীয় সাহিত্যে আলুর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় অভিযাত্রী পেদ্রো সিজা দে লিওর লেখায়। তার পেরু অভিযানের বিবরণী ক্রোনিকাস দেল পেরু প্রথম প্রকাশিত হয় ১৫৫৩ সালে। এ লেখায় আলু সম্পর্কে নানা বিবরণ পাওয়া যায়। ১৫৬৭ সালে আলু অ্যান্টওয়ার্পে পৌঁছে যায়। ১৫৭০ নাগাদ স্পেন এবং আরো অনেক দেশে আলু খাওয়া শুরু হয়ে যায়। আলুর প্রথম ইউরোপীয় রেসিপি পাওয়া যায় একটি জার্মান কুকবুকে, মার্ক্স রাম্পোল্টের লেখা এ বইয়ের নাম Ein new Kochbuch। এ বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৫৮১ সালে।&dquote;&dquote;

১৬০১ খ্রিস্টাব্দে ক্যারোলাস ক্লাসিয়াস তার Rariorum plantarum historia গ্রন্থে আলুর অনেক শ্রেণীবিন্যাসের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন এবং এখানে সংশ্লিষ্ট উডকাট অলংকরণও যুক্ত হয়। এর মধ্যে ছাপা অলংকরণেও আলুর ছবি প্রকাশিত হয়ে গেছে। ১৫৯৭ সালে জন জেরার্ডের দ্য হারবল অর জেনারেল হিস্ট্রি অব প্লান্টেজ গ্রন্থে ইংরেজি ভাষায় প্রথমবারের মতো আলুর বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়।

ক্যারোলাস ক্লাসিয়াস ১৫৮৮ সালে বেলজিয়াম থেকে আলুর টিউবার সংগ্রহ করেছিলেন। পরের বছর বেলজিয়ামের শিল্পী Philippe de Sevres ক্লাসিয়াসকে আলুর একটি চিত্রকর্ম উপহার দেন। এ চিত্রকর্ম এখনো টিকে আছে। এটিই ইউরোপে প্রথম আঁকা আলুর চিত্রকর্ম। এটি বর্তমানে অ্যান্টওয়ার্পের Plantin-Moretus জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।&dquote;&dquote;

পিটার দ্য গ্রেট ১৬৯৭ সালে কিছুদিন নেদারল্যান্ডসে ছিলেন। সেখান থেকেই তিনি আলুকে রাশিয়ায় নিয়ে আসেন। কিন্তু রাশিয়ার কৃষকরা আলুকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি। কারণটা ছিল ধর্মীয়— ১৮৪০ সাল পর্যন্ত রুশ কৃষকদের মধ্যে এ ধারণা প্রবল ছিল যে আলু হচ্ছে জেনেসিসের ‘নিষিদ্ধ ফল’। অষ্টাদশ শতকেই কৃষকদের দিয়ে আলু চাষ করাতে সরকার বিভিন্ন আদেশ জারি করে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিক্ষোভ হয়। ১৮৪০ সালের আলু চাষ বিষয়ে ডিক্রি জারি করা হয়। রুশ লেখক ও চিন্তাবিদ আলেক্সান্দার হের্জেনের (১৮১২-১৮৭০) বিখ্যাত আত্মজীবনী মাই পাস্ট অ্যান্ড থটস থেকে আলু নিয়ে উনিশ শতকে রুশ কৃষকের মনোভাব জানা যায়। এ আত্মজীবনীকে রুশ সাহিত্যের একটি মূল্যবান গ্রন্থ বলে বিবেচিত করা হয়। তিনি এতে লিখেছেন, ‘একটা সময় ইউরোপের কৃষকদের মতো রুশ কৃষকরাও আলু চাষে আগ্রহী ছিলেন না। মানুষের সাধারণ ধারণা ছিল আলু একটা ভুয়া খাবার, যা তাদের শরীরে কোনো শক্তি ও পুষ্টি দেবে না।’

১৮৪০ সালে ডিক্রি জারির পর ভলগা অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। প্রায় পাঁচ লাখ কৃষক বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। অনেকে গুলিতে প্রাণ হারান কিংবা কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। কাউকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। সরকার বিদ্রোহ দমনে সফল হয়। তবে এ বিদ্রোহ শেষ হওয়ার পর থেকেই আলু রাশিয়ার খাদ্য সংস্কৃতিতে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে থাকে। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয় এলেনা মলোখোতের রেসিপি বই আ গিফট টু ইয়ং হাউজওয়াইভস। এ প্রথম সংস্করণ থেকেই বইটিতে আলু জায়গা পেয়ে গিয়েছিল। মলোখোতের বইটি ১৯১৭ সাল পর্যন্ত ২০টির বেশি সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে বইটিকে শুরু থেকেই কৃষকদের বিদ্রোহের প্রতি অবমাননাকর হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। রুশ বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়নে এ বই নিষিদ্ধ হয়।&dquote;&dquote;

রুশ সাহিত্যের স্বর্ণযুগে আলু বেশ জনপ্রিয় উপাদান ছিল। আলেকজান্ডার পুশকিনের সবেচেয়ে প্রিয় খাবার ছিল সেঁকা আলু। তিনি আলুর খোসা ছাড়াতেন না। নিকোলই গোগল তার বিখ্যাত তারাস বুলবায় আলুর উপমা টেনেছেন। তিনি তার ‘দ্য ক্যারিজ’-এ লিখেছেন, একজন খুব মোটা ভূস্বামী, তার হাতগুলো ছোট, মনে হয় যেন তার শরীরে দুটো আলু জন্মাচ্ছে।

সাহিত্য থেকে এবার অর্থনীতির ইতিহাসে দৃষ্টি দেয়া যাক। কলম্বাসের নতুন দুনিয়া থেকে আলু এবং সার আমদানির আগে ইউরোপের জীবনমান বাংলাদেশ কিংবা ক্যামেরুনের মতোই ছিল; ২০১১ সালের এক লেখায় স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনে অন্তত এভাবেই লেখা হয়েছে। দিনে গড়ে ইউরোপীয় কৃষকের পুষ্টি গ্রহণের পরিমাণ ছিল আফ্রিকা ও অ্যামাজনে শিকারি সমাজের মানুষের তুলনায় কম। অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি প্রথমে ইউরোপ এবং পরে দুনিয়ার অন্য অনেক অঞ্চলের মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছিল। আর এই অ্যাগ্রো ইন্ড্রাস্টির যাত্রা শুরু হয়েছিল আলুর হাত ধরেই। আলু আজ তাই যত সহজলভ্য আর সাধারণ চেহারার খাবার হোক না কেন, মানব ইতিহাসে এর গভীর প্রভাব ছিল। আলু সভ্যতার বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ড্রাইভিং ফোর্স হয়ে উঠেছিল এবং  এ আলুই ভ্যান গখকে তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিছু চিত্রকর্ম আঁকতে প্রেরণা দিয়েছিল।