পৌরাণিক কাহিনী পড়তে গিয়ে দেখি, সমুদ্র মন্থন করে অমৃত পেতে হলে বিষ শুষে নিতে হবে। কে সেই বিষ পান করবে? শিব সেই বিষ নিজ কণ্ঠে ধারণ করে হয়েছিলেন নীলকণ্ঠ। বিষক্রিয়ায় কণ্ঠ নীল বর্ণ ধারণ করায় সেই থেকে পুরনো মিথে শিবঠাকুর হয়ে উঠলেন নীলকণ্ঠ। মিথের নীলকণ্ঠ লোকের অন্তরালে থাকলেও বাস্তবের নীলকণ্ঠ যিনি, তাঁকে সাহিত্যাঙ্গনের সবাই চেনেন। দেশভাগের বিষ আকণ্ঠ পান করা নীলকণ্ঠ অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশভাগ মিথ নয়, দেশভাগ নয় সমুদ্র মন্থন, তবুও যেন ঠিক তাই। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় সমুদ্র মন্থন করেই লিখলেন ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’—এক ঐতিহাসিক আখ্যান। যার পরতে পরতে তরমুজ লতার মতো লতিয়ে উঠেছে ’৪৭-এর আগে অগ্রসরমাণ গ্রাম্য সমাজের দৈনন্দিন যাপন। আচার-অনুষ্ঠান, মানুষে-মানুষে সম্প্রীতি দুটি ধর্মের সহাবস্থান। গলাগলি করে বেড়ে ওঠা সরল মানুষের জীবন, নিত্যকার গল্প।

নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের আখ্যানে একসময় হুড়মুড়িয়ে ’৪৭ এসে পড়ে মানুষগুলোর সরল যাপনে। প্রকট হয়ে ওঠে হিন্দু-মুসলিমের আলাদা রঙ। রঙের বিভাজনে সম্প্রীতিতে ফাটল ধরে জ্যৈষ্ঠের কাঠফাটা রোদে শুকিয়ে চৌচির হওয়া ফসলি জমির মতো।

সামু আর বেতের ডগা কেটে দেয় না বিধবা মালতির রোজকার নিরামিষ খাবারে তেল-নুন মাখিয়ে স্বাদে ভিন্নতা আনতে। যদিও বিভাজনের দাঙ্গাই একদিন কারো সোহাগী বউ মালতিকে পরনের রঙিন শাড়ি, কপালের লাল টিপ, সিঁথির সিঁদুর মুছতে বাধ্য করে সামুর বেতের ডগা কেটে দেয়ার অনেক আগেই।

কে জানে কোথায় কিসের টানে, পাগল জ্যাঠামশাই আকাশ হাতড়ে খুঁজতে থাকেন নীলকণ্ঠ পাখি। সে পাখির কোটরে বসানো পলিনের চোখ। চাহনিতে পলিনের মায়া। জ্যাঠামশাই এগিয়ে চলেন নদীর পাড় ধরে, আমরাও পাতার পর পাতা ধরে এগিয়ে যাই আখ্যানের খাল-বিল-নদী পেরিয়ে জনসমুদ্রে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বই দেশভাগের বিষ উপাখ্যান হিসেবে পরিচিত হলেও আমার কাছে মোহময় প্রকৃতির সঙ্গে চিরচেনা মানুষের লতায়-পাতায়, কাদায় মেশা মানুষের সম্পর্কের বয়ান। দেশ-কাল ছাড়িয়ে কতগুলো সম্পর্কের যাপন। মাটি, জল, ঘর-বাড়ির বাইরে যে মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, সেটাই কি আসল সম্পর্ক নয়? সেটার ভাঙনই কি আসল ভাঙন নয়? একটা ভূখণ্ড তখনই কি আপন হয়ে ওঠে না, যখন সেখানকার সবাই আপনার আপন হয়ে বাঁচে। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সুতো নিয়েই গেঁথেছেন সম্পর্কগুলোকে, যে সম্পর্ক ঘাসের মতো গজিয়ে ওঠা মায়া, স্নেহ, ভালোবাসা, রাগ, ক্রোধ, সংসারী মানুষের খেরোখাতার হিসাব, চাষবাস, চার দেয়ালের ভেতর তপ্ত নিঃশ্বাসের সঙ্গে বুকের ওঠানামা। ঝোপ-জঙ্গলে লুকিয়ে ফেলুর যৌনাকাঙ্ক্ষা হাসিলের খায়েশও বাদ পড়ে না সে গাঁথুনিতে।

মানবিকতার সৌন্দর্যে দেখি ধনবৌর ছেলে হয়েছে, সেই খুশি কেবল বড়বাড়ির একার নয়, সে খুশি হিন্দু-মুসলিম বাছবিচারহীন এ গ্রাম, সে গ্রামের সবার। পাগল জ্যাঠামশাই বাড়ি না ফিরলে সে দুশ্চিন্তা বড় বউয়ের কিংবা ঠাইরেনের একার নয়। আবেদালী, সামু, মনজুর, ঈশম সবার। ঝড়-বৃষ্টি, জল, কাদা, শীত সব উপেক্ষা করে শীতে হু হু করে কাঁপতে কাঁপতে রাতের অন্ধকারে হ্যারিকেন হাতে খুঁজতে ছোটে ট্যাবার পুকুরপাড়, অশ্বত্থতলা, টোডারবাগ, নদীর পাড়, পীরের থান, বাদ রাখে না কোথাও। ওদের সঙ্গেই দুর্যোগের দিনে খুঁজতে বেরোয় কোরআন শরিফ পড়া ফেলে ইসমত আলীর ছেলেও। পাগল জ্যাঠামশায়কে খোঁজাটা এদের দায় নয়, লোক দেখানো নয়। এ সবই তাদের আত্মীয়তাবোধ, ভালোবাসা। তাঁদের মনে সঞ্চারিত দুঃখবোধ বেদনাই অন্ধকার রাতে ছুটিয়ে নিয়ে চলে নদীর পাড়ে, এপাড়া-ওপাড়ায়। আবার মটকিলার জঙ্গলে বড়কর্তার ক্ষত-বিক্ষত মুখ দেখে গাছে গাছে পাখিদের আর্তনাদের সঙ্গে তাদের মনেও হাহাকার ওঠে। সবাই প্রার্থনায় বড়কর্তার সুস্থতা কামনা করে। এ হাহাকার যেন পুরুষানুক্রমিক পারস্পরিক হূদ্যতার ফল। ঝড়-জলের রাতে প্রান্তরে প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ে দ্রুতলয়ে। সবাই জেনে যায়। জেনে গেলেই গলে যায়, নুইয়ে পড়ে ভালোবাসায়। সুখে-দুঃখে, হাসে-কাঁদে।

জালালী, আবেদালী, তাদের ছেলে জব্বর, জোটন, মুসকিল আসান বাবা, সামু, ফতিমা, মালতি, ফেলু বইয়ের পাতায় চোখ রাখলেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। একেকটা রক্ত-মাংসের চরিত্র চলতে থাকে, বলতে থাকে, বলতে বলতে খুলতে থাকে অনুক্ত কথার পাপড়ি। রাত ফুরনোর আগেই হোগলা পাতার ঘরে খড়ের বিছানা গুটিয়ে ক্ষুধায় কাতর জোটন সেদ্ধ শালুকের খোসা ছাড়িয়ে মুখে পোরে। ফসলের ক্ষেতের আলে আলে হাঁটার ভান করে ধারালো শামুকের আগায় কেটে নেয় একগুচ্ছ করে আধপাকা ধানের ছড়া। হাঁটুজল হাতড়ে খোঁজ করে হাঁসের ডিম। জৈবিক তাড়নায় আল্লাহর কাছে চেয়ে বসে শরীরের মাশুল তোলার উপায়। সেই চাওয়া নিয়ে হাসিমুখে গুনগুনিয়ে তিনদিনের অভুক্ত পেটে অবসন্ন শরীর নিয়ে রাঁধতে বসে ভাত। কারো থেকে চেয়ে আনা দুটো শুকনো পুঁটি মাছ পুড়িয়ে শিল-নোড়ায় পিষে নুন-তেলে ভর্তা মেখে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের থালা সাজিয়ে দেয় মুসকিল আসানের। ক্ষুধায় নেতিয়ে পড়া শরীর টেনে টেনে ঘরের বেড়া ফাঁক করে চোখ রাখে মুসকিল আসানের খাওয়ায়। অজান্তেই মুখে বেরিয়ে আসে আহা! মানুষটা কেমন যত্ন করে খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে প্রতিটা ভাত আয়েশি ভঙ্গিতে। বেড়ার ফাঁকে রাখা চোখে চিকচিক করে ওঠে স্বপ্ন। ওই মানুষটা নিকা করবে জোটনকে।&dquote;&dquote;

ফেলুর বাড়ির ধারঘেঁষে হাঁড়ি মাথায় বিলের দিকে হেঁটে যায় জালালী। পঙ্গু ফেলু চেয়ে চেয়ে দেখে, কিন্তু জানে না, জালালী আজ ধরা দেবে গজার মাছে ফাঁদে। জালালীকে হেঁটে যেতে দেখা মানুষগুলোর কেউই অনুমান করতে পারে না, জালালীর আজ পেটের জ্বালা জুড়াবে গভীর বিলের শালুক লতায় জড়িয়ে। তার হাঁড়ি উত্তরের হাওয়া লেগে তলায় কটা শালুক নিয়ে ভেসে যাবে নিঃসঙ্গ। মধ্যরাতের কুয়াশা ঘিরে শক্ত নিথর হয়ে ফিরে আসবে লোকালয়ের মিথ হয়ে।

ভাবনারও অতীত ক্রোধে উন্মত্ত ফেলুর শান দেয়া ছুরির ফলায় নিভে যাবে পলিনের ভালোবাসার কাছে আজীবনের ঋণী পাগল জ্যাঠামশাই মণিন্দ্রনাথের জীবন। সব যন্ত্রণা, অভিমান দুর্গের র্যামপার্টে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর ইচ্ছে চুপ হয়ে যাবে হাসান পীরের দরগার নালায়।

ফতিমা সোনাবাবুর সঙ্গে প্রজাপতির মতো ছুটে বেড়ানো মাঠের মায়ায়। চোখ ভরে ওঠে স্বপ্নের মতো, জেগে ওঠে আত্মীয়তা নিয়ে।

এ অবধি সবাই সবার হয়ে বাঁচে। সবাই সবার জন্য কাঁদে-হাসে। সোনালি বালির তীরে ঈশম সবচেয়ে মিষ্টি আর বড় তরমুজ ফলায়। পোক্ত শরীরের ঘাম ঝরে। মুখে দাড়ি, গলায় গামছা, পরনে লুঙ্গি। ঈশম নৌকা বেয়ে সোনাবাবুদের মেলায় নিয়ে যায়, নিয়ে যায় মুড়াপাড়ায় জমিদারবাড়ি দুর্গা পূজা দেখাতে। সেখানে অমলা-কমলার সঙ্গে শিশুর চপলতায় হাতির পিঠে ঘুরে বেড়ায় ঈশমের বড় আদরের সোনাবাবু।

এ অবধি গল্পগুলো একটি ভূখণ্ডের একটি লোকালয়ের। একটু একটু করে দেশভাগের ঢেউ আছড়ে পড়ে এসব সাধারণ হয়ে বাঁচা অসাধারণ মানুষগুলোর সৎ হয়ে বাঁচা সংসারে। সোনাবাবু চেয়ে চেয়ে দেখে, কিছু মানুষজন এসে তাদের ঘরগুলোর উপরে উঠে টিনের স্ক্রু খুলে দিচ্ছে। খুলে রাখা টিনের মতো আলাদা হয়ে যাচ্ছে বুকের সঙ্গে লেগে থাকা বুকগুলোর দরদ। তীক্ষ ছুরির ফলায় অর্জুন গাছের গা চিরে সোনাবাবু লিখে নেয় দেশভাগের শেষ স্বাক্ষর, ‘জ্যাঠামশাই, আমরা হিন্দুস্তান চলে যাচ্ছি।’ হিন্দু-মুসলমানের জন্য আলাদা দেশ! বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে ওঠে কান্না। এসব সাধারণ মানুষ কী এমন চেয়েছিল?

নৌকা ভাসে। ভেসে যেতে থাকে দেশভাগের আগুনে দগ্ধ প্রাণগুলো নিয়ে। ঈশম তার প্রাপ্য পেয়েও হাঁটতে থাকে নৌকার সঙ্গে সঙ্গে সোনালি বালির তীর ধরে। তরমুজের লতা নুইয়ে থাকে বালির বুকে। তরমুজের লতা সোনালি চরের বালি বোঝে না দেশভাগের বোবা যন্ত্রণা। শুধু জানে, যত্ন পেলেই তরতরিয়ে বেড়ে উঠবে লতা। ফুল ফুটবে, ফল বড় হবে। পাকলে খেয়ে তৃপ্ত হবে মানুষ। আর মানুষ জানে, দেশভাগের এ যন্ত্রণা দীর্ঘ হবে, দীর্ঘতর হবে। ফতিমা-ঈশমের কেউ জানে না, তাদের সোনাবাবুই একদিন লিখবেন সেই আখ্যান। চোখের জলে ভিজে আমরা সন্তানসন্ততিরা পড়ে নেব সেই ঐতিহাসিক দলিল। আমরা পড়ব আর বুকের ভেতর ধিকি ধিকি জ্বলবে দেশভাগের যন্ত্রণা, নীলকণ্ঠ পাখি হারানোর যন্ত্রণা।