আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহু...
তিন বছরের দীর্ঘ ভোগান্তির পর শেষমেশ মন্টুর বুড়ি মায়ের দুনিয়াদারির পাট সব চুকেবুকে গেল। প্রাণটা তো গত রাতেই গেছে, এবার বাড়িঘরের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে তার মরদেহ বাড়ির দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে চিরতরে। মন্টুর বুড়ো বাবা চৌকাঠে বসে তার প্রেয়সীর চলে যাওয়ার এ দৃশ্য দেখে, বয়সী ছানি পড়া চোখে যতটা দেখা যায়। সেই ১৯ বছর বয়সে যার সাথে তার পরিচয়, প্রেম, বিরহের সূচনা, যে জীবনভর ছিল তার সবচেয়ে আপনার জন, সুখে-দুঃখে, অভাবে-সচ্ছলে যে ছিল পাশে সবসময়, ছেলেমেয়েদের ঝামেলা যে এক হাতে সামলেছে দৃঢ়ভাবে, সাথে সামলে রেখেছিল তাদের দুই আনার টানাপড়েনের সংসার, বয়সের অসহায়ত্ব যে বুঝতে দেয়নি কোনোদিন, সেই মানুষটা আজ তাকে একলা করে দিয়ে চলে যাচ্ছে চিরদিনের জন্য। ৬০ বছরের সুদীর্ঘ সংসারজীবনের কত কত স্মৃতি ছানি পড়া ঝাপসা চোখে পাক খায়। এত এত অতীত ও তার স্মৃতিগাথা সব আজ কাফনে মুড়ে সাথে নিয়ে চলে যাচ্ছে বুড়ি। মাথা কুটে মরলেও আজ আর সেসব ফিরে পাওয়া যাবে না। মন্টুর বুড়ো বাবার খুব ইচ্ছে করে বাড়ির সীমানা পার হওয়ার আগে বউয়ের মুখটা আরেকবার শেষবারের মতো দেখে নেয় সে। ছেলের বউকে কাছেপিঠে দেখে ডাক দেয় বুড়ো, ও ময়নার মা, মন্টুরে কও না আরেকবার অর মায়ের মুখটা আমারে দেখায় যাক। কও না অরে।
বুড়োর বউমা ঠিক মুখ ঝামটা নয়, তবুও কেমন কড়া স্বরে বলে, আর জ্বালাইয়েন না তো আব্বা। মায়রে এখন কবর দিতে নিয়া যাইতাছে, এখন আর মুখ দেখান যাইব না। আর গুনাহ বাড়াইয়েন না, এমনিতেও আপনে অনেকবার দেখেছেন। মেয়েলোক মরার পর স্বামীর তার মুখ দেখতে নাই জানেন না। এখন আল্লাহর কাছে দোয়া করেন মায়ের লেইগা।
অ বউমা ! কওনা মন্টুরে। কী হইব আরেকটাবার দেখলে। মন্টুর মায়ের মুখ দেখমু তাতে আবার গুনাহর কী আছে। শ্যাষবার দেখি। আর তো দেখতে পামু না।
দূরো !
ময়নার মা! কই গেলা? কইলা মন্টুরে?
ময়নার মায়ের আর খোঁজ মেলে না। বুড়োর ছানি পড়া স্বল্প দৃষ্টি সীমা থেকে কোথায় যে হারিয়ে যায়। বুড়োর পাশে তখন তার নাতনি ময়না এসে বলে, ও দাদু! তোমার চোখে পানি ক্যান?
বুড়ো নাতনিকে কোলের ওপর বসিয়ে বলে, নারে দাদু। কিছু না। এমনি। চোখের অসুখ তো তাই পানি পড়ে। তুই আমার কাছে বইয়া থাক বইন। আমারে ছাইড়া কোথাও যাইস না।
আইচ্ছা দাদু। যামু না।
মন্টুর বউ রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে বুড়ি শাশুড়ির অন্তিম যাত্রা দেখে। দুঃখ যে তার হয় না এটা বলা ভুল, কষ্ট তারও হয়। চোখ থেকে পানিও ঝরে অবিরাম। তবুও গত তিন বছরের রোগীর পেছনের অহর্নিশ অমানুষিক শ্রম থেকে আজ তার মুক্তি। হাজারটা কষ্টের ভিড়ে কোথায় যেন এক-আধটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচা। একটা শান্তির নিঃশ্বাস।
মন্টুর কাঁধের ওপর মায়ের লাশটা বড় ভার ভার লাগে। খাটিয়াটা কেমন তাল হারিয়ে এদিক-ওদিক চলে যায়। মন্টু বুঝতে পারে না সমস্যা তার টালমাটাল পায়ের না খাটিয়ার ওজন সত্যিই বড্ড বেশি? এমন তো হওয়ার কথা নয়। মা বেঁচে থাকতে কতবার তাকে কোলে করে খাট থেকে নামাতে-ওঠাতে হয়েছে। কতবার গোসলখানায় অমনি করে কোলে নিয়ে যাওয়া-আসা করতে হয়েছে। কই তখন তো এত ওজন লাগেনি। পাখির মতো শরীর ছিল মায়ের; একটুখানি, একেবারে হালকা। তবে আজ এত ভারী ঠেকছে কেন? মায়ের অসুখের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। কতবার যে ঘর-বার আর হাসপাতাল করতে হয়েছে। টাকাও কি কম ঢেলেছিল মন্টু। স্বল্প আয়ের মানুষ সে। যা আনত তার অর্ধেক যেত মায়ের চিকিৎসায়। বাবার রুটিন বাঁধা ওষুধপত্তর তো আছেই। এদিকে আবার পাঁচ পাঁচটা লোকের সংসার খরচ। সব মিলিয়ে বড় হিমশিম খেয়েছে সে গত তিন বছর। বুড়ি মাটাও কি কম কষ্ট করেছে এই কটা বছর। রোগে-শোকে বেচারি একেবারে আধমরা হয়ে পড়েছিল। সব থেকে কি তবে সত্যিই মুক্তি মিলল আজ? আজ থেকে আর মায়ের চিকিৎসার খরচের জন্য মাথা চাপড়ে মরতে হবে না। সংসারের টানাপড়েন বেশ খানিকটা কমবে তাহলে। ছিঃ ছিঃ ! কি যা-তা সব মাথায় ঘোল পাকাচ্ছে। ধুর! নিজের ওপর রাগ হয় মন্টুর। কাঁধে খাটিয়ার পায়াটা শক্ত করে জাপটে ধরে লজ্জায় মাথাটা নিচে নামিয়ে আনে। মন্টুর মনে হয়, মা যেন বিস্ময় ব্যাকুল চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হয়, মা যেন খাটে এখনই উঠে বসে তার দিকে তাকিয়ে বলবে, তরে কত কষ্ট কইরা মানুষ করলাম রে মন্টু, আর তুই আইজকা আমার অষুধের টাকা বাঁচল দেইখা খুশি হইতাছস! তরে কোনোদিন অভাব-কষ্ট বুঝতে দেই নাই, যহন যা চাইছস সাধ্যের মধ্যে থাকুক আর না থাকুক, আইন্না দিছি। নিজের থালের ভাত তরে খাওয়াইছি আর আইজকা তুই আমার মরণে খুশি হইলি রে বাপ! তর মা আইজকা তর কাছে এতই ভারী হইয়া গেল। হ্যাঁরে মন্টু, এই ছিল বাপ তর মনে?
শবযাত্রায় জয়নুদ্দিকে পেয়ে খুশি হয় ইনুর বাপ। জয়নুদ্দির বাড়ির পেছনের জমিটুকু পেলে ইনুর বাপের পোলট্রি ফার্মটা গায়ে-গতরে আরো খানিক বাড়তে পারে। তাতে লাভের অংশও কম বাড়বে না। সেই কবে থেকে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে তা জয়নুদ্দি আর বোঝে কই। এবারো মওকাটা হাতছাড়া করে না ইনুর বাপ। বলে, ও জয়নুদ্দি ভাই তোমারে সেই কবে থেইকা তোমার বাড়ির পেছনের জমিডার লেইগা কইতাছি, তুমি তো কথা কানেই তোলো না। জমিডা তো খালিই পইড়া আছে। নালা-নর্দমা হয়া আছে। আমি কি তোমারে দামে কম কইছি কও? আর যদি কমই মনে হয় তোমার, তাইলে না হয় আরেকটু বাড়ায়া দিমু। কি কও?
জয়নুদ্দি বলে, সবই তো ঠিক আছে, কিন্তু জায়গাটা হাতছাড়া হইলে যে আমার বাড়ির পানি যাওনের আর রাস্তা থাকে না হে মুন্সী।
সেইটা নিয়া তুমি ভাইব না। আমার ফার্মের ময়লা যাওনের লেইগা যে ড্রেন করমু, ওইখানে তোমাদের বাড়ির পানির লাইনও ফিট কইরা দিও। তাইলে তো আর কোনো অসুবিধা থাকব না।
আচ্ছা দেহি চিন্তা কইরা।
দেহো জয়নুদ্দি ভাই। আমি তোমারে ঠকামু না।
মুন্সী আর জয়নুদ্দিকে ফেলে শবযাত্রার আরেকটু পেছনে গেলে পাওয়া যাবে ঘটক আতরাফ আর চার চারটে যুবতী মেয়ের বাপ মতিন মিয়াকে। ঘটক সাহেব মতিন মিয়ার দিকে আরেকটু ঘেঁষে এসে গলা নিচু করে বলে, মতিন ভাই ছেলেডা কিন্তু খুব ভালো। আপনের মেজো মাইয়াডারে ছেলের খালায় নাকি দেখছে। হেগো খুব পছন্দ হইছে। ছেলের ভালো চাকরি। ঢাকায় থাকে। দেখতেও সুন্দর। হেবি হ্যান্ডসাম। এমন সুযোগ আর আইব না মতিন ভাই।
কিন্তু ঘটক, বড় মাইয়াডারে রাইখা মেজোডারে কেমনে দিই?
আরে মতিন ভাই হের লেইগা ভাবনা কী? আমি আছি না। আপনের বড় মাইয়ার লেইগাও ভালো ছেলে নিয়া আহুম। দরকার হইলে মেজোডার বিয়া না হয় কয়দিন পরে হইল, কিন্তু পাকা কতাডা এহনই কইয়া রাখেন। এমন ছেলে হাতছাড়া করন যায় না।
বাইতে কতা না কয়া তোমারে আমি কিছুই কইতে পারমু না ঘটক। আগে সবার লগে কতা কইয়া নিই, হেরপর তোমারে জানামু।
কতা তো কইবেনই, অবশ্যই কইবেন। কিন্তু আপনে যে ভাইবা দেখবেন এইটা তো আমার ছেলের বাইতে জানান লাগব নাকি? কিন্তু দেহেন মতিন ভাই কী কপাল। পকেট আমার এক্কেবারে ফাঁকা। ছেলের বাইতে যে যামু সেই ভাড়াডাও নাই। এহন কেমন কইরা যাই কন তো?
মতিন মিয়া পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা শ’ টাকার নোট বের করে ঘটকের দিকে বাড়িয়ে দেয়। বলে, এতে ভাড়া হইব না?
নোটটা হাতে নিয়ে ঘটক আতরাফ বলে, ওই এক রকম চালায়া নিমু আরকি।
মড়ার মিছিলের একেবারে শেষদিকে ছেলেপেলেদের দল। কিন্তু শামুকে দলছাড়া দেখায়। তার হাতে স্মার্টফোন। আঙুলের নাচন কুঁদনে সেই কখন থেকে কার সাথে যেন বার্তালাপ চালিয়ে যাচ্ছে। পাশ থেকে বন্ধু নুরু হাত দিয়ে খোঁচা মেরে বলে, কিরে কার লগে এত চ্যাটিং করস? তর না কয়দিন আগেই ব্রেকআপ হইল।
শামু মিচকি হেসে বলে, একটা গেলে কি আরেকটা পাওয়া যায় না নাকি?
কস কি শামু! এর মদ্যেই আরেকটা জুটায় ফেলাইলি। কে রে?
সেই একটা মাল দোস্ত। সেই সুন্দরী!
আরে ছবি দেহা শালা।
খাড়া। দেহাইতাছি।
ছবি দেখে নুরু বেচারার চোখ ছানাবড়া। উরিব্বাস! এ তো সেই রে। কই পাস তুই এমন? আমারে একটা জুটায় দে না।
যাহ ভাগ শালা। তর যে চেহারা, কোন মাইয়া তর লগে রিলেশন করব!
আরে দে না। এমন করস ক্যা? দে না ভাই।
আইচ্ছা। তরে কয়ডা মাইয়ার ফেসবুক আইডি দিতাছি। দেখ পটাইতে পারস কিনা।
দে ভাই দে। তাত্তাড়ি দে!
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু... হুজুর সাহেব বিরামহীন কলেমা পাঠ করেন। সাথে মুখ মেলায় আরো কয়েকজন ঈশ্বরভক্ত মানুষ। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে মন্টুর বুড়ি মায়ের পাখির মতো প্রাণহীন শরীর। গন্তব্য কবরস্থান। পেছনে ফেলে যায় জীবন ও মৃত্যুর যুগল প্রহসন।






