সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়
১৯ জানুয়ারি কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা ভাষায় বিশিষ্ট সাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির মধ্যে আছে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, ‘অলৌকিক জলযান’, ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘ঈশ্বরের বাগান’, ‘ঋতুসংহার’, ‘নগ্ন ঈশ্বর’, ‘নীল তিমি’। পেয়েছিলেন সাহিত্য অকাদেমি, বঙ্কিম পুরস্কারসহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা।
১৯৩৪ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। জীবিকার টানে ট্রাক পরিষ্কারের কাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতার কাজও করেছেন তিনি। এক জীবনে কাজ করেছেন জাহাজের খালাসি হিসেবেও। পরবর্তী সময়ে সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন বেশ কিছুদিন। বারবার তাঁর লেখায় উঠে এসেছে দেশভাগের যন্ত্রণা
সুকান্ত: কেমন কেটেছে আপনার ছোটবেলা? পারিবারিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কেও জানতে ইচ্ছে করছে। একটু বলুন।
অতীন: দাঁড়াও, এই সুযোগে আমি আমার জন্মসালটা শুধরে নিই। আসলে হয়েছে কী, আমার সব বইয়ে জন্মসাল দেয়া আছে ১৯৩৪। গণ্ডগোলটা করেছিলেন আমার সোনা-জ্যাঠামশাই। ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফর্ম ভরা হচ্ছে, সেটাই তখনকার দিনে বয়সের প্রমাণপত্র। ফর্ম ভরতে সাহায্য করছিলেন প্রধানশিক্ষক, সোনা-জ্যাঠাকে জিজ্ঞেস করলেন, কত বয়স হলো ওর? উনি আন্দাজে বলে দিলেন, এই তো সেদিন জন্মাল, ১৩-১৩ লিখে দিন।
আমার পক্ষে তখন জানা সম্ভব ছিল না কবে জন্মেছি। পরবর্তী সময়ে পিসি একদিন আমার বয়স প্রসঙ্গে হোঁচট খেয়ে বললেন, তোর তো এত কম বয়স হওয়ার কথা নয়। তুই অমুক সময় জন্মেছিস। আমরা তখন এ বাংলায় চলে এসেছি। আমি ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। ওপার থেকে আসতে গিয়ে আমাদের জিনিসপত্রের তখন লণ্ডভণ্ড অবস্থা। যেকোনোভাবে হোক আমার কুষ্ঠিটা চলে এসেছিল মায়ের বাক্স-পেটরায়। আর তা থেকেই জানলাম, আমি জন্মেছি ১৩৩৭, ২২ কার্তিক। ইংরেজিতে ১৯৩০, ৬ নভেম্বর। সার্টিফিকেটের বয়স আর সংশোধন করা হয়নি।
প্র: ওপার বাংলায় থাকার দিনগুলো কেমন ছিল?
উ: এখন মনে হয় স্বপ্নের মতো। অদ্ভুত স্নিগ্ধ প্রকৃতি। পুকুর, নদী, খাল, বিল, চাষের জমি। ডাঙা, জল যেন সমান সমান। আমাদের কুকুর বেড়াল ছাগল গরু, সবার একটা করে নাম! বাবা, জ্যাঠামশাই, কাকারা দূরে দূরে কাজ করতেন। আমরা বড় হয়েছি এক শিক্ষকের অধীনে। তাঁর নাম অনিল পাকরাশী। বাড়ির গৃহকর্তা ছিলেন আমার ঠাকুরদাদা। আমাদের ছিল একান্নবর্তী পরিবার।
প্র: বাড়িটা কোথায়?
উ: ঢাকা জেলার রাইনাদি গ্রামে। এখানেই আমার জন্ম। (একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েথ) ছোটবেলার একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে আবছাভাবে, বাকিটা শুনেছি বড়দের কাছে। মা ঘুম থেকে ডেকে তুললেন। বললেন, ওঠ। তোর ঠাকুরদা মারা গেছেন। ঠাকুরদার সাহচর্য আমার তেমন ছিল না। দেখতাম, খাটে বসে উনি সারা দিন কাশছেন। মা ডেকে দেয়ায় বারান্দায় এসে দেখি, ঠাকুরদাকে খাটসুদ্ধ উঠোনে শোয়ানো হয়েছে। রাত হয়তো ৮-৯টা। শীতকাল। তখন ঘরের মধ্যে মৃত্যু পরিবারের পক্ষে অমঙ্গল মানা হতো। উঠোনেই ঠাকুরদা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। ওকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলো। শ্মশান নয়, আমাদের বাড়ির সামনেই পুকুরের ওপাড়ে বড়সড় অর্জুন গাছের নিচে। এরই মধ্যে আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শোরগোল পড়ে গেল। এদিকে ঠাকুরদাকে দাহ করতে হবে। ওকে তুলতে গিয়ে দেখা গেল, আমি জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছি। কখন ফাঁকতালে ঢুকে গেছি ঠাকুরদার লেপের তলায়। (একটু থেমে) এভাবেই মৃত্যুর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ।
প্র: দেশভাগের সময় পরিবারের সবাই চলে এলেন এপারে। সেই দুঃসময়ের আঁচ কতটা পড়েছিল আপনাদের ওপর?
উ: আমি এসেছি দেশভাগের কিছুদিন পর। সে সময় আমার ম্যাট্রিকের টেস্ট পরীক্ষা চলছিল। তখন পর্যন্ত ওপারে টেস্ট দিলে এপারে ফাইনাল দেয়া যেত। দেশভাগের খবর চাউর হতেই আমাদের বিশাল পরিবার, বাবা, জ্যাঠা, কাকা, কাকিমা, জেঠিমা, ভাইবোন ভাগ ভাগ করে এপারে আসতে লাগল।
প্র: এপারে কোথায়?
উ: মুর্শিদাবাদে। বহরমপুরে আমার এক কাকা দর্জির কাজ করতেন। তিনিই চিঠি লিখে বলেছিলেন চলে আসতে। বড় পরিবার তো, আত্মীয়দের বাড়িতে ছড়িয়ে গেলাম। হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হবে, এই ভয়ে আসা। সে রকম কোনো ঘটনা কিন্তু ঘটেনি আমাদের গ্রামে।
গ্রামের মুসলমানরা একধার থেকে ভেঙে পড়ে পথ আগলে ছিলেন আমাদের। বারবার কাতর গলায় বলেছেন, কেন আপনারা দেশ ছেড়ে যাবেন। আমরা আছি, কিছু হবে না আপনাদের। পরস্পর চোখের জলে বিদায় নিয়েছি। তাড়া খাওয়া, হানাহানির মধ্যে পড়তে হয়নি একবারও। সেই অর্থে কোনো আঁচ লাগেনি আমাদের গায়ে।
আতঙ্ক নিঃশব্দে ছিন্নমূল করে দিল গোটা পরিবারকে। আমার বড় জ্যাঠা মস্তিষ্ক বিকৃত মানুষ, মানে পাগল ছিলেন। সে সময় ওপারেই নিখোঁজ হয়ে যান।
প্র: এখানে আসার পর কী হলো?
উ: খুবই খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়লাম, দেশভাগের এই এলোমেলো সময় বাবা, জ্যাঠা, কাকারা কাজ খুইয়েছেন। বাবা ওপারে মুড়াগ্রাম জমিদার বাড়ির আদায়পত্রের কাজ করতেন। এপারে পায়ের তলায় মাটি চাই, রুটি-রুজির ব্যবস্থা দরকার। তখন কাশিমবাজার রাজাদের জঙ্গল বিক্রি হচ্ছে। বানজেটিয়ার জঙ্গল। শোনা যেত, বাঘ-ভাল্লুক এসবও আছে। সেই জঙ্গলের ২৫ বিঘা বাবা আর সোনা-জ্যাঠা ৫০০ টাকায় কিনে নিলেন। জঙ্গল সাফ করে চাষ হবে, ঘর তুলতে হবে। সোনা-জ্যাঠামশাই ছিলেন পরিবারের অভিভাবক। জমি ভাগ করে দিলেন ভাইদের মধ্যে। প্রত্যেকের ভাগে তিন-সাড়ে তিন বিঘা করে পড়ল।
প্র: এসব বিষয়-বিবরণ আপনার ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ উপন্যাসে এসেছে।
উ: হ্যাঁ। ওই অধ্যায়টায় অবিকল আমার মা-বাবার চরিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের লড়াই, জেদ, আত্মসম্মান বোধ, হতাশা, নতুন অবস্থানে মানিয়ে নেয়া...
প্র: সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ আপনার কবে থেকে এল?
উ: সে অনেক পরে। কলেজে পড়ার সময়। তার আগে তো ভাত-কাপড় জোগাড় করতে বাড়ির লোক হিমশিম খাচ্ছে! বহরমপুর কলেজে বন্ধুরা খুব সাহিত্যচর্চা করত। আমাদের বাড়িতে ‘দেশ’ পত্রিকা আসত। রাখাও হতো বিল্বপত্রের মতো! তখন ‘দেশ’ পত্রিকা খুব পড়ি। ততদিনে অবশ্য জাহাজ থেকে ফিরে এসেছি।
প্র: জাহাজে চাকরির গল্পটা আগে একটু শুনে নিই?
উ: সে-ই ভালো। আইএ পাস করার সঙ্গে সঙ্গে আমি যা হোক একটা চাকরির চেষ্টা করতে থাকি। আমাদের বাড়িতে তখন ভীষণ আর্থিক অনটন। কেউ উপার্জন করেন না। সরকার থেকে মাসিক ২০ টাকা ক্যাশ ডোল দেয়া হয়। উদ্বাস্তু পরিবারপিছু এই সাহায্য। বাবা নেবেন না। বিনা পরিশ্রমে কোনো টাকা নিতে তিনি রাজি নন। চোখের সামনে নিজের লোকেদের অনাহার তো সহ্য করা যায় না। জাহাজে কোলবয়ের চাকরি নিয়ে চলে গেলাম। নানা দেশে, বন্দরে ঘুরেছি। শ্রীলংকা, ইস্ট আফ্রিকায় ডারবান, কেপটাউন। দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, আর্জেন্টিনায় বুয়েন্স অয়ার্সে। তারপর ধরো পেরু। সেই দফার সফর শেষে ফেরার পর বাড়ির লোক, বন্ধুবান্ধব আর আমায় যেতে দেয়নি জাহাজে।
প্র: তারপর?
উ: একটু থিতু হয়েছে সংসার। জাহাজে চাকরির ফলে কিছু টাকা দিতে পেরেছি বাড়িতে। বাবা যজমানি করছেন। ভর্তি হলাম বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে। তখন কলেজ স্টুডেন্টদের কাছে সাহিত্যচর্চা একটা আকর্ষণীয় বিষয়। বাংলা সাহিত্যে বিমল মিত্র সে সময় মধ্যগগনে। ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘সাহেব বিবি গোলাম’ বেরোচ্ছে। সমরেশ বসু এসে গিয়েছেন। ছোটখাটো পত্রিকায় ভালো গল্প বেরোলে হইচই পড়ে যেত। বন্ধুদের সঙ্গে আমিও সেসব পড়ছি। বন্ধুরা চেপে ধরল, তুই একটা গল্প লেখ। তোর জাহাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখ। আমি বললাম, আমি কী লিখব! গল্প লেখার নিয়মকানুন-কৌশল কিছুই জানি না। এক বন্ধু বলল, তুই যেমন আমাদের সামনে বসে জাহাজের গল্প বলছিস, এভাবে লেখ। লিখলাম, কার্ডিফের রাজপথ। ওয়েলসের বন্দর শহর নিয়ে লেখা। বন্ধুদের ‘অবসর’ পত্রিকায় ছাপা হলো। সেই আমার প্রথম গল্প।
প্র: উপন্যাস তো বটেই, আপনার ছোট কোনো গল্পেও ছক বা পরিকল্পনা চোখে পড়ে না। অথচ আশ্চর্যভাবে সাহিত্যকর্মটি হামেশাই শিল্পের শীর্ষবিন্দুটি স্পর্শ করে ফেলে। ম্যাজিকটা কী?
উ: এটা নিয়ে আমি আর কী বলি বলো তো? ঠিকই, খুব গুছিয়ে, পরিকল্পনা করে কোনো লেখাই আমি লিখতে পারি না। এ ব্যাপারটা আমার পাঠকরা যে যার নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেন। এক ভদ্রলোক আমায় চিঠি লিখেছিলেন, তাঁর কথাই তাহলে বলি। লিখেছেন, আপনি গল্পের ছাঁচ মানেন না, ক্রাফটের ব্যাকরণের ধার ধারেন না। এক আশ্চর্য রোম্যান্টিক, বোহেমিয়ানিজম কাজ করে যায় আপনার লেখায়। আপনার বিবৃতি সমুদ্রের মতো দিকচিহ্নহীন...হয়তো তাই। সচেতনভাবে মাথা খাটিয়ে কিছু করি না। ভদ্রলোকের ব্যাখ্যাটা আমার বেশ মনমতো হয়েছিল। আমার গল্পসমগ্রের ব্লার্বে ওঁর মূল্যায়নটাই ছাপতে দিয়েছিলাম। নিজের মূল্যায়ন তো নিজে করা যায় না। আমি তো আরোই পারি না।
প্র: আপনার গল্প-উপন্যাসের অধিকাংশ সময় প্রধান চরিত্র আপনি নিজে। এমনটা কেন? এ প্রবণতা কি আপনার সাহিত্যকর্মকে গণ্ডিবদ্ধ করেনি?
উ: সেটা করতে পারে। তবে আমার বিশ্বাস, আমি যা জানি, সেটুকুই লিখতে পারি। অভিজ্ঞতার বাইরে গেলেই...
প্র: প্রশ্নটাকে আরেকটু সুনির্দিষ্ট করি, আপনি কিন্তু চরিত্র হিসেবেও ঢুকে যাচ্ছেন, শুধু নামটা বদলে নিয়ে। বয়স, আর্থিক অবস্থা, পারিবারিক, সামাজিক অবস্থান একই থাকছে। আখ্যানের সংকট, একেবারেই আপনার ব্যক্তিগত সংকট। অনেক লেখক যেমন নিজের শ্রেণী-অবস্থান থেকে উঠে কিংবা নেমে, অর্থাৎ কিনা কখনো রিকশাওয়ালা অথবা করপোরেট হাউজের টপ বসের ক্রাইসিস নিয়ে লেখেন। লেখক নিজেই সেই চরিত্রে ঢুকে যান...
উ: তা কি কখনো সম্ভব! দেখাটা লেখকের মতোই হয়ে যায়। লেখকের অভিজ্ঞতা অনুভূতির ভিত্তিতে। রিকশাওয়ালার জীবনযাপন, মন, মেধা ওপর থেকে দেখে কতটা বোঝা সম্ভব? ব্যাপারটা আমার কাছে কৃত্রিম লাগে। আমিও ওভাবে লেখার চেষ্টা করেছি। কিছু লেখা ও রকম আছে। ‘শেষ দৃশ্য’ সেই ধরনের উপন্যাস। ডোমেদের নিয়ে লেখা। ছয়-সাত মাস আমি তাদের জীবন খুব কাছ থেকে দেখেছি, তাদের কাজে হাত লাগিয়েছি। মরদেহ পচিয়ে কঙ্কাল বের করে বিক্রি করত তারা। উপন্যাসটা পাঠকদের ভালো লেগেছিল। শীর্ষেন্দু বলেছিল, এ রকম একটা লেখা লিখতে পারলে আমি আর লিখতাম না। উৎসাহ পেয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু আমি নিশ্চিত, চরিত্রগুলোকে আমি পুরোটা চিনতে পারিনি। ওদের এবং পাঠকদের প্রতি অবিচার করেছি।
প্র: আপনার জীবনের ওপার বাংলার পর্ব ধরা আছে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসে। এপারে আসার অনেক বছর পর লিখেছিলেন উপন্যাসটা। এতটা সময় নিলেন কেন?
উ: হ্যাঁ, তা প্রায় ২০ বছর পর। তার প্রধান কারণ হচ্ছে, নিরপেক্ষ হতে সময় লেগেছিল আমার। বাধ্য হয়ে দেশত্যাগের জন্য অন্য উদ্বাস্তুদের মতো আমিও মুসলিমদের দায়ী করতাম। বেশি বেশি করে বিশ্বাস করতাম গ্রাম লুণ্ঠন, নারী অপহরণ, আরো সব নানা খারাপ ঘটনার কথা। আমি আগেই বলেছি, এসব ঘটনা আমাদের গ্রামে ঘটেনি। দিন যেতে উপলব্ধি করলাম, প্রত্যেক জনজাতি তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে চায়। এই যে লাখে লাখে মানুষ এপারে চলে এল, তার মূল কারণ নিরাপত্তাহীনতা। ইজ্জত বাঁচানোর তাগিদ। ঘটনা এতটা ভয়াবহ ছিল না। হিন্দু-মুসলিম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুষ্কৃতিদের রোখা যেতে পারত। রাজনৈতিক পরিস্থিতি তা হতে দেয়নি। আমরাও বিশ্বাস রাখতে পারিনি প্রতিবেশী মুসলিমদের ওপর। কম হেয় জ্ঞান তো করিনি তাদের। ভয় ছিল, এবার বুঝি শোধ তুলবে। এপারে বছর পার হতে লাগল। মনে পড়ত আমাদের পরিবারকে ঘিরে থাকা মুসলিম মানুষগুলোর কথা। তারা কী পরিমাণ ভালোবাসতেন, শ্রদ্ধা-স্নেহ করতেন আমাদের। ধর্ম সেখানে কখনোই অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। এভাবে নিজেকে নিউট্রাল করতে ২০ বছর পার হয়ে গেল। নিরপেক্ষ হতে না পারা অবধি কোনো শিল্প সৃষ্টিতে হাত দেয়া উচিত নয়।
প্র: ৪১ বছর হয়ে গেল, ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ আজও সমান জনপ্রিয়। এর ফলে কি আপনার অন্য গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা আড়ালে চলে গেল না?
উ: সে তো গেলই। অনেকে মনে করেন, এটাই আমার প্রথম উপন্যাস। তার আগে বেশ ক’টা উপন্যাস লিখেছি। ‘নীলকণ্ঠ’ শুধু সমান জনপ্রিয় বললে ভুল বলা হবে, এর বিক্রিও বেড়েই চলেছে। জীবদ্দশায় এটা দেখা বিরল সৌভাগ্য।
প্র: উপন্যাসটা পাঠকের কাছে কেন এত প্রিয়?
উ: তার কারণ কী জানো, ওখানে যেসব চরিত্র আছে, তারা কেউ কেউ রক্তের সম্পর্কের, বাকিরা পাশের বাড়ির অথবা আমার গ্রামের পাশের গ্রামের লোক। প্রকৃতি আমার আশপাশের গ্রামের। এখনো চোখ বুজলে গোটা অঞ্চলটা আমি দেখতে পাই। তরমুজ খেত, সোনালি বালির চর, পুকুরপাড়ে নিমগছে, নোনা ধরা ইটের প্রাচীর, মসজিদ...। আসল ব্যাপার হচ্ছে, যেকোনো লেখকের কাছে নিজের কৈশোরকালটা ভীষণ জরুরি, যার যত সেটা জাগ্রত, লেখাও তত জীবন্ত হয়।
প্র: ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, ‘অলৌকিক জলপান’, ‘ঈশ্বরের বাগান’, ‘মানুষের ঘরবাড়ি’—এ চারটে উপন্যাসে কি আপনি বাংলার একটা কালপর্বকে ধরার চেষ্টা করেছেন?
উ: না। দেশভাগ নিয়ে আরো অনেকেই উপন্যাস লিখেছেন। কালপর্ব সেখানেও ধরা আছে। আমার লেখাগুলো আমার জীবনের বড় দুঃখের, বড় মায়াময় অভিযান। আমি সেই সময়ের সন্তান। লেখার মধ্যে সেগুলোই প্রকাশ পেয়েছে।
প্র: আপনার সাহিত্যে যৌনতা প্রায়ই বিশেষ ভূমিকা পালন করে এসেছে। আখ্যানজুড়ে যৌনতার ওম। এ কি পাঠককে প্রলুব্ধ করার জন্য, নাকি আপনার লেখনীর স্বাভাবিক অভিব্যক্তি?
উ: এটা আমার একেবারে স্বাভাবিক। সুদীর্ঘকাল ধরে আমি যেটা উপলব্ধি করেছি, আমরা যে সংঘবদ্ধ হয়ে আছি, তার কারণ, এর মধ্যে একটি নারী আছে। যদি নারী না থাকত, তাহলে এ সমাজ, রাজনীতি, শিল্প সৃষ্টি কিছুই থাকত না। এ থাকাটাই মূল্যবান। আর এর কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে যৌনতা। আমি মনে করি, যৌনতাই প্রাণ, যৌনতাই সৃষ্টির উৎস, যৌনতাই ঈশ্বর। যৌনতা আমার কাছে ভোগের বস্তু নয়।
প্র: বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন বেশ কয়েকবার। বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন। কখনো ট্রাক ক্লিনার, তাঁত বোনার কাজ, জাহাজের কোলবয়, কারখানার ম্যানেজার, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা...আরো হয়তো কত কী! এত অস্থিরতা কেন? উদ্বাস্তু মানুষ তো থিতু হতে চায়। দ্রুত চারিয়ে দেয় শেকড়।
উ: এ অস্থিরতার কারণ আর কিছুই নয়, সংসারের অভাব। যে করে হোক রোজগার করতে হবে। টাকা পাঠাতে হবে বাবাকে। বাড়ি থেকে দূরে কাজ করতে যেতে দিত না। তাই পালাতে হতো। পরিবারের অনাহারক্লিষ্ট মুখ, মা-বাবার মলিন পোশাক আমাকে ভীষণভাবে বেদনাহত করত। ওপারে কত স্বাচ্ছন্দ্যে, সম্মানের সঙ্গে ছিলেন ওঁরা। এপারে কী নিদারুণ কষ্ট! অথচ কারোর কাছে হাত পাততে পারবেন না। আমার একটাই উদ্দেশ্য ছিল, এ পরিবারটাকে রক্ষা করতে হবে। দায়টা পরিবারের অন্য কেউ নিতে পারত, নেয়নি।
প্র: বিয়ে ও সংসার পাতার পর্বটা শুনি।
উ: জাহাজ থেকে ফেরার পর কৃষ্ণনাথ কলেজে বিকম পড়ছি। বন্ধুরা আমাদের সংসারের অভাবের কথা জানত। এক বন্ধু তার জামাইবাবুকে ধরে হাতিনগর প্রাথমিক স্কুলে টিচারের চাকরিতে ঢুকিয়ে দিল। স্পেশাল ক্যাডার, মানে উদ্বাস্তু হিসেবে চাকরি, ৮০ টাকা মাইনে। তিন বছর চাকরির মাঝে প্রাইভেটে বিকম পাস করি। বন্ধুরা নোটটোট এনে দিয়ে সাহায্য করেছিল। ডিগ্রিটা পেতেই ডিআই বললেন, তুমি বিটি পড়তে যাও। তখন বলা হয় পিজিবিটি। ওঁর কথা হচ্ছে, তুমি এত ভালো পড়াও, কতদিন প্রাইমারি স্কুলে পড়ে থাকবে। হাইস্কুলে পড়াতে হবে তোমাকে।
আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখেছি। আমার দুরবস্থা দেখে, বেদনা দেখে সবাই সবসময় খুব সাহায্য করেছে। সবেতন ছুটি পেয়ে বিটি পড়তে গেলাম। সেই বাবদ কিছু অ্যালাউয়েন্স পাওয়া যেত। স্কুলকে বললাম বেতনটা বাবাকে পাঠিয়ে দিতে। সামান্য হলেও সংসার সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছে। বিটি পড়তে গিয়ে আমার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ, মমতা। ও ট্রেনিং নিতে এসেছিল। আমার দুঃখে খুবই সমব্যথী ছিল সে। কিছুকাল মেলামেশার পর আমরা ঠিক করি বিয়ে করব। দুজনে চাকরি করলে বেশি টাকা দিতে পারব বাবাকে। সংসার সুন্দর হবে।
প্র: আপনার প্রেমের মধ্যে খানিক আর্থিক হিসাব-নিকাশও ছিল?
অবশ্যই ছিল। দরিদ্র্যতাড়িত জীবনে স্ত্রীর অবদান অনেক। লেখালেখিতে ও প্রচুর উৎসাহ দিত। প্রথম দিককার গল্প কপি করে দিয়েছে, আমার হাতের লেখা খারাপ। আমাদের দুই ছেলে যে এত প্রতিষ্ঠিত, এটা সম্ভব হয়েছে ওদের মায়ের কারণেই। ছেলেদের মানুষ করার ব্যাপারে আমি সেভাবে নজর দিতে পারিনি।
প্র: জীবনে আর কোনো প্রেম?
উ: (একচোট হেসে নিয়ে) আমার জীবনে অজস্র প্রেম। সুন্দরী মেয়েমাত্রই আমি প্রেমে পড়ে যাই। সে অনেক ঘটনা। (হঠাৎ সিরিয়াস) একজন এসেছিল। স্থায়ী হতে যাচ্ছিল। তাকে নিয়ে লিখেওছি। তবে নিজেই বেরিয়ে এসেছি সম্পর্কটা থেকে। ততদিনে আমি দুই সন্তানের পিতা। সংসারটা ভাঙার মতো নিষ্ঠুর হতে পারিনি।
প্র: কলকাতায় পাকাপাকিভাবে কবে চলে এলেন?
উ: সেটা ১৯৬৩। আগেও কলকাতায় থেকেছি, বেলেঘাটায়। চাউলপট্টি রোডে পিসির বাড়িতে থেকে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে আইকম পড়তাম। পরীক্ষাটা অবশ্য ওখান থেকে দিইনি। বিটির ট্রেনিংয়ের পর সাঁটুই সিনিয়র বেসিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলাম। আমার স্ত্রীও সেখানে পড়াতেন। প্রকৃতির মাঝে সুন্দর একটা কোয়ার্টারে থাকতাম। স্কুলের এক দুর্নীতিতে সায় দিতে না পেরে চাকরিটা ছাড়তে হলো দুজনকেই। খুব খারাপ সময় গেছে তখন। দুই ছেলে ছোট ছোট। আবার সেই এক বন্ধুর তদ্বিরে এবং তত্পরতায় চাকরি পেলাম শিয়ালদহ কাশিমবাজার রাজবাড়ির প্যাকেজিং কারখানায়। তখন থেকে শুরু হলো পাকাপাকিভাবে কলকাতায় থাকা।
প্র: কতদিন ছিলেন সেই চাকরিতে? তারপর তো সাংবাদিকতা করেছেন।
উ: বোধহয় আট বছর ছিলাম কারখানায়। ম্যানেজার পদ থেকে ইস্তফা দিই। সেখানেও মানাতে পারছিলাম না। ব্যবসায় কিছু অন্যায়, যা প্রায় নির্দোষ হিসেবে ধরা হয়, আমার হাত দিয়ে সেসব কাজ হলো না। তারপর স্যাঙ্গুইন প্রকাশনার রামায়ণী প্রকাশ ভবনের দায়িত্ব পেলাম। সেখান থেকে আমার বই বেরিয়েছে, শীর্ষেন্দুর বই, বরেনের গল্পসংগ্রহ, রমাপদ চৌধুরী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর প্রচুর বই আমার তত্ত্বাবধানে বেরিয়েছে। আবারো সেই দুর্নীতির কারণেই চাকরিটা ছাড়তে হলো। অমিতাভ চৌধুরী ডাকলেন যুগান্তর কাগজে। ‘নীলকণ্ঠ’ লিখে তখন বেশ খ্যাতি হয়েছে। অমিতাভ চৌধুরীকে বললাম, কাগজে চাকরি করব। ইংরেজি প্রায় কিছুই জানি না। উনি বললেন, আপনি রোজ যেতে-আসতে পারবেন তো, তাহলেই হবে। যথাসময়ে ওখান থেকে রিটায়ার করি। ‘যথাসময়ে’ বলাটা ঠিক হলো না, ওই যে সার্টিফিকেটে চার বছর কমানো ছিল, গ্রেস পেয়ে গেলাম। (হাসি)
প্র: আপনার লেখায় ‘মুক্তির স্বাদ’ ভাবনাটা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে এসেছে। সে মুক্তি ভীষণভাবে প্রকৃতিনির্ভর। কেন এত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা?
উ: দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্লেদ আমার সহ্য হয় না। বারবার দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছি। আপস করতে না পেরে বিপন্ন হয়েছি। শুধু টিকে থাকার জন্য অনেক কিছু মানিয়ে নিতে হয়েছে। এমনকি এখনো আমি এক ধরনের গ্লানিতে ভুগি।
প্র: কী রকম?
উ: এই যে, যে বাড়িতে আমি এখন আছি, প্রায় ৪০ বছর হয়ে গেল, সেটা আইনত সরকারের জমি। পাট্টা পাইনি। অথচ আমি কিনেছিলাম একটা কৃষি সমবায় থেকে। পরে জানা গেল, সমবায়ের স্বীকৃতি তুলে নিয়েছে সরকার। হিসাবমতো আমি আজও উদ্বাস্তু! এখানে সরকারি জমিতে কিন্তু হাইরাইজ হয়ে চলেছে। কোনোদিন এসব উচ্ছেদ হবে না। তবু নিজেকে দখলদার মনে হয়। এসব থেকে মুক্তি পেতে আমি প্রকৃতির কোলে ফিরে যেতে চাই। আমাদের বানজেটিয়া গ্রামটা ভীষণ টানে। যেটা এখন মণীন্দ্র কলোনি। বাবার সঙ্গে হাত লাগিয়ে জঙ্গল সাফ করে খড়ের চালের ঘর তুলেছি। কলেজ থেকে ফিরে গরু নিয়ে আলে আলে ঘাস খাওয়াতাম। দরকারে জনমজুরদের সঙ্গে নিড়েন দিতে বসে গিয়েছি নিজেদের জমিতে। বাবা প্রচুর গাছ লাগিয়েছিলেন। তাদের ডাল-পাতাতেই আমাদের জ্বালানির কাজ চলে যেত। বাড়ির কাছেই ছিল হিজলের বিল। সে প্রায় মাইলের পর মাইল। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের গ্রাম বিলের ওপারে। হেঁটে হেঁটে চলে আসত, আড্ডা হতো।
প্র: এখনো যান সেখানে?
উ: যেতে চাই। বাড়ির লোক মানা করে। তবু গিয়েছি। গাছটাছ কেটে বিক্রি হয়েছে। জমিও বিক্রি হয়েছে নানা ছলে-কৌশলে। এখন গেলে দূরে দাঁড়িয়ে বাড়িটা দেখি। ভাইয়েরা ডাকলেও যাই না। এখন ওখানেও মুক্তি নেই। মুক্তির আর কী-ই বা আছে, বয়স হয়ে গেল অনেক! মুক্তি চাই লেখা থেকেও। কেউ লেখা চাইতে এলে প্রচুর দাম হাঁকি। তাতেও অনেকে রাজি হয়ে যায়। বলি, এখন আমার সেই স্ট্যান্ডার্ড নেই। শোনে না।
প্র: কলকাতার লেখক বন্ধুদের কথা একটু বলুন।
উ: আমি যখন লিখতে এলাম, বহরমপুর থেকে সিরাজও লিখতে এল। ও বোধহয় এক বছর পর। তারপর শীর্ষেন্দু ছিল, দিব্যেন্দু ছিল, ছিল বরেন। সুনীলও ছিল, তবে কবিদের মধ্যেই ও বেশি থাকত। ওর সঙ্গে থাকত শক্তি। ওরা আলাদা টেবিলে বসত কফি হাউজে।
প্র: আর মতি নন্দী? শুনেছি মতি নন্দীর সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল আপনার।
উ: বন্ধুত্ব সবার সঙ্গেই মধুর ছিল। মতি কফি হাউজে বিশেষ আসত না। খুব দাম্ভিক ছিল তো। মতিই কিন্তু আমাকে কলকাতা চিনিয়েছে। চলন্ত ট্রামে কীভাবে নামতে হয়, উঠতে হয় শিখিয়েছে। মতিদের বাড়ি গিয়েছি। মতির মা পুত্রবৎসল ছিলেন। আমাকেও সেভাবেই দেখতেন। যত্ন করে খাওয়াতেন। শীর্ষেন্দুর ‘দেশ’-এর প্রথম গল্প পড়ে আমি যেচে আলাপ করি। তারপর খুব বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আমার বাড়ির রাস্তায় এক মেসে থাকত, ওখানে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মেরেছি। ও আমার কাশিমবাজারে রাজবাড়ির বাসায় অনেকবার এসেছে। অনেকেই এসেছে।
প্র: নিজেদের লেখা নিয়ে আলোচনা?
উ: সেটা খুব একটা হতো না। ওই আড্ডাটা হতো বিমল করকে ঘিরে। সমরেশ মজুমদার আসত। ও আমাদের মধ্যে জুনিয়র। আমরা সবাই বিমলদার কাছে লেখালেখির এক ধরনের উত্তাপ পেতাম। বরাবরই বিমলদার লেখার আমি অনুরাগী। গদ্যে ওর পরিমিতি, সিম্বলিক অ্যাফেক্ট আমায় ভীষণ টানত। আমাদের মধ্যে অনেকেরই গোড়ার দিককার লেখায় বিমলদার গদ্য ভঙ্গির প্রভাব ছিল। আশ্চর্যভাবে আমার ছিল না। আমি প্রায় ওঁর ভিন্ন মেরু থেকে লিখতাম। উনি কিন্তু আমার লেখা খুবই পছন্দ করতেন। দরকারমতো সাজেশন দিতেন। বিমলদার প্রেসারেই আমি ‘দেশ’ পত্রিকায় অতটা গল্প লিখতে পেরেছি। ওঁর সঙ্গে আমার ছিল সাহিত্য-রক্তের সম্পর্ক।
প্র: গদ্যে আপনার এ কাব্যিক অবলোকন আপনি আয়ত্ত করলেন কীভাবে? এটা যদি হয় স্বকীয়তা, উৎসটা কোথায়?
উ: আমি খুব সাধারণ গদ্যে বাক্য লিখতে পারি না। আমার ভেতর একটা এলোমেলো ব্যাপার আছে। এগুলোই হয়তো এক ধরনের কাব্যের রূপ নেয়। কাব্য হিসেবে আমি লিখছি না, অথচ হয়ে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ থেকে যে চালু গদ্য চলে আসছে, সেটা আমি কিছুতেই লিখতে পারি না। একটা দরখাস্তও গুছিয়ে লিখতে পারি না আমি।
প্র: আপনার প্রিয় সাহিত্যিক?
উ: প্রিয় সাহিত্যিক বলতে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বুড়ো আংলা পড়ে আমি যেভাবে অভীভূত হয়েছি, আর কোনো লেখা পড়ে অতটা হইনি। অদ্ভুত রহস্যময় সে জগৎ, কী অপূর্ব সেই কল্পনা! ওঁকে বাদ দিলে অনেকেই আমার প্রিয় লেখক। যেমন বিভূতিভূষণ, ‘পথের পাঁচালী’ অসাধারণ। তারপর বিমালদা তো আছেনই, রমাপদ চৌধুরী। সমরেশ বসুর কালকুটের গদ্য আমার খুব ভালো লাগত। ওর স্বনামের গদ্য ততটা ভালো নয়। আমার মনে হয়, এ গদ্যরীতিতে তিনি নিজের প্রতিই অবিচার করেছেন।
প্র: তারাশঙ্কর, মানিক, এমনকি রবীন্দ্রনাথকেও বাদ রাখলেন?
উ: রবীন্দ্রনাথ তো বিশাল ব্যাপার। এক সারিতে বসাই কী করে! তবে ওঁর উপন্যাস নিয়ে আমার রিজার্ভেশন আছে। ডায়ালগ পোরশন বড় পোশাকি। রবীন্দ্রনাথের গান অসাধারণ। রবীন্দ্রসংগীত শুনতে শুনতে লেখা একসময় আমার অভ্যাস ছিল। একটি টিউন তৈরি হয়ে যেত মনে মনে। তারাশঙ্করও খুব বড় লেখক। তবু বলব, কাহিনী ও ঘটনার ঝোঁক বেশি। ওঁর কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল, ‘নীলকণ্ঠ’ লেখার আগে আমি একই জায়গা, একই চরিত্র নিয়ে, নামও তাদের এক, পর পর কয়েকটা গল্প লিখেছি। সেগুলো জুড়েই ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসটা শুরু হয়। তারাশঙ্করও প্রথমে আমায় বলেছিলেন, গল্পগুলো পড়ছি, মনে হচ্ছে বড় কোনো কাজে হাত দিতে যাচ্ছেন? তখন তাঁর বিশাল খ্যাতি। আমাদের মতো নতুনদের লেখা পড়েন। আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম।
প্র: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়?
উ: ‘পদ্মানদীর মাঝি’ ছাড়া আমার আর কিছুই তেমন উঁচুদরের মনে হয় না। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় শশীকে কলকাতায় নিয়ে এসে পুরো উপন্যাসটাকে তিনি মাটি করেছেন। কিছু ভালো গল্প যেমন লিখেছেন, অজস্র খারাপও লিখেছেন। পার্টি ও বামপন্থীরা তাঁকে বড় বেশি মাথায় তুলেছে। আমি খুঁটিয়ে পড়ে এ কথা বলছি। বোঝার চেষ্টা করেছি, কেন লোকে তাঁকে এত বড় লেখক বলে। ওঁকে মহান বানাতে গিয়ে তারাশঙ্কর, বিভূতিকে অবহেলা করা হয়েছে সে সময়।
প্র: অজস্র গল্প লিখেছেন আপনি। বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট কয়েকজন গল্পকারের চেয়েও বেশি। তবু ঔপন্যাসিক হিসেবেই আপনার খ্যাতি বা পরিচিতি হলো অধিক, কেন?
উ: এ ব্যাপারে আমার নিজস্ব একটা ব্যাখ্যা আছে। চটক, চমক, আর কী বলে মোচড়। এসবে আমি বিশ্বাস করি না। যাদের গল্পে এসব আছে, জনপ্রিয় হয় বটে, গল্পটা কিন্তু ওখানেই শেষ হয়ে যায়। আমি মনে করি, যেসব গল্পে অতি নাটকীয়তা থাকে, তাতে সাহিত্যের মাধুর্য নষ্ট হয়ে যায়। (একটুখানি ভেবে নিয়ে) আমি কিন্তু গল্পের বইয়েই সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছি।
প্র: সেটা কি আপনাকে যথাসময়ে দেয়া হয়েছে? কিংবা যথাযথ বইয়ের জন্য? কেননা ওই গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারটি দেয়ার মতো অনেক অনন্য লেখাই তো তার আগে লেখা হয়ে গেছে আপনার।
উ: (একটু বিমর্ষ) হ্যাঁ। আমার আগে অনেক জুনিয়ররা পেয়ে গিয়েছে। হয়তো পেতামই না। সুনীল সাহিত্য অকাদেমির সভাপতি হওয়ায় পেলাম। তবে আমি পুরস্কার নিয়ে ভাবি না। অনেক পেয়েছি। সবচেয়ে বড় পুরস্কার এতদিন ধরে লিখে যেতে পারা। পাঠক আমাকে নিয়েছে। আনন্দবাজার হাউজ কত নতুন লেখককে সুযোগ দিয়েছে, এক্সপেরিমেন্ট করেছে, কোথায় হারিয়ে গিয়েছে তারা। কেউ মনে রাখেনি। বড় কাগজে না লিখেও আমি তো আজও টিকে আছি।
প্র: প্রথম উপন্যাস লিখেই পেয়েছিলেন ‘মানিক স্মৃতি পুরস্কার’। সেই সময়কার অনুভূতিটা বলুন।
উ: (হাসতে হাসতে) সে আর বোলো না। তার আগে ছোট কাগজে দুটি মাত্র গল্প আমি লিখেছি, ‘কার্ডিফের রাজপথ’, ‘বাদশা মিঞা’। নতুন লেখক সন্ধানে ‘উল্টোরথ’ পত্রিকা উপন্যাস প্রতিযোগিতা ঘোষণা করল। আমার সেই বহরমপুরের বন্ধুরা চেপে ধরল। তারা তখন অনেকেই কলকাতায় চলে এসেছে। বলল, তুই লেখ। জাহাজের জীবন নিয়েই লেখ উপন্যাসটা। লিখতেই হবে তোকে। দেবব্রত, (ভেবে নিয়ে) টাইটেলটা মনে পড়ছে না। দেবপ্রিয় চট্টোপাধ্যায়, রবি সেন, প্রশান্ত কান্তি সেনগুপ্ত, সুধীন মজুমদার, এরা আমায় লেখার ব্যাপারে সবসময় উৎসাহ দিয়েছে। আমার দুর্দশায় সর্বদা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এসব বন্ধু সঙ্গে না থাকলে আজ হয়তো আমি এখানে এসে পৌঁছতে পারতাম না। তো সেই ওদের চাপাচাপিতেই লিখলাম ‘সমুদ্র মানুষ’। সম্ভবত ২০০ নাকি ৪০০ উপন্যাস জমা পড়েছিল। ঝাড়াই-বাছাই করতে এক বছরের ওপর লেগে গেল। বাছাই পর্বে প্রথমে হয়তো ১০০ জনের নাম আছে, লিস্টে আমি আছি। বন্ধুদের তাতেই কী উৎসাহ! তারপর ৫০ জনে আছি। বন্ধুদের খাওয়াতে হলো। ২৫ জনে থাকার সময় উত্তেজনা চরমে। খাওয়াদাওয়া, হইচই চলছে। অবশেষে তিনজন। পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘দাঁড়ের ময়না’, মতির ‘ধুলোবালির মাটি’, কে ফাস্ট, কে সেকেন্ড মনে নেই। আমি থার্ড। লীলা মজুমদার, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়রা বিচারকদের মধ্যে ছিলেন। পুরস্কার যখন নিতে আসি, এঁরা বলেছিলেন, উপন্যাসটা কোনো বাঙালির লেখা বলে আমাদের মনে হয়নি। অল্প বয়সী বাঙালির এত দেশ, বিদেশ, সমুদ্রের অভিজ্ঞতা কোথায়? সন্দেহ হচ্ছিল কাহিনীটা কোথাও থেকে চুরি কিনা। বন্ধুরা বলল, ওই সন্দেহেই তোকে থার্ড পজিশনে দিয়েছে। (একটু থেমে) ‘সমুদ্র মানুষ’ কিন্তু আজও ভালোই বিক্রি হয়।
প্র: পুরস্কার পেয়ে বেশ নিশ্চয়ই একটা কনফিডেন্স এসে গেল।
উ: কনফিডেন্স আজও আমার নেই। এটুকু বুঝলাম, যা লিখি, তা-ই লেখা হয়ে যায়। ভেতরে একটা তার, মানে তন্ত্রীতে কম্পন তৈরি হলেই লেখা আপনিই সঠিক পথে চলতে শুরু করে। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, ওই পুরস্কার প্রাপ্তিতে কলকাতার অনেকেই নাক কুঁচকেছিলেন, কোথাকার এক গ্রামের ছেলে এতজনের মধ্য থেকে পুরস্কার নিয়ে চলে গেল। তারা সব ইন্টেলেকচুয়াল।
প্র: ইন্টেলেকচুয়ালদের আপনি ভয় পান?
উ: আজীবন পেয়ে এসেছি। বিমলদাকে ঘিরে কয়েকজন থাকত, যাদের মুখে সবসময় কামু, কাফকা, আরো সব লাতিন আমেরিকান লেখকদের নাম। আমি পড়ে দেখেছি, এদের নিয়ে কী এত ওদের স্ফূর্তি, কেন এত প্রশংসা, বুঝি না। আরে, ওদের জীবনযাপন, ভাবনা, বিবেচনা তো আমাদের দেশের জল-মাটির সঙ্গে মেলে না। আমাদের জীবনধারা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ওঁদের মতো নয়। ও রকমভাবে লিখলে আমাদের চলবে কেন? এই যে ওঁরা বলেন স্যুররিয়ালিজম, এ তো আমাদের রামায়ণ-মহাভারত থেকে চলে আসছে...
প্র: আপনার লেখাতেও আছে?
উ: আছে, আমি বুঝে লিখিনি। যেমন যেমন চিন্তা মাথায় এসেছে, লিখেছি।
প্র: ছোটদের লেখা লিখতে কেমন লাগে? লিখেছেন অনেক? বড়দের লেখার মাঝে কি একটু রিলিফ ফিল করেন?
উ: দেখো, ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’র দেড়খানা অধ্যায় বাদ দিলে এটা প্রায় কিশোরদেরই বলা যায়। আমার লেখার ধরনটাই এ রকম। আলাদা করে রিলিফ কিছু বোধ করি না। ছোটদের, বড়দের সব মিলিয়ে আমি সত্যিই অনেক লিখেছি, এমনকি থ্রিলারও লিখেছি আনন্দবাজার রবিবাসরীয়তে ধারাবাহিক হিসেবে। রমাপদ চৌধুরী বলেছিলেন লিখতে। আমি তো ঘাবড়ে গেলাম। আমার গদ্যে কি থ্রিলার চলবে? তাছাড়া থ্রিলার লেখার জন্য আলাদা মন-মেজাজ দরকার। দু-একটা দিন ভেবে নিয়ে রমাপদবাবুকে সবিনয়ে জানালাম, আমার দ্বারা থ্রিলার হবে না। অসম্ভব। রমাপদবাবু বললেন, ঠিকই হবে। একান্তই যদি অসুবিধা হয়, প্রথমেই একটা ক্যারেক্টারকে মেরে ফেলুন, মানে খুন। তাহলেই দেখবেন লেখা এসে যাচ্ছে। (হাসতে হাসতে) তাই করেছিলাম। লেখা হলো, ‘সমুদ্রে বুনো ফুলের গন্ধ’।
প্র: এত লিখতে হলো কেন?
উ: অর্থকষ্ট। অর্থকষ্টই আমার লেখার অনুপ্রেরণা। বড় কাগজ থেকে লেখার ডাক বেশি আসেনি। ছোট কাগজে অনেক লিখে উপার্জন করতে হয়েছে। আমি যে ছোটদের জন্য অনেক লিখেছি, পাঠক জানতে পারল সংকলনগুলো প্রকাশ হওয়ার পর। ছোটদের বড় কাগজ ‘আনন্দমেলা’য় আমার একটাই উপন্যাস বেরিয়েছে, ‘বিন্নি ধানের খই লাল বাতাসা’। কিছু গল্প অবশ্য এখানে বেরিয়েছে।
প্র: বড় কাগজ থেকে লেখার ডাক না পাওয়ার কারণ?
উ: এর জন্য দায়ী আমার চরিত্রটা। কী বলব, একটু বোকা বোকা, অপরিশীলিত। কোথায় কী বলতে হয় জানি না। যেখানে সেখানে যা ইচ্ছে বলে দিই। সবাই মনে করে, ও একটা গেঁয়ো। ও আবার কী লিখবে? এ রকম একটা ভাবনা বোধহয় বড় কাগজের কর্তৃপক্ষের মধ্যেও ছিল। বড় হাউজের একমাত্র বিমলদাই আমাকে লেখার জন্য বারবার উৎসাহ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, একবার অলোকরঞ্জন, সুনীলের সঙ্গে মোকামপুরে যাচ্ছি। অলোকরঞ্জনকে প্রথম এত কাছ থেকে দেখছি। ওর কথাবার্তা শুনে সুনীলকে বললাম, এ কী ও কি বাঙালি!
আমার কাছে সেই তুমি যে রকম, সে রকমভাবেই কথা বলো। একটু টুইস্ট করে, ছেলে মনে করে চেপে মেপে...দিব্যেন্দুর মধ্যেও এ ব্যাপারটা ছিল। আমার এসব বড্ড কৃত্রিম মনে হয়। হয়তো এক ধরনের অভিনয়দক্ষতা লাগে। আমি ও রকম স্মার্ট হতে পারিনি। স্বাভাবিকভাবেই ওই ছাপ আমার লেখায়ও আসেনি। প্রথম সারির কাগজে আমার লেখার বিশেষ চাহিদা না থাকার এটা একটা কারণ হতে পারে।
প্র: ‘অলৌকিক জলযান’-এ যে হোমোসেক্সুয়ালিটির ইঙ্গিত আমরা পাই, তা কি এ সময়ে লিখলে আরো স্পষ্ট হতো?
উ: এটাকে বোধহয় ঠিক হোমোসেক্সুয়ালিটি বলা যায় না। দীর্ঘদিন নারী বিবর্জিত হয়ে সমুদ্রে কাটালে এক ধরনের হ্যালুসিনেশন, ইলিউশন তৈরি হয়। পুরুষের মধ্যে নারীর ইমেজ খোঁজে নাবিক। পিপাসার্তের মতো ডাঙার জীবন দূরবীণ দিয়ে দেখে। কোনো নারীকে দেখতে পাওয়া তখন বিরাট প্রাপ্তি। মানুষের জীবনকে খুঁটিয়ে দেখার আর্তি অথবা স্বভাবটা আমি বোধহয় বেশ কিছুকাল জাহাজে থাকার কারণেই অর্জন করেছি। আরেকটা কথা, জাহাজের যে কিশোরটির প্রতি অনুরাগ তৈরি হয়েছিল আমার, তারও হয়েছিল আমার ওপর। সে আসলে নারীই ছিল। ছদ্মবেশে থাকত, উপন্যাসের শেষের দিকে আমি দেখিয়েছি।
প্র: কতদিন ছিলেন জাহাজে?
উ: সঠিক হিসাব দেয়া মুশকিল। সমুদ্রের মাঝে দিন-রাত গুলিয়ে যেত। ঋতু টের পেতাম না। যতদূর দৃষ্টি যায় উত্তাল জলরাশি, বিপুল আলস্য আসত শরীরে। দিনের হিসাব করতে ইচ্ছে হতো না। কখনোসখনো আপার ডেকে টাঙানো নোটিস বোর্ড থেকে জেনে আসতাম আজ কত তারিখ। বেশ কয়েকবার সমুদ্রঝড়, সাইক্লোনে পড়েছি। ঝড় থামলে বেঁচে যে আছি, বিশ্বাস করতেই অনেকক্ষণ কেটে যেত। আমাদের জাহাজটাও ছিল জোড়াতালি দেয়া। তরুণ অবস্থায় জাহাজে উঠেছিলাম, ফিরলাম পূর্ণ যুবক হয়ে।
প্র: বাংলা সাহিত্য কি এগোচ্ছে?
উ: অবশ্যই এগোচ্ছে। একটা আশঙ্কাও হচ্ছে, শেষমেশ ইংরেজি সাহিত্যে গিয়ে মিশে না যায়। নাগরিক জীবন, ব্যক্তিমানুষের সংকট নিয়ে বেশি লেখা হচ্ছে। এসবই পশ্চিমি দেশগুলোর অনুকরণ, ওদের সাহিত্য ইদানীং কম পড়া হয়। টিভিতে সিনেমা দেখি। যোনির শুদ্ধতা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। কী বলছি বুঝতে পারছো তো? সৃষ্টির জন্য আরাধ্য যে স্থান, তাকে কলুষিত করছে মানুষ নিজে। মেয়ের ১২ বছর বয়স হয়ে গেলেই মা তার ব্যাগে পিল ঢুকিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে। সম্ভ্রম, অপেক্ষা, রহস্যময়তার মধ্য দিয়ে যে নতুন প্রাণ আসবে পৃথিবীতে, তার ক্ষেত্রটাকে বড্ড সস্তা করে ফেলা হচ্ছে। আমি চাই কোনো পাওয়ারফুল লেখক এর বিপরীত স্রোতের লেখা লিখুক।
প্র: জীবনের প্রায় সব সার্থকতা স্পর্শ করে ফেলেছেন। এখন নিশ্চয়ই আর কোনো ব্যক্তিগত সংকটে ভোগেন না?
উ: ভুগি। ভীষণভাবে ভুগি। একসময় পরিবার, নিকটজনদের সাহায্যের জন্য কী পরিশ্রম করেছি, লিখেছি নিরন্তর। এখন আমার টাকাপয়সা হয়েছে। ভালো রয়্যালটি পাই। কয়েকদিন আগে অনেক টাকার একটা পুরস্কার পেয়েছি। কিন্তু এখন কেউ আমার সাহায্যের পরোয়া করে না। আমাকে ঘিরে থাকা আত্মজনেরা এখন সবাই বেশ সচ্ছল। কোথায় যেন নিজের গুরুত্বটাই কমে গিয়েছে।
প্র: কোনো একটা বিশেষ ভুল, জীবনসায়াহ্নে এসে শুধরে নিতে ইচ্ছে করে?
উ: (অনেকক্ষণ ভাবার পর অনাবিল হাসি) আমার গোটা জীবনটাই তো ভুলে ভরা। কোনটা শোধরাব। সংসারে খারাপ অবস্থা জেনেও বারবার চাকরি ছেড়েছি। বাজে লোককে চিনতে না পেরে ঠকেছি। লিখতেও চলে এসেছি ভুল করে। যশ-খ্যাতির আগ্রহ আমার কোনোদিনই ছিল না। লেখক পরিচয়ের কোনো ফায়দা তুলতে পারিনি। গুণ্ডা, মাতাল বাড়ি এসে অযথা গালাগাল দিয়েছে, ভয় দেখিয়েছে, রাজনৈতিক পার্টি ধরে তাদের শাস্তি দিতে পারিনি। তাহলে যে পার্টিও আমাকে কাজে লাগাবে। বিদেশে যেতে গেলে যাদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে হয়, করিনি। যাওয়া হয়নি। কত সাধারণ লেখক ঘোটের মধ্যে ঢুকে চলেছে। আসলে আমি কোনোদিন খুব একটা অর্গানাইজড নই। আমার এক্সপ্রেশনটাই এলোমেলো। লেখাটাই আমার এক্সপ্রেশন। হয়তো সে কারণেই আমার পাঠকরা আমাকে এত ভালোবাসেন।
সৌজন্যে: বইয়ের দেশ, এপ্রিল-জুন, ২০১২






